📄 কুরায়শ নেতাদের গোপনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠ শ্রবণ
আবু জাহলের কথাটা যখন তাদের মুখে মুখে রটে গেল , তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) যেই নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন পড়তেন , অমনি তারা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যেত এবং তাঁর কুরআন পাঠ শুনতে চাইত না । তাদের কেউ যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কুরআন পাঠ শুনতে চাইত , তা হলে সে তাদের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তা শুনত । সে যদি দেখত যে , কেউ তার শোনার ব্যাপারটা জেনে ফেলেছে , তাহলে সে তাদের নির্যাতনের ভয়ে দ্রুত চলে যেত এবং শুনত না । আর যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নিচু স্বরে কুরআন পাঠ করতেন , তবে গোপনে শ্রবণকারী মনে করত যে , অন্য লোকেরা তাঁর কুরআন পাঠের কিছুই শুনছে না এবং সে তাদের অগোচরেই শুনতে পাচ্ছে । তাহলে সে তা কান লাগিয়ে শুনতে থাকত ।
ইবন ইসহাক বলেন উমর ইবন উসমানের আযাদকৃত দাস দাউদ ইবন হুসায়ন আমাকে বলেছেন যে , ইব্ন আব্বাসের আযাদকৃত দাস ইকরামা জানিয়েছেন যে , আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস তাঁকে বলেছেন : “ তুমি সালাতে স্বর উঁচু করো না এবং অতিশয় নিচুও করো না । এ দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন কর । ” ( ১৭ : ১১০ ) । এ আয়াতটি ঐ সকল ব্যঙ্গ - বিদ্রূপকারী কাফিরদের উদ্দেশ্যেই নাযিল হয় । আয়াতের মর্মার্থ এই যে ,
এত উচ্চস্বরে নামায পড়ো না , যাতে তারা তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যায় , আর এত নিচু স্বরেও পড়ো না , যাতে কুরআন শুনতে ইচ্ছুক কোন ব্যক্তি যদি সংগোপনে কিছু শুনতে চায় , তবুও সে শুনতে পায় না । কেননা লুকিয়ে লুকিয়ে শোনাতেও হয়তো কুরআনের দু'একটা কথা তার মনে বদ্ধমূল হতে পারে , ফলে সে এ দ্বারা উপকৃত হবে ।
যিনি সর্বপ্রথম উচ্চস্বরে কুরআন পড়েন
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াহইয়া ইবন উরওয়া ইবন যুবায়র তাঁর পিতার থেকে শুনে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর পর যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করেন , তিনি হচ্ছেন আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ ( রা ) । একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবিগণ সমবেত হয়ে বললেন : আল্লাহ্র কসম ! কুরায়শরা কখনো তাদের সামনে কাউকে উঁচুস্বরে কুরআন পড়তে শোনেনি । এ কুরআন তাদের শুনিয়ে পড়তে পারে এমন কেউ আছে কি ? তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন মাসউদ বললেন : আমি পারি । তাঁরা বললেন : তোমার উপর তারা আক্রমণ করবে , আমরা এ আশংকা করছি । আমরা চাইছি , এমন কেউ এগিয়ে আসুক , যার এমন আত্মীয় - স্বজন রয়েছে , যারা তাকে কুরায়শদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারবে ।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন মাসউদ বললেন : তোমরা আমাকে এ কাজটি করতে দাও । আল্লাহ্ আমাকে রক্ষা করবেন । পরদিন ইবন মাসউদ ( রা ) দুপুরের সময় কাবার চত্বরে পৌঁছলেন । তখন কুরায়শ নেতারা তাদের আড্ডাখানায় যথারীতি উপস্থিত ছিল । তিনি মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়িয়ে উঁচুস্বরে বিসমিল্লাহ সহ সূরা আর - রাহমান পড়তে পড়তে সামনে এগুতে লাগলেন । এ সময় কুরায়শ নেতারা মনোযোগ দিয়ে তা শুনল এবং তারা বলতে লাগল : উম্মে আবদের ছেলে কী বলল ? তারা নিজেরাই বলল : সে নিশ্চয়ই মুহাম্মদের কাছে আসা বাণীসমূহের কিছু একটা পড়েছে । এ বলে তারা সবাই একযোগে তার দিকে ছুটল । সবাই তার মুখমণ্ডলে আঘাত করতে লাগল । আর তিনি নির্বিকারভাবে পড়ে যেতে লাগলেন । এরপর যতদূর পড়া আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল , ততদূর পড়ে তিনি স্বীয় সংগীদের কাছে চলে গেলেন । আর তাঁর চেহারায় কুরায়শদের আঘাতের চিহ্ন ফুটে উঠল । তাঁর সংগীরা তাঁকে বললেন , আমরা তোমার উপর এ বিপদ নেমে আসার আশংকা করছিলাম । তিনি বললেন , আল্লাহর দুশমনরা আজ আমার দৃষ্টিতে যত তুচ্ছ , এরূপ আর কখনো ছিল না । তোমরা যদি চাও , তবে আমি আগামীকালও তাদের সামনে আবার এরূপ করব । সবাই বললেন , না , যথেষ্ট হয়েছে । তারা যা শুনতে চায় . না , তা তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দিয়েছ ।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠ শুনে আখনাসের মনে প্রশ্ন
ইবন ইসহাক বলেন : মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম ইন শিহাব যুহরী আমাকে বলেছেন যে , তিনি শুনেছেন , একদিন রাতে আবু সুফিয়ান ইবন হারব , আবূ জাহল ইবন হিশাম এবং বনু যুহার মিত্র আখনাস ইবন শুরায়ক ইবন আমর ইবন ওয়াহ্ব সাকাফী - রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কুরআন পাঠ শুনতে বেরিয়ে পড়ল । এ সময় তিনি নিজের ঘরে রাতের নামায আদায় করছিলেন । এ তিনজনের প্রত্যেকে এক - একটা জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে বসে এবং তাঁর অর্থাৎ রাসূল (সা:) -এর কুরআন পাঠ শুনতে লাগল । তিনজনের কেউই তার অপর সাথীর উপস্থিতির কথা জানতে পারেনি । কুরআন শুনতে শুনতে তারা সারারাত কাটিয়ে দিল । যখন ভোর হল , তখন প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ল । কিন্তু পথিমধ্যে সকলের দেখা হয়ে গেল । তখন তারা একে অপরকে তিরস্কার করে বলল , খবরদার ! এমন কাজ আর কখনো করবে না । যদি তোমাদের নির্বোধ লোকেরা এভাবে তোমাদের দেখে ফেলে ; তাহলে তাদের মনে তোমাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হবে । তারপর তারা সবাই চলে গেল । পরদিন রাতে আবার তিনজনই নিজ নিজ গোপন জায়গায় গিয়ে বসল এবং সারারাত ধরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কুরআন পড়া শুনল । ভোর হলে তারা স্ব - স্ব স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ল , কিন্তু পথিমধ্যে সকলের দেখা হয়ে গেল । তারপর তারা আগের দিনের মত পরস্পর কথাবার্তা বলল । তারপর চলে গেল । তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটল । এবার তারা এ মর্মে অঙ্গীকার করল যে , ভবিষ্যতে তারা আর এরূপ করবে না । এ বলে তারা যার যার পথে চলে গেল ।
পরদিন সকালে আখনাস ইবন ওবায়ক তার লাঠি নিয়ে রওয়ানা হল এবং আবু সুফিয়ানের কাছে এসে বলল , হে আবূ হানযালা ! তুমি মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনলে , সে সম্পর্কে তোমার মতামত আমাকে জানাও । সে বলল , হে আবূ সা'লাবা ! শোনো , আল্লাহ্র কসম ! কিছু কথা এমন শুনলাম যা আমি জানি এবং তার অর্থও বুঝি । আবার কিছু কথা এমনও শুনলাম যার অর্থ ও মর্ম আমার জানা নেই । তখন আখনাস বলল : “ আল্লাহ্র কসম ! আমার অবস্থাও তথৈবচ ।
এরপর আখনাস তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবূ জাহলের বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা করে বলল : “ হে আবুল হিকাম ! মুহাম্মাদের কাছ থেকে যা শুনলে , সে সম্পর্কে তোমার অভিমত কি ? ” সে বলল : আমি কি শুনলাম ! আমরা এবং বনূ আব্দ মানাফ কুরায়শ বংশের এ দু'টি শাখাগোত্র দীর্ঘকাল ধরে মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছি । আপ্যায়ন ও ভোজের আয়োজন তারাও করেছে , আমরাও করেছি । সামাজিক দায় - দায়িত্ব তারাও বহন করেছে , আমরাও করেছি । সব কিছুতে তারাও বদান্যতা দেখিয়েছে , আর আমরাও দেখিয়েছি । এভাবে যখন আমরা সমান তালে চলেছি , তখন হঠাৎ তারা দাবি করল , আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন , যার কাছে আসমান থেকে ওহী আসে । এ পর্যায়ে আমরা কিরূপে তাদের সমকক্ষ হব ? আল্লাহ্র কসম ! আমরা তার ওপর কখনো ঈমান আনব না এবং তাঁকে সত্যবাদী বলে স্বীকৃতি দেব না । রাবী বলেন , এ কথা শুনে আখনাস তার কাছে থেকে বিদায় নিল ।
📄 কুরআন শোনার ব্যাপারে কুরায়শদের ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি
ইবন ইসহাক বলেন : যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কুরায়শদের সামনে কুরআন পাঠ করতেন "এবং তাদের আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দিতেন , তখন তারা তাঁকে উপহাস করে বলত : তুমি যার প্রতি আমাদের আহবান করছ , সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ আচ্ছাদিত । কাজেই তুমি যা বলছ তা আমরা বুঝতে পারছি না । আর আমাদের কানে আছে বধিরতা , তুমি যা বলছ তার কিছুই আমরা শুনতে পাচ্ছি না এবং তোমার ও আমাদের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা , যা অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে । সুতরাং তুমি তোমার কাজ করে যাও , আর আমরাও আমাদের কাজ করে যাই । আমরা তোমার কোন কথাই বুঝি না ।
তাদের এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের ওপর এ আয়াত নাযিল করেন : “ আর তুমি যখন কুরআন পাঠ কর , তখন তোমার ও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না , তাদের মাঝে একটা প্রচ্ছন্ন পর্দা রেখে দিই । ” ... “ তোমার প্রতিপালক এক , এ কথা যখন তুমি কুরআন থেকে আবৃত্তি কর , তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তারা সরে পড়ে । " ( ১৭ : ৪৫-৪৬ ) । আমি যদি তাদের কথামত সত্যিই তাদের অন্তর ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে রাখতাম , তাদের কানে ছিপি এঁটে দিতাম এবং তাদের ও তোমার মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে রাখতাম , তাহলে তারা তোমার প্রতিপালকের একত্ব কিভাবে বুঝত ? অর্থাৎ আমি এ কাজ করিনি । আল্লাহ্ বলেন , যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শোনে , তখন তারা কেন কান পেতে শোনে তা আমি ডাল জার্নি এবং এও জানি , গোপনে আলোচনাকালে যালিমরা বলে , তোমরা তো এক জানুান্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছো । ” ( ১৭ : ৪৭ ) । অর্থাৎ আমি তোমাকে তাদের কাছে যে বাণী দিয়ে পাঠিয়েছি , তা বর্জন করা তাদের পারস্পরিক আলোচনাক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্তের ফল । দেখ , তারা তোমার কী উপমা দেয় ! তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না । ” ( ১৭ : ৪৮ ) । অর্থাৎ তারা তোমার ভুল উপমা দেয় । ফলে তারা এ কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করতে পারে না এবং এ সম্পর্কে তাদের কোন মন্তব্যই সঠিক নয় । তারা বলে , “ আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হলেও কি মুন সৃষ্টিরূপে পুনরুপিত হব । ” ( ১৭:৪৯ )
অর্থাৎ তুমি আমাদের একথা জানাতে এসেছ যে , আমরা মরার পর যখন অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হব , তখন আমাদের পুনরুত্থিত করা হবে ; এটা হতেই পারে না । বল , তোমরা হয়ে যাও পাথর অথবা লোহা , অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ; তার বলবে , কে আমাদের পুনরুত্বিত করবে ? বল , তিনি - ই , যিনি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন । ” ( ১৭ : ২০-২১ )
অর্থাৎ তিনি তোমাদের যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন , তা তোমরা জান । সুতরাং তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করা আল্লাহর নিকট তার চেয়ে কঠিন নয় ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন আবূ নুজায়হ মুজাহিদ থেকে এবং মুজাহিদ ইবন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন । মুজাহিদ বলেন , আমি ইবন আব্বাস ( রা ) -কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে , আল্লাহ্ তা'আলা “ অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ” এ কথা দিয়ে কি বুঝিয়েছেন ? তখন ইবন আব্বাস ( রা ) বললেন তিনি এ থেকে মৃত্যু বুঝিয়েছেন ।
📄 ইসলাম গ্রহণকারী দুর্বল লোকদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতন
ইবন ইসহাক বলেন এরপর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর অনুসারী হয়েছিলেন , সেই সাহাবীদের ওপর মুশরিকরা নিপীড়ন - নির্যাতন শুরু করল । আর প্রত্যেক গোত্র তার ভেতরকার মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও নির্যাতন চালাতে লাগল এবং তাদের ধর্ম থেকে তাদেরকে বল প্রয়োগে ফেরাতে উদ্যত হল । কিন্তু আল্লাহ্ তাঁদেরকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করলেন ।