📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শ নেতাদের প্রশ্ন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জবাব

📄 কুরায়শ নেতাদের প্রশ্ন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জবাব


এরপর তারা রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর কাছে এল এবং বলল হে মুহাম্মদ । প্রাচীনকালে যে একদল যুবক উধাও হয়ে গিয়েছিল , তাদের সম্পর্কে আমাদের অবহিত কর । তাদের ঘটনাটা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর । আর অপর একজন পর্যটকের কাহিনী শোনাও । যিনি সমগ্র প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পরিভ্রমণ করেছিলেন । আর আত্মা কি ? তা আমাাদের জানাও ? রাবী বলেন , তখন রাসূলুল্লাহ (সা:) তাদের বললেন , তোমরা আমাকে যা যা জিজ্ঞেস করেছ , তা আমি তোমাদের আগামীকাল জানাব । তবে তিনি ' ইনশাআল্লাহ ' বা আল্লাহ যদি চান এ কথাটি বলেন নি । এ কথা শুনে কুরায়শরা তাঁর কাছ থেকে চলে গেল । বর্ণনাকারীদের বর্ণনামতে জানা যায় যে , এরপর পনের দিন কেটে গেল , আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে তাঁর কাছে কোন ওহী আসল এবং জিবরীল ( আ ) ও তাঁর কাছ আসলেন না । এমনকি মক্কাবাসীরা দুর্নাম ছড়াতে লাগল । তারা বলল , মুহাম্মদ আমাদের কাছে আগামীকালের ওয়াদা করেছিল । অথচ সেদিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত পনের দিন হয়ে গেল । আমরা তাঁর কাছে যে সব প্রশ্ন করেছিলাম , সে তার একটিরও জবাব দিল না । অপরদিকে ওহী বন্ধ থাকায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন । মক্কাবাসীদের কথাবার্তাও তার কাছে বিব্রতকর হয়ে উঠল । অবশেষে তাঁর কাছে জিবরীল ( আ ) আল্লাহর কাছ থেকে সূরা কাহফ নিয়ে এলেন । ভাতে তাঁকে মক্কাবাসীদের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণে ভর্ৎসনা ছিল । এ সূরায় তারা যে যুবকদের কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল তাদের খবর , বিশ্ব পরিভ্রমণকারী ব্যক্তি ও আত্মা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব ছিল ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শ নেতাদের প্রশ্নের জবাব

📄 কুরায়শ নেতাদের প্রশ্নের জবাব


ইবন ইসহাক বলেন : আমাকে বলা হয়েছে যে , জিবরীল ( আ ) এলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে বললেন : “ হে জিবরীল ( আ ) ! আপনি আমার কাছে আসতে এত বিলম্ব করেছেন যে , এতে আমার প্রতি লোকদের খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে । ” তখন তাঁকে জিবরীল ( আ ) বললেন : “ আমরা আপনার রবের আদেশ ব্যতীত অবতরণ করি না । যা আমাদের সামনে ও পেছনে আছে এবং যা এ দুয়ের মাঝে , তা তাঁরই ; আর আপনার রব ভুলে যান না । ” ( ১৯ : ৬৪ )
এরপর মহান আল্লাহ্ সূরা কাহফ শুরু করেছেন নিজের প্রশংসা ও তাঁর রাসূলের নবুওয়তের বর্ণনার মাধ্যমে । কেননা তারা সবুজরাত অস্বীকার করেছিল । আল্লাহ্ বলেন : “ প্রশংসা আল্লাহরই , যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছেন , অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা:) -এর উপর এই মর্মে কিতাব নাযিল করেছেন যে , তুমি আমার পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল । অর্থাৎ মধুওয়ত সম্পর্কে তারা যে প্রশ্ন করে , এ কিতাব তারই বাস্তব জবাব । আর তাতে তিনি বক্রতা রাখেননি ' অর্থাৎ খুবই ভারসাম্যপূর্ণ বানিয়েছেন এবং যাতে কোন মতভেদও নেই । একে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত , তাঁর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য । এখানে কঠিন শাস্তি বলতে পার্থিব জীবনে ও আখিরাতের জীবনে যে যন্ত্রণাদায়ক শান্তি আল্লাহ্ দিবেন তার উভয়টাকেই বুঝানো হয়েছে । ' আর তাঁর পক্ষ থেকে অর্থ হচ্ছে তোমার রবের পক্ষ থেকে , যিনি তোমাকে একজন রাসূল করে পাঠিয়েছেন । আর মু'মিনগণ , যারা সৎকাজ করে ,
তাদের এ সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে , তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার , যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী । অর্থাৎ চিরস্থায়ী জান্নাতে তারা থাকবে , যেখানে তাদের মৃত্যু হবে না । যারা তোমার আনীত দীনকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে এবং তুমি যা যা করতে তাদের নির্দেশ দিয়েছ তা করেছে , তারা সেখানে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না । আর সতর্ক করার জন্য তাদের , যারা বলে যে , আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছেন । অর্থাৎ কুরায়শ বংশের সেই সব লোককে সতর্ক করার জন্য , যারা বলে যে , ' আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করি , তারা আল্লাহ্র মেয়ে । ' এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না । অর্থাৎ সেইসব পূর্বপুরুষদের , যাদের বর্জন করা ও যাদের ধর্মের নিন্দা করাকে তারা গুরুতর অন্যায় বলে মনে করে “ তাদের মুখ - নিঃসৃত বাক্য কি সাংঘাতিক ! ” অর্থাৎ তাদের এ উক্তি যে , ফেরেশতারা আল্লাহর মেয়ে । তারা তো কেবল মিথ্যাই বলে । তারা এ বাণী বিশ্বাস না করলে সম্ভবত তাদের পেছনে ঘুরে তুমি দুঃখে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে । অর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সা:) । তুমি তাদের কাছ থেকে যা আশা করছ , তা যখন সফল হবে না , তখন তাদের চিন্তায় কি তুমি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে ? ” অর্থাৎ তুমি এরূপ করো না ।
ইবন হিশাম বলেন : ' বাখিন নাফসাকা ' অর্থ নিজেকে ধ্বংসকারী । আবু উবায়দা আমাকে বলেছেন যে , কবি মুররুমা তার নিম্নোক্ত কবিতায়ও ' বাখিগুন ' শব্দটি এ অর্থে ব্যবহার করেছেন :
“ ওহে সে ব্যক্তি , যে নিজেকে এমন জিনিসের মহব্বতে ধ্বংস করেছে , যা অদৃষ্ট তার হাত থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে । ”
এর বহুবচন বাখিউন ও বাখ'আ । এটি তার কাব্যের একটি কবিতা ।
আরবরাও বলে থাকে : পাখা তু লাহু নাফসী ” অর্থাৎ আমি তার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি ।
"পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে , আমি সেগুলিকে তার শোভা করেছি মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে , তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ । "
ইবন ইসহাক বলেন : অর্থাৎ কে আমার আদেশের অধিক অনুসারী এবং কে আমার বেশি অনুগত , তা পরীক্ষা করার জন্য ।
"আর তার ওপর যা কিছু আছে , তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য মাটিতে পরিণত করব । " অর্থাৎঃপৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে , তার সবকিছুই ধ্বংস হবে ও বিলীন হবে , আর আমার দিকেই সব কিছুর প্রত্যাবর্তন করতে হবে । তখন আমি প্রত্যেককে তার কাজ অনুসারে প্রতিফল দেব । কাজেই আপনি এ পৃথিবীতে যা কিছু দেখতে ও শুনতে পান , তাতে আপনি মনক্ষুণ্ণ হবেন না ।
ইবন হিশাম বলেন : ' সাঈদ ' ( ) অর্থ পৃথিবী বা মাটি । এর বহুবচন সুউদ ।
যুক্তা একটি হরিণ শাবকের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন : “ মাথায় হাড়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল মদ , তাকে যেন দুপুর বেলা যমীনের ওপর নিক্ষেপ করে । ”
এ কবিতাটি কবির একটি কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ।

**টিকাঃ**
১. মা'মার ইবন রাশিদ যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে , কা'বা পুনঃনির্মাণের সময় কুরায়শীরা তার ভেতর তিনটি পিঠবিশিষ্ট একটি পাথর পায় । তার একপিঠে লেখা ছিল : “ আমি বাক্কার অধিপতি আল্লাহ্ । যেদিন সূর্য ও চন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করি , সেইদিন বাক্কা তৈরিরও পরিকল্পনা করি । ” বাদ বাকী অংশ ইবন ইসহাক উধৃত বাণীর সমার্থক । দ্বিতীয় পিঠে লেখা ছিল : “ আমি বাক্কার অধিপতি আল্লাহ্ । আমিই রাহেম ( জরায়ু ) সৃষ্টি করেছি এবং এর সাথে মিলিয়ে নিজের একটি নাম রেখেছি ( অর্থাৎ রহীম ) । যে ব্যক্তি জরায়ুর সম্পর্ক ( অর্থাৎ আত্মীয়তার বন্ধন ) ছিন্ন করবে , তার সাথে আমিও সম্পর্ক ছিন্ন করব আর যে জরায়ুর সম্পর্ক রক্ষা করবে , আমিও তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করব । তৃতীয় পিঠে লেখা ছিল : “ আমি বাক্কার অধিপতি আল্লাহ্ । কল্যাণ ও অকল্যাণের স্রষ্টা আমি । যার দ্বারা মানুষের উপকার হয় , তার জন্য সুসংবাদ । আর যার দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয় , তার জন্য দুঃসংবাদ । ” ( জামে যুহরী - সীরাতে ইবন হিশামের টীকা দ্র . ) ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আসহাব কাহফ বা গুহাবাসিগণ

📄 আসহাব কাহফ বা গুহাবাসিগণ


সাঈদ অর্থ রাস্তাও । হাদীসে আছে : “ তোমরা সু উদাত অর্থাৎ রাস্তার ওপর বসা থেকে বিরত থাকবে । ”
আর ' জুরুযা ' অর্থাৎ এমন ভূমি , যাতে কোন উদ্ভিদ জন্মে না । এর বহুবচন ‘ আজরায ’ বলা হয়ে থাকে , সানাতু জরুবিন ও ' সিনুনা আজরায়ুন ' অর্থাৎ এমন বছর , যাতে কোন বৃষ্টি হয় না । ফলে , তাতে দুর্ভিক্ষ , অকাল ও দুর্দিন দেখা যায় ।
যুরবুম্মা একটি উটের বর্ণনায় বলেন : তার পেটে যা আছে তা গুটিয়ে গেছে , তার পার্শ্বদেশ পুষ্ট নয় । ”
ইবন ইসহাক বলেন এরপর আল্লাহ্ তা'আলা ঐ যুবকদের ঘটনা বর্ণনা করেন , যাদের সম্পর্কে কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে প্রশ্ন করেছিল । তিনি বলেন :
“ তুমি কি মনে কর যে , গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর । ” অর্থাৎ আমি আমার বান্দাদের ওপর অকাট্য প্রমাণ হিসাবে যে সব নিদর্শন রেখেছি , এটি সেগুলোর মাঝে অধিক বিস্ময়কর ?
ইবন হিশাম বলেন : রাকীম অর্থ সেই ফলক বা তালিকা , যাতে ঐ যুবকদের অবস্থা লিপিবদ্ধ ছিল । রকীমের বহুবচন রুকুম । আজ্জাজ বলেন “ লিখিত মাসহাফের অবস্থানস্থল । ”
ইবন ইসহাক বলেন এরপর আল্লাহ্ বলেন "যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল , তখন তারা বলেছিল , ' হে আমাদের রব ! তুমি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান কর এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর । ' তারপর আমি তাদের গুহার ভেতরে কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে দিলাম । পরে আমি তাদের জাগ্রত করলাম এটা জানার জন্য যে , দুই দলের মধ্যে কোনটি তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে । ”
এরপর মহান আল্লাহ্ বলেন : “ আমি তোমার কাছে তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি । ” অর্থাৎ তাদের সম্পর্কে সত্য ও নির্ভুল ঘটনা ব্যক্ত করছি । “ তারা ছিল কয়েকজন যুবক , তারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম । আমি তাদের মনোবল বৃদ্ধি করে দিলাম যখন তারা উঠে দাঁড়াল , তখন বলল : “ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রব - ই আমাদের রব । আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন ইলাহকে আহবান করব না ; যদি তা করে বসি , তবে তা হবে অতিশয় গর্হিত । ' অর্থাৎ হে মক্কাবাসী ! তোমরা যেমন না জেনেশুনে বিভিন্ন বস্তুকে আমার সংগে শরীক করেছ , ঐ গুহাবাসী যুবকরা তা করেনি ।
ইবন হিশাম বলেন : ' শাতাত ' শব্দটির অর্থ হচ্ছে বাড়াবাড়ি ও সত্যের সীমা অতিক্রম করা । আশা ইন কায়স ইব্‌ন সা'লাবা বলেন :
“ তারা নিজেরা বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকে না এবং অপরকেও নিবৃত্ত রাখে না , ঐ বর্ণার যখমের ন্যায় , যাতে তৈল ও সলিতা উভয়ই চলে যায় । ”
এ লাইনটি আশা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ।
এরপর আল্লাহ্ বলেন : “ আমাদের এই স্বজাতি , তাঁর পরিবর্তে অনেক ইলাহ্ গ্রহণ করেছে । এরা এই সমস্ত ইলাহ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপিত করে না কেন ? ”
ইবন ইসহাক বলেন : ' সুস্পষ্ট প্রমাণ ' অর্থ হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারকারী দলীল । " যে আল্লাহ্ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে , তার চাইতে অধিক যালিম আর কে ? তোমরা যখন বিচ্ছিন্ন হলে তাদের কাছ থেকে এবং তারা আল্লাহ্ পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের কাছ থেকে , তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর । তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন । তুমি দেখতে পেতে তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত , সূর্য উদয়কালে তাদের গুহার দক্ষিণ পার্শ্বে হেলে যায় এবং অন্তকালে তাদের বাম পাশ দিয়ে অতিক্রম করে ।
ইবন হিশাম বলেন : ‘ তাযাওয়ারু ' অর্থ হেলে যায় । এর মূল ধাতু হচ্ছে ' যত্তর । যেমন কবি ইমরুল কায়স ইবন হুজর বলেন :
“ যদি তুমি দাস অবস্থায় ফিরে এস , তবে আমি দায়ী রইলাম , এমন গতিতে ( ফিরে এসো ) যাতে সারস পাখিকেও হেলানো দেখতে পাও । ”
এটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ
আর আবূ যাহাফ কালবী একটি শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন :
“ এ শহরের উটের চারণভূমি অনুর্বর , যা আমাদের ইচ্ছা - আকাঙ্ক্ষা থেকে হেলানো ( অর্থাৎ ইচ্ছা - আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি ) । পাঁচ দিনে একবার পানি পান করার কারণে বাহনগুলো জীর্ণশীর্ণ হয়ে যায় । ”
কবিতার এ চরণ দু'টিও তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ ।
“ অস্তকালে তাদের অতিক্রম করে বাম পাশ দিয়ে । ” এর অর্থ হলো , তাদের বামদিকে রেখে চলে যায় ।
যুররুম্মা বলেন :
"কোথাও যাত্রা করার সময় বালুর গোলাকার বস্তুসমূহ অতিক্রম করে যায় , অশ্বারোহীরা ডানদিক ও বামদিক দিয়ে । "
এটাও তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ ।
' ফাজওয়াহ ' অর্থ প্রশস্ত চত্বর । জনৈক কবি বলেন : “ তুমি তোমার জাতিকে অবমাননা ও ক্ষয়ক্ষতির পোশাক পরিয়েছ , অর্থাৎ তুমি তাদের অপমানিত করেছ , অবশেষে তাদের অবাধ অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং তারা ঘরের প্রশস্ত চত্বর ছেড়ে চলে গেছে । ”
ফাজওয়াহর বহুবচন ফুজা'আ ।
আল্লাহ্ বলেন : “ এ সমস্তই আল্লাহর নিদর্শন । ” অর্থাৎ যে আহলে কিতাব কুরায়শ নেতাদের তোমার নবুওয়াতের সত্যতা যাচাই করার জন্য এইসব প্রশ্ন করার পরামর্শ নিয়েছে , তাদের জন্য গুহাবাসীদের এ ঘটনা একটি অকাট্য প্রমাণ । কেননা তারা তাদের ঘটনা জানত ।
এরপর আল্লাহ্ বলেন : আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন , সে সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন , তার জন্য তুমি কোন পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না । তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত , কিন্তু তারা ছিল নিদ্রিত , আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দু'টি ঘরের দরজায় প্রসারিত করে । ইবন হিশাম বলেন : ' ওয়াসীদ ' অর্থ দরজা বা ফটক ।
কবি আৰসী উবায়দ ইবন ওয়াহ্ব বলেন : “ পানিবিহীন অংগলে ; যার দরজা আমার ওপর বন্ধ করা হয় না , আর সেখানে আমার ভালো কাজ সুপরিচিত । ”
এ লাইনটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ ।
ওয়াসীদ ' অর্থ উঠানও । এর বহুবচন ওয়াসাইদ , উসুদ , আসউদ ও আসদান ।
আল্লাহ্ বলেন : “ তাদের ( গুহাবাসীদের ) তাকিয়ে দেখলে তুমি পেছনে ফিরে পালাতে এবং তাদের ভয়ে আতংকিত হয়ে পড়তে । ” ......... তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল , তারা বলল , আমরা তো নিশ্চয়ই তাদের পার্শ্বে মসজিদ নির্মাণ করব । ( কুরায়শ নেতাদের এসব প্রশ্ন যে ইয়াহুদী পণ্ডিতেরা শিখিয়েছিল ) তারা বলবে তারা ছিল তিনজন তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর । কেউ কেউ বলে তারা ছিল পাঁচজন , তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর । অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে তারা এসব বলে থাকে । আবার কেউ কেউ বলে : তারা ছিল সাতজন , তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর । তুমি বল : আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে । সাধারণ আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না এবং এদের কাউকেও তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো না । অর্থাৎ ৎ তাদের সামনে অহংকার প্রকাশ করবে না । আর এদের সম্পর্কে যেহেতু তাদের জানা নেই , তাই তাদের জিজ্ঞেস করো না । “ আর কখনো তুমি কোন বিষয়ে বলো না যে , আমি আগামীকাল এটা করবো , আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে , এ কথা না বলে । ” যদি ভুলে যাও , তবে তোমার প্রতিপালককে ' স্মরণ কর এবং বলো , সম্ভবত আমার রব আমাকে এর চাইতে সত্যের নিকটতর পথ - নির্দেশ করবেন । অর্থাৎ তারা তোমাকে যে প্রশ্ন করে , সে সম্পর্কে তুমি ' ইনশাআল্লাহ্ ' না বলে তাদের বলবে না যে , আগামীকাল এ ব্যাপারে আমি তোমাদের অবশ্যই অবহিত করবো যেমন তুমি এদের ব্যাপারে বলেছ ।
তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশ বছর , আরো নয় বছর । অর্থাৎ তারা অচিরেই এরূপ কথা বলবে । “ তুমি বল , তারা কতকাল ছিল তা আল্লাহ্ ভালো জানেন । আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই , তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা ! তিনি ছাড়া তাদের আর কোন অভিভাবক নেই । তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না । ” অর্থাৎ তারা তোমার কাছে যা কিছু জিজ্ঞেস করেছে , তার কোন কিছুই তাঁর অজানা নয় ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যুলকারনায়ন

📄 যুলকারনায়ন


তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে একজন বিশ্ব পর্যটক সম্পর্কে যে প্রশ্ন করেছিল , সে সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন :
“ আর তোমাকে জিজ্ঞেস করে যুলকারনায়ন সম্পর্কে । তুমি বল যে , আমি অচিরেই তাঁর বিষয়ে তোমাদের কাছে বর্ণনা করব । আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায় - উপকরণ দিয়েছিলাম । এভাবে তিনি তার পূর্ণ ঘটনার বর্ণনা দিলেন ।
যুলকারনায়নের একটা বৈশিষ্ট্য এই যে , তাকে এমন সব জিনিস দেয়া হয়েছিল , যা অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি । তাকে এত অধিক উপায় - উপকরণ দেয়া হয়েছিল যে , তিনি সম পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য পরিভ্রমণ করেন । তিনি যেখানেই যেতেন , সেখানেই তার সার্বিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হত । তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জনবসতির সর্বশেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : অনারবদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জনৈক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে , যুলকারনায়ন ছিলেন মিসরের অধিবাসী । তার আসল নাম ছিল মারযুবান ইবন মারযুবা ইউনানী । তিনি ইয়াফিস ইবন নূহের বংশধর ছিলেন । ইবন হিশাম বলেন , তাঁর নাম ইসকান্দার । ইসকান্দারিয়া শহরটি তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত বলে তার নামে এ শহরের নামকরণ করা হয় ।
ইবন ইসহাক বলেন সাওর ইবন ইয়াযীদ আমাকে খালিদ ইবন মা'দান কালাই সূে জানিয়েছেন আর কালাঈ রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর যামানা পেয়েছিলেন । তিনি বলেছেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে যুলকারনায়ন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে , তিনি বলেন ; তিনি এমন বাদশাহ ছিলেন , যিনি উপায় - উপকরণের সাহায্যে গোটা পৃথিবীর সার্বিক জরীপ করেছিলেন ।
খালিদ বলেন : উমর ইব্‌ন খাত্তাব ( রা ) শুনতে পেলেন যে , এক ব্যক্তি কাউকে “ হে যুলকারনায়ন " বলে ডাকছে এটা শুনে উমর ( রা ) বললেন , “ আল্লাহ মাফ করুন ! তোমরা নবীদের নামে নাম রেখে তৃপ্ত হওনি । এখন ফেরেশতাদের নামে নাম রাখা শুরু করেছ ! ”
ইবন ইসহাক বলেন : যুলকারনায়ন আসলে কি ছিলেন , তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন । উমর ( রা ) যা বলেছেন , তা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছিলেন কী না ? যদি তিনি এরূপ বলে থাকেন , তবে তাঁর কথাই সঠিক ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00