📄 মাযর ইবন হারিস কর্তৃক কুরায়শদের উপদেশ দান
আবূ জাহলের উপরোক্ত কথা শোনার পর নাযর ইবন হারিস ইবন কালাদা ইবন আলকামা ইবন আবদ মানাফ ইবন আবদুদদার ইবন কুসাই ইবন হিশামের মতে , নাযর ইবন হারিস ইব্ন আলকামা ইব্ন কালাদা ইব্ন আবদ মানাফ উঠে দাঁড়াল ও বক্তৃতা দেয়া শুরু করল ।
ইবন ইসহাক বলেন , সে বলল : আল্লাহ্র কসম ! হে কুরায়শরা ! তোমাদের উপর এমন একটা দুর্যোগ নেমে এসেছে , যা থেকে রক্ষা পাওয়া তোমাদের সাধ্যের বাইরে । মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে একজন উঠতি যুবক । সে তোমাদের মধ্যে সবচাইতে প্রিয় , সত্যভাষী আমানতদার । অবশেষে যখন তোমরা তার মধ্যে প্রৌঢ়ত্বের ছাপ দেখলে এবং সে একটা অভিনব মতাদর্শ তোমাদের কাছে নিয়ে এল , তখন তোমরা বললে সে জাদুকর । অথচ আল্লাহর কসম ! সে জাদুকর নয় । আমরা তো জাদুকরের ঝাড়ফুঁক ও তাবিয তুমার দেখেছি । তোমরা বললে সে গণক । কিন্তু আল্লাহ্র কসম , সে গণক নয় । আমরা গণকদের সূক্ষ্ম হেঁয়ালি ও ছন্দোবদ্ধ কথাবার্তা অনেক শুনেছি । তোমরা বললে সে কবি । অথচ আল্লাহ্র কসম ! সে কবি নয় । আমরা সব রকমের কবিতা দেখেছি । তোমরা বললে সে পাগল । অথচ আল্লাহর কসম ! সে পাগল নয় । আমরা অনেক পাগল দেখেছি । তাঁর মধ্যে পাগলের কোন আলামত নেই । অতএব , হে কুরায়শরা ! তোমরা নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা কর । আল্লাহ্র কসম ! তোমাদের উপর অবশ্যই ঘোরতর দুর্যোগ নেমে এসেছে ।
📄 নাষর কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নির্যাতন
নাযর ইবন হারিস ছিল কুরায়শ গোত্রের কুচক্রীদের অন্যতম । অন্যদের মত সেও রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর উপর নির্যাতন চালাত এবং তাঁর সংগে শত্রুতা পোষণ করত । ইতিপূর্বে সে হীরায় গিয়েছিল এবং সেখান থেকে পারস্যের রাজাদের ইতিহাস জেনে এসেছিল । রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের কাহিনী শুনে এসেছিল । যখনই রাসূলুল্লাহ (সা:) কোন বৈঠকে বসে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং পূর্ববর্তী জাতিগুলো নাফরমানীর কারণে আল্লাহ্র তরফ থেকে কি ধরনের শাস্তি ভোগ করেছিল , তার উল্লেখ করে স্বজাতিকে সতর্ক করতেন , তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর সে তাঁর স্থানে বসে বলত : আল্লাহ্র কসম ! হে কুরায়শরা ! আমি মুহাম্মদের চাইতে উত্তম কথা বলতে পারি । এতএব তোমরা আমার কাছে এস । ত তোমাদের তাঁর চাইতে ভাল কথা শোনাব । তারপর সে পারস্যের রাজাদের এবং রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের কাহিনী শোনাত । অবশেষে সে বলত , বল তো , মুহাম্মদ আমার চাইতে কোন কথাটি ভাল বলেছে ?
ইবন হিশাম বলেন , আমার জানামতে নাযর ইবন হারিস বলেছিল আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন অচিরেই আমি তার মত কথা নাযিল করব ।
ইবন ইসহাক বলেন আমার জানামতে , ইবন আব্বাস ( রা ) বলতেন , এ ব্যক্তি সম্পর্কে কুরআনে আটটি আয়াত নাযিল হয়েছে ।
যেমন : “ যখন তার কাছে আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয় , তখন সে বলে , এ তো সেকালের উপকথা মাত্র । ” ( ৬৮ : ১৫ )
📄 কুরায়শ কর্তৃক ইয়াহুদী পণ্ডিতদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ
নাযর ইব্ন হারিসের বক্তৃতার পর কুরায়শ নেতারা তাকে ও তার সাথে উক্বা ইব্ন আবূ মুআয়তকে মদীনার ইয়াহুদী পণ্ডিতদের কাছে পাঠাল । তারা তাদের দু'জনকে বলল , তারা যেন মুহাম্মদ সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞেস করে , তাঁর গুণাবলী তাদের কাছে বর্ণনা করে এবং তাঁর বক্তব্য তাদেরকে অবহিত করে । কেননা তাঁরা পূর্ববর্তী কিতাবের অধিকারী । তাদের কাছে নবীদের সম্পর্কে এমন জ্ঞান রয়েছে যা আমাদের কাছে নেই ।
এরা উভয়ে মদীনায় গিয়ে ইয়াহুদী পণ্ডিতদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে জিজ্ঞস করল । তারা তাদেরকে তাঁর গুণাবলী জানাল এবং তারা তাঁর কিছু কিছু কথাও তাদের শোনাল । আর তারা ইয়াহুদী পণ্ডিতদের বলল , আপনারা তো তাওরাতের অধিকারী । আমরা আমাদের মধ্যে আবির্ভূত এ লোকটি সম্পর্কে আপনাদের কাছ থেকে জানার জন্য এসেছি । তখন ইয়াহূদী পণ্ডিতরা তাদের বলল , আমরা তোমাদের যৈ তিনটি বিষয়ের কথা বলে দিচ্ছি , তোমরা ডাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর । যদি সে এগুলো তোমাদের জানাতে পারে , তাহলে সে নিশ্চিতভাবেই একজন প্রেরিত নবী । আর যদি সে জানাতে না পারে , তবে তোমরা মনে করবে যে , সে একজন ভণ্ড , জালিয়াত । এরপর তার সম্পর্কে তোমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে । তোমরা তাকে জিজ্ঞেস করবে এমন কতিপয় যুবক সম্পর্কে , যারা প্রাচীনকালে গায়ের হয়ে গিয়েছিল , দের ব্যাপারটা কি ? তাদের ঘটনা ছিল খুবই বিস্ময়কর । আর তোমরা তাকে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেসকরবে , যে সারা বিশ্ব পরিভ্রমণ করেছিল , তার ব্যপারটা কি ? আর তোমরা তাকে জিজ্ঞেস করবে , রূহ কি জিনিস ? যদি সে এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারে , তবে সে নিঃসন্দেহে নবী ; তোমরা তার অনুসরণ ব করবে । আর যদি সে তোমাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব না দিতে পারে , তবে তোমরা বুঝবে , সে ভণ্ড , প্রতারক । তখন তোমরা তার ব্যাপারে যা ভাল মনে হয় , তা করবে । এরপর নাযর ইব্ন হারিস ও ও উকবা ইবন আবু মুআয়ত ইবন আবূ আমর ইব্ন উমায়্যা ইবন আবদ শামস ইবন আব্দ মানাফ ইবন কুসাই উভয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করল । তারা মক্কায় পৌঁছে কুরায়শ নেতাদের কাছে গিয়ে বলল , হে কুরায়শরা ! আমরা তোমাদের কাছে আমাদের ও মুহাম্মদের মধ্যকার বিরোধের একটা চূড়ান্ত মীমাংসা নিয়ে এসেছি । ইয়াহুদী পণ্ডিতরা আমাদের তাদের শেখানো কয়েকটা প্রশ্ন মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন । সে যদি তোমাদের এর জবাব দিতে পারে , তা হলে সে নবী , নচেৎ সে ৩০। কাজেই তোমরা তাঁর সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নেবে , তা ভেবে দেখ ।
📄 কুরায়শ নেতাদের প্রশ্ন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জবাব
এরপর তারা রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর কাছে এল এবং বলল হে মুহাম্মদ । প্রাচীনকালে যে একদল যুবক উধাও হয়ে গিয়েছিল , তাদের সম্পর্কে আমাদের অবহিত কর । তাদের ঘটনাটা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর । আর অপর একজন পর্যটকের কাহিনী শোনাও । যিনি সমগ্র প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পরিভ্রমণ করেছিলেন । আর আত্মা কি ? তা আমাাদের জানাও ? রাবী বলেন , তখন রাসূলুল্লাহ (সা:) তাদের বললেন , তোমরা আমাকে যা যা জিজ্ঞেস করেছ , তা আমি তোমাদের আগামীকাল জানাব । তবে তিনি ' ইনশাআল্লাহ ' বা আল্লাহ যদি চান এ কথাটি বলেন নি । এ কথা শুনে কুরায়শরা তাঁর কাছ থেকে চলে গেল । বর্ণনাকারীদের বর্ণনামতে জানা যায় যে , এরপর পনের দিন কেটে গেল , আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে তাঁর কাছে কোন ওহী আসল এবং জিবরীল ( আ ) ও তাঁর কাছ আসলেন না । এমনকি মক্কাবাসীরা দুর্নাম ছড়াতে লাগল । তারা বলল , মুহাম্মদ আমাদের কাছে আগামীকালের ওয়াদা করেছিল । অথচ সেদিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত পনের দিন হয়ে গেল । আমরা তাঁর কাছে যে সব প্রশ্ন করেছিলাম , সে তার একটিরও জবাব দিল না । অপরদিকে ওহী বন্ধ থাকায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন । মক্কাবাসীদের কথাবার্তাও তার কাছে বিব্রতকর হয়ে উঠল । অবশেষে তাঁর কাছে জিবরীল ( আ ) আল্লাহর কাছ থেকে সূরা কাহফ নিয়ে এলেন । ভাতে তাঁকে মক্কাবাসীদের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণে ভর্ৎসনা ছিল । এ সূরায় তারা যে যুবকদের কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল তাদের খবর , বিশ্ব পরিভ্রমণকারী ব্যক্তি ও আত্মা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব ছিল ।