📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে উত্তা ইন্ন রবী'আ আলোচনা
ইবন ইসহাক বলেন : মুহাম্মদ ইবন কা'ব কুরাধীর বরাতে ইয়াযীদ ইবন যিয়াদ আমাকে বলেছেন যে , কুরায়ণের অন্যতম নেতা উতবা ইবন রাবীআ একদিন তাদের এ মজলিসে বসে ছিল । সে সময় রাসূলুাহ্ (সা:) মসজিদে হারামে একাকী বসেছিলেন । তখন উতবা বলল : হে কুরায়শ জনমণ্ডলী ! আমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই , এ ব্যাপারে তোমাদের মত কি ? আমি তার সামনে কিছু প্রস্তাব রাখব । আশা করি সে তার কিছু না কিছু গ্রহণ করবে । সে যে সুবিধা চায় , তা আমরা তাকে দেব । ফলে সে আমাদের নিন্দা করা থেকে বিরত থাকবে । হামযা ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর অনুসরীদের সংখ্যা ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে দেখে উত্সা এ প্রস্তাব দেয় । তাতে কুরায়শ নেতারা বলল : ঠিক আছে , হে আবুল ওয়ালীদ ! তুমি যাও এবং তাঁর সাথে কথা বল ।
বচাতা হলে
রাবীবলেন , তখন রাসুলুল্লাহ (সা:) তাকে বললেন : হে আবুল ওয়ালীদ বলুন , আমি শুনছি । উত্ত্বা বলল , হে আমার প্রিয় ভাতিজা তুমি যে ব্যাপারটি নিয়ে এসেছ , তার উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে , তুমি বিত্তশালী হতে চাও , তা হলে আমরা তোমার জন্য এত সম্পদের ব্যবস্থা করে দেব , যাতে তু তুমি আমাদের মাঝে সবচাইতে ধনী হয়ে যাও । আর যদি পদমর্যাদা চাও , তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে নেব এবং তোমাকে বাদ দিয়ে কোন ব্যাপারেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব না । এর যদি তুমি রাজা হতে চাও , তা হলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নেব । আর যদি মনে কর , যে অদৃশ্য ব্যক্তিটি তোমার কাছে আসে , যাকে তুমি দেখতে পাও , সে জিন জাতীয় কেউ এবং তুমি তাকে প্রতিহত করতে অক্ষম , তা হলে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব । আর এতে আমাদের যত অর্থই খরচ হোক না কেন , আমরা এ থেকে তোমাকে মুক্ত করবই । অনেক সময় এ ধরনের বশীকৃত জিন তার মনিবের উপর পরাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ছাড়া তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না । এভাবে সে আরো নানা কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে বললেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নিবিষ্ট চিত্তে তার কথা শুনছিলেন ।
উত্তার কথা যখন শেষ হল , তখন তিনি বললেন : হে আবূ ওয়ালীদ । আপনার কথা কি শেষ হয়েছে ?
সে বলল : হ্যাঁ ।
রাসূল ( রা ) বললেন : তা হলে আমার বক্তব্য শুনুন । উত্ত্বা বলল : বল । রাসূলুল্লাহ বললেন : “ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম । ( হা - মীম ! দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্র নামে । হা - মীম ! এটি ইহা দয়াময় পরম দয়ালুর নিকট হতে অবতীর্ণ ) । এ এক কিতাব । বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ আরবী ভাষায় কুরআনরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য , সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে , কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে । সুতরাং তারা শুনবে না । তারা বলে : তুমি যার প্রতি আমাদের আহবান করছ , সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আররণ - আচ্ছাদিত । ” ( ৪১ : ১-৫ ) ।
📄 উত্তার অভিমত
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তার সামনে এ সূরা পড়তে থাকলেন । আর উত্সা পিঠের পেছনে হাত রেখে হেলান দিয়ে নীরবে শুনতে লাগল । সূরাটির যেখানে সিজদার আয়াত রয়েছে , সে পর্যন্ত গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) থামলেন এবং সিজদা করলেন । তারপর বললেন : হে আবূ ওয়ালীদ ! যা শুনলেন তাতো শুনলেনই । এখন আপনিই বিবেচনা করুন ।
এরপর উত্ত্বা সেখান থেকে উঠে তার সংগীদের কাছে ফিরে গেল । তখন তারা পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল : আল্লাহ্র কসম ! আবুল ওয়ালিদ যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিল , এখন তা থেকে ভিন্ন রকম চেহারা নিয়ে এসেছে । উত্ত্বা তাদের কাছে বসলে তারা বলল : হে আবুল ওয়ালীদ ! সেখানকার খবর কি ? উত্ত্বা বলল সেখানকার খবর এই যে , আল্লাহ্র কসম ! আমি এমন কথা শুনেছি , যার মত কথা ইতিপূর্বে আর কখনো শুনিনি । আল্লাহর কসম , তা কবিতাও নয় , জাদুও নয় , জ্যোতিষীর বাণীও নয় । হে কুরায়শরা ! তোমরা আমার কথা শোনো এবং এই সমস্ত বিষয় আমার হাতে ছেড়ে দাও । আর এ লোকটি যে কাজে নিয়োজিত , তা তাকে করতে দাও এবং তোমরা তার থেকে সরে থাক । কারণ আল্লাহ্র কসম ! তার থেকে যে কথা আমি শুনেছি , তা একদিন বিপুল খ্যাতি অর্জন করবে । আরবরা যদি তার ক্ষতি সাধন করে , তা হলে তোমরা মনে করবে যে , তারা তোমাদের কাজ সম্পন্ন করে দিয়েছে । আর যদি সে আরবদের উপর জয়ী হয় , তবে তার রাজ্য ও রাজত্ব তোমাদেরই রাজ্য ও রাজত্ব হবে । তার প্রভাব- প্রতিপত্তি ও সম্মান তোমাদেরই প্রভাব - প্রতিপত্তি ও সম্মান হবে । তেমন হলে , এর অসীলায় তোমরা সবচাইতে সুখী ও সৌভাগ্যশালী জাতিতে পরিণত হবে । এ কথা শুনে সবাই বলে উঠল : আল্লাহ্র কসম । হে আবূ ওয়ালীদ , সে তোমাকে নিজের কথা দিয়ে জাদু করেছে । উত্পা বলল : এ হচ্ছে তাঁর সম্পর্কে আমার অভিমত । এখন তোমরা যা ভালো মনে কর , তাই কর । ”
📄 ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর কুরায়শ নেতাদের নিপীড়ন
ইবন ইসহাক বলেন মক্কায় কুরায়শ বংশের বিভিন্ন গোত্রে নারী ও পুরুষদের মধ্যে ইসলাম বিস্তার লাভ করতে লাগল । কুরায়শরা মুসলমানদের থেকে যাকে পারত আটক করত এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালাত ।
📄 কুরায়শ নেতাদের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আলাপ-আলোচনা
ইবন ইসহাক বলেন : কোন কোন আলিম সাঈদ ইবন জুবায়র ও ইব্ন আব্বাসের মুক্ত গোলাম ইকরামা ( র ) -এর বরাতে আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেন : এরপর কুরায়শ বংশের প্রত্যেক গোত্রের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ একদিন সন্ধ্যার পর কা'বা শরীফের কাছে সমবেত হল । এ নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিল উত্তবা ইবন রবীআ ; শায়বা ইন রবী'আ , আবূ সুফিয়ান ইবন হারব , নাযার ইবন হারিস , বনূ আবদুদদারের সদস্য , আবুল বাখতারী ইবন হিশাম , আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব ইবন আসাদ । যামা'আ ইবন আসওয়াদ , ওয়ালীদ ইবন মুগীরা , আবূ জাহল ইবন হিশাম , আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ উমায়্যা , আস ইব্ন ওয়ায়ল , সাহম গোত্রের হাজ্জাজের দুই ছেলে নাবীহ ও মুনাব্বিহ , উমায়া ইবন খালাফ ও আরো অনেকে । তারা একে অপরকে বলতে লাগল : মুহাম্মদকে ডেকে পাঠাও , তার পর তার সাথে কথা বল ও তর্কবিতর্ক কর । তা হলে তাঁর ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে কারো কিছু বলার থাকবে না । এরপর তাঁর কাছে এ খবরসহ লোক পাঠানো হল : “ তোমার গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকেরা তোমার সাথে কথা বলার জন্য সমবেত হয়েছে , তুমি তাদের কাছে এস । ”
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) দ্রুত তাদের কাছে আসলেন । তিনি ভেবেছিলেন যে , তাদের সাথে শুরুতে তিনি যে দাওয়াতী কথাবার্তা বলেছেন , সে ব্যাপারেই তারা কোন সিদ্ধান্তে এসেছে । কেননা তিনি তাদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলেন এবং তাদের একগুঁয়ে মনোভাব তাঁর কাছে খুবই পীড়াদায়ক ছিল ।
তিনি এসে তাদের কাছে বসতেই তারা বললো : “ হে মুহাম্মদ । আমরা কিছু কথা বলার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি ! আল্লাহ্র কসম ! আরবে আর কখনো তোমার মত কোন ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছে বলে আমরা জানি না । তুমি যে ধরনের কথাবার্তা ও মতাদর্শ আপন জাতির মধ্যে প্রচলিত করেছ , অতীতে কেউ তেমন করেছে বলে আমাদের জানা নেই । তুমি পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করেছ , ধর্মের নিন্দা করেছ । দেবদেবীকে গালাগাল করেছ , বুদ্ধিমানদের নির্বোধ সাব্যস্ত করেছ এবং সমাজকে বিভক্ত করেছ । আমাদের ও তোমার মাঝের সম্পর্ক নষ্ট করার ব্যাপারে তুমি কিছু বাদ রাখনি । এভাবে তারা আরো অনেক দোষ তাঁর উপর আরোপ করল । তারপর তারা আরো বলল : এ বক্তব্য যদি তুমি এ জন্য উপস্থাপিত করে থাক যে , তুমি কিছু অর্থ - সম্পদের মালিক হতে চাও , তা হলে আমাদের সম্পদ থেকে তোমার জন্য এত অর্থ সংগ্রহ করব , যাতে তুমি আমাদের মাঝে সবাইতে অধিক সম্পদের মালিক হবে । আর যদি তুমি এ দিয়ে আমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ পদমর্যাদা লাভ করতে চাও , তা হলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে নেব । আর যদি রাজত্ব চাও , তবে তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নেব । আর যদি মনে কর , যে বশীভূত জিনটি তোমার কাছে আসে , সে তোমার উপর পরাক্রান্ত হয়েছে , আর মাঝে মাঝে এরূপ হয়েও থাকে , তাহলে আমরা তোমাকে রোগমুক্ত করতে যত অর্থ লাগে খরচ করে তোমাকে তার থেকে মুক্ত করে ছাড়ব । অন্তত তোমার ব্যাপারে আমরা দায়মুক্ত হব ।
. তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাদের বললেন : “ তোমরা যা যা বলছ , তার কোনটিই আমার মধ্যে নেই । আমি তোমাদের কাছে যে দাওয়াত নিয়ে এসেছি , তার বিনিময়ে আমি তোমাদের অর্থ - সম্পদ , নেতৃত্ব , রাজত্ব কোনটাই চাই না । আমাকে তো আল্লাহ্ তোমাদের কাছে রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন । আমার উপর একটি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা হওয়ার জন্য আমাকে আদেশ দিয়েছেন । সুতরাং আমি আমার রবের বাণী তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের সদুপদেশ দিয়েছি । তোমরা যদি আমার আনীত দাওয়াত গ্রহণ কর , তবে তা তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের কারণ হবে । আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান কর , তা হলে আমি আল্লাহ্র সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ততক্ষণ ধৈর্য ধারণ করব , যতক্ষণ না তিনি আমার ও তোমাদের বিবাদের নিষ্পত্তি করে দেন । ”