📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর মুশরিকদের নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন : উরওয়া ইবন যুবায়রের ছেলে ইয়াহ্ইয়া স্বীয় পিতা উরওয়া ইবন যুবায়র থেকে এবং তিনি আমর ইব্ন আসের ছেলে আবদুল্লাহ্ থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , উরওয়া বলেন , আমি আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম : কুরায়শের লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য শত্রুতা চালিয়ে যাচ্ছিল , তুমি তাদের রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে কতবার কষ্ট দিতে দেখেছ ? তিনি বললেন : একদিন শীর্ষস্থানীয় কুরায়শ নেতারা হিজরের ( হাতীমে ) কাছে সমবেত হয়েছিল । আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম । তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে কথাবার্তা বলা শুরু করল । তারা বলল :
এ লোকটির ব্যাপারে আমরা যত ধৈর্য ধারণ করলাম , অতীতে আমরা কোন ব্যাপারে এরূপ করিনি । সে বলছে , আমাদের নাকি বিবেক - বুদ্ধি বলতে কিছু নেই । আমাদের পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করছে , আমাদের ধর্মের নিন্দা করছে , আমাদের সমাজকে বিভক্ত করছে , আর আমাদের দেবদেবীদের গালিগালাজ করছে । আমরা তার এসব মারাত্মক কথার ওপর ধৈর্য ধরেছি । এভাবে তারা আরো অনেক কিছু বলাবলি করল । এ সময় হঠাৎ সেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আবির্ভূত হলেন । তিনি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে রুকনে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন । তারপর তিনি সমবেত নেতাদের অতিক্রম করে কা'বার তওয়াফ শুরু করলেন । তিনি যখন তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন , তখন তারা তাঁকে কটাক্ষ করে কিছু বলে । রাবী বলেন , আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চেহারা মুবারকে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম । তথাপি তিনি তওয়াফ করতে লাগলেন । দ্বিতীয়বার যখন তিনি তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন , তখন তারা আগের মতই তাঁকে কটাক্ষ করে কিছু বলে । এবারও আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চেহারা মুবারকে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম । তিনি তৃতীয়বারও তাদের পাশ দিয়ে গেলেন এবং এবারও তারা আগের মত তার প্রতি কটাক্ষ করে কিছু বলে । এবার রাসূলুল্লাহ্ (সা:) থামেন এবং বলেন : “ হে কুরায়শ দল ! তোমরা শোন ! সেউ সত্তার কসম , যাঁর হাতে আমার জীবন ! আমি তোমাদের ধ্বংসের সংবাদ নিয়ে এসেছি । ” আবদুল্লাহ্ বলেন , তাঁর এ কথা লোকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করল এবং তাদের মাঝে চরম নীরবতা নেমে আসল । তাদের মধ্যকার ঐ সমস্ত ব্যক্তি , যারা রাসুলুল্লাহ্ (সা:) -এর বিরুদ্ধে লোকদের উত্তেজিত করত , তারাও সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে তাঁর হৃদয় জয় করার চেষ্টা করতে লাগল ।
ভারা বলে হে আবুল কাসিম ! যান , আল্লাহর কসম ! আপনি তো কোনদিন মূর্খের মত কথা বলেন নি । ” রাবী বলেন : এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সেখান থেকে চলে আসেন । পরদিন আবার ঐ মুশরিকরা হিজরে হাতীমে জমায়েত হল । আমিও সেখানে উপস্থিত হলাম । শুনতে পেলাম । তারা একে অপরকে বলছে : তোমাদের কি মনে আছে , তোমাদের পক্ষ থেকে তাঁকে কি বলা হয়েছে এবং তাঁর থেকে তোমরা কি জবাব পেয়েছ ? এমনকি যখন সে তোমাদের সামনে তেজোদৃপ্ত ভাষায় কটু কথা বল্ল , তখনও তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে !
এ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাদের সামনে আবির্ভূত হলেন । তখন তারা সকলে একসংগে তাঁর উপর হামলা করল । তারা তাঁকে ঘিরে ফেলল । রাসুলুল্লাহ (সা:) তাদের ধর্ম ও দেব - দেবীর নিন্দায় যা যা বলতেন , তার উল্লখ করে তারা বলতে লাগল , “ তুমিই এসব কথা বলে থাকো , কেমন ? ” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নির্বিকারভাবে বললেন : “ হ্যাঁ , আমিই এসব কথা বলে থাকি । রাবী বলেন : এ সময় আমি তাদের একজনকে দেখলাম যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চাদরের দুই দিক দিয়ে প্যাঁচ দিয়ে তাঁর গলায় ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছে । এ সময় আবু বকর ( রা ) ঐ লোকটির সামনে রুখে দাঁড়ালেন আর তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন : তোমরা কি এমন এক লোককে হত্যা করবে , যে বলছে আমার রব আল্লাহ ? এ কথা বলার পর তারা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে সবাই চলে গেল । আবদুল্লাহ্ বলেন , আমি কুরায়শদের তরফ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর উপর যত নির্যাতন ও নিপীড়ন হতে দেখেছি , তার মধ্যে এটিই ছিল সবচাইতে মর্মান্তিক ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবূ বকর ( রা ) -এর কন্যা উম্মু কুলসুমের সন্তানদের কেউ আমাকে বলেছেন যে , উম্মু কুলসুম সেদিনকার ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেছেন যে , আবূ বকর যখন ঘটনার শেষে বাড়ি ফিরলেন , তখন দেখা গেল , কাফিররা তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে । তারা তাঁর দাড়ি ধরে টেনেছিল এবং তিনি ছিলেন অধিক চুলের অধিকারী ।
ইবন হিশাম বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন কোন ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে , কুরায়শদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) যে নিগ্রহ ভোগ করেছেন , তার ভেতর সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ছিল এই যে , একদিন তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর পথে যার সাথেই তার দেখা হয়েছে , চাই সে দাস হোক বা স্বাধীন লোক হোক , তাঁকে মিথ্যুক বলেছে ও কষ্ট দিয়েছে । এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বাড়ি ফিরে আসেন এবং অধিক মনোকষ্টের কারণে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন । এ সময় আল্লাহ্ নাযিল করেন : “ হে কম্বল আচ্ছাদিত ব্যক্তি ! উঠ , এবং সতর্ক কর । ”
**টিকাঃ**
১. আল - কুরআন , ৭৪ : ১-২ ।