📄 হাতিবের যুদ্ধ
ইবন হিশাম বলেন : ' হাতিবের যুদ্ধ ' প্রসংগে যে হাতিবের কথা বলা হয়েছে , সে হলো : হাতিব ইবন হারিস ইবন কায়স ইবন হায়শামা ইবন হারিস ইবন উমায়্যা ইব্ন মুআবিয়া ইব্ন মালিক ইবন আওফ ইন আমর ইবন আওফ ইব্ন মালিক ইব্ন আওস । সে খাযরাজ গোত্রের প্রতিবেশী জনৈক ইয়াহুদীকে হত্যা করে । এরপর ইয়াযীদ ইবন হারিস ইবন কায়স ইন মালিক ইবন আহমার ইবন হারিসা ইব্ন সা'লাবা ইবন কা'ব ইব্ন খাযরাজ ইবন হারিস ইব্ন খাযরাজ একদিন রাতে হারিস ইবন খাযরাজের কতিপয় লোক সাথে নিয়ে তার পিছু নেয় এবং তাকে হত্যা করে । ইয়াযীদ ইব্ন হারিসের অপর নাম ইব্ন ফুসহাম । ফুসহাম তার মায়ের নাম । ফুসহাম কায়ন ইব্ন জাসর গোত্রের মেয়ে । এ হত্যাকাণ্ডের কারণে আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । এ যুদ্ধে খাযরাজ গোত্র অওস গোত্রের উপর বিজয়ী হয় । সেদিন সুওয়ায়দ ইবন সামিত ইবন খালিদ ইবন আতিয়া ইবন হাউড ইবন হাবীব ইবন আমর ইবন আওফ ইবন মালিক ইবন আওস নিহত হয় । তাকে হত্যা করে মুজাফ্ফার ইবন যিয়াদ বালাভী । মুজায্যারের নাম আবদুল্লাহ এবং সে ছিল বনূ আওফ ইব্ন খাযরাজের মিত্র । উহুদ যুদ্ধের দিন মুজাফ্ফার ইবন যিয়াদ রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর পক্ষে যুদ্ধ করেন । তাঁর পক্ষে সুওয়ায়দ ইবন সামিতের ছেলে হারিসও যুদ্ধ করেন । হারিস ইব্ন সুওয়ায়ন মুজাফ্ফারকে অসতর্ক অবস্থায় পেয়ে তাকে আপন পিতৃহত্যার প্রতিশোধ হিসাবে হত্যা করেন । যথাস্থানে এ ঘটনা বর্ণনা করবো ইনশাআল্লাহ্ ।
এরপর তাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ - বিগ্রহ সংঘটিত হয় । দাহিসের যুদ্ধের ন্যায় এ ঘটনারও বিস্তারিত বিবরণ দিলে তা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জীবনী বর্ণনায় বিঘ্ন ঘটাবে । এ জন্য আমি সে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করা থেকে বিরত থাকলাম ।
📄 হাকীম ইবন উমায়্যা স্বীয় গোত্রকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শত্রুতা করতে নিষেধ করে যে কবিতা আবৃত্তি করেন
ইবন ইসহাক বলেন বনু উমায়া গোত্রের মিত্র , আপন গোত্রে সম্মানিত ও ভক্তিভাজন এবং পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণকারী হাকীম ইবন উমায়া ইবন হারিস ইবন আওকাস সুলামী স্বীয় গোত্রকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর শত্রুতা করার নীতি থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন । এ প্রসংগে তিনি নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করেন :
“ এমন কোন সত্যবাদী আছে কি , যে সত্য কথা না বলে চুপ থাকতে পারে ? আর এমন কোন রাগান্বিত ব্যক্তি আছে কি , যে সহজ - সরল কথা শোনে ? এমন কোন সরদার আছে কি , যা থেকে তার আপনজনেরা উপকৃত হওয়ার আশা করে ? আর যে দূরের ও নিকটের সকল স্বজনকে একত্র করতে সক্ষম ? আমি সকলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি , কেবল প্রাতঃকালীন বায়ুর অধিপতি ( আল্লাহ্ ) ছাড়া । আর যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের মাঝে আত্মকলহ সৃষ্টিকারী ও এর নিষ্পত্তিকারী বিদ্যমান থাকবে , আমি তোমাদের কাছ থেকে দূরে থাকবো ।
“ আমি আমার সত্তাকে এবং কথাবার্তাকে সত্য মাবূদের উপর সোপর্দ করছি , যদিও এ কারণে বন্ধুদের পক্ষ থেকে আমাকে ধমকের পর ধমকও দেয়া হয় । ”
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর নিজের গোত্রের পক্ষ থেকে যে নির্যাতন ভোগ করেন তার বর্ণনা
কুরায়শের দুশ্চরিত্র মূর্খ লোক কর্তৃক তাঁর উপর নিপীড়ন
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর এবং তাঁর হাতে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন , তাদের ব্যাপারে কুরায়শদের নিষ্ঠুর মনোভাব আরো কঠোর রূপ ধারণ করে । তারা তাদের মধ্যকার নির্বোধ , বখাটে ও দুশ্চরিত্র লোকদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় । তারা তাঁকে মিথ্যুক বলে , নানাভাবে কষ্ট দেয় এবং তাঁকে কখনো কবি , কখনো জাদুকর , কখনো গণক , আবার কখনো পাগল বলে অভিহিত করে । এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আল্লাহ্র বিধান প্রচার করতে থাকেন । কিছুই গোপন করলেন না । তিনি তাদের ধর্মের অসারতা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে থাকেন , যা তারা পসন্দ করত না । তিনি তাদের দেবদেবীদের বয়কট করেন এবং তাদের কুফরী আচরণের জন্য তাদেরকে বর্জন করা অব্যাহত রাখলেন ।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর মুশরিকদের নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন : উরওয়া ইবন যুবায়রের ছেলে ইয়াহ্ইয়া স্বীয় পিতা উরওয়া ইবন যুবায়র থেকে এবং তিনি আমর ইব্ন আসের ছেলে আবদুল্লাহ্ থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , উরওয়া বলেন , আমি আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম : কুরায়শের লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য শত্রুতা চালিয়ে যাচ্ছিল , তুমি তাদের রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে কতবার কষ্ট দিতে দেখেছ ? তিনি বললেন : একদিন শীর্ষস্থানীয় কুরায়শ নেতারা হিজরের ( হাতীমে ) কাছে সমবেত হয়েছিল । আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম । তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে কথাবার্তা বলা শুরু করল । তারা বলল :
এ লোকটির ব্যাপারে আমরা যত ধৈর্য ধারণ করলাম , অতীতে আমরা কোন ব্যাপারে এরূপ করিনি । সে বলছে , আমাদের নাকি বিবেক - বুদ্ধি বলতে কিছু নেই । আমাদের পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করছে , আমাদের ধর্মের নিন্দা করছে , আমাদের সমাজকে বিভক্ত করছে , আর আমাদের দেবদেবীদের গালিগালাজ করছে । আমরা তার এসব মারাত্মক কথার ওপর ধৈর্য ধরেছি । এভাবে তারা আরো অনেক কিছু বলাবলি করল । এ সময় হঠাৎ সেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আবির্ভূত হলেন । তিনি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে রুকনে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন । তারপর তিনি সমবেত নেতাদের অতিক্রম করে কা'বার তওয়াফ শুরু করলেন । তিনি যখন তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন , তখন তারা তাঁকে কটাক্ষ করে কিছু বলে । রাবী বলেন , আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চেহারা মুবারকে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম । তথাপি তিনি তওয়াফ করতে লাগলেন । দ্বিতীয়বার যখন তিনি তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন , তখন তারা আগের মতই তাঁকে কটাক্ষ করে কিছু বলে । এবারও আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চেহারা মুবারকে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম । তিনি তৃতীয়বারও তাদের পাশ দিয়ে গেলেন এবং এবারও তারা আগের মত তার প্রতি কটাক্ষ করে কিছু বলে । এবার রাসূলুল্লাহ্ (সা:) থামেন এবং বলেন : “ হে কুরায়শ দল ! তোমরা শোন ! সেউ সত্তার কসম , যাঁর হাতে আমার জীবন ! আমি তোমাদের ধ্বংসের সংবাদ নিয়ে এসেছি । ” আবদুল্লাহ্ বলেন , তাঁর এ কথা লোকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করল এবং তাদের মাঝে চরম নীরবতা নেমে আসল । তাদের মধ্যকার ঐ সমস্ত ব্যক্তি , যারা রাসুলুল্লাহ্ (সা:) -এর বিরুদ্ধে লোকদের উত্তেজিত করত , তারাও সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে তাঁর হৃদয় জয় করার চেষ্টা করতে লাগল ।
ভারা বলে হে আবুল কাসিম ! যান , আল্লাহর কসম ! আপনি তো কোনদিন মূর্খের মত কথা বলেন নি । ” রাবী বলেন : এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সেখান থেকে চলে আসেন । পরদিন আবার ঐ মুশরিকরা হিজরে হাতীমে জমায়েত হল । আমিও সেখানে উপস্থিত হলাম । শুনতে পেলাম । তারা একে অপরকে বলছে : তোমাদের কি মনে আছে , তোমাদের পক্ষ থেকে তাঁকে কি বলা হয়েছে এবং তাঁর থেকে তোমরা কি জবাব পেয়েছ ? এমনকি যখন সে তোমাদের সামনে তেজোদৃপ্ত ভাষায় কটু কথা বল্ল , তখনও তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে !
এ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাদের সামনে আবির্ভূত হলেন । তখন তারা সকলে একসংগে তাঁর উপর হামলা করল । তারা তাঁকে ঘিরে ফেলল । রাসুলুল্লাহ (সা:) তাদের ধর্ম ও দেব - দেবীর নিন্দায় যা যা বলতেন , তার উল্লখ করে তারা বলতে লাগল , “ তুমিই এসব কথা বলে থাকো , কেমন ? ” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নির্বিকারভাবে বললেন : “ হ্যাঁ , আমিই এসব কথা বলে থাকি । রাবী বলেন : এ সময় আমি তাদের একজনকে দেখলাম যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চাদরের দুই দিক দিয়ে প্যাঁচ দিয়ে তাঁর গলায় ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছে । এ সময় আবু বকর ( রা ) ঐ লোকটির সামনে রুখে দাঁড়ালেন আর তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন : তোমরা কি এমন এক লোককে হত্যা করবে , যে বলছে আমার রব আল্লাহ ? এ কথা বলার পর তারা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে সবাই চলে গেল । আবদুল্লাহ্ বলেন , আমি কুরায়শদের তরফ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর উপর যত নির্যাতন ও নিপীড়ন হতে দেখেছি , তার মধ্যে এটিই ছিল সবচাইতে মর্মান্তিক ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবূ বকর ( রা ) -এর কন্যা উম্মু কুলসুমের সন্তানদের কেউ আমাকে বলেছেন যে , উম্মু কুলসুম সেদিনকার ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেছেন যে , আবূ বকর যখন ঘটনার শেষে বাড়ি ফিরলেন , তখন দেখা গেল , কাফিররা তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে । তারা তাঁর দাড়ি ধরে টেনেছিল এবং তিনি ছিলেন অধিক চুলের অধিকারী ।
ইবন হিশাম বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন কোন ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে , কুরায়শদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) যে নিগ্রহ ভোগ করেছেন , তার ভেতর সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ছিল এই যে , একদিন তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর পথে যার সাথেই তার দেখা হয়েছে , চাই সে দাস হোক বা স্বাধীন লোক হোক , তাঁকে মিথ্যুক বলেছে ও কষ্ট দিয়েছে । এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বাড়ি ফিরে আসেন এবং অধিক মনোকষ্টের কারণে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন । এ সময় আল্লাহ্ নাযিল করেন : “ হে কম্বল আচ্ছাদিত ব্যক্তি ! উঠ , এবং সতর্ক কর । ”
**টিকাঃ**
১. আল - কুরআন , ৭৪ : ১-২ ।