📄 আপন গোত্রের সাহায্য ও সমর্থন পেয়ে আবূ তালিব তাদের প্রশংসায় যে কবিতা রচনা করেন
আবূ তালিব যখন দেখলেন , তার গোত্রের লোকেরা তার সহযোগিতায় সক্রিয় , তখন তিনি খুবই আনন্দিত হলেন , তাদের প্রতি খুবই প্রীত হলেন , তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের অতীত গৌরবের উল্লেখ করলেন । সে সাথে সমগ্র গোত্রের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কত মর্যাদাবান ব্যক্তি , তাও ব্যাখ্যা করলেন , যাতে তাদের মতামত আরো মযবূত হয় এবং সব সময় তারা তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে । এ বিষয়ে তিনি তার কবিতায় বললেন :
“ কুরায়শ যখন কোন অতীত গৌরবের ব্যাপারে একমত হবে , তখন ( দেখা যাবে ) আবদে মানাফই তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । আর যদি আবদ মানাফের শরীফ ব্যক্তিদের গণনা করা হয় , তবে . বনূ হাশিমের মধ্যেই রয়েছে শরাফত ও আভিজাত্য ।
আর কুরায়শরা যদি কোন দিন গৌরববোধ করে , তবে মুহাম্মদই হবেন তাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম এবং তিনিই হবেন তাদের মধ্যে মহান ও অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি । কুরায়শ আমাদের ওপর তাদের খাঁটি ও ভেজাল সকল লোককে উস্কে দিয়েছিল , কিন্তু তারা সফল হয়নি , তাদের জ্ঞান - বুদ্ধি বিলুপ্ত হয়েছে । আমরা প্রাচীনকাল থেকেই কোন যুলুমকে সমর্থন করিনি , তবে কেউ ( অহংকারের সাথে ) মুখ বাঁকা করলে তা সোজা করে দিতাম । সব সময়ই আমরা কুরায়শকে সংকটকাল ও দুর্যোগে রক্ষা করতাম আর যারা তাদের সীমানায় প্রবেশ করতে চায় , আমরা তাদেরকে দূরে হটিয়ে দিতাম ।
“ আমাদের কল্যাণেই শুকনো কাঠে জীবনের সঞ্চার হত , আমাদের ঘন অরণ্যেই তার মূল বিকাশ লাভ করত । ”
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শত্রুদের বিরুদ্ধে ওয়ালীদ ইব্ মুগীরার চক্রান্ত ও কুরআনের ব্যাপারে তার ভূমিকা
একদিন কুরায়শ গোত্রের একটি দল ওয়ালীদ ইবন মুগীরার কাছে সমবেত হল । তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন বর্ষীয়ান ব্যক্তি । তখন হজ্জের মওসুম সমাগত । তিনি বললেন , কুরায়শের লোকেরা , হজ্জের মওসূম সমাগত । এ সময় আরবের সব এলাকা থেকে প্রতিনিধি দল আসবে । তোমাদের সংগী মুহাম্মদের ব্যাপার তো তারা শুনেছেই । কাজেই তার ব্যাপারে তোমরা একটা সর্বসম্মত মত স্থির কর । এ ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে একজন আরেকজনকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করবে এবং একজন আরেকজনের কথার জবাব দেবে । তারা সবাই বলল , হে আবূ আব্দ শাম্স , আপনিই বলুন এবং আপনিই আমাদের জন্য একটি মত স্থির করে দিন , আমরা সে মতই কাজ করব ।
আমি শুনব ।
ওয়ালীদ বললেন , বরং তোমরাই বল , তারা বলল , আমরা তো বলি মুহাম্মদ একজন জ্যোতিষী ।
ওয়ালীদ বললেন , না , আল্লাহ্র কসম , তিনি জ্যোতিষী নন । আমরা বহু জ্যোতিষী দেখেছি । জ্যোতিষীর রহস্যময় ও গোপন কথার সাথে মুহাম্মদের কথাবার্তার কোন মিল নেই ।
জনতা বলল , তা হলে আমরা বলবো তিনি পাগল ।
ওয়ালীদ বললেন : না , তিনি পাগল নন । আমরা পাগলামি দেখেছি ও জানি । মুহাম্মদের মধ্যে সে ধরনের মানসিক প্ররোচনা অস্থিরতা ও কুমন্ত্রণার ভাব নেই ।
জনতা বলল , তাহলে আমরা তাকে কবি বলি ।
ওয়ালীদ বললেন , না তিনি কবি নন । আমরা সকল ধরনের কবিতা পড়েছি এবং জানি । যুদ্ধের কবিতা , শান্তির কবিতা , ছোট কবিতা , বড় কবিতা সবই দেখেছি । কিন্তু মুহাম্মদ যা বলে তা কবিতা নয় ।
সবাই বলল , তাহলে আমরা তাকে জাদুকর বলি ।
ওয়ালীদ বললেন , না , তিনি জাদুকর নন । আমরা বহু জাদুকর ও জাদু দেখেছি । জাদুকররা যেভাবে সূতায় গিরে দিয়ে তাতে ফুঁক দেয় , মুহাম্মদ তা করে না ।
সবাই বলল , তাহলে হে আবূ আব্দ শাসস , ( ওয়ালীদের ডাক নাম ) আপনার মত কি !
ওয়ালীদ বললেন , মুহাম্মদের কথাবার্তা বড়ই মিষ্টি , তার মূল বড়ই মযবৃত এবং তার ফল খুবই সুস্বাদু ।
ইবন হিশাম বলেন : কেউ কেউ বলেছেন , ওয়ালীদ বলেছিলেন , মুহাম্মদের কথাবার্তা খুবই রস ও তাৎপর্যে পরিপূর্ণ । ওয়ালীদ আরো বললেন , তোমরা এ সব যাই বলবে , সেটাই ভ্রান্ত প্রমাণিত হবে । তবে জাদুকর বলাই অপেক্ষাকৃত সঠিক হবে । কেননা সে এমন বক্তব্য নিয়ে এসেছে র্যাঁ পিতা - পুত্রে , ভাইয়ে ভাইয়ে , স্বামী -স্ত্রীতে এবং খান্দানের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায় । আর সেই বক্তব্যের ফলে বাস্তবিকই পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে ।
ওয়ালীদের পরামর্শ মুতাবিক হজ্জের মওসুম যখন সমাগত হল , তখন কুরায়শের লোকেরা লোকজনের চলার পথে বসে পড়ল । রাস্তা দিয়ে যে - ই যায় , তাকেই তারা মুহাম্মদের ধর্ম প্রচারের বিরূদ্ধে সাবধান করে দিত । এ জন্য আল্লাহ্ তা'আলা ওয়ালীদ ইবন মুগীরা সম্পর্কে আয়াত নাযিল করেন :
“ আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে , যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে ।
আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন - সম্পদ ,
এবং নিত্যসংগী পুত্রগণ ,
এবং তাকে দিয়েছি সচ্ছল জীবনের প্রচুর উপকরণ—
এরপরও সে কামনা করে যে , আমি তাকে আরো অধিক দিই ।
না , তা হবে না , সেতো আমার নিদর্শনসমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী । ” ( ৭৪ : ১১-১৬ )
ইবন হিশাম বলেন : ' আনীদ ' অর্থ চরম শত্রু ।
কবি রুবা ইব্ন আজ্জাজ বলেন : “ আমরা পরম শত্রুর শির বিচূর্ণ করে থাকি । ” ...... “ আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করব ।
সে তো চিন্তা করল এবং সিদ্ধান্ত করল ।
📄 ওয়ালীদের সংগীদের উক্তির জবাবে কুরআন
অভিশপ্ত হোক সে । কেমন করে সে এ সিদ্ধান্ত করল । অভিশপ্ত হোক সে কেমন করে সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হল ?
সে আবার চেয়ে দেখল । এরপর ভ্রূ - কুঞ্চিত করল ও মুখ বিকৃত করল । ” ( ৭৪ : ১৮-২২ ) । ইবন হিশাম বলেন : “ বাসারা ' অর্থ মুখ বিকৃত করা । আজ্জাজ বলেন : l i ball side সে চেহারা বিকৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে এ কথা বলেছে ।
“ তারপর সে পিছনে ফিরল এবং দম্ভ প্রকাশ করল ।
এবং ঘোষণা করল , এতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত জাদু ছাড়া আর কিছু নয় , এতো মানুষেরই কথা । ” ( ৭৪ : ২৩ , ২৪ , ২৫ )
ইবন ইসহাক বলেন : যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে এ সব উক্তি করল , তাদের জবাবে আল্লাহ্ নাযিল করলেন :
“ যেভাবে আমি অবতীর্ণ করেছিলাম ( কুরআনকে ) বিভক্তকারীদের ওপর ।
যারা কুরআনকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করেছে ।
তাই শপথ তোমার প্রতিপালকের ! আমি তাদের সকলকে প্রশ্ন করবই ,
সে বিষয়ে , যা তারা আমল করে । ” ( ১৫ : ৯০-৯৩ ) ।
ইবন ইসহাক বলেন : কুরায়শের ঐ সকল কুচক্রী লোকজন যে ব্যক্তির সাথেই দেখা হয় , তাকেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে অনুরূপ বলতে থাকে । ফলে সে মওসুমে আরবরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সম্পর্কে তাদের প্রচার করা খবর নিয়ে দেশে ফিরল । তারপর তাদের মাধ্যমে আরবের সর্বত্র এ খবর ছড়িয়ে পড়ল ।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শত্রুতায় আবূ তালিবের কবিতা
এরপর যখন আবূ তালিব আশঙ্কা করলেন যে , আরবের সাধারণ মানুষ কুরায়শী জনতার সাথে মিলিত হয়ে না জানি কোন সময় তার উপর আক্রমণ করে বসে , তখন তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করেন । এতে তিনি মক্কার হারাম শরীফে এবং সেখানে বসবাসের দরুন তিনি যে সম্মান অর্জন করেন , সে বিষয় উল্লেখ করেন । সে কবিতায় কুরায়শ নেতৃবৃন্দের প্রতি তার ভালবাসা প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি সকলকে এ কথাও দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেন যে , তিনি নিজে মৃত্যুমুখে পতিত হলেও কখনো কোন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে কারো হাতে সোপর্দ করবেন না । তার কবিতাটির অনুবাদ :
“ যখন দেখলাম , গোত্রের লোকদের কোন মমত্ব নেই এবং তারা সকল সম্পর্ক ও বন্ধন ছিন্ন করেছে , তারা প্রকাশ্যে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও নির্যাতনের চ্যালেঞ্জ দিয়েছে এবং কট্টর দুশমনের রীতি অনুসরণ করেছে । এমন লোকদের সাথে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মৈত্রী স্থাপন করেছে , যারা অগোচরে আমাদের বিরুদ্ধে রাগে আংগুল কামড়ায় এবং যারা আমাদের প্রতি সন্দেহপ্রবণ । উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তলোয়ার ও বর্শা হাতে নিয়ে তাদের মুকাবিলায় আমি নিজেকে ধৈর্যশীল বানিয়েছি । আর কা'বাঘরের কাছে আমার গোত্রের লোকজন ও ভাইদের হাযির করেছি এবং সকলে মিলে কা'বাঘরের লাল নকশী চাদর আঁকড়িয়ে ধরেছি । একই সাথে তার মহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু'আ করেছি , যেখানে প্রত্যেক নফল ইবাদতকারী দাঁড়িয়ে শপথ গ্রহণ করে । যেখানে যিয়ারতকারীরা তাদের উট বসায় , ইসাফ ও নায়েলার কাছে পানির স্রোত প্রবাহের স্থানে । বাহনগুলোর বাহুতে ও ঘাড়ে প্রতীক অংকিত ছয় বছর ও নয় বছর বয়সের বাহন যেখানে অনুগত হয়ে থাকে ।
“ শিশু - কিশোরদের সাজগোছের সরঞ্জাম , মর্মর পাথর ও অন্যান্য সৌন্দর্য উপকরণকে সেগুলোর ঘাড়ে এমনভাবে লটকানো দেখবে যেমন খেজুর গাছের সাথে খেজুরের থোকা লটকানো থাকে ।
“ সকল বিদ্রূপকারী থেকে মানুষের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় চাই , যে দুশমন আমাদের জন্য অকল্যাণ কামনা করে অথবা কোন অন্যায় কথা নিয়ে জিদ ধরে । আর সে বিদ্বেষ পোষণকারী শত্রু থেকেও নিস্তার চাই যে আমাদের ছিদ্র ও ত্রুটি অন্বেষণ করে এবং সেই ব্যক্তি থেকে , যে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মকে বিকৃত করে ।
“ সাওর পর্বতের আশ্রয় নিচ্ছি এবং সে সত্তার আশ্রয় — যিনি তদস্থলে সাবীর পর্বতকে নিজ স্থানে মযবূতভাবে গেড়ে দিয়েছেন এবং হেরা পর্বতে আরোহণকারী ও অবতরণকারীর ( জিবরীল ) আশ্রয় । কা'বাগৃহ ও তার অধিকারের আশ্রয় , যে ঘর মক্কার উপত্যকায় অবস্থিত , আর আল্লাহ্ আশ্রয় নিচ্ছি , নিশ্চয়ই তিনি অনবহিত নন ।
“ আর আশ্রয় নিচ্ছি হাজারে আসওয়াদের — যখন লোকে তাকে স্পর্শ করে । যখন সকাল ও সন্ধ্যায় লোকজন তাকে ঘিরে রাখে । আর পাথরের ভেতরে ইবরাহীম ( আ ) -এর পা রাখার জায়গাটির আশ্রয় নিচ্ছি , যা সিক্ত , যখন তিনি নগ্নপায়ে ( তার ওপর ) দাঁড়ান ও তা নরম হয়ে যায় । আর সাফা ও মারওয়া পাহাড় দু'টির মাঝখানে যে দ্রুত প্রদক্ষিণ করে তার আশ্রয় নিচ্ছি । এ দুই পাহাড়ের মাঝে যে ছবি ও মূর্তি রয়েছে তার আশ্রয় নিচ্ছি । আর আশ্রয় নিচ্ছি যারা বায়তুল্লাহ্ - এর হজ্জ করে সাওয়ারীতে আরোহণ করে কিংবা পদব্রজে এবং আশ্রয় নিচ্ছি প্রত্যেক মানতকারীর ।
“ আর আরাফাত ময়দানের আশ্রয় নিচ্ছি , যখন হাজীগণ এর দিকে যাত্রা করে আর ইলাল পর্বতের সে স্থানের আশ্রয় নিচ্ছি , যেখানে পানির প্রণালীগুলো একত্র হয় । আশ্রয় নিচ্ছি সন্ধ্যায় পাহাড়ের উপর তাদের অবস্থানের স্থলটির , যেখানে হাতের সাহায্যে তারা ভারবাহী পশুর সম্মুখ ভাগ বিন্যাস করে । আর মুযদালিফার রাত ও মিনার মনযিলগুলার আশ্রয় নিচ্ছি । এগুলোর চাইতে অধিক সম্মানী কোন মহান মনযিল কি হতে পারে ? আর মুযদালিফার আশ্রয় নিচ্ছি , যখন শাস্ত উটগুলো তাকে এত দ্রুত পরিত্যাগ করে , যেমন মুষলধারে বৃষ্টি নামলে তারা ছুটে চলে । আর জামারাতুল কুবরার আশ্রয় নিচ্ছি , যখন লোকেরা তার দিকে ছুটে চলে , তার চূড়ায় কঙ্কর ছুঁড়ে মারে । আর কিন্দা গোত্রের লোকেরা যখন সন্ধ্যাকালে কঙ্কর নিক্ষেপের জায়গায় অবস্থান করে , তখন বাকর ইব্ন ওয়ায়লের হাজীরা তাদেরকে অতিক্রম করে । এরা উভয় গোত্র পরস্পরের এমন মিত্র যে , তারা নিজেদের মধ্যে যে কোন বিষয়ে অঙ্গীকার করে , তা দৃঢ়তার সাথে পালন করে এবং সকল মায়া - মমতার বন্ধন ও উপায় এর জন্য ব্যয় করে । আর আশ্রয় নিচ্ছি উটপাখির ন্যায় দ্রুতগামী সাওয়ারীর অভিযান দ্বারা পাহাড়ের কলাগাছ ও বড় বড় বৃক্ষ এবং গুল্ম - লতার বিনাশ সাধনের । এরপর আর কোন আশ্রয় গ্রহণকারীর কি কোন আশ্রয়স্থল আছে ? আর কোন ন্যায়নিষ্ঠ খোদাভীরু আশ্রয়দাতাও আছে কি ? আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের কথা মানা হয় এবং তারা চায় যে , আমাদের জন তুর্ক এবং কাকূলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাক ।
“ আল্লাহ্র ঘরের কসম ! তোমরা মিথ্যা বলেছ ; তোমাদের এ খেয়াল সম্পূর্ণ অসার যে , আমরা মক্কা ভূমি ছেড়ে চলে যাব । আল্লাহ্র ঘরের কসম ! তোমাদের এ ধারণা মিথ্যা যে , মুহাম্মদের জন্য চূড়ান্ত লড়াই না করেই আমরা তাকে বর্জন করব । এ ধারণাও মিথ্যা যে , তার জন্য নিহত না হওয়া এবং নিজেদের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে চেতনা ভুলে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা মুহাম্মদকে কারো কাছে সমর্পণ করব ।
“ যতক্ষণ কোন সশস্ত্র দল তোমাদের দিকে এমনভাবে ধাবিত না হয় , যেমন ধাবিত হয় পানিবাহী ঘণ্টধ্বনি বহনকারী উটের বহর ।
“ যতক্ষণ তুমি বিদ্বেষপরায়ণ শত্রুকে রক্তস্নাত অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে না দেখবে , ততক্ষণ আমরা মুহাম্মদকে সমর্পণ করব না ।
“ আল্লাহর স্থায়িত্বের কসম , আমি যা ধারণা করছি তা যদি সত্যিই ঘটে , তাহলে আমাদের তরবারিগুলো বড় বড় সর্দারদের পেটে বিদ্ধ হবে ।
“ শিহার নক্ষত্রের মত উজ্জল নেতৃস্থানীয় যুবকের হাতে থাকবে তরবারিগুলো , যিনি বিশ্বস্ত এবং সত্যের সংরক্ষক বীর পুরুষ । আমাদের উপর দিয়ে মাসের পর মাস , দিনের পর দিন ও পূর্ণ বছর অতিবাহিত হবে এবং এক হজ্জের পর আরেক হজ্জ আসবে । তোমার পিতৃবিয়োগ ঘটুক , মুহাম্মদ (সা:) -এর ন্যায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে ত্যাগ করা কাম্য নয় , যিনি সত্যের সংরক্ষণ করে থাকেন , আর যিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী নন এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীলও নন । এমন উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী , যার চেহারার বরকতে বৃষ্টি চাওয়া হয় এবং যে ইয়াতীমের অভিভাবক ও অধিকার রক্ষক । তার কাছে আশ্রয় নেয় বনূ হাশিমের দুস্থ লোকেরা । তারা তার কাছে দয়া ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে অবস্থান করে ।
“ আমার জীবনের কসম , উসায়দ ও বাকর গোত্র আমাদের সাথে শত্রুতা করেছে এবং আহারকারীর জন্য আমাদেরকে টুকরো টুকরো করে হাযির করেছে । আর উসমান ও কুনফু আমাদের দিকে কোন লক্ষ্যই করেনি ; বরং তারা আমাদের শত্রুভাবাপন্ন গোত্রগুলোর সহযোগিতা করেছে ।
“ তারা আনুগত্য প্রকাশ করেছে উবায় ও ইবন আব্দ ইয়াগূস গোত্রের এবং আমাদের কথার প্রতি কোন কর্ণপাত করেনি ।
“ যেমন আমরা সুবায়— ও নাওফলের কাছ থেকে একই ব্যবহার পেয়েছি এবং তারা সকলেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে , সৎব্যবহার করেনি ।
“ এখনও যদি তাদের সাক্ষাত পাওয়া যায় কিংবা আল্লাহ্ তাদের ওপর আমাদেরকে বিজয়ী করেন , তা হলে তাদের জন্য উপযুক্ত প্রতিশোধ ঠিক করে রেখেছি । আবূ আমর আমাদের ক্রোধ ছাড়া আর কিছু চায় না , যাতে আমাদেরকে তারা উট ও ছাগলের মধ্যে বসবাস করাতে সমর্থ হয় ৷
“ আবূ আমর প্রত্যেক সকালে ও সন্ধ্যায় আমাদের ব্যাপারে চুপিচুপি ষড়যন্ত্র করে । হে আবূ আমর , তুমি যত পার কানাঘুষা এবং ধোঁকাবাজি করতে থাক ।
“ সে আল্লাহ্র কসম করে বলে যে , আমাদের সাথে ধোঁকাবাজি করবে না , অথচ আমরা স্পষ্টত দেখছি যে , সে আমাদের সাথে ধোঁকাবাজি করছে ।
“ আমাদের প্রতি শত্রুতা তার জন্য আখশাব ও মুজাদিল পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকাকেও সংকীর্ণ করে দিয়েছে ।
“ আবুল ওয়ালীদকে জিজ্ঞেস কর , তুমি ধোঁকাবাজদের মত বিমুখ হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালিয়ে কি ক্ষতি করতে পেরেছ ?
' “ তুমি তো এমন এক ব্যক্তি ছিলে , যার দয়া ও মতামত নিয়ে জীবন ধারণ করা হত , তুমি কোন অজ্ঞ ব্যক্তি নও ।
“ হে উত্বা ! তুমি আমাদের সম্পর্কে এমন কোন কপট শত্রুর কথা শুনবে না , যে হিংসুটে , মিথ্যুক ও ধোঁকাবাজ ।
“ আবূ সুফিয়ান আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল , যেমন কোন গোত্রপতি বড় বড় ব্যবসায়ীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ।
“ সে নাজদ ও তার ঠাণ্ডা পানির স্থানের দিকে পালিয়ে যায় আর ভাবে যে , আমি তোমাদের সম্পর্কে অনবহিত নই ।
টিই সে আমাদেরকে একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর মত জানায় যে , সে আমাদের প্রতি দয়ালু এবং নিষ্ঠুর ইবাদতগুলোক চাপা দিয়ে ও দমন করে রাখে ।
“ হে মুতঈম ! আমি তো নাজদার দিন তোমাকে অপমান করিনি , আর বড় বড় বিপদের সময়ও তোমার সম্মানকে অবজ্ঞা করিনি ।
“ আর সে সংঘর্ষের দিনও আমি তোমার সহযোগিতা ত্যাগ করিনি । যখন তোমার কাছে তোমার চরম দুশমন উপস্থিত হয়েছে তোমার মুকাবিলা করার জন্য ।
“ হে মুতঈম ! গোত্রের লোকেরা তোমার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে , আর আমার ওপর যখন দায়িত্ব অর্পিত হবে , তখন তুমি রেহাই পাবে না ।
“ আমাদের পক্ষ হতে আল্লাহ্ নাওফাল ও আবদ শামসকে খারাপ প্রতিদান দিন । বিলম্বে নয় , অনতিবিলম্বে ।
“ ন্যায্য বিচারের তুলাদণ্ডে , যেখানে একটি যব পরিমাণও কারো ক্ষতি করা হয় না । তার বিবেক সাক্ষ্য দেয় যে , এ প্রতিদান অন্যায়মূলক নয় । যে গোত্র আমাদের বদলে বনূ খালাফ ও বনূ গায়াতিলকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে , তাদের জ্ঞান লোপ পেয়েছে । আমরা অনেক আগে থেকেই হাশিমের আসল বংশধর এবং আমরা ধনু কুসাইরের বিশিষ্ট ব্যক্তি ।
আর বনু সাহম ও বনূ মাখযূম ইতর ও নির্বোধ শ্রেণীর লোকদের আমাদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে ফিতনা - ফাসাদ সৃষ্টি করেছে ।
“ হে বনূ আব্দ মানাফ ! তোমরা তো তোমাদের গোত্রের শ্রেষ্ঠ মানুষ । কাজেই তোমরা তোমাদের ব্যাপারে কোন অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে শরীক করবে না ।
“ আমার জীবনের শপথ ! তোমরা দুর্বল ও অক্ষম হয়ে পড়েছ এবং এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছ যা যুক্তিসম্মত নয় । কিছু দিন আগে তোমরা ছিলে একটি ডেগের জ্বালানি স্বরূপ , আর এখন তোমরা হয়েছ অনেক ডেগের জ্বালানি । আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করা , আমাদের সাহায্য না করা এবং জরিমানা আদায়ের ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা না করার জন্য বনূ আব্দ মানাফকে ধন্যবাদ । আমরা যদি মানুষ হয়ে থাকি , তা হলে তোমাদের এ আচরণের প্রতিশোধ নেব এবং তোমরা আমাদের থেকে কোনরূপ সাহায্য - সহযোগিতা পাওনা । বনূ লুআঈ ইব্ন গালিবের মাঝে যে সম্পর্ক , তা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী লোকেরা অস্বীকার করেছে । নুফায়লের লোকেরা এ প্রস্তরময় ভূখণ্ডে পদার্পণকারীদের মধ্যে নিকৃষ্টতম এবং বনূ মা'আদের ধনী - দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের মধ্যে তারাই হীনতম মানুষ । বনূ কূসাইকে এ খবর ও সুসংবাদ পৌঁছে দাও যে , অচিরেই আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে এবং আমাদের তরফ থেকে তাদের আর কোনরূপ সাহায্য করা হবে না । যদি হঠাৎ বনূ কূসাইয়ের ওপর কোন দুর্যোগ নেমে আসে , তবে আমরা তাদের উদ্ধার করার জন্য বাধ্য থাকব না । যদি লোকেরা তাদের ঘরে ঢুকে তাদের ওপর জঘন্য হামরা চালায় , তবে আমরা সন্তানধারী মহিলাদের কাছে বসে থাকব ( অর্থাৎ তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাব না ) । আমার জীবনের কসম ! যাকে আমরা বন্ধু ও ভাগিনা মনে করি , তাকে আমরা একটু পরেই উপকারী হিসাবে পাই না । তবে বনূ কিলাব ইব্ন মুরার একটি অংশ এর ব্যতিক্রম , যারা আমাদের সংগে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিযোগ থেকে পবিত্র । আমরা তাদের এমনভাবে দুর্বল করে দিয়েছি যে , তাদের দল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে । আর সব ধরনের বিদ্রোহী ও নির্বোধ লোকেরা আমাদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায় । তাদের বস্তিতে আমাদের পানি পান করানোর একটি হাওয ছিল । আর আমরাই তো বনূ গালিবের মাঝে শ্রেষ্ঠ সম্মানের অধিকারী । আমরা আতরের মাঝে আংগুল ডুবিয়ে শপথকারী বনু হাশিমের এমন কিছু যুবক , যাদের ইস্পাতদৃঢ় হাতে চকচকে তরবারি শোভা পাচ্ছে । আমরা প্রতিশোধ নিইনি , রক্তপাত ঘটাইনি এবং সম্প্রদায়ের নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের ছাড়া আর কারো বিরোধিতা করিনি । একটি আঘাত এলেই তুমি এসব যুবককে দেখবে , তারা যেন গোশতের স্তূপের ওপর হিংস্র সিংহ । ওরা একটি ভারতীয় প্রিয় দাসীর সন্তান , তারা বনূ জুমাহ উবায়দ কায়স ইব্ন আকিলের বংশধর । কিন্তু আমরা এমন একদল সম্ভ্রান্ত সর্দারের বংশধর , যাদের মাধ্যমে খারাপ কাজের সময় লোকদের মৃত্যুর পরোয়ানা জারী করা হয় । যুহায়র হল কাওমের উত্তম ভাগ্নে , সত্যবাদী , যাকে মিথ্যাবাদী বলা হয়নি ; যেন সে একটি কোষমুক্ত ধারালো তরবারি । সে শ্রেষ্ঠ সরদারদের অন্যতম ; সে এমন সম্ভ্রান্ত বংশের সংগে সংশ্লিষ্ট , যা সম্মানের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত । আমার জীবনের কসম ! স্নেহ - বৎসল লোকদের মত আমিও আহমদ (সা:) এবং তাঁর ভাইদের মায়া - মমতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি ।
“ সে বিশ্ববাসীর জন্য সৌন্দর্যের উৎস হয়ে থাকুক , আর যারা তাঁর সংগে সম্পর্ক রাখবে তাদের দুঃখ - কষ্ট দূরকারী হিসাবে সে [ আহমদ (সা:) ] বেঁচে থাকুক । যখন বিচারকরা মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করবে , তখন আহমদ (সা:) -এর মত লোক মানুষের মাঝে আর কি পাবে , যার থেকে কিছু আশা করা যায় । সে ধৈর্যশীল , বুদ্ধিমান , ন্যায়পরায়ণ এবং ধীরস্থির , এমন এক মাবূদের সংগে সম্পর্ক রাখে , যিনি তার প্রতি উদাসীন নন । আল্লাহ্র কসম ! যদি আমার ( ইসলাম গ্রহণের ) কারণে জনসমক্ষে আমার মুরুব্বীদের উপর দুর্নামের আশংকা না করতাম , তবে আমি অবশ্যই তাঁর অনুসরণ করতাম , সময়ের অবস্থা যা - ই হত না কেন । এটা আমার মনের কথা ; ঠাট্টাচ্ছলে বলছি না ।
“ সকল লোক জানে যে , আমাদের এই ছেলের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার মত আমাদের মাঝে কেউ নেই , আর মিথ্যা অপবাদকারীদের কথার প্রতি তো ভ্রূক্ষেপ করা হয় না । আমাদের মাঝে আহমদ (সা:) এমন মূল ( বাপ - মা ) থেকে জন্ম নিয়েছে যে , কোন দাম্ভিক ব্যক্তির বাড়াবাড়ি তাকে কোনভাবে ক্ষতি করতে পারে না । তাকে রক্ষা করার জন্য আমি আমার নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছি এবং আমি তাকে সব কিছু দিয়ে সর্বতোভাবে হিফাযত করেছি । বান্দাদের প্রতিপালনকারী রব তাকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর সত্য দীনকে বিজয়ী করেছেন । এরা শরীফ লোক , কাপুরুষ নয় , তাদের পিতৃ - পুরুষ , যাদের উদ্দেশ্য ছিল , তারা তাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের পথে চলা শিক্ষা দিয়েছেন ।
“ যদি বনূ কাবের বনূ লুআঈ - এর আত্মীয়তার সম্পর্ক থেকে থাকে , তবে এ বন্ধন ছিন্নও হতে পারে । আর কোন না কোন দিন তাদের এ ঐক্যে অবশ্যই ফাটল ধরবে । ”
ইবন হিশাম বলেন : আবূ তালিবের কবিতার এ অংশটুকু আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয় । তবে কোন কোন কাব্য বিশারদ পণ্ডিত এর অধিকাংশকে আবূ তালিবের কবিতা বলে স্বীকার করেননি ।