📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আবূ তালিবের কথোপকথন

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আবূ তালিবের কথোপকথন


ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াকুব ইবন উবা ইবন মুগীরা ইবন আখনাস আমাকে বলেছেন যে , কুরায়শ নেতারা যখন আবূ তালিবকে উপরোক্ত কথাগুলো বলল , তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে ডেকে বললেন : “ হে আমার ভাতিজা ! তোমার গোত্রের লোকেরা আমার কাছে এসেছিল । তারা এই এই কথা আমাকে বলেছে । অথএব তুমি তোমার নিজের ও আমার দিকটা বিবেচনা কর এবং আমার ওপর এমন কোন বোঝা চাপিও না , যা আমি বহন করতে অক্ষম । ” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) মনে করলেন যে , তাঁর চাচা বোধহয় তাঁকে সমর্পণ ও অপমানিত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং তার সাহায্য ও সহায়তা করতে তিনি অপারগ হয়ে পড়েছেন । তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : “ হে আমার চাচা ! আল্লাহ্র কসম , তারা যদি আমার ডানহাতে সূর্য ও বামহাতে চাঁদ এনে দিয়ে চাইত যে , আমি এ কাজ পরিত্যাগ করি , তথাপি আমি তা পরিত্যাগ করতাম না , যতক্ষণ না আল্লাহ্ এ কাজকে সফল ও জয়যুক্ত করেন অথবা আমি এ কাজ করতে করতে শহীদ হয়ে যাই । ” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর চোখ অশ্রুপূর্ণ হল এবং তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে লাগলেন । তিনি চলে যেতে থাকলে আবূ তালিব তাঁকে ডাকলেন । বললেন , ভাতিজা এদিকে এস ! রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তার কাছে গেলেন । তারপর তিনি বললেন : “ হে আমার ভাতিজা ! যাও , যা ভালো লাগে বল । আল্লাহ্র কসম , আমি কখনো কোন কারণেই তোমাকে তাদের হাতে সোপর্দ করব না । ”

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শ কর্তৃক ওয়ালীদের পুত্র উমারাকে আবু তালিবের কাছে দত্তক দানের প্রস্তাব

📄 কুরায়শ কর্তৃক ওয়ালীদের পুত্র উমারাকে আবু তালিবের কাছে দত্তক দানের প্রস্তাব


ইবন ইসহাক বলেন : কুরায়শরা যখন নিশ্চিতভাবে জানল যে , আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে তাদের হাতে সোপর্দ করতে ও অপমানিত করতে অস্বীকার করছেন এবং এটাও বুঝল যে , এ ব্যাপারে আবূ তালিব গোটা কুরায়শ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের শত্রুতার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত , তখন তারা ওয়ালীদ ইবন মুগীরার ছেলে উমারাকে নিয়ে তার কাছ গেল । তারপর আমার জানামতে , তারা তাকে বলল : “ হে আবূ তালিব ! এই দেখুন , ওয়ালীদের ছেলে উমারা , সে কুরায়শ গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুদর্শন যুবক । ওকে আপনি নিয়ে নিন , ওর বুদ্ধি ও বল আপনার উপকারে আসবে । ওকে আপনি পুত্র হিসাবে নিয়ে নিন , সে আপনারই । ওর বদলে আপনার এ ভাতিজাকে আমাদের হাতে হাতে সোপর্দ করুন । সে আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষের ধর্মের বিরোধিতা করছে । সে আপনার বংশের ঐক্য বিনষ্ট করছে , তাদেরকে নির্বোধ বলছে । তাকে আমরা মেরে ফেলব । মানুষের বদলে মানুষ । আবূ তালিব বললেন : ছি ছি ! আল্লাহ্র কসম , তোমরা যে বিনিময় আমার সাথে করতে চাইছ , তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের ! তোমরা আমাকে তোমাদের ছেলেকে দিতে চাইছ যেন তাকে আমি লালন - পালন করে পুষ্ট করি তোমাদের জন্য , আর আমার ছেলেকে নিতে চাইছ হত্যা করার জন্য ? আল্লাহ্র কসম , এটা কখনো হবে না । এ কথা শুনে মুতঈম ইব্‌ন আদী ইব্‌ন নাওফাল ইব্‌ন আব্দ মানাফ ইব্‌ন কুসাই বলল : আল্লাহ্র কসম , হে আবূ তালিব , তোমার গোত্র তোমার প্র প্রতি সুবিচার করেছে এবং তুমি নিজেও যা অপসন্দ কর তা থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে চাইছে । কিন্তু আমি দেখছি , তুমি তাদের কোন প্রস্তাবই মানতে চাইছ না । আবূ তালিব মুতঈমকে বললেন : “ আল্লাহ্র কসম , তারা আমার প্রতি সুবিচার করেনি । তুমি আমাকে অপমানিত করতে এবং একটি শক্তিমান পক্ষকে আমার ওপর বিজয়ী করার ফন্দি এঁটেছ । ঠিক আছে , যা ভালো বুঝ , কর । ” এরপর উভয় পক্ষে উত্তেজনা বাড়তে থাকে , যুদ্ধের পরিবেশ উত্তপ্ত হতে লাগল এবং শোরগোল করে একে অপরকে হুমকি দিতে লাগল ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুতঈম ও অন্যান্যদের ব্যাপারে আবূ তালিবের কবিতা

📄 মুতঈম ও অন্যান্যদের ব্যাপারে আবূ তালিবের কবিতা


মুতঈম ইব্‌ন আদি এবং বনূ আব্দ মানাফ ও অন্যান্য কুরায়শী উপগোত্রের যারা আবূ তালিবকে অপমান করতে চেয়েছিল এবং তার প্রতি শত্রুতার মনোভাব পোষণ করছিল , তাদেরকে লক্ষ্য করে এবং তাদের অবাঞ্ছিত দাবির উল্লেখ করে আবূ তালিব নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করলেন :
“ হে আমর , ওয়ালীদ ও মুতঈমকে বলে দাও , তোমাদের প্রহরার বদলে আমি যদি একটি বকনা উটও পেতাম , তাহলেও ভালো হত । সে বকনা উট যতই অল্পবয়সী ও দুর্বল হোক , তার মুখে প্রচুর ফেনা জমে থাকুক এবং দুই পায়ের ওপর প্রস্রাবের ফোঁটা পড়তে থাকুক , তাতে কিছু এসে যায় না । ( দুর্বলতার দরুন ) সে অগ্রণী উটগুলোর পিছু পিছু চলতে থাকে , অথচ সংলগ্ন থাকে না , আর যখনই মরুভূমির ওপর ওঠে , তখন তাকে ওয়াবার ( বিড়াল সদৃশ ক্ষুদ্র প্রাণীবিশেষ ) বলে আখ্যায়িত করা হয় । আমাদের একই পিতামাতা থেকে জন্ম নেয়া আমাদের দু'ভাইকে দেখতে পাই , যখন তাদেরকে জিজ্ঞেসা করা হয় , তখন তারা বলে যে , ব্যাপারটা অন্যের হাতে ন্যস্ত । হ্যাঁ , তাদের হাতেও ক্ষমতা আছে , কিন্তু তারা এত নীচে নেমে গেছে যেন যু - আলাক পর্বতের শীর্ষ থেকে পাথর গড়িয়ে পড়েছে । বিশেষ করে আমি আব্দ শামস ও নাওফলের কথা উল্লেখ করছি , ( কুরায়শের এ দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম শাখা আবূ তালিবের নিরাপত্তা নিয়ে মাথা ঘামায় না , এ কথা বলেই আবূ তালিব দুঃখ প্রকাশ করছেন ) । আগুন যেমন পুড়ে যাওয়া অংগারকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় , তেমনিভাবে তারা আমাদেরকে ছুঁড়ে ফেলেছে । তারা উভয়ে তাদের ভাইদের অপমানিত করেছে সকলের সামনে । ফলে গোত্রের কাছ থেকে তারা শূন্য হাতেই ফিরেছে । তারা এমন লোককে গৌরব ও মর্যাদার অংশীদার করেছে , যার কোন পিতৃপরিচয় নেই , কেবল তার কথা উল্লেখ করেই পরিচয় দিতে হয় । বনু তায়ম , বনু মাখঘুম ও বনূ যুহরা এদেরই দলভুক্ত । যখনই সাহায্য তলব করা হত তখন তারা আমাদের সহযোগী হত । অতএব আল্লাহ্র কসম , আমাদের প্রজন্মের একটি লোকও যতদিন বেঁচে থাকবে , আমাদের মধ্যে শত্রুতা বজায় থাকবে । তাদের ধৈর্য ও বুদ্ধি লোপ পেয়েছে । তারা প্রশস্ত কূপের মত ব্যবধান সৃষ্টি করেছে , আর এ ব্যবধান হলো খুবই মন্দ । ”
ইবন হিশাম বলেন : আমরা এ কবিতার দুটো লাইন বাদ দিয়েছি , যাতে আবু তালিব খুবই কটু ভাষা প্রয়োগ করেছেন ।

**টিকাঃ**
১. অর্থাৎ আবূ তালিব বলতে চাইছেন যে , আমার জন্য একটি বকনা উটও তোমাদের চাইতে উপকারী । কাজেই তোমরা যে ব্যবস্থাধীনে আমাকে নিরাপত্তা দিতে চাও , তার চাইতে একটা বকনা উট পাওয়াও আমার জন্য ঢের ভালো ছিল ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শ বংশের লোকেরা ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে শত্রুতা প্রদর্শন করতে লাগল

📄 কুরায়শ বংশের লোকেরা ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে শত্রুতা প্রদর্শন করতে লাগল


ইবন ইসহাক বলেন : এরপর কুরায়শ গোত্রের লোকেরা গোত্রের বিভিন্ন শাখায় যে সব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল , তাদের একে অপরকে উস্কে দিতে লাগল । ফলে প্রতিটি গোত্র তাদের ভেতরকার মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও নির্যাতন চালাতে লাগল এবং তাদের ধর্ম থেকে তাদেরকে বল প্রয়োগে ফেরাতে উদ্যত হল । কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে আবূ তালিবের মাধ্যমে রক্ষা করলেন । আবূ তালিব যখন দেখলেন , সমগ্র কুরায়শ গোত্র বন্ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবের সাথে খারাপ আচরণ করছে , তখন দু'টি শাখার লোকদেরকে ডেকে নিজের অনুসৃত নীতি অনুসরণ পূর্বক রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে রক্ষা করা ও তাঁর ওপর থেকে সকল আক্রমণ প্রতিহত করার আহবান জানালেন । সকলে তাকে সমর্থন করল ও তার আহবানে সাড়া দিল । কেবল অভিশপ্ত আবূ লাহাব মানল না ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00