📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 জিব্রীল (আ)-এর আগমন

📄 জিব্রীল (আ)-এর আগমন


ইবন ইসহাক বলেন : ওয়াব ইব্‌ন কায়সান আমাকে জানিয়েছেন যে , তাকে উবায়দ বলেছেন : প্রতি বছর সেই মাসটিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নির্জনে অবস্থান করতেন । তখন তাঁর কাছে যে সব গরীব লোক আসত , তিনি তাদের খাওয়াতেন । মাসটি অতিক্রান্ত হলে তিনি নির্জনবাস পরিত্যাগ করে বাড়িতে ফেরার আগে প্রথমে সাতবার বা আল্লাহ্ যতবার চাইতেন , ততবার কা'বা শরীফ তওয়াফ করতেন । তারপর নিজের বাড়িতে ফিরে যেতেন ।
অবশেষে সেই মাসটি এল , যখন আল্লাহ্ তাঁকে নবৃওয়াতে দ্বারা সম্মানিত করলেন । সে মাসটি ছিল রমযান মাস । আপন পরিবার - পরিজনের সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় আগে যেমন তিনি হেরার নির্জনবাসের জন্য বেরিয়ে যেতেন , এবারও তেমনি গেলেন । তারপর সেই নির্দিষ্ট রাতটি এল , যে রাতে আল্লাহ্ তাঁকে তাঁর রাসূল হিসাবে মনোনীত করে সম্মানিত করলেন এবং এভাবে তিনি গোটা মানব জাতিকে অনুগৃহীত করলেন । এ রাতে আল্লাহর আদেশক্রমে জিবরীল ( আ ) তার কাছে এলেন ।
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন : যখন জিবরীল ( আ ) আমার কাছে এলেন , তখন আমি ঘুমন্ত ছিলাম তিনি একখও রেশমী বস্ত্র নিয়ে এলেন , যাতে কিছু লিখিত বাণী উৎকীর্ণ ছিল । তারপর তিনি বললেন : পড়ুন । আমি বললাম : আমি পড়তে পারি না । তারপর তিনি আমাকে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন । আমার মনে হল যেন আমার মৃত্যু হচ্ছে । তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন । এরপর বললেন : পড়ুন । আমি বললাম : আমি পড়তে পারি না । এতে তিনি আমাকে এমন জোরে জাপটে ধরলেন যে , মনে হল , আমি মরে যাচ্ছি । আবার আমাকে ছেড়ে দিলেন । তারপর বললেন : পড়ুন । আমি বললাম : কি পড়ব ? এবারও তিনি আমার সংগে এমন জোরে আলিংগন করলেন যে , আমি মরে যাব বলে আশংকা করলাম । এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন : পড়ুন । আমি বললাম : কি পড়ব ? এ কথা আমি এজন্য বলছিলাম যেন জিবরীল আবার আমাকে চেপে না ধরেন । এবার বললেন : “ পড়ুন , আপনার রবের নামে , যিনি ( আপনাকে ) সৃষ্টি করেছেন । যিনি জমাট রক্ত থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন । পড়ুন , আর আপনার রব সর্বাপেক্ষা সম্মনিত , যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন , মানুষকে তার অজানা জিনিস শিখিয়েছেন । ” আমি এগুলো পড়লাম । এরপর জibরীল ( আ ) ক্ষান্ত হলেন এবং আমার কাছ থেকে চলে গেলেন । এরপর আমি আমার ঘুম থেকে জেগে উঠলাম । মনে হচ্ছিল যেন আমার হৃদয়পটে ঐ কথাগুলো অংকিত হয়ে গেছে । এরপর আমি বের হলাম । পাহাড়ের মাঝখানে পৌঁছলে আকাশের দিক থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম : “ হে মুহাম্মদ ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল । আর আমি জিবরীল । " আমি আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালাম । দেখলাম , জিবরীল ( আ ) আকাশের এক প্রান্তে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি বলছেন : “ হে মুহাম্মদ ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল । আর আমি জিবরীল । ” আমি অপলক নেত্রে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম । আকাশের অন্যান্য প্রান্তেও তাকিয়ে দেখি , তিনি সর্বত্র একইভাবে বিরাজমান । আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । আগে - পিছে কোনদিকেই নড়তে পারছিলাম না । এ সময় খাদীজা আমর সন্ধানে লোক পাঠান । তারা উঁচু এলাকায় গিয়ে ( আমাকে না পেয়ে ) খাদীজার কাছে ফিরে যায় । অথচ আমি সেখানেই ছিলাম । এরপর জিবরীল ( আ ) আমার দৃষ্টি থেকে অন্তর্হিত হলেন ।

**টিকাঃ**
১. এই নির্জনবাস ই'তিকাফের মতই ছিল । কেবল পার্থক্য এই যে , ই'তিকাফ মসজিদের ভেতরে করতে হয় । কিন্তু এই নির্জনবাস বা ' জিওয়ার ' মসজিদ ছাড়াও করা যায় । এটা ইব্‌ন আবদুল বারর - এর অভিমত । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর হেরায় অবস্থানকে এ জন্যই ই'তিকাফ বলা হয়নি যে , হেরা কোন মসজিদ নয় , ওটা হারাম শরীফের একটি পর্বত গুহা ।
১. রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন : জিবরীল ( আ ) যখন আমার কাছে এলেন , তখন আমি ঘুমস্ত ছিলাম । এ হাদীসের শেষে তিনি বলেন : আমি ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম । মনে হল , আমি নিজের হৃদয়পটে একটা বাণী লিখে নিয়েছি । ” হযরত আয়েশা ( রা ) বা অন্য কারো বর্ণিত হাদীসে ঘুমের উল্লেখ নেই । এমনকি হযরত আয়েশা ( রা ) থেকে উরওয়া বর্ণিত হাদীস থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে , সূরা ইকরা নিয়ে যখন জিবরীল ( আ ) অবতীর্ণ হন , তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) জাগ্রত ছিলেন । কেননা হযরত আয়েশা ( রা ) হাদীসটির শুরুতে বলেছেন : সত্য স্বপ্ন দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর নবুওয়তের সূচনা হয় । এ সময় তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন , তা ঊষার আলোর মতই বাস্তব হয়ে দেখা দিত । এরপর আল্লাহ্ তাঁকে নিভৃতবাসের প্রতি আকৃষ্ট করলেন । . অবশেষে তাঁর কাছে যখন সত্য বাণী এল , তখন তিনি হেরা গুহায় ছিলেন । তাঁর কাছে জিবরীল ( আ ) এলেন । হযরত আয়েশা ( রা ) -এ হাদীসে এ কথাই বলেছেন যে , এ স্বপ্ন দেখা ঘটত জিবরীল ( আ ) -এর কুরআন নিয়ে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হওয়ার আগে । তবে উভয় হাদীসের মধ্যে এভাবে সমন্বয় বিধান করা যেতে পারে যে , জিবরীল ( আ ) নবী (সা:) -এর কাছে জাগ্রত অবস্থায় আগমনের পূর্বে স্বপ্নে দেখা দিতেন যাতে তার সাক্ষাতটা তাঁর কাছে সহজতর হয় এবং তাঁর সাথে কোমলতর ব্যবহার করা যায় । কেননা নবুওয়তের দায়িত্বটা বড়ই কঠিন এবং ভারী । আর মানুষ স্বভাবতই দুর্বল । পরবর্তীতে ইসরা ও মি'রাজ সংক্রান্ত হাদীস প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ মনীষীদের বক্তব্য তুলে ধরা হবে , এ মতের সমর্থন পাওয়া যাবে । বিশুদ্ধ বর্ণনায় আমির শা'বী থেকে এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে , প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর তত্ত্বাবধানের জন্য হযরত ইসরাফীল ( আ ) -কে নিযুক্ত করা হয় । ইসরাফীল ( আ ) তিন বছর যাবত তাঁকে দর্শন দিতেন এবং ওহীর কিছু কিছু কথা ও কিছু কিছু বিষয় তাঁর কাছে নিয়ে আসতেন । এরপর জিবরীল ( আ ) -কে তাঁর তত্ত্বাবধানে দেয়া হয় । জিবরীল ( আ ) তাঁর কাছে কুরআন ও ওহী নিয়ে আসতেন । সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে , রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর নিকট একাধিক প্রক্রিয়ায় ওহী নাযিল হত । একটি হল নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নযোগে , যা ইবন ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা গেল । দ্বিতীয়টি হচ্ছে , তাঁর হৃদয়ে কোন কথা উৎকীর্ণ করে বা ঢুকিয়ে দিয়ে । যেমন এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন : জিবরীল ( আ ) আমার হৃদয়ে এ কথা ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে , কোন প্রাণীর জীবিকা ও আয়ূ ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তার মৃত্যু হয় না । সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জীবিকার সন্ধানে উত্তম প্রচেষ্টা চালাও । তৃতীয়টি এই যে , ঘন্টা বাজার মত শব্দ সহকারে কখনো কখনো তাঁর কাছে ওহী আসত । এটা ছিল তাঁর পক্ষে সবচেয়ে কষ্টকর ওহী । কেউ কেউ বলেন , এ ধরনের ওহীতে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর একাগ্রতা বেশি হত । ফলে তিনি যা শুনতেন তা অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে মনে রাখতেন পারতেন এবং ওহী অধিকতর নিখুঁতভাবে হৃদয়ে ধারণ করতেন । চতুর্থটি এই যে , ফেরেশতা কখনো কখনো তাঁর কাছে মানুষের বেশে আসতেন । সাধারণত দিয়া ইব্‌ন খালীফার রূপ ধারণ করে আসতেন । পঞ্চমটি হলো , জিবরীল ( আ ) কখনো কখনো তাঁর আসল রূপ নিয়ে দেখা দিতেন । আল্লাহ্ তাঁকে মণিমুক্তাখচিত ছয়শত ডানা সহকারে সৃষ্টি করেছেন । ষষ্ঠ প্রক্রিয়া এই যে , আল্লাহ্ তা'আলা স্বয়ং পর্দার আড়াল থেকে তাঁর সাথে কথা বলতেন । এ কথোপকথন জাগ্রত অবস্থায়ও হতো , যেমন মি'রাজের রাত্রে হয়েছিল ; আবার তা নিদ্রা অবস্থায়ও হতো , যেমন হযরত মুআয ( আ ) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) বলেন , আমার রব সর্বোত্তম রূপ নিয়ে আমাকে দর্শন দিয়েছেন । ( তিরমিযী )
এরূপ রেশমী বস্ত্রে ওহী প্রেরণ দ্বারা বুঝান হয়েছে যে , মহাগ্রন্থ কুরআন রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর উম্মতের জন্য সমস্ত অনারব জগতকে জয় করার দুয়ার খুলে দিয়েছে । কিন্তু তাদের ব্যবহৃত রেশম বস্ত্রকে নিষিদ্ধ করেছে । পক্ষান্তরে এ গ্রন্থ দ্বারা এ উম্মত আখিরাত ও বেহেশতের পোশাক লাভ করতে পারবে এবং সেই পোশাক হলো রেশমী পোশাক ।
১. অর্থাৎ আমি নিরক্ষর । তাই কোন লেখা জিনিস পড়তে পারি না । এ কথা তিনি তিনবার বলেন । এরপর তাঁকে বলা হল , “ তোমার রবের নামে পড় , যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন । ” অর্থাৎ তুমি নিজের ক্ষমতা , নিজের জ্ঞান ও গুণের বলে পড়তে পারবে না ঠিকই , তবে তোমার রবের নাম নিয়ে ও তাঁর সাহায্য চেয়ে পড় । তিনি যেমন তোমাকে সৃষ্টি করেছেন , তেমনি তোমাকে পড়াও শেখাবেন । কোন কোন বর্ণনার ভাষা থেকে মনে হয় , রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন , আমি কি পড়ব ? তবে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনার ভাষা থেকে মনে হয় , তিনি বলেছেন , আমি পড়তে পারি না ।
হযরত জাবির ( রা ) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে , রাসূল (সা:) তাঁকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে খাটে বা সিংহাসনে বসা দেখলেন । বুখারীর শেষাংশে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে , যখন ওহী বন্ধ হয়ে যায় , তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নিচে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যুরবণ করতে চাইতেন । এ সময় জিবরীল তাঁকে দেখা দিয়ে বলতেন : “ হে মুহাম্মদ ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরীল । ”

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ (সা) খাদীজাকে জিবরীলের আগমনের বিষয়ে অবহিত করলেন

📄 রাসূলুল্লাহ (সা) খাদীজাকে জিবরীলের আগমনের বিষয়ে অবহিত করলেন


রাসুলুল্লাহ (সা:) খাদীজাকে জিবরীলের আগমনের বিষয় অবহিত করলেন
এরপর আমি নিজের পরিবারের কাছে ফিলে গেলাম । খাদীজার কাছে গিয়ে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলাম । তিনি বললেন : হে আবুল কাসিম ! আপনি কোথায় ছিলেন ? আমি আপনাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছিলাম । তারা মক্কা পর্যন্ত গিয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে । আমি তাকে যা দেখেছিলাম খুলে বললাম । তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন : “ হে আমার চাচাতো ভাই ! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং স্থির থাকুন । আল্লাহ্র শপথ ! যাঁর হাতে খাদীজার জীবন , আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে , আপনি এ উম্মতের নবী হবেন । ”

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খাদীজা ওয়ারাকা ইবন নাওফলকে জানালেন

📄 খাদীজা ওয়ারাকা ইবন নাওফলকে জানালেন


খাদীজা ওয়ারাকা ইবন নাওফলকে জানালেন
- এরপর খাদীজা কাপড় - চোপড়ে আবৃত হয়ে তৈরি হলেন এবং তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফল ইবন আসাদ ইবন আবদুল উযযা ইবন কুসাই এর কাছে উপস্থিত হলেন । ইতিপূর্বেই ওয়ারাকা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন আসমানী কিতাব পড়াশুনা করেছিলেন । বিশেষত তাওরাত ও ইনজীলে অভিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন । রাসূলুল্লাহ (সা:) যে ঘটনা দেখেছেন ও শুনেছেন , খাদীজা তা আদ্যোপান্ত ওয়ারাকাকে জানালেন । ওয়ারাকা ঘটনাটা শুনেই বলে উঠলেন : কুদ্দুস । ! কুদ্দুস !! ( মহাপবিত্র ! মহাপবিত্র !! ) ওয়ারাকার জীবন যাঁর হাতে ন্যস্ত তাঁর শপথ ! হে খাদীজা ! তুমি যা আমাকে বললে , তা যদি সত্য হয়ে থাকে , তাহলে মুহাম্মদের কাছে সেই মহাদূতই “ এসেছিলেন , যিনি মূসার কাছেও আসতেন ' আর মুহাম্মদ যে এ উম্মতের নবী , তাতে কোন সন্দেহ নেই । কাজেই , তাকে স্থির ও নিশ্চিত থাকতে বল । ”
খাদীজা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ফিরে এলেন এবং তাঁকে ওয়ারাকা ইবন নাওফাল যা বলেছিলেন , তা জানালেন । এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) হেরা গুহায় নির্জনবাস সমাপ্ত করে মক্কায় ফিরে আগের মত কা'বার তওয়াফ শুরু করলেন । এ তওয়াফ চলাকালে ওয়ারাকা ইবন নাওফল তাঁর সাথে দেখা করলেন । তিনি তাঁকে বললেন : হে আমার ভাতিজা ! তুমি কী দেখেছ ও শুনেছ আমাকে বল । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বললেন । সব শুনে ওয়ারাকা বললেন : আল্লাহ্র কসম ! যাঁর হাতে আমার জীবন । তুমি অবশ্যই এ উম্মতের নবী । মূসার কাছে যে নামূস আসতেন , তিনিই তোমার কাছে এসেছিলেন । তুমি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ , তোমার জাতি তোমাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করতে চাইবে । তোমার ওপর নির্যাতন চালাবে , তোমাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করবে এবং তোমার সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হবে । আহা ! আমি যদি সে সময় বেঁচে থাকি , তাহলে আমি অবশ্যই আল্লাহ্র দীন প্রতিষ্ঠায় এমন সাহায্য করব যা তিনি জানেন । এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর কাছে মাথা এগিয়ে এনে তাঁর কপালে চুমু খেলেন । পরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাঁর ঘরে ফিরে এলেন ।

**টিকাঃ**
১. মূল আরবী শব্দ নামূস অর্থাৎ বাদশাহর গোপন বার্তাবাহক বা বাণীবাহক । অন্য মতে , নামূস মূলত রাজকীয় গোপন বার্তাবাহক । কারো কারো মতে , নামূস ও জাসূস প্রায় সমার্থক শব্দ । পার্থক্য শুধু এই যে , নামূস ভালো খবর বহন ও সংগ্রহ করে , আর জাসূস ( গোয়েন্দা ) খারাপ খবর সংগ্রহ ও সরবরাহ করে ।
২ , হযরত ঈসাকে বাদ দিয়ে কেবল হযরত মূসার নামোল্লেখের কারণ এই যে , ওয়ারাকা তৎকালীন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন । খ্রিস্টানরা হযরত ঈসা সম্পর্কে এ কথা বলত না যে , তিনি একজন নবী এবং তাঁর কাছে জিবরীল আসতেন । বরং তারা তাঁর সম্পর্কে বলত যে , আল্লাহ্র সত্তার তিন অংশের একাংশ ঈসার দেহে ঢুকে গিয়ে তাঁর সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে । ঈসার দেহে আল্লাহ্র সত্তার একাংশের প্রবেশ ও বিলীন হওয়া কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল , তা নিয়ে অবশ্য তাদের মধ্যে মতভেদ আছে । ঈসা ( আ ) তাদের মতে আল্লাহ্ তাত্ত্বিক বা জ্ঞানগত অংশ । এ জন্য তারা বিশ্বাস করত যে , ঈসা তাদেরকে অদৃশ্য তথ্য ও আগামী দিনের ঘটনা জানাতে পারেন ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ওহী সম্পর্কে খাদীজার নিশ্চয়তা দান

📄 ওহী সম্পর্কে খাদীজার নিশ্চয়তা দান


ওহী সম্পর্কে খাদীজার নিশ্চয়তা দান
ইবন ইসহাক বলেন : যুবায়র পরিবারের ভৃত্য ও আযাদকৃত গোলাম ইসমাঈল ইব্‌ন আবূ হাকীম আমাকে জানিয়েছেন যে , তিনি শুনেছেন , খাদীজা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে বলেছিলেন , হে আমার চাচাতো ভাই ! আপনার যে সহচরটি আপনার কাছে মাঝে মাঝে আসে , সে যখন আসবে , তখন কি আপনি আমাকে তার আগমনের খবর জানাতে পারবেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন , হ্যাঁ , পারব । খাদীজা বললেন , তাহলে যখন আসবেন তখন আমাকে জানাবেন । এরপর যথারীতি জিবরীল ( আ ) তাঁর কাছে এলেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) খাদীজাকে বললেন , হে খাদীজা ! এই তো জিবরীল আমার কাছে এসেছেন । তখন খাদীজা বললেন , হে আমার চাচাতো ভাই , আপনি উঠে আমার বাম ঊরুর ওপর বসুন তো । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) উঠলেন এবং তার বাম উরুর ওপর বসলেন । তখন খাদীজা বললেন , এখন কি আপনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন , হ্যাঁ । খাদীজা বললেন , এখন একটু সরে আমার ডান উরুর ওপর বসুন তো ! রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একটু সরে খাদীজার ডান উরুর ওপর বসলেন । তারপর খাদীজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন , এখনো কি তাকে দেখতে পাচ্ছেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন , হ্যাঁ । রাবী বলেন : তখন খাদীজা একটু ঘুরে বসলেন এবং নিজের কাঁধের ওপর থেকে অবগুণ্ঠন খুলে রাখলেন । অথচ তখনও তাঁর কোলে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বসা ছিলেন । এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে জিজ্ঞেস করলেন , এখনো কি তাকে দেখতে পাচ্ছেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন , না । খাদীজা বললেন , হে আমার চাচাতো ভাই , আপনি অবিচল ও উৎফুল্ল থাকুন । আল্লাহ্ শপথ ! এ আগন্তুক নিশ্চয়ই ফেরেশতা , শয়তান নয় ।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন : আমি বিষয়টি আবদুল্লাহ ইব্‌ন হাসান ইব্‌ন হাসান ইব্‌ন আলী ইব্‌ন আবূ তালিবের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম । আবদুল্লাহ্ বললেন : আমি আমার মাতা ফাতিমা বিনতে হুসায়ন ( যার বোন আমিনা বা সুকায়না ) ইব্‌ন আলীর কাছেও এ ব্যাপারটি খাদীজার বরাতে শুনেছি । পার্থক্য শুধু এই যে , তাঁর বর্ণনায় ছিল যে , খাদীজা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে তাঁর ও তার বহিরাবরণের মাঝখানে ঢুকিয়ে নিলেন , তখনই জিবরীল প্রস্থান করেন । এ সময় খাদীজা বলেন , নিশ্চয়ই এ আগন্তুক ফেরেশতা , শয়তান নয় ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00