📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি ঈমান আনার জন্য নবীগণের নিকট থেকে আল্লাহ্ অংগীকার গ্রহণ
রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর প্রতি ঈমান আনার জন্য ( পূর্ববর্তী ) নবীগণের নিকট থেকে আল্লাহ্র অংগীকার গ্রহণ
আবূ মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইবন হিশাম জানান , যিয়াদ ইবন হিশাম জানান যে , যিয়াদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ বাক্কায়ী মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক মুত্তালিবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর বয়স যখন চল্লিশ বছর হল , তখন আল্লাহ তাঁকে সারা জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা হিসাবে পাঠালেন । ইতিপূর্বে পৃথিবীতে যত নবী - রাসূল আগমন করেছিলেন , তাঁদের প্রত্যেকের নিকট থেকে আল্লাহ অংগীকার নিয়েছিলেন যে , তাঁরা তার ওপর ঈমান আনবেন , তাকে সত্য বলে জানবেন এবং তাঁর বিরোধীদের মুকাবিলায় তাঁকে সাহায্য করবেন । আর ঐ নবী - রাসূলের প্রতি যারা ঈমান আনবে ও তাঁদের সমর্থন করবে , তাদেরও তাঁরা অনুরূপ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেবেন । এ অংগীকার অনুসারে প্রত্যেক নবী নিজ নিজ অনুসারীদের মুহাম্মদ (সা:) -এর প্রতি ঈমান আনার ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে যান । এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ রাসূল (সা:) -কে লক্ষ্য করে বলেন :
“ স্মরণ কর , যখন আল্লাহ্ নবীদের অংগীকার নিয়েছিলেন , ' আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি তার শপথ , আর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসবে , তখন নিশ্চয়ই তোমরা তাঁকে বিশ্বাস করবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে । তিনি বললেন , ' তোমরা কি স্বীকার করলে ? এবং এ সম্পর্কে আমার অংগীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে ? তারা বলল , আমরা স্বীকার করলাম । তিনি বললেন , তবে আমিও তোমাদের সংগে সাক্ষী রইলাম । ” ( ২ : ৮১ )
বস্তুত সকল নবীর কাছ থেকেই এ সাক্ষ্য ও অংগীকার নেয়া হয় এবং তাওরাত ও ইনজীল - এ উভয় গ্রন্থের অনুসারীদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে মেনে নেয়ার এবং তাঁর শত্রুদের মুকাবিলায় তাঁকে সাহায্য করার নির্দেশ দেয়া হয় ।
**টিকাঃ**
১. চল্লিশ বছর বয়সেই যে তিনি নবুওয়ত লাভ করেছিলেন , সে কথা ইবন ইসহাক ইব্ন আব্বাস , যুবায়র ইবন মুতইম , কুবাস ইবন আশয়াম , ' আতা , সাঈদ ইবন মুসায়্যব ও আনাস ইবন মালিক ( রা ) থেকে বর্ণনা করেন , জ্ঞানী ও সীরাত লেখকদের কাছে এটাই বিশুদ্ধ মত । তবে কোন কোন বর্ণনায় চাল্লিশ বছর দু ' মাসও তাঁর নবুওয়তপ্রাপ্তির বয়স বলে উল্লেখ করা হয়েছে । কুবাস ইবন আশয়ামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে , আপনি বড় , না রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বড় ? তখন তিনি বলেন , রাসূল (সা:) আমার চেয়ে ( মর্যাদায় ) বড় , তবে আমি তাঁর চেয়ে বয়সে বড় । আবরাহার হস্তীবাহিনীর আক্রমণের বছর ছিল রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর জন্মের বছর । আমার মা আমাকে নিয়ে পথ চলার সময় হাতির গোবরের কাছে থেমেছিলেন । কারো কারো মতে হস্তীবাহিনীর আক্রমণের এক বছর পর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জন্ম হয় । বাক্কায়ী বর্ণনা করেন যে , রাসূলুল্লাহ (সা:) বিলালকে বলেছেন , সোমবারের রোযা খুবই পুণ্যময় । কেননা এদিন আমি জন্মেছি , নবুওয়ত লাভ করেছি এবং এ দিনই আমার মৃত্যু হবে । ( রওযুল উনুফ , প্রথম খণ্ড , ২৬৫ পৃ . ) ।
📄 সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের সূচনা
সত্য স্বপ্ন দ্বারা নবুওয়তের সূচনা
ইবন ইসহাক বলেন : যুহরী উরওয়া ইব্ন যুবায়র থেকে , তিনি হযরত আয়েশা ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , আল্লাহ্ যখন রাসূল (সা:) -কে সম্মানিত করতে ও তাঁর দ্বারা মানব জাতিকে অনুগৃহীত করতে চাইলেন , তখন রাসূল (সা:) নবুওয়তের সূচনা হিসাবে নির্ভুল স্বপ্ন দেখতে থাকেন । এ সময় তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন , তা ভোরের সূর্যোদয়ের মতই বাস্তব হয়ে দেখা দিত । এ সময় আল্লাহ্ তাকে নির্জনে অবস্থানের প্রতি আগ্রহী করে দেন । একাকী ও নিভৃতে অবস্থান তাঁর কাছে খুবই প্রিয় হয়ে ওঠে ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি গাছ ও পাথরের সালাম
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর প্রতি গাছ ও পাথরের সালাম
ইবন ইসহাক বলেন : প্রখর স্মৃতিধর আবদুল মালিক ইবন উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আৰু সুফিয়ান ইন আলা ইন জারিয়া সাকাফী কিছু সংখ্যক বিজ্ঞজনের বরাত দিয়ে আমাকে জানিয়েছেন যে , যখন আল্লাহ্ তাঁর রাসূল (সা:) -কে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তাঁকে নবুওয়ত দানের মাধ্যমে তার সূচনা করলেন , তখন তিনি নিজের কোন প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরুলেই লোকালয় থেকে অনেক দূরে , মক্কার উপকণ্ঠের জনবিরল পার্বত্য উপত্যকার ও বিস্তীর্ণ সমভূমির দিকে চলে যেতেন । এ সময় তিনি যে গাছ ও পাথরের পাশ দিয়েই যেতেন , সেটাই তাঁকে বলতো , “ আসসালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! ” কোথা থেকে এ আওয়াজ আসে , দেখার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আশেপাশে , ডানে - বামে , সামনে - পেছনে তাকাতেন কিন্তু গাছ ও পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না । এভাবে যতক্ষণ আল্লাহ্র ইচ্ছা হত তিনি দাঁড়িয়ে থেকে দেখতেন ও শুনতেন । এরপর একদিন রমযান মাসে , যখন তিনি হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন , তখন আল্লাহ্র তরফ থেকে পরম সম্মান ও মর্যাদার বাণী বহন করে জিবরাঈল আলায়হিস সালাম তাঁর কাছে এলেন ।
**টিকাঃ**
১. তিরমিযী ও মুসলিম শরীফে আছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন : “ মক্কায় একটি পাথরকে আমি চাল চিনি । আমার ওপর ওহী নাযিল হওয়ার আগে সে আমাকে সালাম দিত । কোন কোন হাদীস গ্রন্থে এ কথাও আছে যে , সালাম দানকারী এ পাথরটি ছিল হাজরে আসওয়াদ । এ সালাম দ্বারা স্পষ্টতই প্রচলিত ' সালামকে বুঝানো হয়েছে । তবে এমনও হতে পারে যে , একটা খেজুরগাছকে যেমন আল্লাহ্ কাঁদবার ক্ষমতা দিয়েছিলেন , তেমনি গাছ এবং পাথরকে কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন । তবে এরূপ কথা বলার জন্য জীবন , জ্ঞান , ইচ্ছাশক্তি , ধ্বনি ও বর্ণ থাকা জরুরী নয় । কেননা ওটা অন্যান্য শব্দের মতই নিছক শব্দমাত্র , যা অধিকাংশের মতে একটা অস্থায়ী অবস্থামাত্র , কোন স্থায়ী গুণ নয় । তবে নায্যামের মতে , শব্দ একটা বস্তু । আর আশআরীর মতে , শব্দ ঘর্ষণের চেয়ে অতিরিক্ত একটা জিনিস ।
উল্লিখিত উভয় মত সমর্থন বা রদ করার যুক্তি উপস্থাপনের স্থান এটা নয় । তথাপি কথা বলাকে যদি গাছ ও পাথরের গুণ বা বৈশিষ্ট্য ধরে নেয়া হয় এবং তাদের শব্দটি যদি ঐ গুণের অভিব্যক্তি বলে মনে করা হয় , তা হলে এ কথা বলার জন্য জীবন ও জ্ঞান থাকা অপরিহার্য বিবেচিত হবে । গাছ ও পাথরের কথা বলাটা আসলে জীবন ও জ্ঞান সহকারে সংঘটিত হয়েছিল , না জীবনবিহীন জড় পদার্থের শব্দমাত্র- ছিল , তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন । যদি জীবন ও জ্ঞান সহকারে সংঘটিত হয়ে থাকে , তবে বলতে হবে - গাছ ও পাথর নবী (সা:) -এর ওপর ঈমান এনেছিল । তবে প্রকৃত ব্যাপার যেটাই হয়ে থাকুক , এটা যে নবুওয়তের একটি আলামত ও অলৌকিক ঘটনা ছিল , তা সন্দেহাতীত । অবশ্য খেজুরগাছের কান্না বা রোদনকে রোদনই বলা হয়েছে ( শব্দ নয় ) এবং তার জন্য জীবন থাকা জরুরী । গাছ - পাথরের সালামদানের অর্থ এও হতে পারে যে , ঐসব জায়গায় অবস্থানকারী ফেরেশতারা সালাম দিয়েছিলেন । তবে সম্ভবত গাছ - পাথরই সালাম দিয়েছিল , ফেরেশতারা নয় । সর্বাবস্থায়ই এটা নবুওয়তের নিদর্শন ছিল । তবে আকীদাশাস্ত্রবিদদের একাংশের পরিভাষায় এটা মু'জিযা নয় । কিন্তু সৃষ্টিজগতকে চ্যালেঞ্জ করার মত ঘটনা অবশ্যই মু'জিযা । কেননা এর মুকাবিলা করা অসম্ভব । ( রওযুল উনুফ , প্রথম খণ্ড , পৃ . ২৬৬-২৬৭ )
📄 জিবরীলের অবতরণ
জিবরীলের অবতরণ
ইব্ন ইসহাক বলেন : যুবায়র পরিবারের মুক্ত গোলাম ওয়াব ইব্ন কায়সান আমাকে বলেছেন : আমি উবায়দ ইবন উমায়র ইব্ন কাতাদা লায়সীকে লক্ষ্য করে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ( রা ) -কে বলতে শুনেছি , হে উবায়দ । যখন জিবরীল সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে আসেন , তখন তাঁর ওপর নবূওয়াতের দায়িত্ব অর্পণের কাজটি কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল , তা আমাদের বলুন । তখন আমার উপস্থিতিতে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র ও তাঁর সংগীদের উবায়দ বলেন :
প্রতি বছরই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এক মাস হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন । এরূপ নির্জন বাস কুরায়শের লোকেরাও জাহিলিয়াত যুগে করত এবং আরবীতে একে ‘ তাহানুস ' বলা হতো । তাহানুসের আরবী প্রতিশব্দ তাবাররুর । যার অর্থ ধর্মীয় তপস্যা বা ধ্যান ।
**টিকাঃ**
উল্লেখযোগ্য যে , জিবরীল সুরিয়ানী শব্দ । এর অর্থ আবদুর রহমান বা আবদুল আযীয । এটি হযরত ইব্ন আব্বাসের বর্ণনা । এটা তাঁর নিজস্ব অভিমতও হতে পারে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) থেকে বর্ণিত মতও হতে পারে । তবে তাঁর নিজস্ব অভিমত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি । কেউ কেউ বলেন , নামের প্রথমাংশের অর্থ আল্লাহ্ এবং দ্বিতীয়াংশের অর্থ বান্দা । আবার কেউ কেউ এর বিপরীত বলে থাকেন । তবে জিবরীল নামটি অনারবীয় শব্দ হলেও আরবীতেও তা উক্ত ফেরেশতার সাথে সামঞ্জস্যশীল । আরবীতে নামের প্রথমাংশের অর্থ বাধ্য করা । যেহেতু জিবরীল ওহী প্রেরণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং ওহীতে ইসলামের বাধ্যতামূলক নির্দেশ থাকত , তাই এ নাম তাঁর ক্ষেত্রে সার্থক ও মানানসই হয়েছে ।
তাবাররুর শব্দটির মূল ধাতু বীর , যার অর্থ নেককাজ । এটি যখন তাবাররুরে রূপান্তরিত হয় , তখন এর অর্থ হয় নেককাজে গভীরভাবে মনোনিবেশ করা । পক্ষান্তরে তাহানুসে মূল ধাতু হিন্স যার অর্থ ভারী বোঝা । এটি তাহানুসে রূপান্তরিত হলে এর অর্থ হয় ভারী বোঝা ছুঁড়ে ফেলা বা গুরুদায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ । আবার তাহানুফ শব্দটির মূল ধাতু হানীফিয়াহ , যার অর্থ হযরত ইবরাহীম ( আ ) -এর আনীত একত্ববাদ । এ শব্দটি যখন তাহানুফে রূপান্তরিত হয় , তখন এর অর্থ দাঁড়ায় , ইবরাহীম ( আ ) -এর আনীত একত্ববাদের গভীরে প্রবেশ করা । ইবন হিশামের বক্তব্যও অনুরূপ । ( রাওযুল উনুফ , প্রথম খণ্ড , পৃ . ২৬৭ ) ।