📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পৌত্তলিকতা বর্জনের বিষয়ে যায়দের স্বরচিত কবিতা

📄 পৌত্তলিকতা বর্জনের বিষয়ে যায়দের স্বরচিত কবিতা


পৌত্তলিকতা বর্জনের বিষয়ে যায়দের স্বরচিত কবিতা
যায়দের স্ব - জাতির অনুসৃত ধর্ম পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করায় কাওমের পক্ষ থেকে তার ওপর যে নির্যাতন করা হয় , সে সম্পর্কে তিনি বলেন : একজন প্রভুর আনুগত্য করব , না হাজার হাজার প্রভুর ? যখন জীবন ধারণের প্রক্রিয়া বহুভাবে বিভক্ত হয়ে যায় । আমি লাত ও উয্যা সবাইকেই ছেড়ে দিয়েছি । প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও ন্যায়নিষ্ঠ লোক এরূপই করে থাকে । আমি উয্যারও পূজা করি না । তার দুই মেয়েরও পূজা করি না । বনু আমরের দুই মূর্তির কাছেও আমি যাই না । হুবালকেও আমি মানি না । অথচ সে আবহমানকাল থেকে আমাদের প্রভু সেজে বসেছিল । আমি তখন নানা রকম স্বপ্ন দেখতাম । আমি অবাক হয়ে ভাবতাম এসব কি হচ্ছে । বস্তুত রাতের বেলা অনেক আজব ঘটনা ঘটত । কিন্তু দিনের বেলা চক্ষুষ্মান ব্যক্তি সঠিক জিনিস চিনতে পারে । আমি ভাবতাম যে , আল্লাহ্ তো সীমা অতিক্রমকারী বহুলোককে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন ।
আবার সৎলোকদের সুবাদে অনেককে বাঁচিয়ে রেখেছেন । তাদের থেকে ছোট ছোট শিশু বড় হচ্ছে । কোন কোন মানুষ অধঃপতনের শিকার হয়ে তো স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে , যেমন পাতাঝরা ডালে আবার পাতা জন্মে । তবে আমি আমার প্রভু পরম দয়াবানের ইবাদত করি , যেন সেই ক্ষমাশীল প্রভু আমাকে ক্ষমা করেন । অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চল । যতক্ষণ তাঁকে ভয় করে চলবে , ধ্বংস হবে না । দেখবে সৎলোকেরা জান্নাতে থাকবে । আর অবিশ্বাসীরা থাকবে জ্বলন্ত আগুনে । তদুপরি দুনিয়ায় তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা , আর মৃত্যুর পর কষ্টদায়ক পরিণাম ।
যায়দ ইবন আমরের আরো একটি কবিতা নিম্নে দেয়া হলো । তবে ইবন হিশামের মতে এর প্রথম দুটি চরণ , পঞ্চমটি ও শেষ চরণটি ছাড়া পুরো কবিতাই উমায়্যা ইব্‌ন আবূ সালতের :
“ আমি শুধু আল্লাহ্র জন্যই আমার সকল প্রশংসা নিবেদন করছি , আরো নিবেদন করছি বলিষ্ঠ ও তেজোদীপ্ত বাক্য , যা চিরস্থায়ী হবে না । সেই মহান বাদশাহর জন্য , যাঁর ওপরে আর কোন ইলাহ নেই এবং তাঁর সমকক্ষ কোন রবও নেই । ওহে মানুষ , তুমি নিজের খারাপ পরিণতি থেকে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট হও । মনে রেখ , আল্লাহ্র কাছ থেকে তুমি কিছুই গোপন করতে পারবে না । আল্লাহ্র সংগে আর কাউকে শরীক করো না , সত্য ও ন্যায়ের পথ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে । হে আমার মাবূদ ! আমি তোমার অফুরন্ত করুণা চাই , দেশবাসী জিন - ভূতের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছা কামনা করে । কিন্তু আমার প্রভুও তুমি আর আশা - ভরসার স্থলও তুমিই । হে আল্লাহ্ ! প্রভু হিসাবে তোমাকে পেয়েই আমি সন্তুষ্ট । তোমাকে ছাড়া কারো আনুগত্য করার কথা আমি কখনো বিবেচনায়ও আনব না । তুমিই তো পরম কৃপা ও অনুগ্রহের বশে মুসার কাছে দূত পাঠিয়ে বলেছিলে , ' হারুনকে সাথে নিয়ে খোদাদ্রোহী ফিরআওনের কাছে যাও এবং তাকে আল্লাহ্র দিকে ডাক । তাকে তোমরা গিয়ে জিজ্ঞেস কর : হে ফিরআওন ! তুমি কি পেরেক ছাড়া এ যমীনকে স্থির রেখেছ ? তাকে জিজ্ঞেস কর , এ আকাশকে কোন খুঁটি ছাড়া তুমিই কি সমুন্নত করেছ । তাহলে তো তুমি এক সুনিপূণ কারিগর তাকে আরো জিজ্ঞেস করো , অন্ধকারময় রাতে আলোদানকারী ও দিক - নির্দেশক প্রদীপ ( চাঁদ ) -কে আকাশের মাঝে তুমি স্থাপন করেছ ? তাকে আবার জিজ্ঞেস কর , প্রতিদিন সকালে সূর্যকে পাঠিয়ে পৃথিবীর সবকিছুকে উদ্ভাসিত করেন কে ? তাকে পুনঃ জিজ্ঞেস কর , মাটি থেকে কে চারা উদ্‌গত করে তা থেকে তরতাজা শাক - সবৃজি উৎপন্ন করেন ? আর সেই সবজির মাথার ওপরে বীজদানা কে বের করেন ? বুদ্ধিমান লোকের জন্য এসব জিনিসে স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে । হে আল্লাহ্ ! তুমিই তো তোমার অপার করুণাবলে ইউনুস ( আ ) -কে উদ্ধার করেছিলে , অথচ তিনি মাছের পেটে অনেক রাত কাটিয়েছিলেন । আমি তোমার নামে যতই তাসবীহ পাঠ করি , তুমি ক্ষমা না করলে আমার গুনাহ মাফের কোন আশা নেই । সুতরাং হে বিশ্বপ্রভু ! আমার ওপর , আমার সম্পদ ও সন্তানদের ওপর দয়া ও কল্যাণ বর্ষণ কর । ”

**টিকাঃ**
১. লাতের বিবরণ ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে । উযযার মূর্তিটি এক খেজুর বাগানে রক্ষিত ছিল ! আমর ইবন লুআই বলেছিল যে , বিশ্ব প্রভু শীতকালে লাতের কাছে এবং গরমকালে উয্যার কাছে থাকেন । সেই থেকে আরবরা উ্যাকে বিশেষ মর্যাদা দিত । তারা তার জন্য একটা ঘর বানায় । সেখানে ঠিক কাবার অনুকরণে পশু বলি দেয়া হত । রাসূলুল্লাহ (সা:) মক্কা বিজয়ের পর এই মূর্তি ভাঙার জন্য খালিদকে পাঠালেন । তখন স্থানীয় প্রবীণরা তাকে বলল , হে খালিদ ! ওটা ভেঙো না । সাবধান হয়ে যাও । কারণ ওটা ভাঙলে আবার আপনা - আপনি সাবেক অবস্থায় বহাল হয়ে যায় । কিন্তু খালিদ তবু তা ভেংগে গুড়িয়ে দিলেন , অবশ্য মূর্তিটার গোড়ার অংশ ও ভিত বহাল রাখলেন । মন্দিরের রক্ষক বলল : আল্লাহ্র কসম , উয্যা আবার পূনর্বহাল হবে এবং যে তাকে ভেংগেছে , তার ওপর প্রতিশোধ নেবে । এরপর খালিদ রাসূল (সা:) -এর নিকট ফিরে গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত জানান । রাসূল (সা:) বললেন : খালিদ ! তুমি ভাঙার পর কি কোন প্রতিক্রিয়া দেখেছ ? খালিদ বলেন , না । তখন তিনি খালিদকে বললেন : যাও , ওর বাকীটুকুও ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে এস । খালিদ ফিরে গিয়ে যখন তার ভিত্তি বের করলেন , তখন সেখানে এক এলোচুল বিশিষ্ট কালো মহিলাকে পেলেন । তিনি ডাকে হত্যা করলেন এবং রক্ষক এই বলতে বলতে পালিয়ে গেল যে , এখন থেকে আর উয্যার পূজা হবে না । ( নিশাপুরী , আর - রাযী , রযীন ) ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাযরামীর বংশ পরিচয়

📄 হাযরামীর বংশ পরিচয়


হাযরামীর বংশ পরিচয়
ইবন হিশাম বলেন : হাযরামীর নাম আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাদ । ইনি সাদিফ গোত্রের সদস্য । সাদিফের পুরো নাম আমর ইব্‌ন মালিক । আর ইনি সাকুন ইব্‌ন আশরাস ইন কিন্দীর সদস্য । কারো মতে : কিন্দী নয় , বরং কিন্দা ইব্‌ন সাওর ইব্‌ন মুরাক্তি— ইব্‌ন উফায়র ইব্‌ন আদী ইবন হারিস ইব্‌ন মুররা ইব্‌ন উদাদা উন যায়দ ইব্‌ন মিসা— ইব্‌ন আমর ইব্‌ন আরীব ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন কাহলান ইব্‌ন সাবা । আবার কারো মতে : মুরতি— ইব্‌ন মালিক ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন কাহলান ইব্‌ন সাবা ৷

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 স্ত্রীর ভর্ৎসনায় যায়দের কবিতা

📄 স্ত্রীর ভর্ৎসনায় যায়দের কবিতা


স্ত্রীর ভর্ৎসনায় যায়দের কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন : যায়দ ইব্‌ন আমর মক্কা থেকে বেরিয়ে ইবরাহীমের একত্ববাদী ধর্মের সন্ধানে বিশ্বভ্রমণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন ।
কিন্তু সফিয়্যা বিন্ত হাযরামী যখনই তাকে বাড়ির বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখত তখনই তা খাত্তাব ইব্‌ন নুফায়লকে জানিয়ে দিত । আর খাত্তাব ছিল তার চাচা ও বৈপিত্রেয় ভাই । সে স্বজাতির ধর্ম পরিত্যাগ করার জন্য সব সময় যায়দকে তিরস্কার করত । ( হযরত উমরের পিতা ) খাত্তাব ছিল যায়দ ইব্‌ন আমরের চাচা । যায়দ স্বজাতির ধর্ম ত্যাগ করায় খাত্তাব তাকে ভর্ৎসনা করত । অধিকন্তু যায়দের স্ত্রী সফিয়্যাকে সে তার প্রহরায় নিয়োজিত করেছিল এবং বলেছিল , যায়দ যখনই কোন কিছু করতে চাবে , তখন তা আমাকে আগে জানাবে । যায়দের সংকল্প স্ত্রী সফিয়্যার পক্ষ থেকে ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হওয়ায় যায়দ তাকে ভর্ৎসনা করে যে কবিতা রচনা করেন তা হল :
“ আমাকে এ অবমাননাকর জীবনে আবদ্ধ রেখ না । আমার পথের বাধা দূর করে দাও ৷ যখনই আমি অবমাননার আশংকা করি , তখনই আমি দুঃসাহসী হয়ে সকল বাধা গুঁড়িয়ে দেই । পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করে আমি রাজার দরবারে পৌঁছতে সচেষ্ট । আমি প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে মুক্ত প্রান্তরে যেতে বদ্ধপরিকর । কোন সহযোগিতা ছাড়া আমি সকল উপায় - উপকরণ জয় করে থাকি । অবমাননা সহ্য করে শুধু সেই কাফেলা , যে নিজের চামড়াকে কষ্ট দিতে প্রস্তুত হয় এবং বলে , আমি শক্ত পেশীকে অবনমিত করব না । আমার বৈপিত্রেয় ভাই এবং চাচার কথাবার্তা আমার সহ্য হয় না । যখন সে আমাকে রূঢ় কথা বলে , তখন তার জবাবও দিতে পারি না । তবে আমি যদি চাই , তবে আমি এমন কথা বলতে পারি , যা আর কারো জানা নেই । ”

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যায়দ কা'বার অভিমুখী হয়ে যে কবিতা বলেন

📄 যায়দ কা'বার অভিমুখী হয়ে যে কবিতা বলেন


যায়দ কা'বার অভিমুখী হয়ে যে কবিতা বলেন
ইবন ইসহাক বলেন : যায়দ ইব্‌ন আমর ইব্‌ নুফায়লের কোন কোন আত্মীয় - স্বজনের বরাতে আমাকে জানান হয়েছে যে , যায়দ ইব্‌ন আমর ইবন নুফায়ল যখন মসজিদের ভেতরে থেকে কা'বার দিকে মুখ করতেন , তখন তিনি বলতেন : লাব্বায়কা হাক্কান , হাক্কান , তা‘আবদান ও রিক্কান ( তোমার দরবারে আমি উপস্থিত , নিশ্চিতভাবে উপস্থিত , একনিষ্ঠভাবে উপস্থিত , দাসত্ব ও আনুগত্য সহকারে ) । তিনি আরো বলতেন :
ইবরাহীম কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে যাঁর আশ্রয় চাইতেন , আমি তাঁর আশ্রয় চাই । হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার কাছে আনত , তোমার চির বশীভূত , তুমি যতই আমাকে কষ্ট দাও , আমি তা বরদাশত করতে প্রস্তুত । আমি সত্য ও ন্যায় চাই , অংহকার চাই না । যে ব্যক্তি দুপুরের সময় চলে , সে দুপুরে নিদ্রিত ব্যক্তির মত নয় ।
ইবন ইসহাক যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়লের নিম্নোক্ত কবিতাটি উদ্ধৃত করেছেন :
“ আমি সেই সত্তার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছি , যাঁর সামনে ভারী ও সুদৃঢ় পৃথিবী অবনত হয়েছে । আল্লাহ্ পৃথিবীকে পানির ওপর বিস্তৃত করলেন । যখন তা স্থির হল , তখন তার ওপর পাহাড় স্থাপন করলেন । সুপেয় পানি বর্ষণকারী মেঘ যাঁর অনুগত হয়েছে , আমি তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি । যখন মেঘকে কোন ভূখণ্ডের দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হয় , তখন সে সেখানে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করে । ”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00