📄 ইবন জাহশের স্ত্রীর সংগে রাসূলুল্লাহর বিয়ে
ইবন জাহশের স্ত্রীর সংগে রাসূলুল্লাহ্র বিয়ে
ইবন ইসহাক বলেন : উবায়দুল্লাহ্ ইবনে জাহশের ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তার স্ত্রী উম্মে হাবীবা বিনত আবূ সুফিয়ান ইব্ন হারবকে বিয়ে করেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : মুহাম্মদ ইব্ন আলী ইবন হুসায়ন আমাকে বলেছেন যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমর ইবন উমায়্যা যামরী ( রা ) নামক সাহাবীকে এ ব্যাপারে নাজাশীর নিকট প্রেরণ করেন । আমরের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর বার্তা পেয়ে নাজাশী স্বয়ং উম্মে হাবীবার নিকট রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর সংগে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব দেন । এরপর তিনি তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে বিয়ে দেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে চারশ দীনার মোহরানা আদায় করেন । মুহাম্মদ ইব্ন আলী বলেন , আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান যে পরবর্তীকালে মহিলাদের মোহরানা চারশ দীনার ধার্য করেন , তার দলীল হল এটা । রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর পক্ষ থেকে যিনি উম্মে হাবীবাকে এই মোহরানা অর্পণ করেন , তিনি হলেন খালিদ ইবন সাঈদ ইব্ন আস ।
📄 ইবন হুয়ায়রিসের রোম সম্রাটের নিকট গমন এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ
ইবন হুয়ায়রিসের রোম সম্রাটের নিকট গমন এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন : তৃতীয় ব্যক্তি উসমান ইব্ন হুয়ায়রিস রোম সম্রাট সীজারের কাছে গিয়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন এবং সেখানে প্রভাবশালী সভাসদে পরিণত হন ।
ইবন হিশাম বলেন : সীজারের নিকট উসমানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে বহু ঘটনা বর্ণিত আছে । ' কিন্তু মূল আলোচ্য বিষয় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জীবনী থেকে অনেক দূরে সরে যেতে হয় বলে তা পরিহার করলাম ।
**টিকাঃ**
১. কথিত আছে যে , সীজার উসমানকে মক্কার শাসনকর্তা নিয়োগ করে রাজকীয় মুকুট পরিয়ে পাঠান । মক্কায় এলে জনগণ তাকে তীব্র ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে । বিশিষ্ট কুরায়শ নেতা আসওয়াদ ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ( হযরত খাদীজার চাচা ) জোরদার আওয়াজ তোলেন যে , মক্কা চির স্বাধীন ও চিরঞ্জীব । সে কখনো কোন সাম্রাজ্যের অধীনতা মানবে না । এভাবে উসমানের অভিলাষ ব্যর্থ হয়ে যায় । রোম সম্রাট উসমানকে বিরিক ( ১০,০০০ সৈন্যের সেনাপতি ) উপাধি দেন , যদিও সে একজন অনুসারীও পায়নি । পরে সে সিরিয়ায় পালিয়ে গেলে সেখানকার গাসসানী রাজা তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে । এ রাজার নাম ছিল আমর ইবন জাফনা । ( দ্র . রওযুল উনুফ )
📄 যায়দ ইব্ন আমরের ঘটনা
যায়দ ইব্ন আমরের ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন : চতুর্থ ব্যক্তি যায়দ ইব্ন আমর ইবন নুফায়ল ইয়াহূদী বা খ্রিস্টধর্মের কোনটাই গ্রহণ করেননি । তিনি স্ব - জাতির অনুসৃত পৌত্তলিকতাও বর্জন করেন । তিনি মৃত প্রাণী , রক্ত এবং দেব - দেবীর নামে যবেহ করা প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করতেন না । তিনি আবরদের কন্যাশিশু হত্যা করতে নিষেধ করতেন । তিনি আরো বলতেন : আমি ইবরাহীমের রবের ইবাদত করি এবং আরবদের পৌত্তলিকতাকে নিন্দা ও বর্জন করি ।
ইবন ইসহাক বলেন : হিশাম ইবন উরওয়া আমাকে বলেছেন যে , তার পিতা ( উরওয়া ) তার মাতা আসমা বিন্ত আবূ বকর ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেন : আমি যায়দ ইব্ন আমর ইবন নুফায়লকে কা'বা শরীফের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেছি । সে সময় তিনি ছিলেন গুড়গুড়ে বুড়ো । তিনি সমবেত কুরায়শদের বলছিলেন হে কুরায়শ সম্প্রদায় ! যায়দের প্রাণ যাঁর হাতে , তাঁর শপথ করে বলছি , সমগ্র কুরায়শ বংশে আমি ছাড়া আর কেউ ইবরাহীমের ধর্মের ওপর বহাল নেই । হে আল্লাহ ! কোন পদ্ধতিতে তোমার ইবাদত করা তোমার কাছে অধিক প্রিয় , তা জানালে আমি সেই পদ্ধতিতে তোমার ইবাদত করতাম । ' কিন্তু আমি তা জানি না । এ বলে তিনি নিজের হাতের তালুর ওপর সিজদা করলেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : যায়দের ইন্তিকালের অনেক পরে তার ছেলে সাঈদ ইব্ন যায়দ ইব্ন আমর ইব্ নুফায়ল এবং তার চাচাতো ভাই উমর ইব্ন খাত্তাব ( রা ) রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে বললেন : আমরা কি যায়দের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা চাইতে পারি ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : হ্যাঁ । তাঁকে স্বতন্ত্র একটি উম্মাহ হিসাবে কিয়ামতের ময়দানে উঠানো হবে ।
**টিকাঃ**
কথিত আছে যে , বালদাহ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা:) যায়দ ইব্ন আমরের সাথে নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বে সৌজন্যমূলক সাক্ষাত করতে যান । সেখানে রাসূল (সা:) -কে কিছু খাবার পরিবেশন করা হল বা তিনি তা পরিবেশন করেন কিন্তু যায়দ নিজে তা খেতে অস্বীকার করেন । যায়দ বলেন , দেব - দেবীর নামে লটারীর মাধ্যমে যেসব পশু যবেহ করা হয় তা আমি খাই না । এখানে প্রশ্ন জাগে যে , জাহিলী রীতি- প্রথাকে বর্জন করতে আল্লাহ্ যায়দকে কিভাবে উদ্বুদ্ধ করলেন ? অথচ জাহিলী যুগে এরূপ মনোভাব রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর মাঝেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাগার কথা ছিল ! কেননা আল্লাহ তাঁকে এরূপ বিবেক - বুদ্ধি দিয়েই সৃষ্টি করেছিলেন । এর জবাব এই যে , এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা:) খেয়েছিলেন , এমন কথা বলা হয়নি । আর তিনি যদি খেয়েও থাকেন , তবে তাতে দোষ হয়নি । কেননা তখনো শরীআতের বিধি নাযিল করে এগুলোকে হারাম করা হয়নি । আর যায়দ নিজের ব্যক্তিগত চিন্তা - ভাবনার আলোকেই এটাকে বর্জন করে চলতেন ।
১. হাদীসে বর্ণিত আছে যে , জাহিলী যুগে আরো এক ব্যক্তি এরূপ করতেন । তিনি হলেন কবি ফারাযদাকের দাদা সা‘সা'আ ইব্ন মু'আবিয়া । তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন , তখন রাসূলুল্লাহ (সা:) -কে জিজ্ঞেস করলেন , আমি শিশুকন্যা হত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতাম , এর কি প্রতিদান পাব ? রাসূল (সা:) বললেন : আল্লাহ্ যখন তোমাকে ইসলামের নিয়ামত দিয়ে কৃতার্থ করেছেন , তখন তুমি অবশ্যই প্রতিদান পাবে । কথিত আছে যে , আরবরা কন্যাদের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণাবশতই তাদেরকে হত্যা করত । বিশেষত তাদের ভেতরে কোন খুঁত থাকলে সেটিকে অশুভ লক্ষণ মনে করে কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে হত্যা করত ।
📄 পৌত্তলিকতা বর্জনের বিষয়ে যায়দের স্বরচিত কবিতা
পৌত্তলিকতা বর্জনের বিষয়ে যায়দের স্বরচিত কবিতা
যায়দের স্ব - জাতির অনুসৃত ধর্ম পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করায় কাওমের পক্ষ থেকে তার ওপর যে নির্যাতন করা হয় , সে সম্পর্কে তিনি বলেন : একজন প্রভুর আনুগত্য করব , না হাজার হাজার প্রভুর ? যখন জীবন ধারণের প্রক্রিয়া বহুভাবে বিভক্ত হয়ে যায় । আমি লাত ও উয্যা সবাইকেই ছেড়ে দিয়েছি । প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও ন্যায়নিষ্ঠ লোক এরূপই করে থাকে । আমি উয্যারও পূজা করি না । তার দুই মেয়েরও পূজা করি না । বনু আমরের দুই মূর্তির কাছেও আমি যাই না । হুবালকেও আমি মানি না । অথচ সে আবহমানকাল থেকে আমাদের প্রভু সেজে বসেছিল । আমি তখন নানা রকম স্বপ্ন দেখতাম । আমি অবাক হয়ে ভাবতাম এসব কি হচ্ছে । বস্তুত রাতের বেলা অনেক আজব ঘটনা ঘটত । কিন্তু দিনের বেলা চক্ষুষ্মান ব্যক্তি সঠিক জিনিস চিনতে পারে । আমি ভাবতাম যে , আল্লাহ্ তো সীমা অতিক্রমকারী বহুলোককে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন ।
আবার সৎলোকদের সুবাদে অনেককে বাঁচিয়ে রেখেছেন । তাদের থেকে ছোট ছোট শিশু বড় হচ্ছে । কোন কোন মানুষ অধঃপতনের শিকার হয়ে তো স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে , যেমন পাতাঝরা ডালে আবার পাতা জন্মে । তবে আমি আমার প্রভু পরম দয়াবানের ইবাদত করি , যেন সেই ক্ষমাশীল প্রভু আমাকে ক্ষমা করেন । অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চল । যতক্ষণ তাঁকে ভয় করে চলবে , ধ্বংস হবে না । দেখবে সৎলোকেরা জান্নাতে থাকবে । আর অবিশ্বাসীরা থাকবে জ্বলন্ত আগুনে । তদুপরি দুনিয়ায় তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা , আর মৃত্যুর পর কষ্টদায়ক পরিণাম ।
যায়দ ইবন আমরের আরো একটি কবিতা নিম্নে দেয়া হলো । তবে ইবন হিশামের মতে এর প্রথম দুটি চরণ , পঞ্চমটি ও শেষ চরণটি ছাড়া পুরো কবিতাই উমায়্যা ইব্ন আবূ সালতের :
“ আমি শুধু আল্লাহ্র জন্যই আমার সকল প্রশংসা নিবেদন করছি , আরো নিবেদন করছি বলিষ্ঠ ও তেজোদীপ্ত বাক্য , যা চিরস্থায়ী হবে না । সেই মহান বাদশাহর জন্য , যাঁর ওপরে আর কোন ইলাহ নেই এবং তাঁর সমকক্ষ কোন রবও নেই । ওহে মানুষ , তুমি নিজের খারাপ পরিণতি থেকে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট হও । মনে রেখ , আল্লাহ্র কাছ থেকে তুমি কিছুই গোপন করতে পারবে না । আল্লাহ্র সংগে আর কাউকে শরীক করো না , সত্য ও ন্যায়ের পথ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে । হে আমার মাবূদ ! আমি তোমার অফুরন্ত করুণা চাই , দেশবাসী জিন - ভূতের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছা কামনা করে । কিন্তু আমার প্রভুও তুমি আর আশা - ভরসার স্থলও তুমিই । হে আল্লাহ্ ! প্রভু হিসাবে তোমাকে পেয়েই আমি সন্তুষ্ট । তোমাকে ছাড়া কারো আনুগত্য করার কথা আমি কখনো বিবেচনায়ও আনব না । তুমিই তো পরম কৃপা ও অনুগ্রহের বশে মুসার কাছে দূত পাঠিয়ে বলেছিলে , ' হারুনকে সাথে নিয়ে খোদাদ্রোহী ফিরআওনের কাছে যাও এবং তাকে আল্লাহ্র দিকে ডাক । তাকে তোমরা গিয়ে জিজ্ঞেস কর : হে ফিরআওন ! তুমি কি পেরেক ছাড়া এ যমীনকে স্থির রেখেছ ? তাকে জিজ্ঞেস কর , এ আকাশকে কোন খুঁটি ছাড়া তুমিই কি সমুন্নত করেছ । তাহলে তো তুমি এক সুনিপূণ কারিগর তাকে আরো জিজ্ঞেস করো , অন্ধকারময় রাতে আলোদানকারী ও দিক - নির্দেশক প্রদীপ ( চাঁদ ) -কে আকাশের মাঝে তুমি স্থাপন করেছ ? তাকে আবার জিজ্ঞেস কর , প্রতিদিন সকালে সূর্যকে পাঠিয়ে পৃথিবীর সবকিছুকে উদ্ভাসিত করেন কে ? তাকে পুনঃ জিজ্ঞেস কর , মাটি থেকে কে চারা উদ্গত করে তা থেকে তরতাজা শাক - সবৃজি উৎপন্ন করেন ? আর সেই সবজির মাথার ওপরে বীজদানা কে বের করেন ? বুদ্ধিমান লোকের জন্য এসব জিনিসে স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে । হে আল্লাহ্ ! তুমিই তো তোমার অপার করুণাবলে ইউনুস ( আ ) -কে উদ্ধার করেছিলে , অথচ তিনি মাছের পেটে অনেক রাত কাটিয়েছিলেন । আমি তোমার নামে যতই তাসবীহ পাঠ করি , তুমি ক্ষমা না করলে আমার গুনাহ মাফের কোন আশা নেই । সুতরাং হে বিশ্বপ্রভু ! আমার ওপর , আমার সম্পদ ও সন্তানদের ওপর দয়া ও কল্যাণ বর্ষণ কর । ”
**টিকাঃ**
১. লাতের বিবরণ ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে । উযযার মূর্তিটি এক খেজুর বাগানে রক্ষিত ছিল ! আমর ইবন লুআই বলেছিল যে , বিশ্ব প্রভু শীতকালে লাতের কাছে এবং গরমকালে উয্যার কাছে থাকেন । সেই থেকে আরবরা উ্যাকে বিশেষ মর্যাদা দিত । তারা তার জন্য একটা ঘর বানায় । সেখানে ঠিক কাবার অনুকরণে পশু বলি দেয়া হত । রাসূলুল্লাহ (সা:) মক্কা বিজয়ের পর এই মূর্তি ভাঙার জন্য খালিদকে পাঠালেন । তখন স্থানীয় প্রবীণরা তাকে বলল , হে খালিদ ! ওটা ভেঙো না । সাবধান হয়ে যাও । কারণ ওটা ভাঙলে আবার আপনা - আপনি সাবেক অবস্থায় বহাল হয়ে যায় । কিন্তু খালিদ তবু তা ভেংগে গুড়িয়ে দিলেন , অবশ্য মূর্তিটার গোড়ার অংশ ও ভিত বহাল রাখলেন । মন্দিরের রক্ষক বলল : আল্লাহ্র কসম , উয্যা আবার পূনর্বহাল হবে এবং যে তাকে ভেংগেছে , তার ওপর প্রতিশোধ নেবে । এরপর খালিদ রাসূল (সা:) -এর নিকট ফিরে গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত জানান । রাসূল (সা:) বললেন : খালিদ ! তুমি ভাঙার পর কি কোন প্রতিক্রিয়া দেখেছ ? খালিদ বলেন , না । তখন তিনি খালিদকে বললেন : যাও , ওর বাকীটুকুও ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে এস । খালিদ ফিরে গিয়ে যখন তার ভিত্তি বের করলেন , তখন সেখানে এক এলোচুল বিশিষ্ট কালো মহিলাকে পেলেন । তিনি ডাকে হত্যা করলেন এবং রক্ষক এই বলতে বলতে পালিয়ে গেল যে , এখন থেকে আর উয্যার পূজা হবে না । ( নিশাপুরী , আর - রাযী , রযীন ) ।