📄 কায়লার বংশ পরিচয়
কায়লার বংশ পরিচয়
ইব্ন হিশাম বলেন : সে হল কায়লা বিন্ত কাহিল ইব্ন উযরা ইব্ন সা'দ ইব্ন যায়দ ইব্ন লায়স ইব্ন সাওদ ইব্ন আসলাম ইব্ন ইলহাফ ইব্ন কুযাআ । ( এ মহিলা ) আওস ও খাযরাজের মা ।
নু'মান ইব্ন বাশীর আনসারী আওস ও খাযরাজের প্রশংসা করে বলেন : “ কায়লার সন্তানেরেরা এমন সব সরদার যে , তাদের সাথে মিশে কেউ বিব্রত হয় না । তারা এমন উদারচেতা বীর , যারা তাদের পিতৃপুরুষদের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে ।
.... ইব্ন
উপরোক্ত পংক্তি দুটি নু'মান ইবন বশীরের এক দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ । ইবন ইসহাক বলেন : আসিম ইবন উমর ( র ) ইবন কাতাদাল আনসারী আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন , সালমান ( রা ) বলেছেন : যখন আমি খেজুর গাছের মাথা থেকে একথা শুনলাম , তখন আমার ভেতরে এমন আনন্দ ও উত্তেজনা দেখা দিল যে , আমি বেসামাল হয়ে আমার মনিবের ঘাড়ের ওপর পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলাম । ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে এলাম । আমি ঐ লোকটিকে বললাম : আপনি কি বলছিলেন ? এ কথা শুনে আমার মনিব রেগে গিয়ে আমাকে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় মারল এবং বলল : তোর তা দিয়ে কি কাজ ? নিজের কাজে মনোনিবেশ কর । আমি বললাম : আমার কোন দরকার নেই । কেবল কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করেছিলাম ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাদিয়াসহ সালমান (রা)-এর উপস্থিতি
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর নবুওয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সালমান ( রা ) -এর উপস্থিতি
সালমান বলেন , এ সময় আমার কাছে কিছু খাবার জিনিস জমা ছিল । সন্ধ্যাবেলায় আমি সেই খাদ্য সামগ্রী নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে গেলাম । তিনি তখন কুবায় অবস্থান করছিলেন । আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম , আমি জানতে পেয়েছি যে , আপনি একজন সৎ লোক । আপনার সাহাবীদের অনেকেই দরিদ্র ও অভাবী । আমার কাছে কিছু সাদকার জিনিস জমা আছে । ভাবলাম , অন্যের তুলনায় আপনি এর বেশি হকদার । এ বলে , আমি তা তাঁর সামনে এগিয়ে দিলাম । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাঁর সাহাবীদের তা খেতে বললেন : কিন্তু নিজে তা খেলেন না । তখন আমি মনে মনে বললাম : একটি আলামত পেয়ে গেলাম । তারপর আমি তাঁর কাছ থেকে চলে এলাম ।
এবার কিছু খাবার জিনিস সংগ্রহ করলাম । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কুবা থেকে মদীনায় চলে এসেছেন । আমি তাঁর কাছে খাবার জিনিসগুলো নিয়ে হাযির হলাম এবং তাঁকে বললাম , ইতিপূর্বে আমি দেখেছি আপনি সাদকার জিনিস খান না । তাই এবার যা এনেছি , তা সাদকা নয় , বরং হাদিয়া । এটা আপনার প্রতি সম্মানের নিদর্শন স্বরূপ এনেছি । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তা থেকে কিছু খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদের খেতে বললেন । তারাও তাঁর সংগে খেলেন । তখন আমি মনে মনে বললাম , আম্মুরিয়ার যাজক এ যুগের নবীর যে আলামতগুলো বলেছিলেন , এ হলো তার দ্বিতীয়টি ।
এরপর তিনি যখন বাকীউল গারকাদ নামক কবরস্থানে তাঁর জনৈক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসছিলেন , তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম । তখন আমার গায়ে ছিল দুটো ঢিলেঢালা পোশাক । তিনি তাঁর সাহাবীদের মাঝে বসে ছিলেন । এ সময় আমি তাঁকে সালাম দিলাম । এরপর আমি ঘুরে গিয়ে তাঁর পিঠের দিকে তাকাতে লাগলাম । ভাবলাম , আমার উস্তাদ যে নবুওয়তের মোহরের কথা বলেছেন , তা দেখা যায় কিনা ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে বুঝতে পারলেন যে , আমি সম্ভবত কোথাও থেকে তাঁর কোন বিষয় জেনে এসেছি এবং তা সত্য কিনা তার অনুসন্ধান চালাচ্ছি । তাই তিনি তাঁর গায়ের চাদর তাঁর পিঠের ওপর থেকে ফেলে দিলেন । তখন আমি মোহরটি দেখে চিনতে পরলাম । আমি মোহরটিতে চুমু খাওয়ার জন্য তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়লাম এবং কাঁদতে লাগলাম । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে বললেন , সামনে এসো । আমি সামনে এসে বসে পড়লাম । তারপর আমার অতীতের সমস্ত ঘটনা তাঁকে খুলে বললাম ।
হে ইব্ন আব্বাস ! যেমন আমি এখন তোমার কাছে বর্ণনা করছি , তেমনিভাবে আমি তাঁর কাছে আমার সব ঘটনা বলি । শুনে তিনি মুগ্ধ হলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বললেন । এরপর দাসত্বের কারণে সালমান ( রা ) রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশ নিতে পারেন নি ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক সালমানকে দাসত্ব থেকে মুক্তি অর্জনের উপদেশ
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কর্তৃক সালমানকে দাসত্ব থেকে মুক্তি অর্জনের উপদেশ
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন , এক সময় রাসূল (সা:) আমাকে বললেন , সালমান ! তুমি মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তিলাভের উদ্যোগ নাও । তাঁর পরামর্শ অনুসারে আমি আমার মনিবকে মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তিলাভের ইচ্ছা জানালাম । বিনিময়ে ৩০০ টি খেজুরের চারা লাগিয়ে দিতে এবং তাকে ৪০ উকিয়া ( ৪০ আউন্স ) সোনা দিতে স্বীকার করলাম । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাঁর সাহাবীদের বললেন , তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য কর । সাহাবীরা তাঁদের সাধ্যমত খেজুর চারা দিয়ে আমাকে সাহায্য করলেন এবং এভাবে ৩০০ টি চারাগাছ সংগৃহীত হয়ে গেল । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে বললেন , সালমান ! এগুলো নিয়ে যাও এবং যমীন তৈরি কর । তারপর আমার কাছে এসো । আমি নিজ হাতে চারাগুলো লাগিয়ে দিয়ে আসব । সালমান ( রা ) বলেন : আমি ভূমি তৈরি করলাম এবং এ কাজে আমার সাথীরা আমাকে সাহায্য করলেন । যখন আমি এ কাজ শেষ করলাম , তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে গিয়ে এ খবর জানালাম । তিনি [ রাসূল (সা:) ] আমার সংগে বাগানে আসলেন । তখন আমরা তাঁর হাতের কাছে খেজুর চারা এগিয়ে দিতে লাগলাম আর তিনি স্বহস্তে তা যমীনে রোপণ করতে লাগলেন । এভাবে আমরা একাজ শেষ করলাম । আল্লাহ্ শপথ ! যাঁর হাতে সালমানের জীবন ! ঐ তিনশ চারা থেকে একটি চারাও মারা যায়নি ।
এভাবে খেজুরের চারা তো লাগানো হল । কিন্তু চল্লিশ উকিয়া ( আউন্স ) সোনা আমার যিস্মায় বাকী রইল । একদিন কোন একটি খনি থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে মুরগীর ডিমের মত এক টুকরা সোনা পেশ করা হল । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সাহাবীদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন : সেই মুক্তিকামী পারসিক গোলাম তার মুক্তিপণের ব্যাপারে কি করেছে ? সালমান ( রা ) বলেন , এরপর আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ডাকা হল । আমি তাঁর কাছে গেলে তিনি বললেন : হে সালমান , এটা নিয়ে যাও এবং তোমার বাকী ঋণ পরিশোধ করে দাও । আমি বললাম , ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) । আমার ঋণের কতটুকু এ থেকে দেয়া যাবে ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : নিয়ে যাও । এ দ্বারা আল্লাহ্ তোমার সমুদয় ঋণ পরিশোধ করে দেবেন । আমি ডিম্বাকৃতির সোনার টুকরাটি নিয়ে গেলাম ।
আমি সেটি নিয়ে ওযন করলাম । আল্লাহ্ শপথ ! যাঁর হাতে সালমানের জীবন , দেখলাম সেটির ওযন পুরোপুরি ৪০ আউন্স । আমি নিজের মুক্তিপণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করে স্বাধীন হয়ে গেলাম । তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে খন্দকের লড়াই - এ অংশ গ্রহণ করি । এরপর সকল যুদ্ধে আমি তাঁর সংগী হয়ে অংশগ্রহণ করি ।
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াযীদ ইব্ন আবূ হাবীব আমাকে আবদুল কায়স গোত্রের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জানান যে , সালমান বলেন , আমি বললাম , ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! এতটুকু সোনা দিয়ে আমার মুক্তিপণ কিভাবে শোধ হবে ? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তা নিজের মুখে পুরে দিয়ে বের করে আমাকে দিলেন , তখন তা পুরো ৪০ আউন্স হয়ে গেল । আমি তা দিয়ে আমার সব মুক্তিপণ পরিশোধ করলাম ।
ইবন ইসহাক বলেন : আসিম ইবন উমর ( র ) আমাকে বলেছেন যে , আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি যে , উমর ইব্ন আবদুল আযীয ( র ) সালমান ( রা ) থেকে বলেছেন : সালমান ফারসী যখন রাসূল (সা:) -কে নিজের বৃত্তান্ত অবহিত করেন , তখন তিনি এ কথাও জানান যে , আম্মুরিয়ার জনৈক খ্রিস্টান ধর্মযাজক তাকে সিরিয়ার একটা স্থানে যেতে বলেছিলেন । সেখানে দুই জংগলের মাঝখানে একজন লোক রয়েছেন , যিনি প্রতি বছর এক জংগল থেকে আরেক জংগলে যান । তখন রুগ্ন লোকেরা তার সাথে দেখা করে । তিনি যার জন্যই দু'আ করেন , সে আরোগ্য লাভ করে । আম্মুরিয়ার যাজক তাকে বলেন , তুমি সেই লোকের কাছে চলে যাও এবং তুমি যে ধর্মের অনুসন্ধান করছ , সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস কর । তিনি তোমাকে এ ব্যাপারে অবহিত করবেন ।
সালমান ( রা ) বলেন : আমি তখন সেই জায়গায় গেলাম । দেখলাম , লোকেরা তাদের রোগীদের নিয়ে সেখানে সমবেত হয়েছে । অবশেষে সেই ব্যক্তি আবির্ভূত হলেন । তখন লোকেরা তাদের রোগীদের নিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলল । তিনি যার জন্য দু'আ করলেন । সেই ভাল হল । লোকদের ভিড়ের কারণে আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারলাম না । এরপর তিনি পরবর্তী প্রবেশের সময় আমি তাঁর কাছে পৌছলাম । তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন : ইনি কে ? আমি বললাম : আল্লাহ্ আপনার ওপর রহম করুন , আপনি আমাকে ইব্রাহীমের পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে অবহিত করুন । তিনি বললেন : তুমি আমাকে এমন একটা বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ , যে সম্পর্কে এ যুগের আর কেউ জিজ্ঞেস করে না । হারাম শরীফের অধিবাসীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি অচিরেই সেই পবিত্র দীন নিয়ে আবির্ভূত হবেন । তাঁর কাছে যেও । তিনি তোমাকে সেই দীনে দীক্ষিত করবেন । এ কথা বলার পর তিনি গভীর জংগলে প্রবেশ করলেন ।
এ বিবরণ শোনার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সালমান ( রা ) -কে বললেন : হে সালমান , তোমার বিবরণ যদি সত্য হয় , তাহলে তুমি আল্লাহ্ নবী ঈসা ইব্ন মারইয়ামের সাক্ষাত পেয়েছ ।
**টিকাঃ**
১. মতান্তরে সালমান ( রা ) নিজ হাতে একটি চারা লাগান । অবশিষ্ট ২৯৯ টি চারা লাগান রাসূলুল্লাহ্ (সা:) । সালমান ( রা ) তাঁর হাতে যে চারাটি লাগান , কেবল সেটি মারা যায় এবং বাকী চারাগুলো বেঁচে যায় । ( দ্র . রওযুল উনুফ ) ।
📄 সত্য-দীনের অনুসন্ধানকারী চার ব্যক্তি
সত্য - দীনের অনুসন্ধানকারী চার ব্যক্তি
ইবন ইসহাক বলেন : একদিন কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাদের এক জাতীয় উৎসব উপলক্ষে একটি প্রধান মূর্তির নিকট সমবেত হল । এটি ছিল তাদের বার্ষিক উৎসবের দিন । তারপর তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় চারজন নেতা গোপন বৈঠকে বসলেন । এরা হলেন , ওয়ারাকা ইব্ন নাওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উযযা ইব্ন কুসাই ইব্ন কিলাব ইব্ন মুরা ইব্ন কা'ব ইব্ন লুআঈ- ইনি খাদীজার আপন চাচাতো ভাই , উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন জাহশ ইন রিআব ইব্ন ইয়া'মার ইবন সাব্রা ইব্ন মুরা ইব্ন গানম ইব্ন দূদান ইব্ন আসাদ ইব্ন খুযায়মা । তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের কন্যা উমায়মার ছেলে ।
উসমান ইব্ন হুয়ায়রিস ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উযযা ইব্ন কুসাই ( খাদীজার এক চাচার ছেলে ) এবং যায়দ ইব্ন আমর ইবন নুফায়ল ইব্ন আবদুল উযযা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন কুরত ইব্ন রিবাহ ইব্ন রিযাহ ইবন আদী ইব্ন কা'ব ইবন লুআঈ - ইনি ছিলেন উমর ( রা ) -এর আপন চাচাতো ভাই ।
প্রথমে তারা পরস্পরে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে , এ বৈঠকের কোন কথাবার্তা বাইরে প্রকাশ করা চলবে না । তারপর তারা পরস্পরে যে বিষয়ে আলোচনা করেন , তা হল : দেশের মানুষ যে ধর্ম পালন করছে , তার কোন ভিত্তি নেই । তারা ইবরাহীমের পবিত্র ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছে । এ সব প্রতিমা যাদের আমরা পূজা করি , নিছক জড় পাথর ছাড়া আর কিছুই নয় । এরা দেখে না , শোনে না , কারো ভালোমন্দ কিছুই করতে পারে না । তোমরা জনগণের প্রতিনিধি । তোমরা তোমাদের জাতির জন্য নতুন কিছু ভাবো । তোমরা যে পথে চলছ , তার কোন ভিত্তি নেই । এরপর তাঁরা দেশ - বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন এবং ইবরাহীমের পবিত্র ধর্ম অনুসন্ধান করতে থাকেন ।