📄 সালমান ও তার সাথী আম্মুরিয়ার
সালমান ও তার সাধী আম্বুরিয়ায়
তিনি যখন মারা গেলেন , তখন আমি আম্মুরিয়ার সাথীর নিকট গেলাম এবং তাকে আমার সব খবর জানালাম । তিনি আমাকে তাঁর কাছে থাকতে বললেন । আমি তাকে একজন সৎব্যক্তি হিসাবে পেলাম । এখানে আমি শুধু ধর্মীয় অনুশীলনেই ক্ষান্ত থাকিনি , অর্থোপার্জনের সুযোগও পেয়েছিলাম । আমার বহু গরু - ছাগল হয়েছিল ।
এরপর তারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হল । এ সময় আমি তাকে আমার অতীতের অভিজ্ঞতাসমূহ জানালাম । আমি তাকে বললাম , হুযূর ! আপনার মৃত্যুর সময় তো ঘনিয়ে এসেছে । আপনার মৃত্যুর পর আমি কোন্ ব্যক্তিকে ধর্মযাজক হিসাবে গ্রহণ করব । এ ব্যাপারে আপনি আমাকে কি নির্দেশ দেন ? তখন তিনি বললেন , বাবা , আল্লাহ্র কসম ! এখন আর আমাদের এই ধর্ম সঠিকভাবে অনুসরণ করে এমন কেউ আছে বলে আমার জানা নেই । তবে একজন নতূন নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে । তিনি ইবরাহীম ( আ ) -এর ধর্মসহ প্রেরিত হবেন । তিনি আরবভূমিতে আবির্ভূত হবেন । দুই মরুর মাঝে খেজুর বাগানে পরিপূর্ণ এক জায়গায় তিনি হিজরত করবেন । তাঁর আলামতগুলো সুস্পষ্ট হবে । তিনি হাদিয়া নেবেন কিন্তু সাদকা গ্ৰহণ করবেন না । তার দুই কাঁধের মাঝখানে নবুওয়তের সীল থাকবে । তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার , তবে সেখানে যাবে ।
📄 সালমান ও তার অপহরণকারীরা ওয়াদিল কুরায় ও সেখান থেকে মদীনায়
সালমান ও তার অপহরণকারীরা ওয়াদিল কুরায় ও সেখান থেকে মদীনায়
এরপর এ ব্যক্তি মারা গেলে আমি কিছুকাল আম্মুরিয়াতে অবস্থান করলাম । তখন বনূ কালবের একদল বণিক আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল । তাদের আমি বললাম , তোমরা আমাকে আরব দেশে নিয়ে যাও এবং এর বিনিময়ে আমি তোমাদের এসব গবাদি পশু দিয়ে দেব । তারা এ প্রস্তাবে রাযী হল । আমি তাদের আমার গবাদি পশু দিলাম এবং তারা আমাকে তাদের সাথে নিয়ে চলল । কিন্তু ওয়াদিল কুরাতে পৌঁছার পর তারা আমার ওপর যুলুম করল এবং আমাকে জনৈক ইয়াহুদীর নিকট দাস হিসাবে বিক্রি করে ফেলল । আমি তার কাছে থাকতে লাগলাম । সেখানে খেজুর গাছ দেখে ভাবলাম , আম্বুরিয়ার পাদ্রীর কাছে যে জায়গার কথা শুনেছিলাম , এটা হয়তো সেই জায়গা । কিন্তু আমার কাছে এটা স্পষ্ট ছিল না ।
এ সময় মদীনার বনূ কুরায়যা গোত্র থেকে ঐ ইয়াহুদীর এক চাচাতো ভাই এল । সে আমাকে কিনে নিয়ে মদীনায় গেল । আল্লাহ্র কসম ! মদীনাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম যে , এটাই আমার আম্মুরিয়ার উস্তাদের বর্ণিত জায়গা । আমি সেখানে থাকতে লাগলাম , আর এ ততদিন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নবৃওয়াতপ্রাপ্ত হন এবং যতদিন মক্কায় থাকার পরিবেশ ছিল , মক্কায় থাকেন । গোলাম থাকার কারণে তাঁর সম্পর্কে আমার পক্ষে আর কিছুই জানা সম্ভব হয়নি । তারপর তিনি মদীনায় হিজরত করে চলে আসেন ।
একদিন আমি একটি খেজুরভর্তি গাছের মাথায় উঠে আমার মনিবের জন্য কিছু কাজ করছিলাম । মনিব তখন আমার ঠিক নিচে বসা ছিলেন । সহসা তার এক চাচাতো ভাই এসে তাকে বলল : আল্লাহ্ কায়লার বংশধরকে ধ্বংস করুন ( আওস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রের মাতার নাম কায়লা ) । ওরা এখন মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তির চার পাশে কুবা নামক স্থানে ভিড় জমিয়েছে । লোকটি আজই এসেছে । তারা ধারণা করে যে , সে নাকি নবী ।
📄 কায়লার বংশ পরিচয়
কায়লার বংশ পরিচয়
ইব্ন হিশাম বলেন : সে হল কায়লা বিন্ত কাহিল ইব্ন উযরা ইব্ন সা'দ ইব্ন যায়দ ইব্ন লায়স ইব্ন সাওদ ইব্ন আসলাম ইব্ন ইলহাফ ইব্ন কুযাআ । ( এ মহিলা ) আওস ও খাযরাজের মা ।
নু'মান ইব্ন বাশীর আনসারী আওস ও খাযরাজের প্রশংসা করে বলেন : “ কায়লার সন্তানেরেরা এমন সব সরদার যে , তাদের সাথে মিশে কেউ বিব্রত হয় না । তারা এমন উদারচেতা বীর , যারা তাদের পিতৃপুরুষদের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে ।
.... ইব্ন
উপরোক্ত পংক্তি দুটি নু'মান ইবন বশীরের এক দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ । ইবন ইসহাক বলেন : আসিম ইবন উমর ( র ) ইবন কাতাদাল আনসারী আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন , সালমান ( রা ) বলেছেন : যখন আমি খেজুর গাছের মাথা থেকে একথা শুনলাম , তখন আমার ভেতরে এমন আনন্দ ও উত্তেজনা দেখা দিল যে , আমি বেসামাল হয়ে আমার মনিবের ঘাড়ের ওপর পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলাম । ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে এলাম । আমি ঐ লোকটিকে বললাম : আপনি কি বলছিলেন ? এ কথা শুনে আমার মনিব রেগে গিয়ে আমাকে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় মারল এবং বলল : তোর তা দিয়ে কি কাজ ? নিজের কাজে মনোনিবেশ কর । আমি বললাম : আমার কোন দরকার নেই । কেবল কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করেছিলাম ।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে হাদিয়াসহ সালমান (রা)-এর উপস্থিতি
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর নবুওয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সালমান ( রা ) -এর উপস্থিতি
সালমান বলেন , এ সময় আমার কাছে কিছু খাবার জিনিস জমা ছিল । সন্ধ্যাবেলায় আমি সেই খাদ্য সামগ্রী নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে গেলাম । তিনি তখন কুবায় অবস্থান করছিলেন । আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম , আমি জানতে পেয়েছি যে , আপনি একজন সৎ লোক । আপনার সাহাবীদের অনেকেই দরিদ্র ও অভাবী । আমার কাছে কিছু সাদকার জিনিস জমা আছে । ভাবলাম , অন্যের তুলনায় আপনি এর বেশি হকদার । এ বলে , আমি তা তাঁর সামনে এগিয়ে দিলাম । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাঁর সাহাবীদের তা খেতে বললেন : কিন্তু নিজে তা খেলেন না । তখন আমি মনে মনে বললাম : একটি আলামত পেয়ে গেলাম । তারপর আমি তাঁর কাছ থেকে চলে এলাম ।
এবার কিছু খাবার জিনিস সংগ্রহ করলাম । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কুবা থেকে মদীনায় চলে এসেছেন । আমি তাঁর কাছে খাবার জিনিসগুলো নিয়ে হাযির হলাম এবং তাঁকে বললাম , ইতিপূর্বে আমি দেখেছি আপনি সাদকার জিনিস খান না । তাই এবার যা এনেছি , তা সাদকা নয় , বরং হাদিয়া । এটা আপনার প্রতি সম্মানের নিদর্শন স্বরূপ এনেছি । তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তা থেকে কিছু খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদের খেতে বললেন । তারাও তাঁর সংগে খেলেন । তখন আমি মনে মনে বললাম , আম্মুরিয়ার যাজক এ যুগের নবীর যে আলামতগুলো বলেছিলেন , এ হলো তার দ্বিতীয়টি ।
এরপর তিনি যখন বাকীউল গারকাদ নামক কবরস্থানে তাঁর জনৈক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসছিলেন , তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম । তখন আমার গায়ে ছিল দুটো ঢিলেঢালা পোশাক । তিনি তাঁর সাহাবীদের মাঝে বসে ছিলেন । এ সময় আমি তাঁকে সালাম দিলাম । এরপর আমি ঘুরে গিয়ে তাঁর পিঠের দিকে তাকাতে লাগলাম । ভাবলাম , আমার উস্তাদ যে নবুওয়তের মোহরের কথা বলেছেন , তা দেখা যায় কিনা ? রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে বুঝতে পারলেন যে , আমি সম্ভবত কোথাও থেকে তাঁর কোন বিষয় জেনে এসেছি এবং তা সত্য কিনা তার অনুসন্ধান চালাচ্ছি । তাই তিনি তাঁর গায়ের চাদর তাঁর পিঠের ওপর থেকে ফেলে দিলেন । তখন আমি মোহরটি দেখে চিনতে পরলাম । আমি মোহরটিতে চুমু খাওয়ার জন্য তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়লাম এবং কাঁদতে লাগলাম । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে বললেন , সামনে এসো । আমি সামনে এসে বসে পড়লাম । তারপর আমার অতীতের সমস্ত ঘটনা তাঁকে খুলে বললাম ।
হে ইব্ন আব্বাস ! যেমন আমি এখন তোমার কাছে বর্ণনা করছি , তেমনিভাবে আমি তাঁর কাছে আমার সব ঘটনা বলি । শুনে তিনি মুগ্ধ হলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বললেন । এরপর দাসত্বের কারণে সালমান ( রা ) রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশ নিতে পারেন নি ।