📄 সালমান আগে অগ্নিউপাসক ছিলেন, একটি গীর্জায় গিয়ে খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে অবহিত হন
সালমান ফারসী ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ
সালমান আগে অগ্নিউপাসক ছিলেন । একটি গীর্জায় গিয়ে খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে অবহিত হন
ইবন ইসহাক বলেন : আসিম ইবন উমর ( র ) আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন , সালমান ফারসী ( রা ) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন : আমি একজন পারসিক ছিলাম । পারস্যের ইসফাহান প্রদেশের ‘ জাঈ ' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলাম । আমার পিতা ছিলেন জাঈ গ্রামের দিকান বা মোড়ল । তিনি আমাকে এত বেশি স্নেহ করতেন যে , আমাকে বাড়ি থেকে কোথাও যেতে দিতেন না । দাসদাসীর মত তিনি আমাকে বাড়িতে আটকিয়ে রাখতেন । এ সময়ে আমি অগ্নি - উপাসনায় খুবই দক্ষতা অর্জন করি । এক মুহূর্তও যাতে আগুন নিভতে না পারে এমনভাবে কুণ্ডলী জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্বে ছিলাম আমি । আমার পিতার একটি বিরাট ভূসম্পত্তি ছিল । একটা ভবন তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি ঐ ভূসম্পত্তিটি দেখাশোনা করতে পারতেন না । অগত্যা ঐ সম্পত্তির দেখাশোনা এবং সেই সাথে তার ঈপ্সিত আরো কাজের দায়িত্ব তিনি আমার ওপর ন্যস্ত করলেন এবং সেখানে যেতে বললেন । তবে সেই সাথে বলে দিলেন যে , তুমি আমার দৃষ্টির আড়ালে যাবে না । মাঝে মাঝে দেখা করবে । তা না হলে ঐ ভূ - সম্পত্তির চেয়েও তোমাকে নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ব ।
পিতার নির্দেশ অনুসারে আমি সেই ভূসম্পত্তিটি দেখতে চলে গেলাম । পথে একটি খ্রিস্টীয় গীর্জায় লোকজনকে উপাসনারত অবস্থায় শব্দ করতে দেখলাম । পিতার অন্ধ স্নেহের শিকার হয়ে বাড়িতে বন্দী হয়ে থাকার কারণে সমাজের কোন খবরই আমি রাখতাম না । তাদের হৈচৈ শুনে সেখানে তারা কি করছিল , তা দেখার জন্য আমি গীর্জার ভেতরে ঢুকে গেলাম । তাদের উপাসনা দেখে আমি মুগ্ধ হলাম এবং আমি তাদের এ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হলাম । মনে মনে বললাম , আমাদের ধর্মের চেয়ে এটা অবশ্যই ভালো । আল্লাহ্র কসম ! সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমি সেখানে অবস্থান করলাম । পিতার ভূসম্পত্তি দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করলাম । এরপর আমি গীর্জার লোকদের জিজ্ঞেস করলাম : এ ধর্মের উৎস কোথায় ? তারা বলল , সিরিয়ায় ।
📄 খ্রিস্টান দলের সাথে সালমানের পলায়ন
এরপর আমি আমার পিতার কাছে ফিরে এলাম । পিতা ইতিপূর্বেই আমার সন্ধানে লোক পাঠিয়েছিলেন । তিনি সকল কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে আমার চিন্তায় অধীর হয়ে পড়েছিলেন । তাঁর কাছে যখন এলাম , তখন তিনি বললেন , তুমি কোথায় ছিলে , বাবা ? তোমার কাছ থেকে আমি যে অংগীকার নিয়েছিলাম , তা কি তুমি ভুলে গেছ ? আমি বললাম , বাবা , যাওয়ার পথে একটি গীর্জায় কিছু লোককে উপাসনা করতে দেখলাম । পরে তাদের ধর্মীয় আচার - অনুষ্ঠান দেখে ঐ আমার বড়ই ভালো লাগল । তাই সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের সাথে থেকে গেলাম । তিনি বললেন , ধর্ম ভালো নয় বাবা । তোমার ও তোমার পিতৃপুরুষদের ধর্ম তার চেয়ে ভালো । আমি বললাম , কখনো নয় । ঐ ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে ভালো । এতে তিনি আমাকে নিয়ে ভীত হয়ে পড়লেন । আমার পায়ে একটি শিকল পরিয়ে তিনি আমাকে তার ঘরে আটক করে রাখলেন । খ্রিস্টান দলের সাথে সালমানের পলায়ন
এ সময় আমি গোপনে গীর্জার খ্রিস্টানদের নিকট খবর পাঠালাম যে , আপনাদের কাছে সিরিয়া থেকে কোন কাফেলা এলে আমাকে জানাবেন । কিছুদিন পর তাদের কাছে সিরিয়া থেকে খ্রিস্টানদের একটা বাণিজ্যিক কাফেলা এল । তারা যথাসময়ে আমাকে খবরটি জানাল । আমি বলে পাঠালাম , এই কাফেলার কাজ যখন শেষ হবে এবং তারা দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে , তখন আমাকে জানাবেন । তারপর কাফেলা স্বদেশে ফেরার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলে তারা আমাকে এ খবর জানাল । আমি পায়ের বেড়ী ফেলে দিয়ে তাদের সাথে সিরিয়া চলে গেলাম । সিরিয়ায় গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম : এ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী কে ? তারা আমাকে বলল , গীর্জার প্রধান যাজকই সবচেয়ে জ্ঞানী ।
📄 একজন খারাপ পাদ্রীর সাথে সালমান
একজন খারাপ পাদ্রীর সাথে সালমান
সালমান বলেন , আমি তার কাছে হাযির হলাম । তাকে বললাম , আমি এ ধর্মের প্রতি আগ্রহী । আমি আপনার সহচর হতে চাই । আমার ইচ্ছা আপনার এ গীর্জায় আপনার সেবা করি এবং আপনার কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করি এবং আপনার সাথে উপাসনা করি । তিনি বললেন , গীর্জার ভেতরে চল । আমি তার সাথে গীর্জায় প্রবেশ করলাম । পরে বুঝতে পারলাম , লোকটি ভীষণ অসৎ । সে জনগণের কাছ থেকে সাদকা আদায় করে এবং তা গরীবদের না দিয়ে নিজে আত্মসাৎ করে । এভাবে সে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করে । আমি তাকে খুবই ঘৃণা করতে লাগলাম ।
সে মারা গেলে , তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে খ্রিস্টানরা সমবেত হল । আমি তাদের বললাম , লোকটি অসৎ । তোমাদের সাদকা দিতে উপদেশ দিত ও উদ্বুদ্ধ করত ; কিন্তু তোমাদের দেয়া সাদকাগুলো সে আত্মসাৎ করত এবং গরীবদের এ থেকে কিছুই দিত না । তারা আমাকে বললো , তুমি যা বলছ , তার প্রমাণ কি ? আমি বললাম , সে যে সম্পদ জমা করেছে , তা আমি তোমাদের দেখাতে পারি । তারা বলল , দেখাও তো । আমি তাদের যাজকের থাকার জায়গাটা দেখালাম । তখন তারা সেখান থেকে সোনা - রূপা ভর্তি সাতটা কলসী বের করলো । তা দেখে তারা বলল , আল্লাহ্ শপথ ! এ নরাধমকে আমরা কবর দেব না ।
তারপর তার লাশকে তারা শূলে চড়াল , তাতে পাথর নিক্ষেপ করল । তারপর তারা নতূন এক যাজক নিয়োগ করল ।
📄 একজন সৎ যাজকের সাথে সালমান
একজন সৎ যাজকের সাথে সালমান
সালমান বলেন , এই নতুন যাজকটি ছিলেন সর্বদিক দিয়ে অতুলনীয় । পৃথিবীর সম্পদের প্রতি তিনি ছিলেন একেবারেই আসক্তিহীন । তার সমস্ত আসক্তি ছিল আখিরাতের প্রতি । দিনরাত তিনি উপাসনায় মশগুল থাকতেন এবং মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন । এই যাজককে আমি এত ভালোবাসতাম যে , ইতিপূর্বে আমি আর কাউকে কখনো এত ভালবাসিনি । তার সাথে দীর্ঘদিন কাটালাম ।
আমি তো
তারপর তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আমি তার কাছে গিয়ে বললাম , হুযূর ! আপনার সংগে দীর্ঘদিন কাটালাম এবং আপনাকে সবচাইতে বেশি ভালবাসতাম । এখন তো আপনার শেষ অবস্থা । এখন আপনি আমাকে কার কাছে যেতে বলেন এবং কি করার নির্দেশ দেন ? তিনি বললেন : বাবা , আল্লাহ্র কসম ! আমি যতটা খাঁটি ধর্মের অনুসারী ছিলাম , এখন তেমনটি আর কাউকে দেখি না । ভাল লোকেরা বিদায় নিয়ে গেছে । এখন যারা আছে , তারা ধর্মকে অনেকাংশে বিকৃত করে ফেলেছে এবং অনেকখানি বর্জন করেছে । তবে মূসেলে ( মাওসিলে ) এক ব্যক্তি আছে । সে আমার মত খাঁটি ধর্মের অনুসারী । তুমি তার কাছে চলে যাও ।