📄 কুরায়শদের এ মতবাদে অন্যান্য গোত্রের সম্মতি
কুরায়শদের এ মতবাদে অন্যান্য গোত্রের সম্মতি
পরবর্তীকালে বনূ কিনানাও কুরায়শদের এ মতবাদ মেনে নেয় ।
উল্লিখিত বনূ আমির ইব্ন সা'সা'আ - এর সাথে বনূ হানযালা ইবন মালিক গোত্রের এক সংঘর্ষ ঘটে জাবালা নামক স্থানে এবং তাতে বনূ আমির বনু হানযালার ওপর জয়লাভ করে ।
ইন হিশাম বলেন : আবূ উবায়দা নাবী আমাকে জানিয়েছেন যে , বনূ আমির , ইন সা‘সা'আ ইব্ন মুআবিয়া ইবন বকর ইব্ন হাওয়াযিন পরবর্তীকালে এ মতবাদ মেনে নেয় । আবূ উবায়দা আমাকে আমর ইব্ন মা'দীকারিবের একটি কবিতা শোনান :
“ ওহে আব্বাস ইবন মিরদাস সুলামী ! আমাদের ঘোড়াগুলো যদি মোটাতাজা হত , তাহলে তাসলীসে তুমি বনূ আমির ইব্ন সা'সা আর সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হতে না । এ উদ্দেশ্যে যে , উক্ত আব্বাস তাসলীস নামক স্থানে বনূ যুবায়দের ওপর হামলা চালিয়েছিল । ”
আর আবূ উবায়দা আমাকে লাকীত ইবন যারারা দারিমীর জাবালা যুদ্ধ সম্পর্কে কবিতা ( যা ইসলামের আবির্ভাবের চল্লিশ বছর আগে অনুষ্ঠিত হয় এবং এ যুদ্ধ ছিল রাসূলের জন্মের বছর শোনান : “ সাবধান , বনূ আস হচ্ছে হুমস মতবাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাবান গোষ্ঠী । কারণ জাবালার যুদ্ধে বনূ আস বনূ আমির ইব্ন সার্সা আর মিত্র ছিল । ”
আর সেদিন লাকীত ইবন যুরারা ইব্ন উদুস ( মতান্তরে আদাস ) নিহত এবং হাযিব ইন যুরারা ইব্ন উদুস , আমর ইবন আমর ইব্ন উদুস ইব্ন যায়দ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন দারিম ইব্ন মালিক ইব্ন হানযালা বন্দী হয় । এ সম্পর্কে কবি ফারাযদাকের কবিতা নিম্নরূপ :
“ তুমি বোধ হয় লাকীত , হাজিব ও আমর ইব্ন আমরকে দেখনি । যখন তারা দারিমকে ডেকেছিল । ” এটা ফারাযদাকের দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ ।
📄 যুনাজাবের যুদ্ধ
ঘৃনাজাবের যুদ্ধ
তারপর মাত্তায়ানের নিকটস্থ উপত্যকা ঘূনাজাবে যে যুদ্ধ হয় , তাতে বনূ ‘ আমিরের ওপর হানযালা গোত্র জয়ী হয় । সেদিন ইব্ন কাবশা নামে খ্যাত হাস্সান ইবন মুআবিয়া কিন্দী নিহত হন এবং ইয়াযীদ ইব্ন সাইক কিলাবী বন্দী হন । এ যুদ্ধে তুফায়ল ইব্ন মালিক ইব্ন জা'ফর ইব্ন কিলাব ও আবূ আমির ইব্ন তুফায়ল পরাজিত হয় । এ যুদ্ধ সম্পর্কে ফারাযদাকের কবিতা হল :
“ তুফায়ল ইব্ন মালিক যখন কুরফুল নামক ঘোড়ায় চড়ে পলায়নপর এক পরাজিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করল , তখন আমরা ইব্ন খুওয়ায়লিদের গর্দান মেরে দিলাম । ফলে পেঁচার ( নিহতের সংখ্যা কেবল বাড়িয়েই দিলাম ।
আর জারীরের কবিতার অংশ নিম্নরূপ :
“ আমরা ইব্ন কাবশার মুকুটকে রক্তে রঞ্জিত করে দিলাম এবং সে ঘোড়ার আস্তাবলে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল । ” আর জাবালা ও যূ - নাজাবের যুদ্ধের বৃত্তান্ত অনেক দীর্ঘ । ফিজার যুদ্ধের মত এ কাহিনীরও আমি এখানেই ইতি টানলাম , যাতে মূল সীরাত আলোচনায় ছেদ না পড়ে ।
📄 আরবদের বাড়াবাড়ি
আরবদের বাড়াবাড়ি
ইবন ইসহাক বলেন : কুরায়শরা এরপর তাদের বৈষম্যপূর্ণ মতবাদে আরো গোঁড়ামি ও উগ্রতা সংযোজন করে । তারা ইরামরত অবস্থায় খাবারের পানির ব্যবহার করা , যে কোন ধরনের মাখন থেকে ঘি তৈরি করা , পশমের তৈরি তাঁবুতে প্রবেশ করা , এমন ঘরে প্রবেশ করা যা চামড়ার তৈরি , হারাম শরীফে বহিরাগত হাজীদের হারাম শরীফের বাইরে থেকে আনা খাদ্য খাওয়া এবং বাইরে থেকে আনা কাপড় পরে তওয়াফ করাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । বরং তাদের হারাম শরীফের ভেতরে তৈরি খাবার খেতে হবে এবং ভেতর থেকে সংগৃহীত কাপড় পরতে হবে । কাপড় না পাওয়া গেলে নগ্ন হয়ে তওয়াফ করতে হবে । আর যদি কেউ আত্মমর্যাদাবশত যে কাপড় বাইর থেকে নিয়ে এসেছে , তা পরিধান করে তওয়াফ করে , তাহলে তওয়াফের পর তা পরিত্যাগ করতে হবে । ঐ কাপড় সে নিজে বা অন্য কেউ আর কখনো ব্যবহার করতে পারবে না ।
📄 আরবদের সমাজে লাকা প্রথার স্থান
আরবদের সমাজে লাকা প্রথার স্থান
আরবরা এ কাপড়কে লাকা বলত । কুরায়শরা আরবদের এ প্রথা মানতে বাধ্য করে । তারা আরাফাতে অবস্থান করত এবং সেখান থেকে তওয়াফ করার জন্য মক্কায় আসত । পুরুষেরা উলঙ্গ হয়ে আল্লাহর ঘর তওয়াফ করত । আর মহিলারা শরীরের সমস্ত কাপড় খুলে ফেলে কেবল একটা ঢিলে জামা পরে তওয়াফ করত ।
এ অবস্থায় তওয়াফরত জনৈক আরব মহিলা কবি বলেন : “ আজ শরীরের অংশবিশেষ অথবা পুরোটাই প্রকাশিত হবে । যেটুকু প্রকাশিত হবে , তা কারো জন্য হালাল হতে দেব না ।
তওয়াফকারীদের মধ্যে যারা হারাম শরীফের বাইর থেকে কোন কাপড় নিয়ে আসত , তারা তা পরিত্যাগ করত এবং তা সে নিজেও ব্যবহার করত না , অন্যরাও না । জনৈক আরব যখন তার অতি প্রিয় পোশাক এভাবে পরিত্যাগ করল এবং তার কাছে যেতে পারল না , তখন সে দুঃখ করে বলল : “ এর পাশ দিয়ে বারবার যাতায়াত করায় আমার দুঃখ বেড়ে গেছে , যেন তা কেউ ব্যবহার করতে পারছে না । তওয়াফকারীদের সামনে নিক্ষিপ্ত কাপড় হিসাবে পড়ে রয়েছে । ” অথচ তওয়াফ সম্পর্কে ইসলামের বিধান এ হুমস নামক বৈষম্যমূলক প্রথা রহিত করে ।
এ সমস্ত কুসংস্কার চলতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মদ (সা:) -কে নবুওয়ত দান করেন , দীনকে তাঁর জন্য সুদৃঢ় করেন এবং হজ্জের বিধি - বিধান প্রবর্তন করেন । তখন আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করেন : “ এরপর অন্যান্য লোক যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে , তোমরাও সে স্থান থেকে প্রত্যাবর্তন করবে । আর আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা চাইবে , বস্তুত আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু । ” ( ২ : ১৯৯ )
উক্ত আয়াতে ‘ তোমাদের ' দ্বারা কুরায়শদের এবং ‘ লোকদের ' দ্বারা অন্যান্য আরবদের বুঝান হয়েছে । এরপর তিনি (সা:) হজ্জের বছর সকলকে সঙ্গে নিয়ে আরাফাতে যান , সেখানে অবস্থান করেন এবং তওয়াফের জন্য সেখান থেকে মক্কায় যান ।
বায়তুল্লাহর কাছে লোকদের খানাপিনা ও পোশাক পরা নিষিদ্ধ করা , নগ্ন হয়ে তওয়াফ করতে বাধ্য করা এবং হারাম শরীফের বাইরে থেকে আনা খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ করার কুরায়শী মনগড়া বিধি - নিষেধ আল্লাহ্ এ বলে রহিত করেন :
“ হে বনী আদম ! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে । আহার করবে ও পান করবে । কিন্তু অপব্যয় করবে না । আল্লাহ অপব্যয়কারীকে পসন্দ করেন না । ( হে নবী , আপনি ) বলুন : আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন , তা কে নিষিদ্ধ করেছে ? বলুন , পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে এ সমস্ত তাদের জন্য , যারা ঈমান আনে । এরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করি । ” ( ৭ : ৩১-৩২ )
এরূপে আল্লাহ্ তাঁর রাসূল পাঠিয়ে ইসলামের মাধ্যমে কুরায়শরা লোকদের মাঝে ‘ হুমস ’ নামক যে কুপ্রথা চালু করেছিল , তা চিরতরে রহিত করেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ বাকর ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন আমর ইব্ন হাযম ( র ) —উসমান ইবন আবু সুলায়মান ইবন জুবায়র ইব্ন মুতইম ( রা ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন , আমি ওহী নাযিল হওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে নিজের উটে আরোহণ করে সাধারণ মানুষের সাথে আরাফার ময়দানে অবস্থান করতে দেখেছি । এরপর আল্লাহ্র অনুগ্রহে তিনি (সা:) সকলকে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন ।
**টিকাঃ**
যুবায়র ইবন মুতইম রাসূলুল্লাহ (সা:) -কে লোকদের সঙ্গে আরাফার ময়দানে অবস্থানরত দেখে বলেন : ইনি তো হারামের অধিবাসী , তিনি কেন হারামবাসীদের সঙ্গে হারামের ভেতর অবস্থান করলেন না ? ( দ্র . রওযুল উনুফ )