📄 আবূ উমায়্যা ইব্ন মুগীরা কর্তৃক মীমাংসার পন্থা উদ্ভাবন
আবূ উমায়্যা ইবন মুগীরা কর্তৃক মীমাংসার পন্থা উদ্ভাবন
বর্ণিত আছে যে , ঐ সময় সমগ্র কুরায়শ বংশের প্রবীণতম ব্যক্তি আবূ উমায়্যা ইবনুল মুগীরা নিম্নরূপ আহবান জানালেন : “ হে কুরায়শ সম্প্রদায় ! এই পবিত্র মসজিদ দিয়ে যে ব্যক্তি প্রথম প্রবেশ করবে , ' তাকেই তোমরা এই বিবাদ নিষ্পত্তির দায়িত্ব দাও । ” এ প্রস্তাবে সবাই সম্মত হল । তারপর দেখা গেল , রাসূলুল্লাহ (সা:) সর্ব প্রথম প্রবেশ করলেন । তাঁকে দেখে সবাই বলল , এতো আমাদের আল - আমীন ( চির বিশ্বস্ত ) মুহাম্মদ (সা:) ; তাঁর ফায়সালা আমরা মাথা পেতে নেব ।
--রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন জনতার কাছে পৌঁছলেন , তখন সকলে তাঁকে ব্যাপারটা জানাল । তিনি বললেন , তোমরা আমার কাছে একখানা চাদর নিয়ে এস । চাদর আনা হলে তিনি নিজে পাথরখানাকে চাদরের মাঝখানে রাখলেন । তারপর বললেন , প্রত্যেক গোত্রের প্রতিনিধিরা এই চাদরের পাশ ধরে একসাথে পাথরটি উঁচু করে নিয়ে চল । সবাই তাই করল । যখন তারা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছল , তখন তিনি নিজে পাথরটি ধরে যথাস্থানে স্থাপন করলেন এবং তার ওপর গাঁথুনি দিলেন । উল্লেখ্য যে , কুরায়শরা ওহী নাযিলের আগে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে ‘ আল - আমীন ' বলে ডাকত ৷
**টিকাঃ**
১. মাসজিদুল হারামের যে দরজার কথা বলা হয়েছিল , তা ছিল বাবু বনী শায়বা । জাহিলী যুগে একে বাবু বনী আবদে শামস বলা হত । এখন বলা হয় বাবুস সালাম । মতান্তরে যে ব্যক্তি প্রথমে বাবুস সাফায় প্রবেশ করবে ।
২. কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে , এই সময় জনৈক নাজদী প্রবীণ ব্যক্তির রূপ ধারণ করে ইবলিস কুরায়শদের মধ্যে অবস্থান করছিল । সে প্রতিবাদ করে বলল যে , “ তোমাদের মধ্যে এত বিজ্ঞ প্রবীণেরা থাকতে এত বড় গৌরবের কাজটি একজন পিতৃহীন তরুণের ওপর সোপর্দ করতে তোমরা কিভাবে সম্মত হলে ? ” কিন্তু তার এ প্রতিবাদ কুরায়শীদের উল্লাসের মধ্যে তলিয়ে যায় । নচেৎ এর ফলে পুনরায় গোলযোগ বেধে যেতে পারত । পরবর্তীকালে ইবন যুবায়র ( রা ) -এর আমলে যখন কা'বার সংস্কার ..তখন পুনঃস্থাপন করেন তাঁর পুত্র হামযা ।
হয় ,
৩. চাদরের যে কোণটি আবদে মানাফের বংশধরের জন্য নির্দিষ্ট হল , তা ধরল উতবা ইব্ন রবীআ , ` দ্বিতীয় কোণটি ধরল যামআ । তৃতীয়টি আবূ হুযায়ফা ইবন মুগীরা , চতুর্থটি কায়স ইবন আদী । হিজরতের আগে কা'বার সংস্কার হয় । তখন কুরায়শরা যুদ্ধের পথ ছেড়ে শান্তির পথ ধরেছিল রাসূল (সা:) -এর ফয়সালার ভিত্তিতে । হুবায়রা ইব্ন আবূ ওয়াহব মাখযূমী এ ঘটনা সম্পর্কে এক কবিতায় বলেন : “ সকল গোত্র একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে দুর্ভাগ্যবশত বিবাদে লিপ্ত হল । প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্বেষে রূপান্তরিত হল এবং ভয়ংকর যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল । যখন আমরা দেখলাম , ব্যাপারটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তরবারি ছাড়া এর আর কোন সমাধান নেই , তখন আমরা একমত হয়ে বললাম , মক্কার সমতল ভূমি থেকে যে ব্যক্তি প্রথম আসবে , সেই হবে মীমাংসাকারী । আকস্মিকভাবে আল - আমীন মুহাম্মদ (সা:) প্রথম ব্যক্তি হয়ে আমাদের কাছে আসলেন , আর আমরা বললাম , পরম বিশ্বস্ত মুহাম্মদের ব্যাপারে আমরা সম্মত । ”
৩. উল্লেখ্য যে , আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়রের আমলে কা'বা সংস্কার হলে পাথরটিকে বর্তমান জায়গায় রাখেন উরওয়া ইব্ন আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র । ( রওযুল উনুফ দ্র . )
📄 কা'বাঘরের সাপ সম্পর্কে যুবায়রের কবিতা
কা'বা ঘরের সাপ সম্পর্কে যুবায়রের কবিতা
সংস্কার কাজটি সম্পন্ন হলে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর চাচা যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিব ইতিপূর্বে কা'বার দেয়ালে যে সাপটি দেখে কুরায়শরা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল , তা নিয়ে নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন । তিনি বলেন :
“ যে সাপটি কুরায়শদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল , একটি ঈগল কিরূপ নির্ভুলভাবে ছোঁ মেরে তাকে ধরে নিয়ে গেল ; তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি । সাপটি কখনো কুণ্ডলী পাকিয়ে , কখনো ফণা তুলে ছোবল মারার ভঙ্গীতে থাকত । যখনই আমরা কা'বা সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছি , তখন - ই সে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং তার স্বভাবসুলভ ভীতিপ্রদ ভঙ্গীতে ভয় দেখিয়েছে । আমরা যখন এই আপদের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম , তখন এ ঈগলটি এসে আমাদের রক্ষা করল এবং সংস্কারের কাজে আমাদের আর কোন বাধা থাকল না । পরদিন আমরা সকলে নগ্ন হয়ে সংস্কার কজে লেগে গেলাম । মহান আল্লাহ্ এ কাজটি করার সুযোগ দিয়ে ধনু লুআই তথা আমাদের গৌরবান্বিত করলেন । তবে তাদের পরে বনু আদী , বনূ মুররাও একাজে উদ্যোগী হয়েছে । বনূ কিলাব ছিল একাজে তাদের চেয়েও অগ্রণী । আল্লাহ্ আমাদের সসম্মানে কা'বার নিকট বসবাসের অধিকারও দিয়েছেন । আশা করা যায় , এ কাজের প্রতিদান আল্লাহ্র কাছে পাওয়া যাবে । ”
**টিকাঃ**
১. সহীহ্ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে , কুরায়শরা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে কা'বা সংস্কারের জন্য পাথর সংগ্রহ করেছিল এবং এটিকে তারা একটি পূণ্যের কাজ মনে করত ।
📄 কা'বার উচ্চতা
কা'বার উচ্চতা
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর আমলে কা'বা শরীফের উচ্চতা ছিল ১৮ হাত । প্রথমে কুবাতা ' এবং পরে বুরূদ ' জাতীয় সাধারণ কাপড় দিয়ে কা'বার গেলাফ চড়ানো হত । সর্বপ্রথম রেশমী গেলাফ চড়ান হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ।
**টিকাঃ**
২. কুবাতা হল , মিসরে তৈরি এক ধরনের সাদা কাপড় ।
৩. বুরূদ হল , ইয়ামানে তৈরি এক প্রকার কাপড় ।
📄 হুমসের বর্ণনা
হুমসের বর্ণনা ( কুরায়শদের মাঝে হুমস প্রথা )
ইবন ইসহাক বলেন কুরায়শরা ' ইমস ' নামক একটি মতবাদ উদ্ভাবন করেছিল । এটি তারা আবরাহার কা'বা অভিযানের আগে করেছিল না পরে , তা আমার জানা নেই । এ মতবাদটি তারা ব্যাপকভাবে প্রচারও করে । এ মতবাদের সারকথা হল , তারা দাবি করত যে , “ আমরা ইবরাহীমের বংশধর হিসাবে যাবতীয় মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী । আমরা কা'বা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক , মক্কার অধিবাসী ও নেতা । সুতরাং আমাদের মর্যাদা ও অধিকার আরবের অন্য সকলের চেয়ে বেশি । আমাদের মত ব্যাপক খ্যাতি ও পরিচিতি আর কারো নেই । হারাম শরীফের ন্যায় মর্যাদা , হারাম শরীফ বহির্ভূত এলাকার নেই । তা যদি থাকে , তাহলে আরব জাতির ওপর কুরায়শের কোন শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে না । ” তারা আরো বলত , আরবরা হারাম শরীফ ও তার বাইরের এলাকার মর্যাদা সমান করে ফেলেছে । সেজন্য আরাফাত ময়দানে অবস্থান এবং সেখান থেকে কা'বার দিকে যাত্রা করা তারা পরিত্যাগ করেছে । অথচ তারা জানে যে , এ কাজটা হজ্জ ও ইবরাহীম ( আ ) আনীত দীনের অন্তর্ভুক্ত । কুরায়শরা মনে করত , আরাফাত ময়দানে অবস্থান ও সেখান থেকে কা'বা অভিমুখে আসা অন্যান্য আরবদের দায়িত্ব , তাদের নয় । তারা মনে করত যে , “ আমরা হারাম শরীফের অধিবাসী । কাজেই আমাদের এখান থেকে বের হওয়া এবং হারাম শরীফের বহির্ভূত কোন স্থানকে হারাম শরীফের মত সম্মান দেয়া আমাদের কর্তব্য নয় । ” এরপর এ বৈষম্যমূলক ধ্যান - ধারণা তারা হারামবাসীর বংশধর এবং অ - হারামবাসীর বংশধরের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে , নিছক জন্মের সূত্র ধরে । হারামবাসীর বংশধরের জন্য যেমন কিছু কাজ বৈধ ও কিছু কাজ অবৈধ সাব্যস্ত হতে থাকে , তেমনি হারাম শরীফ বহির্ভূতদের বংশধরদের জন্যও কিছু কাজ বৈধ ও কিছু কাজ অবৈধ বলে চিহ্নিত হতে থাকে ।