📄 আবূ তালিব-এর প্রত্যাবর্তন: যুরায়র ও তার দু'সাথীর ষড়যন্ত্র
বহীরার ঘটনা
[ আবূ তালিব কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (সা:) -কে নিয়ে সিরিয়া যাত্রা ] : ইব্ন ইসহাক বলেন , এরপর আবূ তালিব এক কাফেলার সাথে বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়ায় যাত্রার উদ্যোগ নিলেন । সফরের সকল প্রস্তুতি যখন সম্পন্ন হল , তখন বালক মুহাম্মদ (সা:) আবূ তালিবকে জড়িয়ে ধরলেন । তা দেখে আবূ তালিবের মন নরম হয়ে পড়ল । তিনি বললেন , ওকে আমার সাথে করে নিতেই হবে । ওকে কিছুতেই রেখে যেতে পারব না । আর সেও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না । তারপর রাসূল (সা:) আবূ তালিবের সফরসঙ্গী হলেন ।
কাফেলা সিরিয়ার অন্তর্গত বুসরা এলাকায় যাত্রা বিরতি করল । সেখানে ছিলেন বহীরা নামক এক খ্রিস্টান যাজক । ওখানকার এক গির্জায় তিনি থাকতেন । ঈসায়ী ধর্ম সম্পর্কে তার যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি ছিল । ঐ গির্জায় সর্বদাই একজন পাদ্রী নিযুক্ত থাকত , যার ধর্মতত্ত্ব জ্ঞানের ওপর ঐ এলাকার মানুষ নির্ভরশীল ছিল । দীর্ঘকালব্যাপী ঐ গির্জায় একখানা আসমানী কিতাব রক্ষিত থাকত । পুরুষানুক্রমে ঐ আসমানী কিতাব থেকে জ্ঞানের উত্তরাধিকার চলে আসছিল । বহীরার কাছ দিয়ে ইতিপূর্বে বহু বাণিজ্য কাফেলা আসা - যাওয়া করত । তিনি কারো সামনে বেরুতেন ও না , কারো সাথে কথাবার্তাও বলতেন না । কিন্তু এই বছর যখন কুরায়শ কাফেলা আবূ তালিব ও বালক মুহাম্মদ (সা:) -কে সাথে নিয়ে ঐ স্থানে বহীরার গির্জার পার্শ্বে যাত্রাবিরতি করল , তখন বহীরা তাদের জন্য প্রচুর খাদ্যের আয়োজন করলেন । ঐতিহাসিকদের অভিমত এই যে , ঐ কাফেলার অবস্থান গ্রহণের পর নিজ গির্জার ভেতরে বসেই পাদ্রী বহীরা এমন কিছু অসাধারণ আলামত প্রত্যক্ষ করেন , যার জন্য তিনি গোটা কাফেলার সম্মানে ভোজের আয়োজন করতে উদ্বুদ্ধ হন । ঐতিহাসিকগণ বলেন , কাফেলার ভেতরে রাসূলুল্লাহ (সা:) উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় " যখন তা এগিয়ে আসছিল , তখন গির্জার ভেতর থেকেই পাদ্রী বহীরা দেখতে পান যে , সমগ্র কাফেলার মধ্য থেকে কেবল বালক মুহাম্মদ (সা:) -এর মাথার ওপর একখানি মেঘ ছায়া দিয়ে আসছে । কাফেলাটি গির্জার নিকটবর্তী গাছের ছায়ার নীচে এসে থামল । তখনো পাদ্রী দেখলেন যে , মেঘটি এখনো গাছের ওপর ছায়া বিস্তার করে আছে এবং গাছের ডালপালা রাসূল (সা:) -এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে । এ দৃশ্য দেখে বহীরা গির্জা থেকে বেরিয়ে এলেন এবং লোক পাঠিয়ে কাফেলার লোকদেরকে বললেন , “ হে কুরায়শ বণিকগণ ! আমি আপনাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন করেছি । আপনাদের ছোট - বড় , আযাদ ও গোলাম নির্বিশেষে সকলকে এসে খাদ্য গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি । ” কাফেলার মধ্য থেকে একজন বলল , আজ আপনি এক অভিনব কাজ করলেন । আগে আমরা এই পথে বহুবার যাতায়াত করেছি কিন্তু কখনো আপনি এরূপ আতিথেয়তা দেখাননি । আজ আপনার এরূপ করার হেতু কি ? বহীরা বললেন : “ আপনি ঠিকই বলেছেন । আপনি যা বলেছেন , সে রকমই হয়ে আসছে কিন্তু আজ যেহেতু আপনারা যাত্রাবিরতি ঘটিয়ে আমার মেহমানে পরিণত হয়েছেন , তাই আমি আপনাদের আপ্যায়ন করতে আগ্রহী । আপনাদের জন্য আমি খাদ্য তৈরি করছি । আপনারা সকলে তা খেয়ে যাবেন এই আমার অনুরোধ । ”
এরপর সকলেই খাবার জায়গায় সমবেত হলো । কিন্তু অল্পবয়স্ক বিধায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কাফেলার বহরের সাথে গাছের ছায়ার নিচে বসে রইলেন । এদিকে খাওয়ার জন্য যে কুরায়শী বণিকরা সমবেত হয়েছেন , পাদ্রী বহীরা তাদের সবাইকে ভালোভাবে পরখ করতে লাগলেন । কিন্তু তাদের কারো মধ্যে সেই হাবভাব ও চালচলন দেখতে পেলেন না , যা একটু আগে বালক মুহাম্মদের মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন । এজন্য তিনি বললেন , হে কুরায়শী অতিথিবৃন্দ ! আপনাদের কেউ যেন আমার খাবার গ্রহণ থেকে বাদ না পড়ে । তারা বলল : “ হে বহীরা , যারা এখানে আসার মত , তারা সবাই এসে গেছেন । শুধু একটি বালক কাফেলার বহরে রয়ে গেছে । সে কাফেলার মধ্যে সবচেয়ে অল্পবয়স্ক । বহীরা দৃঢ়ভাবে বললেন : “ না , তাকে বাদ রাখবেন না । তাকেও ডাকুন । সেও আপনাদের সাথে আহার করুক । ” এই সময় জনৈক কুরায়শী বলে উঠল : “ লাত ও উয্যার কসম , আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র আমাদের সাথে থাকবে অথচ আমাদের সাথে ভোজনে অংশ নেবে না , এটা হতেই পারে না । আমাদের জন্য এটা খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার । ” এ কথা বলেই সে উঠে গিয়ে রাসূল (সা:) -কে কোলে করে নিয়ে এলো এবং সবার সাথে খাবারের মজলিসে বসিয়ে দিল । এই সময় বহীরা তাঁর আপদমস্তক গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন এবং দেহের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ ও লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করলেন । কারণ ঐ অঙ্গ ও লক্ষণগুলো সম্পর্কে তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য পেয়েছিলেন । সমাগত অতিথিদের সকলের খাওয়া- দাওয়া শেষ হলে এবং তারা একে একে সবাই বেরিয়ে গেলে বহীরা রাসূল (সা:) -এর কাছে এসে বললেন : “ হে বালক ! আমি তোমাকে লাত ও উয্যার কসম দিয়ে অনুরোধ করছি , তুমি আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দেবে । ” বহীরার লাত ও উয্যার কসম দেয়ার কারণ এই যে , তিনি কুরায়শী বণিকদের কথাবার্তায় ঐ দুই দেবতার শপথ করতে শুনেছেন । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বহীরাকে বললেন : “ আমাকে লাভ - উযযার কসম দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না । আল্লাহ্র কসম , আমি ঐ দুই দেবতাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি । ” বহীরা বললেন , “ ঠিক আছে , আমি তাহলে আল্লাহ্র কসম দিয়ে বলছি , যা জিজ্ঞেস করব , তার জবাব দেবে । ” রাসূল (সা:) বললেন : “ বেশ , কি কি জানতে চান বলুন । ” তারপর বহীরা তাঁকে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন । তার ঘুমের কথা , দেহের গঠন প্রকৃতি ও অন্যান্য অবস্থার কথা জানতে চাইলেন । রাসূল (সা:) তার প্রশ্নগুলোর যে জবাব দিলেন , তা বহীরার আগে থেকে জানা তথ্যাবলীর সাথে হুবহু মিলে গেল । তারপর তিনি তাঁর পিঠ দেখলেন । পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের মোহর অংকিত দেখতে পেলেন । মোহরটি অবিকল সেই জায়গায় দেখতে পেলেন , যেখানে বহীরার পড়া আসমানী কিতাবের বর্ণনা অনুসারে থাকার কথা ছিল ।
ইবন হিশাম বলেন : নবুয়তের মোহরটি দেখতে ঠিক শিংগা লাগানোর যন্ত্রের অংকিত চিহ্নের মত বৃত্তাকার ছিল ।
ইবন ইসহাক বলেন : এ সব করার পর বহীরা আবূ তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন , “ এই বালকটি আপনার কে ? তিনি বললেন , “ আমার ছেলে । ” বহীরা বললেন , “ সে আপনার ছেলে নয় । এই ছেলের পিতা জীবিত থাকার কথা নয় । ”
আবূ তালিব বললেন : “ সে আমার ভাই - এর ছেলে । ” বহীরা বললেন , “ ওর পিতার কি হয়েছিল ? ” আবূ তালিব বললেন : “ এই ছেলে মায়ের পেটে থাকতেই তার পিতা মারা গেছেন । ” বহীরা বললেন : “ এই রকমই হওয়ার কথা । আপনি আপনার এই ভাতিজাকে নিয়ে দেশে ফিরে যান । খবরদার , ইয়াহুদীদের থেকে ওকে সাবধানে রাখবেন । আল্লাহ্র কসম , তারা যদি এই বালককে দেখতে পায় এবং আমি তার যে নিদর্শনাবলী দেখে চিনেছি , তা যদি চিনতে পারে , তাহলে তারা ওর ক্ষতি সাধনের চেষ্টা না করে ছাড়বে না । কেননা আপনার এই ভাতিজা ভবিষ্যতে এক মহামর্যাদাবান হিসাবে আবির্ভূত হবেন । ” তারপর আবূ তালিব তাঁকে নিয়ে স্বদেশে ফিরে গেলেন ।
আবূ তালিব - এর প্রত্যাবর্তন : যুরায়র ও তার দু'সাথীর ষড়যন্ত্র
আবূ তালিব তাঁকে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লেন এবং সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের সমাপ্তি টেনে মক্কায় উপনীত হলেন । তবে জনশ্রুতি রয়েছে যে , সিরিয়া সফরে থাকাকলে বহীরার মত আহলে কিতাবের আরো তিন ব্যক্তি যুরায়র , তাম্মাম ও দারীস রাসূল (সা:) -এর নবুয়তের নিদর্শনাবলী অবগত হয় এবং তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আঁটে । কিন্তু বহীরা তাদেরকে নিবৃত্ত করেন । তিনি তাদেরকে আল্লাহ্র কথা এবং আসমানী কিতাবের শেষনবী সম্পর্কে যে বিবরণ ও নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে , তা স্মরণ করিয়ে দেন । তিনি তাদেরকে এ কথাও জানান যে , তারা যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েও তাঁর ক্ষতি করতে চায় , তবু তা তারা সমর্থ হবে না । এই তিন ব্যক্তি যতক্ষণ বহীরার কথা মেনে না নিয়েছে , ততক্ষণ বহীরা তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেননি । শেষ পর্যন্ত তারা তাদের দুরভিসন্ধি পরিত্যাগ করে চলে যায় ।
📄 শিশুকালে আল্লাহ্ কিভাবে তাঁকে রক্ষা করেছেন সে সম্পর্কে স্বয়ং তাঁর বক্তব্য
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যৌবনে পদাপর্ণ করেন । আল্লাহ্ তাঁকে তাঁর রিসালাত ও সম্মান রক্ষার্থে হিফাযত করতে থাকেন । তাই তাঁকে জাহিলিয়াতের সকল দোষ - ত্রুটি , কলঙ্ক - কালিমা ও নোংরামি থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ ও পবিত্র রেখেছিলেন । ফলে তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করলেন , তখন তিনি হলেন আরবের সবচেয়ে সচ্চরিত্র , সবচেয়ে উদারমনা , সবচেয়ে দয়ালু , সম্ভ্রান্ত , সবচেয়ে ধৈর্যশীল , সবচেয়ে সৎ প্রতিবেশী , সবচেয়ে সত্যবাদী , সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও আমানতদার এবং খারাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরের ( সংযমী ) মানুষ । তাঁর ভেতরে সদ্গুণাবলীর এত ব্যাপক ও বিপুল সমাবেশ ঘটার কারণে তাঁকে তাঁর সমাজ ' আল - আমীন ' খেতাবে ভূষিত করা হয় ।
শিশুকালে আল্লাহ্ কিভাবে তাঁকে রক্ষা করেছেন সে সম্পর্কে স্বয়ং তাঁর বক্তব্য
জাহিলিয়াতের দোষত্রুটি থেকে শিশুকাল থেকেই আল্লাহ্ কিভাবে রাসূল (সা:) -কে রক্ষা করেছেন , রাসূল (সা:) নিজেই তার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন : শৈশবে কুরায়শী শিশুদের সাথে আমি নানা রকমের খেলায় অংশগ্রহণ করতাম । তন্মধ্যে বড় বড় পাথর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোরও একটা খেলা ছিল । এই খেলা খেলতে গিয়ে প্রায় সব শিশু চাদর খুলে উলঙ্গ হয়ে যেত । চাদর কাঁধে গিয়ে তার ওপর পাথর বহন করত । আমি সময় সময় এভাবে উলঙ্গ হওয়ার উপক্রম করতাম । কিন্তু ইতস্তত করতাম । এই সময় এক অদৃশ্য লোক আমাকে ঘুষি লাগিয়ে দিতেন এবং ঘুষিতে বেশ ব্যথাও পেতাম । তিনি ঘুষি দিতেন আর বলতেন , চাদর বেঁধে নাও । তারপর চাদর শক্ত করে বেঁধে রাখতাম এবং অন্য সকল শিশুর মধ্যে আমি একাই চাদর পরা অবস্থায় খালি ঘাড়ে পাথর বহন করতাম ।