📄 সফিয়্যা কর্তৃক তার পিতা আবদুল মুত্তালিবের শোকগাথা
আবদুল মুত্তালিবের ইন্তিকাল এবং তার শোকে রচিত কবিতা
রাসূলুল্লাহ (সা:) আট বছর বয়সে উপনীত হলে অর্থাৎ আবরাহার হস্তীবাহিনী নিয়ে কা'বা শরীফ আক্রমণ করার আট বছর পর আবদুল মুত্তালib মারা যান । ইব্ন ইসহাক বলেন : আব্বাস ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন মা'বাদ ইব্ন আব্বাস তার পরিবারের কারো সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুকালে রাসূলুল্লাহ (সা:) -এর বয়স ছিল আট বছর ।
... ইব্ন ইসহাক বলেন : সাঈদ ইবনু মুসায়্যাব ( র ) -এর পুত্র মুহাম্মদ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , যখন আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যু আসন্ন হল এবং তিনি বুঝতে পারলেন যে তার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে , তখন তার সব কন্যাকে একত্র করলেন । তার সর্বমোট ছয়জন কন্যা ছিল । তাদের নাম হলো : সফিয়্যা , বাররা , আতিকা , উম্মে হাকীম আল - বায়যা , উমায়মা ও আরওয়া । তিনি তাদেরকে বললেন : আমার মৃত্যুর পর তোমরা কে কি বলে বিলাপ করবে বল , আমি মরার আগে সেটা একটু শুনে , যেতে চাই ।
ইবন হিশাম বলেন : আমি কবিতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ এমন কোন কবি দেখিনি , যিনি এসব শোকগাথা সম্পর্কে জানেন । তবে মুহাম্মদ ইব্ন সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব থেকে কিছু কবিতা বর্ণিত হয়েছে , যা আমরা এখানে উধৃত করছি ।
সফিয়্যা কর্তৃক তার পিতা আবদুল মুত্তালিবের শোকগাথা
সফিয়্যা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব তার পিতার প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেন :
“ কবরের পাশের রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে এক মহান ব্যক্তির মৃত্যুর শোকে ক্রন্দনরত এক মহিলার কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় । সে বিলাপ শুনে আমার চোখের পানি মুক্তোর মত গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল । সে বিলাপ ছিল সম্মানিত এক মহৎ ব্যক্তির প্রতি , যিনি কখনো নিজেকে অন্য বংশের অন্তর্ভুক্ত বলে মিথ্যা দাবি করতেন না । যিনি আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন , শায়বার প্রতি যিনি ছিলেন মহাদানশীল এবং অনেক গুণের অধিকারী । তোমার উত্তম পিতা , যিনি ছিলেন সকল বদান্যতার উত্তরাধিকারী । আমি বিলাপ করছি সেই ব্যক্তিত্বের ওপর , যিনি কোন বিষয়ে তার সঙ্গীদের পেছনে থাকতেন না এবং যুদ্ধের ময়দানে খুব বীরত্বের সাথে মুকাবিলা করতেন । যিনি ছিল উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং উচ্চ বংশীয় । বিলাপ তাঁর প্রতি , যিনি ছিলেন দানবীর , দারাযদস্ত , সৌন্দর্য ও বীরত্বের অধিকারী এবং প্রশংসার পাত্র তাঁর নিজে গোত্রীয়দের কাছে এবং সর্বজনমান্য । তাঁর প্রতি , যিনি ছিলেন উঁচু বংশের সুদর্শন চেহারার অধিকারী ও গুণে গুণান্বিত এবং দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের প্রতি দানশীল । তাঁর প্রতি , যিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং সম্মানিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত , সম্মানিত বাহাদুর গোত্রসমূহের পৃষ্ঠপোষক , যদি কোন ব্যক্তি তার পুরানো ইযযত ও সম্মানের কারণে চিরস্থায়ী হত , তবে সেই ব্যক্তি বংশ মর্যাদা ও গুণাবলীর কারণে চিরস্থায়ী হতেন । কিন্তু চিরস্থায়ী হওয়ার কোন উপায় নেই । ”
📄 বাররা রচিত শোকগাথা
বাররা রচিত শোকগাথা
আর বাররা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব স্বীয় পিতার শোকগাথায় বলেন :
“ ওহে আমার চোখদ্বয় ! তোমরা সেই গুণবান ব্যক্তির জন্য মুক্তার ন্যায় অশ্রু ঝরাও । উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব , মানুষের প্রয়োজন পূরণকারী , সুদর্শন চেহারার অধিকারী । মহাসম্মানিত শায়বা প্রশংসার পাত্র , বহুগুণের অধিকারী এবং সম্মান ও গৌরবমণ্ডিত । বিপদে ধৈর্যশীল ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী , অনেক গুণসম্পন্ন দানবীর । তাঁর স্বজাতির ওপর তিনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন । মর্যাদায় — তিনি জ্যোতির্ময়- চন্দ্রের ন্যায় চমকাতেন ।
“ যুগের আবর্তন এবং তাকদীরের নির্মম পরিহাস নিয়ে তাঁর কাছে মৃত্যু উপস্থিত হয়ে তাঁকে নিষ্ঠুর আঘাত হানল । ”
📄 আতিকা রচিত শোকগাথা তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিব-এর উদ্দেশ্যে
আতিকা রচিত শোকগাথা তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিব - এর উদ্দেশ্যে
আতিকা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব তার পিতার শোকে কাঁদতে কাঁদতে বলেন :
“ হে আমার চক্ষুদ্বয় ! লোকেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে , তখন তোমরা যত পার অশ্রু বর্ষণ কর এবং এ ব্যাপারে কার্পণ্য করো না ।
হে আমার চক্ষুদ্বয় ! তোমরা প্রচুর অশ্রু বর্ষণ কর এবং বিলাপ সহকারে কাঁদতে থাক , হে আমার চক্ষুদ্বয় ! তোমরা কান্নায় ডুবে যাও সেই অসাধারণ পুরুষের ওপর , যিনি কোন দিক থেকেই দুর্বল ছিলেন না । যিনি সকল বিপদ - আপদে সাহায্যকারী এবং সমাধানে তৎপর এবং অঙ্গীকার পূরণকারী , তোমরা কাঁদতে থাক শায়বাতুল হামদের ওপর , যিনি দানবীর , সত্যবাদী , দৃঢ় মনোবলের অধিকারী এবং যুদ্ধের সময় খোলা তরবারি এবং শত্রু বিনাশকারী , নম্রস্বভাব ; উদারহস্ত , ওয়াদা পূরণকারী , বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং পুণ্যবান । তাঁর গৃহ মর্যাদার কেন্দ্র , তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব । ”
📄 উম্মে হাকীমের শোকগাথা
উম্মে হাকীম বায়যা বলেন : “ ওহে আমার চোখ , অশ্রু বর্ষণ কর এবং বিলাপ কর , আর সকল সম্মানিত ও দানবীর লোকেেক কাঁদিয়ে তোল । হে আমার চোখ ! তুমি প্রচুর অশ্রুবর্ষণে আমাকে সহযোগিতা কর । তোমার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোড়সওয়ার পিতার জন্য কাঁদো , যিনি কল্যাণের আধার ছিলেন এবং সুপেয় পানির পুষ্করিণী ( স্বরূপ ) ছিলেন । যিনি ছিলেন উদার ও মুক্তহস্ত , মর্যাদাশালী , মহৎ গুণসম্পন্ন ও প্রশংসনীয়ভাবে দানশীল শুভ্রকেশী বৃদ্ধ । আত্মীয় - স্বজনের প্রতি মহানুভব , পরম সুঠামদেহী সুপুরুষ , প্রজ্ঞাময় এবং দুর্ভিক্ষের সময় জনসেবাব্রতী । যখন তুমুল লড়াই বাধত , তখন ছিলেন তিনি এমন বীর শার্দুল যে , সকলেই তাঁকে দেখে বিমোহিত হয়ে যেত । তিনি বনূ কিনানার বংশধরের মধ্যে অতীব বিচক্ষণ , বুদ্ধিমান ও আশ্বস্তকারী ব্যক্তি , যখন তারা অত্যন্ত অবাঞ্ছিত দুর্যোগ ও দুর্ভোগে আক্রান্ত হত । আর যখন যুদ্ধ বাধত কিংবা কঠিন সমস্যা দেখা দিত , তখন তিনি ছিলেন তাদের আশ্রয় ও সহায় । কাজেই তাঁর জন্য কাঁদো , মনে দুঃখ পুষে রেখ না , ক্রন্দসীরা যতদিন বেঁচে থাক তাঁর জন্য কাঁদতে থাক । ”