📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হালীমার ভাগ্য খুলে গেল

📄 হালীমার ভাগ্য খুলে গেল


হালিমা বলেন : ইয়াতীম শিশু মুহাম্মদ (সা:) -কে নিয়ে আমি কাফেলায় ফিরে গেলাম । তাঁকে যখন কোলে নিলাম , তখন আমার স্তন দুটো দুধে ভরে উঠল এবং তা থেকে শিশু মু (সা:) পেটভরে দুধ খেলেন । তার দুধ ভাইটিও পেট ভরে খেল । তারপর দু'জনেই ঘু পড়ল । অথচ আমাদের এই সন্তানটির জ্বালায় ইতিপূর্বে আমরা ঘুমাতে পারিনি । আমার স্বামী আমাদের সেই উষ্ট্রীটির কাছে যেতেই দেখতে পেলেন , সেটির পালানও দুধে ভর্তি । তারপর তিনি প্রচুর পরিমাণে দুধ দোহন করলেন এবং আমরা দু'জনে পেটভরে দুধ খেলাম । এরপর বেশ ভালোভাবেই আমাদের রাতটা কেটে গেল ।
সকালবেলা আমার স্বামী বললেন : হালিমা , জেনে রেখ , তুমি এক মহাকল্যাণময় শিশু এনেছ । আমি বললাম : আমারও তাই মনে হয় ।
এরপর আমরা রওয়ানা দিলাম । আমি গাধার পিঠে সওয়ার হলাম । আমাদের গাধা সমগ্র কাফেলাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল । কাফেলার কারো গাধাই তার সাথে পেরে উঠল না । আমার সহযাত্রী মহিলারা বলতে লাগল : হে যুয়ায়বের কন্যা , একটু দাঁড়াও । আমাদের জন্য একটু থাম । যে গাধার পিঠে চড়ে তুমি এসেছিলে , এটা কি সেই গাধা নয় ? আমি বললাম : হ্যাঁ , সেই গাধাই তো ! তারা বলল : আল্লাহ্র কসম , এখন এর ভাবগতিই আলাদা ।
শেষ পর্যন্ত আমরা বনূ সা'দ গোত্রের বসতিতে আপন আপন গৃহে এসে পৌঁছলাম । আমাদের ঐ এলাকাটার মত খরাপীড়িত জমি তখন আর কোথাও ছিল বলে মনে হয় না । কিন্তু শিশু মুহাম্মদ (সা:) -কে নিয়ে বাড়ি পৌঁছার পর প্রতিদিন আমাদের ছাগল - ভেড়া - উট ইত্যাদি খেয়ে পেট পূর্ণ করে ও পালানভর্তি দুধ নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে লাগল । অথচ অন্যরা তাদের ছাগল - ভেড়া থেকে একফোঁটাও দুধ দোহাতে পারত না । এমনকি আমাদের গোত্রের লোকেরা তাদের রাখালদেরকে বলতে লাগল : বোকার দল , আবূ যুয়ায়বের কন্যার রাখাল যে মাঠে পশু চরায় , সেই মাঠে পশুদের চরাতে নিয়ে যেতে পারিস না ? তারপর রাখালরা আমার মেষ চরানোর মাঠে নিয়ে তাদের মেষ চরাতে লাগল । কিন্তু তবুও তাদের মেষপাল ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরে আসতে লাগল । অথচ আমার মেষগুলো ফিরে আসতো ভরা পেট ও দুধে টইটুম্বুর পালান নিয়ে । এভাবে ক্রমেই আমার সংসার প্রাচুর্য ও সুখ - সমৃদ্ধিতে ভরে উঠতে লাগল । এ অবস্থার ভেতর দিয়েই দু'বছর কেটে গেল এবং আমি মুহাম্মদ (সা:) -এর দুধ ছাড়িয়ে দিলাম । অন্যান্য সমবয়সী শিশুদের চেয়ে দ্রুতগতিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন । দু'বছর হতেই তিনি বেশ চটপটে ও নাদুস - নুদুস হয়ে উঠলেন ।
: এই পর্যায়ে আমি তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম , যদিও আমরা তাঁকে আরো কিছুকাল রাখতে আগ্রহী ছিলাম । কারণ তাঁর আসার পর থেকে আমাদের কপাল খুলে গিয়েছিল এবং বিপুল সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল । তাঁর মাকে আমি বললাম আপনি যদি এই ছেলেকে আরো একটু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া পর্যন্ত আমার কাছে থাকতে দিতেন , তাহলে ভালো হতো । আমার আশংকা হয় যে , সে মক্কার রোগ - ব্যাধি ও মহামারীতে আক্রান্ত হতে পারে । অনেক বুঝিয়ে - সুঝিয়ে বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁকে আমাদের সাথে ফেরত পাঠালেন ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলের বক্ষ বিদারণকারী দুই ফেরেশতার বিবরণ

📄 রাসূলের বক্ষ বিদারণকারী দুই ফেরেশতার বিবরণ


রাসূলের বক্ষ বিদারণকারী দুই ফেরেশতার বিবরণ
আমরা তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফেরার একমাস পরের ঘটনা । একদিন তিনি তাঁর দুধ - ভাই - এর সাথে আমাদের বাড়ির পেছনের মাঠে মেষশাবক চরাচ্ছিলেন । হঠাৎ তাঁর বড় ভাই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ছুটে এলো এবং আমাকে ও তার পিতাকে বলল : আমাদের ঐ কুরায়শী ভাইটাকে সাদা কাপড় পরা দুটো লোক এসে ধরে শুইয়ে দিয়ে পেট চিরে ফেলেছে এবং পেটের সবকিছু বের করে নাড়াচাড়া করছে ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হালিমা রাসূল (সা)-কে নিয়ে তাঁর জননীর কাছে গেলেন

📄 হালিমা রাসূল (সা)-কে নিয়ে তাঁর জননীর কাছে গেলেন


হালীমা রাসূল (সা:) -কে নিয়ে তাঁর জননীর কাছে গেলেন
হালিমা ( রা ) বলেন , আমার স্বামী বললেন : আমার মনে হয় , এই ছেলের ওপর কোন কিছুর আছর হয়েছে । সুতরাং কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ' পৌঁছে দাও ।
যথার্থই আমরা তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম । তাঁর মা বললেন : ‘ ওহে বোন , তুমি তো ওকে নিজের কাছে রাখতে খুবই উদ্গ্রীব ছিলে । হঠাৎ কি হয়েছে যে , ওকে নিয়ে এলে : আমি বললাম : “ আল্লাহ্ আমার ছেলেকে বড় করেছেন এবং আমার যা দায়িত্ব ছিল , তা পালন করেছি । আমি তাঁর ব্যাপারে দুর্ঘটনার আশংকা করছি । তাই আপনার ছেলেকে ভালোয় ভালোয় আপনার হাতে তুলে দিলাম । ” আমিনা বললেন : তুমি যা বলছ তা প্রকৃত ঘটনা নয় ৷ আসল ব্যাপারটা কি , আমাকে সত্য করে বল । এভাবে পুরো ঘটনা খুলে না বলা পর্যন্ত তিনি আমাকে ছাড়লেন না । ঘটনা শুনে আমিনা বললেন : তুমি কি মনে কর ওকে ভূতে ধরেছে ? আমি বললাম , হ্যাঁ । তিনি বললেন : কখনো তা হতে পারে না । আল্লাহ্র কসম , শয়তান ওর ধারে - কাছেও ঘেঁষতে পারে না । আমার ছেলে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী । আমি কি তোমাকে তাঁর শানের কথা বলব : আমি বললাম : হ্যাঁ , বলুন । তিনি বললেন : সে গর্ভে থাকা অবস্থায় · আমি স্বপ্নে দেখি যে , আমার দেহের ভেতর থেকে একটা জ্যোতি বেরিয়ে এলো এবং তার জ্যোতিতে সিরীয় ভূখণ্ডের বুসরার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে গেল । এরপর সে গর্ভে বড় হতে লাগল । আল্লাহ্র বসম , এত হালকা ও সহজ গর্ভধারণ আমি আর কখনো দেখিনি । সে যখন ভূমিষ্ঠ হল , তখন মাটিতে দুহাত রাখা ও আকাশের দিকে মাথা তোলা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হল । তুমি ওকে রেখে নির্দ্বিধায় চলে যেতে পার

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যখন তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয়, তখন রাসূল (সা) কর্তৃক নিজের পরিচয় প্রদান

📄 যখন তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয়, তখন রাসূল (সা) কর্তৃক নিজের পরিচয় প্রদান


যখন তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয় , তখন রাসূল (সা:) কর্তৃক নিজের পরিচয় প্রদান
ইবন ইসহাক বলেন : সাওর ইবন ইয়াযীদ কতিপয় বিদ্বান ব্যক্তির নিকট থেকে ( আমার ধারণা , একমাত্র খালিদ ইব্‌ন মা'দান আল - কালাঈর নিকট থেকেই ) বর্ণনা করেছেন যে , কতিপয় সাহাবী একবার রাসূল (সা:) -কে বলেন : হে আল্লাহ্র রাসূল ! আপনার নিজের সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু জানান । তিনি বললেন : তাহলে শোন । আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দু'আ ও আমার ভাই ঈসার সু - সংবাদের ফল । আমি গর্ভে আসার পর আমার মা স্বপ্নে দেখলেন যে , তাঁর শরীরের ভেতর থেকে একটা জ্যোতি বেরুল যা দ্বারা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেল । আর বনূ সা'দ ইব্‌ন বাকর - এর গোত্রের ধাত্রীর কোলে আমি লালিত - পালিত হচ্ছিলাম । এই সময় আমার এক দুধভাই - এর সাথে আমাদের ( ধাত্রীমাতা হালীমার ) বাড়ির পেছনে মেষ চরাতে যাই । তখন সাদা কাপড় পরা দু'জন লোক আমার কাছে এলেন । তাঁদের কাছে একটি সোনার প্লেটভর্তি বরফ ছিল । তারা আমাকে ধরে আমার পেট চিরে ফেললেন । তারপর আমার হৃৎপিণ্ড বের করে তাও চিরলেন এবং তা থেকে একফোঁটা কালো জমাট রক্ত বের করে তা ফেলে দিলেন । তারপর ঐ বরফ দিয়ে আমার পেট ও হৃৎপিণ্ডকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিলেন । তারপর তাদের একজন অপরজনকে বললেন , মুহাম্মদ ( সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ) -কে তার উম্মতের দশজনের সাথে ওজন কর । তিনি আমাকে ওজন করলেন এবং আমি দশজনের চাইতেও ভারী প্রমাণিত হলাম । তারপর বললেন , তাকে তার উম্মতের একশ ' জনের সাথে ওজন কর । তিনি আমাকে একশ ' জনের সাথে ওজন করলেন । আমি ওযনে একশ ' জনের চেয়েও ভারী হলাম । এরপর তিনি বললেন , তাঁকে তাঁর উম্মতের এক হাজার জনের সাথে ওজন কর । আমাকে এক হাজার জনের সাথে ওজন করলে এবারও আমি এক হাজার জনের চেয়ে ভারী হলাম । তারপর তিনি বললেন , রেখে দাও , আল্লাহ্র কসম , তাঁকে যদি তাঁর সকল উম্মতের সাথে ওজন করা হয় , তাহলেও তিনি তাদের সবার চাইতে ভারী ( অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ) হবেন ।

**টিকাঃ**
১. সিরিয়া বিজিত হওয়া এবং সমগ্র উমাইয়া শাসনকালে সিরিয়ার রাজধানী দামেশক ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী থাকার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল এই স্বপ্নে । অনুরূপভাবে বর্ণিত আছে যে , রাসূল (সা:) -এর জন্মের কয়েকদিন আগে সাঈদ ইবনুল আস স্বপ্নে দেখেন যে , যমযম কূপ থেকে একটি আলোকরশ্মি বেরিয়ে এলো এবং সেই আলোকে মদীনার খেজুর বাগানের কাঁটা খেজুর পর্যন্ত পরিদৃষ্ট হল । এ ঘটনা যখন তিনি তার ভাই আমর ইবনুল আসকে জানালেন , তখন তিনি বললেন : যমযম তো আবদুল মুত্তালিবের পুণর্খনন করা কূপ । সুতরাং এই জ্যোতি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর থেকেই আবির্ভূত হবে । এ ঘটনার কারণেই সাঈদ ইবনুল আস ইসলাম গ্রহণে আগ্রগামী হতে পেরেছিলেন ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00