📄 রাসূল (সা)-কে গ্রহণের পর তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত শুভ লক্ষণসমূহ সম্পর্কে হালিমার বিবরণ
রাসূল (সা:) -কে গ্রহণের পর তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত শুভ লক্ষণসমূহ সম্পর্কে হালিমার বিবরণ
ইবন ইসহাক বলেন : হারিস ইব্ন হাতিব আল - জুমাহীর মুক্ত গোলাম আবূ জাহমের ছেলে জাহম আবূ তালিবের পৌত্র আবদুল্লাহ্ ইব্ জা'ফর ইব্ন আবূ তালিব - এর কাছ থেকে জেনে আমাকে বলেছেন যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর ধাত্রীমাতা হালিমা বিন্ত আবূ যুয়ায়ব সাদিয়া বলতেন : তিনি তার স্বামী ও দুগ্ধপোষ্য ছেলেকে সাথে নিয়ে বনূ সা'দ গোত্রের একদল মহিলার সাথে দুধ - শিশুর সন্ধানে বের হলেন । ঐ মহিলারাও নাকি একই উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল । বছরটি ছিল ঘোর অজন্মার । আমরা একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলাম । হালিমা বলেন : আমি একটা সাদা গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের সাথে একটি বয়স্ক উষ্ট্রীও ছিল । সেটি একফোঁটাও দুধ দিচ্ছিল না । আমাদের যে শিশু সন্তানটি সাথে ছিল , সে ক্ষুধার জ্বালায় এত কাঁদছিল যে , তার দরুন আমরা সবাই বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছিলাম । তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার মত দুধ আমার স্তনেও ছিল না , উষ্ট্রীর পালানেও ছিল না । তবে আমরা বৃষ্টি ও স্বাচ্ছন্দ্য লাভের আশায় প্রহর গুণছিলাম । এ অবস্থায় আমি নিজের গাধাটার পিঠে চড়ে রওয়ানা হলাম । পথ ছিল দীর্ঘ । এক নাগাড়ে চলতে চলতে আমাদের গোটা কাফেলা ক্লান্ত হয়ে পড়ল । অবশেষে আমরা মক্কায় পৌঁছে দুধ - শিশু খুঁজতে লেগে গেলাম । আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক মহিলাকেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হল । কিন্তু তিনি ইয়াতীম- -এ কথা শুনে কেউ তাঁকে নিতে রাযী হল না । কারণ প্রত্যেক ধাত্রীই শিশুর পিতার কাছ থেকে উত্তম পারিতোষিক পাওয়ার আশা করত । আমরা সবাই বলাবলি করছিলাম : পিতৃহীন শিশু ! ওর মা আর দাদা কিইবা পারিতোষিক দিতে পারবে ? এ কারণে আমরা সবাই তাঁকে নেয়া অপসন্দ করছিলাম । ইতোমধ্যে আমার সাথে আগত সকল মহিলাই একটা না একটা দুধ - শিশু পেয়ে গেল কিন্তু আমি একটিও পেলাম না । খালি হাতেই ফিরে যাব বলে স্থির করে ফেলেছিলাম । সহসা মত পাল্টে আমার স্বামীকে বললাম , আল্লাহর কসম , এতগুলো সহযাত্রীর সাথে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে যেতে আমার খুব খারাপ লাগছে । আমি ঐ ইয়াতীম শিশুটার কাছে যাবই এবং ওকেই নেব । আমার স্বামী বললেন : কোন আপত্তি নেই । নিতে পার । বলা যায় কি , হয়তো আল্লাহ্ তাঁর ভেতরেই আমাদের জন্যে কল্যাণ রেখেছেন । হালিমা বলেন : "এরপর আমি সেই ইয়াতীম শিশুর কাছে গেলাম এবং শুধু আর কোন শিশু না পাওয়ার কারণেই তাঁকে নিয়ে গেলাম । ”
**টিকাঃ**
১. হালিমার আগে রাসূল (সা:) -কে আবূ লাহাবের দাসী সুয়ায়বা দুধ খাইয়েছিল । সে রাসূল (সা:) ছাড়া তাঁর চাচা হামযাকে এবং আবদুল্লাহ্ ইবন জাহশকেও দুধ খাইয়েছে । সুয়ায়বার দুধ খাওয়ার কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) জানতেন এবং মদীনায় থাকাকালে তার সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং উপঢৌকনাদি পাঠাতেন । মক্কা বিজয়ের পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে , সুয়ায়বা , তার ছেলে মাসরূহ কিংবা অন্য কোন আত্মীয় - স্বজন বেঁচে নেই ।
২. দুধ খাওয়ানো ধাত্রীরা এ কাজের জন্য পারিশ্রমিক চাওয়া পসন্দ করত না । শুধু পারিতোষিক প্রত্যাশা করত । হালিমা বনূ সা'দ গোত্রের সবচেয়ে সম্মানিতা মহিলা ছিলেন । সম্ভবত এজন্যই আল্লাহ্ স্বীয় নবীর ধাত্রী হিসাবে তাঁকে মনোনীত করেছিলেন । ধাত্রীর স্বভাব - চরিত্র দুধ খাওয়া শিশুকে প্রভাবিত করে । কথিত আছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কখনো উভয় স্তন থেকে পান করতেন না । শুধু একটি থেকে পান করতেন । অপরটি থেকে পান করতে দিলেও করতেন না । তাঁর দুধ - ভাই - এর জন্য হয়তো ওটা রাখতেন । তিনি ছিলেন আজন্ম ন্যায়বিচারক ও সমমর্মী ।
📄 হালীমার ভাগ্য খুলে গেল
হালিমা বলেন : ইয়াতীম শিশু মুহাম্মদ (সা:) -কে নিয়ে আমি কাফেলায় ফিরে গেলাম । তাঁকে যখন কোলে নিলাম , তখন আমার স্তন দুটো দুধে ভরে উঠল এবং তা থেকে শিশু মু (সা:) পেটভরে দুধ খেলেন । তার দুধ ভাইটিও পেট ভরে খেল । তারপর দু'জনেই ঘু পড়ল । অথচ আমাদের এই সন্তানটির জ্বালায় ইতিপূর্বে আমরা ঘুমাতে পারিনি । আমার স্বামী আমাদের সেই উষ্ট্রীটির কাছে যেতেই দেখতে পেলেন , সেটির পালানও দুধে ভর্তি । তারপর তিনি প্রচুর পরিমাণে দুধ দোহন করলেন এবং আমরা দু'জনে পেটভরে দুধ খেলাম । এরপর বেশ ভালোভাবেই আমাদের রাতটা কেটে গেল ।
সকালবেলা আমার স্বামী বললেন : হালিমা , জেনে রেখ , তুমি এক মহাকল্যাণময় শিশু এনেছ । আমি বললাম : আমারও তাই মনে হয় ।
এরপর আমরা রওয়ানা দিলাম । আমি গাধার পিঠে সওয়ার হলাম । আমাদের গাধা সমগ্র কাফেলাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল । কাফেলার কারো গাধাই তার সাথে পেরে উঠল না । আমার সহযাত্রী মহিলারা বলতে লাগল : হে যুয়ায়বের কন্যা , একটু দাঁড়াও । আমাদের জন্য একটু থাম । যে গাধার পিঠে চড়ে তুমি এসেছিলে , এটা কি সেই গাধা নয় ? আমি বললাম : হ্যাঁ , সেই গাধাই তো ! তারা বলল : আল্লাহ্র কসম , এখন এর ভাবগতিই আলাদা ।
শেষ পর্যন্ত আমরা বনূ সা'দ গোত্রের বসতিতে আপন আপন গৃহে এসে পৌঁছলাম । আমাদের ঐ এলাকাটার মত খরাপীড়িত জমি তখন আর কোথাও ছিল বলে মনে হয় না । কিন্তু শিশু মুহাম্মদ (সা:) -কে নিয়ে বাড়ি পৌঁছার পর প্রতিদিন আমাদের ছাগল - ভেড়া - উট ইত্যাদি খেয়ে পেট পূর্ণ করে ও পালানভর্তি দুধ নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে লাগল । অথচ অন্যরা তাদের ছাগল - ভেড়া থেকে একফোঁটাও দুধ দোহাতে পারত না । এমনকি আমাদের গোত্রের লোকেরা তাদের রাখালদেরকে বলতে লাগল : বোকার দল , আবূ যুয়ায়বের কন্যার রাখাল যে মাঠে পশু চরায় , সেই মাঠে পশুদের চরাতে নিয়ে যেতে পারিস না ? তারপর রাখালরা আমার মেষ চরানোর মাঠে নিয়ে তাদের মেষ চরাতে লাগল । কিন্তু তবুও তাদের মেষপাল ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরে আসতে লাগল । অথচ আমার মেষগুলো ফিরে আসতো ভরা পেট ও দুধে টইটুম্বুর পালান নিয়ে । এভাবে ক্রমেই আমার সংসার প্রাচুর্য ও সুখ - সমৃদ্ধিতে ভরে উঠতে লাগল । এ অবস্থার ভেতর দিয়েই দু'বছর কেটে গেল এবং আমি মুহাম্মদ (সা:) -এর দুধ ছাড়িয়ে দিলাম । অন্যান্য সমবয়সী শিশুদের চেয়ে দ্রুতগতিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন । দু'বছর হতেই তিনি বেশ চটপটে ও নাদুস - নুদুস হয়ে উঠলেন ।
: এই পর্যায়ে আমি তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম , যদিও আমরা তাঁকে আরো কিছুকাল রাখতে আগ্রহী ছিলাম । কারণ তাঁর আসার পর থেকে আমাদের কপাল খুলে গিয়েছিল এবং বিপুল সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল । তাঁর মাকে আমি বললাম আপনি যদি এই ছেলেকে আরো একটু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া পর্যন্ত আমার কাছে থাকতে দিতেন , তাহলে ভালো হতো । আমার আশংকা হয় যে , সে মক্কার রোগ - ব্যাধি ও মহামারীতে আক্রান্ত হতে পারে । অনেক বুঝিয়ে - সুঝিয়ে বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁকে আমাদের সাথে ফেরত পাঠালেন ।
📄 রাসূলের বক্ষ বিদারণকারী দুই ফেরেশতার বিবরণ
রাসূলের বক্ষ বিদারণকারী দুই ফেরেশতার বিবরণ
আমরা তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফেরার একমাস পরের ঘটনা । একদিন তিনি তাঁর দুধ - ভাই - এর সাথে আমাদের বাড়ির পেছনের মাঠে মেষশাবক চরাচ্ছিলেন । হঠাৎ তাঁর বড় ভাই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ছুটে এলো এবং আমাকে ও তার পিতাকে বলল : আমাদের ঐ কুরায়শী ভাইটাকে সাদা কাপড় পরা দুটো লোক এসে ধরে শুইয়ে দিয়ে পেট চিরে ফেলেছে এবং পেটের সবকিছু বের করে নাড়াচাড়া করছে ।
📄 হালিমা রাসূল (সা)-কে নিয়ে তাঁর জননীর কাছে গেলেন
হালীমা রাসূল (সা:) -কে নিয়ে তাঁর জননীর কাছে গেলেন
হালিমা ( রা ) বলেন , আমার স্বামী বললেন : আমার মনে হয় , এই ছেলের ওপর কোন কিছুর আছর হয়েছে । সুতরাং কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ' পৌঁছে দাও ।
যথার্থই আমরা তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম । তাঁর মা বললেন : ‘ ওহে বোন , তুমি তো ওকে নিজের কাছে রাখতে খুবই উদ্গ্রীব ছিলে । হঠাৎ কি হয়েছে যে , ওকে নিয়ে এলে : আমি বললাম : “ আল্লাহ্ আমার ছেলেকে বড় করেছেন এবং আমার যা দায়িত্ব ছিল , তা পালন করেছি । আমি তাঁর ব্যাপারে দুর্ঘটনার আশংকা করছি । তাই আপনার ছেলেকে ভালোয় ভালোয় আপনার হাতে তুলে দিলাম । ” আমিনা বললেন : তুমি যা বলছ তা প্রকৃত ঘটনা নয় ৷ আসল ব্যাপারটা কি , আমাকে সত্য করে বল । এভাবে পুরো ঘটনা খুলে না বলা পর্যন্ত তিনি আমাকে ছাড়লেন না । ঘটনা শুনে আমিনা বললেন : তুমি কি মনে কর ওকে ভূতে ধরেছে ? আমি বললাম , হ্যাঁ । তিনি বললেন : কখনো তা হতে পারে না । আল্লাহ্র কসম , শয়তান ওর ধারে - কাছেও ঘেঁষতে পারে না । আমার ছেলে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী । আমি কি তোমাকে তাঁর শানের কথা বলব : আমি বললাম : হ্যাঁ , বলুন । তিনি বললেন : সে গর্ভে থাকা অবস্থায় · আমি স্বপ্নে দেখি যে , আমার দেহের ভেতর থেকে একটা জ্যোতি বেরিয়ে এলো এবং তার জ্যোতিতে সিরীয় ভূখণ্ডের বুসরার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে গেল । এরপর সে গর্ভে বড় হতে লাগল । আল্লাহ্র বসম , এত হালকা ও সহজ গর্ভধারণ আমি আর কখনো দেখিনি । সে যখন ভূমিষ্ঠ হল , তখন মাটিতে দুহাত রাখা ও আকাশের দিকে মাথা তোলা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হল । তুমি ওকে রেখে নির্দ্বিধায় চলে যেতে পার