📄 আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব
আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব
হুবালের কাছে সাতটি তীর থাকত । প্রত্যেক তীরেই এক - একটা কথা লিখিত ছিল । একটা তীরে লেখা ছিল ' রক্তপণ " । রক্তপণ কার উপর বর্তায় ( অর্থাৎ হত্যাকারী কে ) তা নিয়ে যখন তাদের ভেতর মতবিরোধ হত , তখন একে একে সাতটি তীর টানা হত । যদি ' রক্তপণ ' লেখা তীর কারো নামে বেরুত , তাহলে যার নামে বেরুত তাকেই রক্তপণ দিতে হত । একটা তীরে ' হ্যাঁ ' লেখা ছিল । যখন কোন কাজের ইচ্ছা পোষণ করা হত , তখন একই নিয়মে তীরগুলো টানা হত । যদি ঐ ‘ হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঈপ্সিত কাজটি করা হত । আর একটি তীরে লেখা ছিল ' না ' । কোন কাজের ইচ্ছা নিয়ে তীরগুলো টানা হত । যদি ' না ' লেখা তীর বেরিয়ে আসত , তাহলে আর সে কাজ তারা করত না । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' বা ‘ তোমাদের মধ্য থেকে ’ । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ সংযুক্ত ’ আর একটাতে ‘ তোমাদের বহির্ভূত ' এবং আর একটাতে ' পানি ' । কূপ খনন করতে হলে তারা এ তীরগুলো টানত এবং তার মধ্যে ' পানি ' লেখা তীরটিও থাকত । ফলাফল যা বেরুত , সেই অনুসারে কাজ করা হত ।
সেকালে আরবরা যখন কোন বালকের খাতনা করাতে , কোন কন্যার বিয়ে দিতে কিংবা কোন মৃতকে দাফন করতে চাইত , অথবা কারো জন্মসূত্র নিয়ে সন্দেহ দেখা দিত , তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হুবাল নামক দেবমূর্তির নিকট হাযির করত এবং সেই সাথে একশ দিরহাম , একটা বলির উটও নিয়ে যেত । অর্থ ও উট তীর টানা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিত । তারপর যার ব্যাপারে নিষ্পত্তি কাম্য , তাকে মূর্তির সামনে হাযির করে বলত : “ হে আমাদের দেবতা ! এ ব্যক্তি অমুকের সন্তান অমুক , তার ব্যাপারে আমরা তোমার নিকট থেকে অমুক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চাইছি । অতএব তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানিয়ে দাও । ” তারপর তীর টানার কাজে নিয়োজিত লোকটিকে তারা ভীর টানতে বলত । যদি ' তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে তারা বুঝত যে , সংশ্লিষ্ট শিশুটি বৈধ সন্তান । আর যদি ' তোমাদের বহির্ভূত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মিত্র বলে গণ্য হত । আর যদি ‘ সংযুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মধ্যে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকত , তার বংশ মর্যাদা বা মৈত্রী ইত্যদি অনির্ধারিতই থাকত । আর যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত অন্য কোন কাজের প্রশ্নে ' হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ কাজ নিঃসন্দেহে সম্পন্ন করত । কিন্তু ' না ' লেখা তীর বেরুলে ঐ বছরের জন্যে কাজটি স্থগিত রাখত । পরবর্তী বছর ঐ কাজটি সম্পর্কে পুনরায় একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করত এবং সমাধান চাইত । এভাবে তীরের ফায়সালাই ছিল তাদের কাছে সকল ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা । '
**টিকাঃ**
১ . কেউ কেউ বলেন , আরবরা যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করত , তখন তিনটি তীর টানত । একটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে কাজটি করতে আদেশ দিয়েছেন । ” অপরটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন । ” আর তৃতীয়টায় লেখা থাকত , “ সিদ্ধান্ত স্থগিত ” । আদেশসূচক তীর বের হলে কাজটির বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া , নিষেধসূচক তীর বের হলে কাজটি পরিত্যাগ করা এবং স্থগিতাদেশসূচক তীর বের হলে কাজটি পুনরায় স্থগিত রাখা হত । সম্ভবত সাত তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এবং তিন তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এ উভয় পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করত ।
📄 আবদুল মুত্তালিব এবং তার সন্তানগণ তীর রক্ষকের সামনে
আবদুল মুত্তালিব এবং তাঁর সন্তানগণ তীর রক্ষকের সামনে
আবদুল মুত্তালিব তাঁর রক্ষককে বললেন , “ আমার এই সন্তানদের ব্যাপারে তাঁর টেনে দেখুন তো ” । তিনি তাকে নিজের মানতের কথাও জানালেন । তারপর প্রত্যেক পুত্র নিজের নাম লেখা তীর তার কাছে সমর্পণ করলেন । আবদুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে । * আবদুল্লাহ্ , যুবায়র ও আবূ তালিব- এই তিনজন ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনত আমর ইবন আইব ইবন আবদ ইবন ইমরান ইব্ন মাখযূম ইবন ইয়াকথা ইন মুররা ইবন কা'ব ইবন লুআই ইব্ন গালিব ইবন ফিহরের গর্ভজাত ছেলে ।
ইনে হিশাম বলেন : আইয ইব্ন ইমরান ইব্ন মাখযূম ।
**টিকাঃ**
১. আল্লামা আলূসী ( র ) নিজ গ্রন্থ ' বুলূগুল আরাব ফী আহওয়ালিল আরাব ' নামক ইতিহাস গ্রন্থে তীরের দ্বারা ভাগ্য গণনা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন । উৎসাহী পাঠককে ঐ গ্রন্থ পড়ে দেখতে অনুরোধ করছি ।
স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে , এখানে আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক সন্তানকে কুরবানী দেয়ার প্রতিজ্ঞা করার সময় আবদুল্লাহ্ যে তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে ছিলেন , সে কথাই বুঝানো হয়েছে । অথবা আবদুল্লাহ্ নিজের সহোদর ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তাই হয়ত বর্ণনার সারকথা । কেননা হযরত হামযা ( রা ) যে আবদুল্লাহ্র ছোট এবং আব্বাস ( রা ) হামযা ( রা ) -এর ছোট ছিলেন তা সুবিদিত ব্যাপার । অথচ আব্বাস ( রা ) নিজেই বলেছেন আমার বেশ মনে আছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জন্মের সময় আমার বয়স প্রায় তিন বছর ছিল । তখন তাঁকে আমার কাছে আনা হলে তার দিকে তাকালাম । আর মহিলারা রসিকতা করে আমাকে বলতে লাগল , এই যে তোমার ভাই , একে চুমু খাও । ” আমি চুমু খেলাম । এ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে , আবদুল্লাহ্ আবদুল মুত্তালিবের সবচেয়ে ছোট ছেলে নন । ( রওযুল উনুফ দ্রষ্টব্য )
৩. ইবন হিশাম ( র ) -এর মতই বিশুদ্ধতম , কেননা হয়ত মানত পূরণের সময় আবদুল্লাহই কনিষ্ঠ ছিলেন । ( রওযুল উনুফ দ্রষ্টব্য )
📄 আবদুল্লাহ্র নামে তীর বের হওয়া এবং তার পিতা কর্তৃক তাকে যবেহ করতে ইচ্ছা করা ও কুরায়শদের বাধাদান
আবদুল্লাহর নামে তীর বের হওয়া এবং তাঁর পিতা কর্তৃক তাঁকে যবেহ করতে ইচ্ছা করা ও কুরায়শদের বাধাদান
ইবন ইসহাক ( র ) বলেন বহুল প্রচলিত ধারণা যে , আবদুল্লাহ্ আবদুল মুত্তালিবের সকলের চেয়ে বেশি স্নেহভাজন সন্তান ছিলেন । তাই তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করছিলেন যে , তীর আবদুল্লাহকে পাশ কাটিয়ে যায় কিনা । পাশ কাটিয়ে গেলেই তো আবদুল্লাহ্ বেঁচে যাবেন , যিনি হবেন আল্লাহ্র রাসূল (সা:) -এর পিতা । আর তা না হলে আবদুল্লাহকে যবেহ করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে ।
তীর টানা লোকটি যখন তীর টানতে উদ্যত হল , তখন আবুল মুত্তালিব হুবাল দেবতার কাছে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন । তারপর তীর টানা হলে দেখা গেল , তীর আবদুল্লাহ্র নামেই বেরিয়েছে । ফলে আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ এক হাতে আবদুল্লাহকে ও অন্য হাতে বড় একটা ছোরা নিয়ে তাঁকে যবেহ করার উদ্দেশ্যে ইসাফ ও নায়েলা নামক দেব - দেবীর মূর্তির পাশে নিয়ে গেলেন । নিকটেই আসর জমিয়ে বসা কুরায়শ নেতারা তা দেখে উঠে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল , “ আবদুল মুত্তালিব , আপনি কী করতে চাইছেন ? ” তিনি বললেন , একে যবেহ করব । তখন কুরায়শ নেতৃবৃন্দ ও তাঁর অন্যান্য সন্তানগণ একযোগে বলে উঠলেন : মহান আল্লাহ্র শপথ ! উপযুক্ত কারণ ব্যতীত কিছুতেই যবেহ্ করবেন না । আর যদি আপনি তা করেন , তবে যুগ যুগ ধরে যবেহ চলতে থাকবে । লোকেরা নিজ নিজ সন্তানকে এনে বলি দিতে থাকবে । এভাবে একে একে মানব বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে । আবদুল্লাহ্র মামাদের গোত্রীয় জনৈক মুগীরা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইবন আমর ইবন মাখযূম ইবন ইয়াকাযাহ্ বললেন : একেবারে নিরুপায় না হলে এমন কাজ করো না । যদি ওকে অব্যাহতি দিতে মুক্তিপণের প্রয়োজন হয় , তাহলে আমরা মুক্তিপণ দিয়ে দেব । পক্ষান্তরে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ ও আবদুল মুত্তালিবের ছেলেগণ বললেন , ওকে যবেহ করবেন না ; বরং ওকে নিয়ে হিজাযে চলে যান । সেখানে এক মহিলা জ্যোতিষী রয়েছে । তার অধীনে জিন আছে । তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিন , কাজটা ঠিক হবে কিনা । এরপর আমরা বাধা দেব না । আপনি স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছে তাই করবেন । মহিলা যদি যবেহ্ করতে বলে , যবেহ করবেন । আর যদি অন্য কোন উপায় বাতলে দেয় , তবে তা মেনে নেবেন ।
📄 হিজাযের মহিলা জ্যোতিষী এবং আবদুল মুত্তালিবের প্রতি তার পরামর্শ
হিজাযের মহিলা জ্যোতিষী এবং আবদুল মুত্তালিবের প্রতি তার পরামর্শ
আবদুল মুত্তালিব কুরায়শ নেতাদের এই উপদেশই মেনে নিলেন এবং সহযোগীদের নিয়ে হিজায অভিমুখে রওয়ানা দিলেন । মদীনা শরীফের কাছে খায়বরে গিয়ে তারা সেই মহিলার সাক্ষাত পেলেন । আবদুল মুত্তালib মহিলাকে তাঁর ও তাঁর ছেলের সকল বৃত্তান্ত ও তার সম্পর্কে নিজের মানত খুলে বললেন । মহিলা বলল : তোমরা আজ চলে যাও । আমার অনুগত জিনটা আসুক । তার কাছ থেকে আমি জেনে নিই । সবাই মহিলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলেন । বিদায় নিয়ে বের হওয়ামাত্রই আবদুল মুত্তালিব আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করলেন । পরদিন সকালে আবার সবাই মহিলার কাছে উপস্থিত হল । মহিলা বলল : আমি প্রয়োজনীয় তথ্য অবগত হয়েছি । তোমাদের সমাজে মুক্তিপণ কি হারে ধার্য আছে ? তারা জবাব দিলেন , দশটা উট । বাস্তবিকপক্ষে মুক্তি পণের হার এ রকমই ছিল । মহিলা বলল : যাও , তোমরা স্বদেশে ফিরে যাও । তারপর তোমাদের সংশ্লিষ্ট লোকটিকে মূর্তির নিকট হাযির কর ও দশটা উট বলি দাও । তারপর উট ও তোমাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণের জন্য তীর টান । যদি তোমাদের সংশ্লিষ্ট লোকটির নামে তীর বেরোয় , তাহলে আরো উট দাও , যতক্ষণ না তোমাদের প্রতিপালক খুশি হন । আর যদি উটের নামে বেরোয় , তা হলে সে উটগুলো তার পরিবর্তে যবেহ্ কর । তবে বুঝতে হবে তোমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাদের সাথী অব্যাহতি পেয়েছে ।
**টিকাঃ**
১ . কেউ কেউ বলেন , এই মহিলার নাম ছিল কুতবা । তবে ইব্ন ইসহাক বলেন : তার নাম সাজাহ্ ।