📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যমযমের ফযীলত

📄 যমযমের ফযীলত


যমযমের ফযীলত
ইবন ইসহাক বলেন : তারপর যমযম কূপের খ্যাতি ও মর্যাদা অন্য সকল কূপকে ছাড়িয়ে যায় । হাজীরা তার থেকেই পানি পান করতে থাকেন এবং অন্য লোকেরাও এর প্রতি আকৃষ্ট হয় । কেননা তা ছিল মসজিদে হারামের মধ্যে এবং সে পানি ছিল সবচেয়ে উত্তম । এ কূপটি ছিল ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম ( আ ) -এর কূপ । বনূ আবদে মানাফ এ কূপটি নিয়ে কুরায়শ তথা গোটা আরব জাতির উপর গর্ব করত ।
যেহেতু বনূ আবদে মানাফ একই বংশের ছিল , কাজেই তাদের যে কোন শাখার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব , অন্যান্য শাখাগুলোর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় ছিল । সে জন্যই মুসাফির ইব্‌ন আবূ আম্র ইবন উমায়্যা ইব্‌ন আবদে শাম্‌স ইব্‌ন আবদে মানাফ কুরায়শ ও তাদের তত্ত্বাবধানে সিকায়া ও রিফাদা ( যমযম পান করান ও হাজীদের অতিথিপরায়ণতা ) -এর দায়িত্ব এবং তাদের হাতে যমযম প্রকাশ লাভের কারণে গর্ব করে বলেন :
“ আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদা লাভ করেছি , আর এ মর্যাদা আমাদের কাছে এসে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে ।
“ আমরা কি হাজীদের পানি পান করাই নি ? আর মোটা - তাজা অনেক দুগ্ধবতী উষ্ট্রী যবেহ করিনি ?
“ মৃত্যুর রাজত্বে তুমি আমাদের কঠোর এবং অন্যান্যদের আশ্রয়দাতা হিসাবে পাবে ।
“ আমরা যদি ধ্বংসও হয়ে যাই , এতে বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই । কেননা আমরা তো আমাদের জীবনের মালিক নই । তাছাড়া কেউ তো আর চিরজীবী নয় !
“ আমাদের পূর্বসূরীদের তত্ত্বাবধানে ছিল যমযম , যে আমাদের সাথে হিংসা করবে , আমরা তাদের চোখ ফুঁড়ে দেব । ”
ইবন ইসহাক বলেন : বনূ আদী ইব্‌ন কাপব ইবন লুআই - এর জনৈক ব্যক্তি হুযায়ফা ইবন গানিম বলেন :
“ বনূ ফি - এর সর্দার আবদে মানাফ ও হাশিম পানি পান করাতেন এবং রুটি গুঁড়া করে খাওয়াতেন ।
“ তিনি মাকামে ইবরাহীমের কাছে পাথর দিয়ে যমযম নির্মাণ করেন । তার এ কূপ প্রত্যেক গর্বিত ব্যক্তির উপর গর্বের অধিকার রাখে । * .
ইবন হিশাম বলেন ; এ কবিতাগুলোতে হুযায়ফা ইব্‌ন গানিম আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন হাশিমের প্রশংসা করেন । এ পংক্তি দুটো তার একটি কাসীদার অংশবিশেষ , যা আমরা যথাস্থানে ইনশা - আল্লাহ্ উল্লেখ করব ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ

📄 আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ


আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ
ইবন ইসহাক ( র ) বলেন : প্রকৃত ব্যাপার তো আল্লাহ্ই ভালো জানেন , তবে এই মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে যে , আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ খননের উদ্যোগ নিতে গিয়ে যখন কুরায়শ বংশের লোকদের পক্ষ থেকে বাধা পেয়েছিলেন , তখন মানত করেছিলেন যে , যদি তার দশটি সন্তান জন্মে এবং তারা তাঁর জীবদ্দশায় বয়োপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম হয় , তাহলে তিনি একটি সন্তানকে আল্লাহ্র নামে কা'বা শরীফের পাশে কুরবানী করবেন । তারপর তাঁর সন্তানের সংখ্যা যখন দশটি পূর্ণ হলো এবং তিনি নিশ্চিত হলেন যে , তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারবে , তখন তিনি তাদের সবাইকে ডেকে একত্র করলেন এবং তাদেরকে নিজের মানতের কথা জানালেন । তারপর তাদেরকে ঐ মানত পূরণের আহবান জানালেন । সন্তানগণ সবাই তাতে আনুগত্যের সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন যে , আমাদের কিভাবে কি করতে হবে ? তিনি বললেন : “ তোমরা প্রত্যেকে একটা করে তীর নেবে । তারপর তাতে নিজের নাম লিখে আমার কাছে নিয়ে আসবে । ” সকলে তাই করলেন এবং একটা করে তীর হাতে নিয়ে তাঁর কাছে এলেন । আবদুল মুত্তালিব তাদেরকে সাথে নিয়ে হুবাল মূর্তির নিকট গেলেন । সে সময় হুবাল কা'বার মধ্যবর্তী একটি কূপের কাছে ছিল । কাবাঘরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যাবতীয় বস্তু ঐ কূপে জমা হত ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব

📄 আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব


আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব
হুবালের কাছে সাতটি তীর থাকত । প্রত্যেক তীরেই এক - একটা কথা লিখিত ছিল । একটা তীরে লেখা ছিল ' রক্তপণ " । রক্তপণ কার উপর বর্তায় ( অর্থাৎ হত্যাকারী কে ) তা নিয়ে যখন তাদের ভেতর মতবিরোধ হত , তখন একে একে সাতটি তীর টানা হত । যদি ' রক্তপণ ' লেখা তীর কারো নামে বেরুত , তাহলে যার নামে বেরুত তাকেই রক্তপণ দিতে হত । একটা তীরে ' হ্যাঁ ' লেখা ছিল । যখন কোন কাজের ইচ্ছা পোষণ করা হত , তখন একই নিয়মে তীরগুলো টানা হত । যদি ঐ ‘ হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঈপ্সিত কাজটি করা হত । আর একটি তীরে লেখা ছিল ' না ' । কোন কাজের ইচ্ছা নিয়ে তীরগুলো টানা হত । যদি ' না ' লেখা তীর বেরিয়ে আসত , তাহলে আর সে কাজ তারা করত না । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' বা ‘ তোমাদের মধ্য থেকে ’ । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ সংযুক্ত ’ আর একটাতে ‘ তোমাদের বহির্ভূত ' এবং আর একটাতে ' পানি ' । কূপ খনন করতে হলে তারা এ তীরগুলো টানত এবং তার মধ্যে ' পানি ' লেখা তীরটিও থাকত । ফলাফল যা বেরুত , সেই অনুসারে কাজ করা হত ।
সেকালে আরবরা যখন কোন বালকের খাতনা করাতে , কোন কন্যার বিয়ে দিতে কিংবা কোন মৃতকে দাফন করতে চাইত , অথবা কারো জন্মসূত্র নিয়ে সন্দেহ দেখা দিত , তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হুবাল নামক দেবমূর্তির নিকট হাযির করত এবং সেই সাথে একশ দিরহাম , একটা বলির উটও নিয়ে যেত । অর্থ ও উট তীর টানা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিত । তারপর যার ব্যাপারে নিষ্পত্তি কাম্য , তাকে মূর্তির সামনে হাযির করে বলত : “ হে আমাদের দেবতা ! এ ব্যক্তি অমুকের সন্তান অমুক , তার ব্যাপারে আমরা তোমার নিকট থেকে অমুক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চাইছি । অতএব তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানিয়ে দাও । ” তারপর তীর টানার কাজে নিয়োজিত লোকটিকে তারা ভীর টানতে বলত । যদি ' তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে তারা বুঝত যে , সংশ্লিষ্ট শিশুটি বৈধ সন্তান । আর যদি ' তোমাদের বহির্ভূত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মিত্র বলে গণ্য হত । আর যদি ‘ সংযুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মধ্যে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকত , তার বংশ মর্যাদা বা মৈত্রী ইত্যদি অনির্ধারিতই থাকত । আর যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত অন্য কোন কাজের প্রশ্নে ' হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ কাজ নিঃসন্দেহে সম্পন্ন করত । কিন্তু ' না ' লেখা তীর বেরুলে ঐ বছরের জন্যে কাজটি স্থগিত রাখত । পরবর্তী বছর ঐ কাজটি সম্পর্কে পুনরায় একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করত এবং সমাধান চাইত । এভাবে তীরের ফায়সালাই ছিল তাদের কাছে সকল ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা । '

**টিকাঃ**
১ . কেউ কেউ বলেন , আরবরা যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করত , তখন তিনটি তীর টানত । একটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে কাজটি করতে আদেশ দিয়েছেন । ” অপরটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন । ” আর তৃতীয়টায় লেখা থাকত , “ সিদ্ধান্ত স্থগিত ” । আদেশসূচক তীর বের হলে কাজটির বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া , নিষেধসূচক তীর বের হলে কাজটি পরিত্যাগ করা এবং স্থগিতাদেশসূচক তীর বের হলে কাজটি পুনরায় স্থগিত রাখা হত । সম্ভবত সাত তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এবং তিন তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এ উভয় পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করত ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবদুল মুত্তালিব এবং তার সন্তানগণ তীর রক্ষকের সামনে

📄 আবদুল মুত্তালিব এবং তার সন্তানগণ তীর রক্ষকের সামনে


আবদুল মুত্তালিব এবং তাঁর সন্তানগণ তীর রক্ষকের সামনে
আবদুল মুত্তালিব তাঁর রক্ষককে বললেন , “ আমার এই সন্তানদের ব্যাপারে তাঁর টেনে দেখুন তো ” । তিনি তাকে নিজের মানতের কথাও জানালেন । তারপর প্রত্যেক পুত্র নিজের নাম লেখা তীর তার কাছে সমর্পণ করলেন । আবদুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে । * আবদুল্লাহ্ , যুবায়র ও আবূ তালিব- এই তিনজন ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনত আমর ইবন আইব ইবন আবদ ইবন ইমরান ইব্‌ন মাখযূম ইবন ইয়াকথা ইন মুররা ইবন কা'ব ইবন লুআই ইব্‌ন গালিব ইবন ফিহরের গর্ভজাত ছেলে ।
ইনে হিশাম বলেন : আইয ইব্‌ন ইমরান ইব্‌ন মাখযূম ।

**টিকাঃ**
১. আল্লামা আলূসী ( র ) নিজ গ্রন্থ ' বুলূগুল আরাব ফী আহওয়ালিল আরাব ' নামক ইতিহাস গ্রন্থে তীরের দ্বারা ভাগ্য গণনা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন । উৎসাহী পাঠককে ঐ গ্রন্থ পড়ে দেখতে অনুরোধ করছি ।
স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে , এখানে আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক সন্তানকে কুরবানী দেয়ার প্রতিজ্ঞা করার সময় আবদুল্লাহ্ যে তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে ছিলেন , সে কথাই বুঝানো হয়েছে । অথবা আবদুল্লাহ্ নিজের সহোদর ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তাই হয়ত বর্ণনার সারকথা । কেননা হযরত হামযা ( রা ) যে আবদুল্লাহ্র ছোট এবং আব্বাস ( রা ) হামযা ( রা ) -এর ছোট ছিলেন তা সুবিদিত ব্যাপার । অথচ আব্বাস ( রা ) নিজেই বলেছেন আমার বেশ মনে আছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জন্মের সময় আমার বয়স প্রায় তিন বছর ছিল । তখন তাঁকে আমার কাছে আনা হলে তার দিকে তাকালাম । আর মহিলারা রসিকতা করে আমাকে বলতে লাগল , এই যে তোমার ভাই , একে চুমু খাও । ” আমি চুমু খেলাম । এ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে , আবদুল্লাহ্ আবদুল মুত্তালিবের সবচেয়ে ছোট ছেলে নন । ( রওযুল উনুফ দ্রষ্টব্য )
৩. ইবন হিশাম ( র ) -এর মতই বিশুদ্ধতম , কেননা হয়ত মানত পূরণের সময় আবদুল্লাহই কনিষ্ঠ ছিলেন । ( রওযুল উনুফ দ্রষ্টব্য )

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00