📄 হাফর কূপ এবং তার খননকারী
হাফর কৃপ এবং তার খননকারী
উমাইয়া ইব্ন আবদে শাম্স নিজের জন্য ' হাফর ' নামে একটি কূপ খনন করেছিলেন ।
বনু আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ‘ সুকাইয়া ' ভিন্নমতে শাফিকা নামে একটি কূপ খনন করিয়েছিলেন । কূপটি বনূ আসাদের কূপ নামে পরিচিত ছিল । বনূ আবদুদ্দার ‘ উম্মে আহরাদ ’ নামে একটি কূপ খনন করেছিল । বনূ জুমাহ ‘ সুম্বুলাহ ' নামে একটি কূপ খনন করেছিল যা খালাফ ইবন ওয়াহাবের কূপ নামে পরিচিত ছিল । বনূ সাহম ' গাম্রা ' নামে একটি কূপ খনন করেছিল , যা বনূ সাহমের কূপ নামে পরিচিত ছিল ।
মক্কার বাইরেও কয়েকটি কূপ ছিল । এ কূপগুলো কুরায়শদের অন্যতম আদি পুরুষ মুররা ইবন কা'ব এবং কিলাব ইব্ন মুররা এরও পূর্ব থেকে ছিল । তন্মধ্যে একটি কূপের নাম ছিল ‘ রুম্মা ' । কূপটি মুররাহ ইব্ন কা'ব ইবন লুআই - এর কূপ নামে পরিচিত ছিল । বনু কিলার ইন মুররা - এর ' খুম্মা ' নামে একটি কূপ ছিল । ' আল - হাফ্রা ' নামেরও একটি কূপ ছিল ।
বনূ আদী ইব্ন কা'ব ইবন লুআই - এর জনৈক ব্যক্তি হুযায়ফা ইব্ন গানিম ( ইবনে হিশামের মতে তার নাম হল আবূ উবায় জাহম ইব্ন হুযায়ফা ) এ কবিতা বলেন :
"আমরা ' খুম ' নামক কূপ থেকে অথবা ' হা ' নামের কূপ থেকে পানি পানি করি । শত শত বছর পূর্ব থেকেই আমাদের অন্য কোন কূপের প্রয়োজন ছিল না । ”
📄 যমযমের ফযীলত
যমযমের ফযীলত
ইবন ইসহাক বলেন : তারপর যমযম কূপের খ্যাতি ও মর্যাদা অন্য সকল কূপকে ছাড়িয়ে যায় । হাজীরা তার থেকেই পানি পান করতে থাকেন এবং অন্য লোকেরাও এর প্রতি আকৃষ্ট হয় । কেননা তা ছিল মসজিদে হারামের মধ্যে এবং সে পানি ছিল সবচেয়ে উত্তম । এ কূপটি ছিল ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম ( আ ) -এর কূপ । বনূ আবদে মানাফ এ কূপটি নিয়ে কুরায়শ তথা গোটা আরব জাতির উপর গর্ব করত ।
যেহেতু বনূ আবদে মানাফ একই বংশের ছিল , কাজেই তাদের যে কোন শাখার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব , অন্যান্য শাখাগুলোর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় ছিল । সে জন্যই মুসাফির ইব্ন আবূ আম্র ইবন উমায়্যা ইব্ন আবদে শাম্স ইব্ন আবদে মানাফ কুরায়শ ও তাদের তত্ত্বাবধানে সিকায়া ও রিফাদা ( যমযম পান করান ও হাজীদের অতিথিপরায়ণতা ) -এর দায়িত্ব এবং তাদের হাতে যমযম প্রকাশ লাভের কারণে গর্ব করে বলেন :
“ আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদা লাভ করেছি , আর এ মর্যাদা আমাদের কাছে এসে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে ।
“ আমরা কি হাজীদের পানি পান করাই নি ? আর মোটা - তাজা অনেক দুগ্ধবতী উষ্ট্রী যবেহ করিনি ?
“ মৃত্যুর রাজত্বে তুমি আমাদের কঠোর এবং অন্যান্যদের আশ্রয়দাতা হিসাবে পাবে ।
“ আমরা যদি ধ্বংসও হয়ে যাই , এতে বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই । কেননা আমরা তো আমাদের জীবনের মালিক নই । তাছাড়া কেউ তো আর চিরজীবী নয় !
“ আমাদের পূর্বসূরীদের তত্ত্বাবধানে ছিল যমযম , যে আমাদের সাথে হিংসা করবে , আমরা তাদের চোখ ফুঁড়ে দেব । ”
ইবন ইসহাক বলেন : বনূ আদী ইব্ন কাপব ইবন লুআই - এর জনৈক ব্যক্তি হুযায়ফা ইবন গানিম বলেন :
“ বনূ ফি - এর সর্দার আবদে মানাফ ও হাশিম পানি পান করাতেন এবং রুটি গুঁড়া করে খাওয়াতেন ।
“ তিনি মাকামে ইবরাহীমের কাছে পাথর দিয়ে যমযম নির্মাণ করেন । তার এ কূপ প্রত্যেক গর্বিত ব্যক্তির উপর গর্বের অধিকার রাখে । * .
ইবন হিশাম বলেন ; এ কবিতাগুলোতে হুযায়ফা ইব্ন গানিম আবদুল মুত্তালিব ইব্ন হাশিমের প্রশংসা করেন । এ পংক্তি দুটো তার একটি কাসীদার অংশবিশেষ , যা আমরা যথাস্থানে ইনশা - আল্লাহ্ উল্লেখ করব ।
📄 আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ
আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ
ইবন ইসহাক ( র ) বলেন : প্রকৃত ব্যাপার তো আল্লাহ্ই ভালো জানেন , তবে এই মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে যে , আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ খননের উদ্যোগ নিতে গিয়ে যখন কুরায়শ বংশের লোকদের পক্ষ থেকে বাধা পেয়েছিলেন , তখন মানত করেছিলেন যে , যদি তার দশটি সন্তান জন্মে এবং তারা তাঁর জীবদ্দশায় বয়োপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম হয় , তাহলে তিনি একটি সন্তানকে আল্লাহ্র নামে কা'বা শরীফের পাশে কুরবানী করবেন । তারপর তাঁর সন্তানের সংখ্যা যখন দশটি পূর্ণ হলো এবং তিনি নিশ্চিত হলেন যে , তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারবে , তখন তিনি তাদের সবাইকে ডেকে একত্র করলেন এবং তাদেরকে নিজের মানতের কথা জানালেন । তারপর তাদেরকে ঐ মানত পূরণের আহবান জানালেন । সন্তানগণ সবাই তাতে আনুগত্যের সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন যে , আমাদের কিভাবে কি করতে হবে ? তিনি বললেন : “ তোমরা প্রত্যেকে একটা করে তীর নেবে । তারপর তাতে নিজের নাম লিখে আমার কাছে নিয়ে আসবে । ” সকলে তাই করলেন এবং একটা করে তীর হাতে নিয়ে তাঁর কাছে এলেন । আবদুল মুত্তালিব তাদেরকে সাথে নিয়ে হুবাল মূর্তির নিকট গেলেন । সে সময় হুবাল কা'বার মধ্যবর্তী একটি কূপের কাছে ছিল । কাবাঘরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যাবতীয় বস্তু ঐ কূপে জমা হত ।
📄 আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব
আরবদের নিকট লটারীর তীরের গুরুত্ব
হুবালের কাছে সাতটি তীর থাকত । প্রত্যেক তীরেই এক - একটা কথা লিখিত ছিল । একটা তীরে লেখা ছিল ' রক্তপণ " । রক্তপণ কার উপর বর্তায় ( অর্থাৎ হত্যাকারী কে ) তা নিয়ে যখন তাদের ভেতর মতবিরোধ হত , তখন একে একে সাতটি তীর টানা হত । যদি ' রক্তপণ ' লেখা তীর কারো নামে বেরুত , তাহলে যার নামে বেরুত তাকেই রক্তপণ দিতে হত । একটা তীরে ' হ্যাঁ ' লেখা ছিল । যখন কোন কাজের ইচ্ছা পোষণ করা হত , তখন একই নিয়মে তীরগুলো টানা হত । যদি ঐ ‘ হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঈপ্সিত কাজটি করা হত । আর একটি তীরে লেখা ছিল ' না ' । কোন কাজের ইচ্ছা নিয়ে তীরগুলো টানা হত । যদি ' না ' লেখা তীর বেরিয়ে আসত , তাহলে আর সে কাজ তারা করত না । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' বা ‘ তোমাদের মধ্য থেকে ’ । আর একটা তীরে লেখা ছিল ‘ সংযুক্ত ’ আর একটাতে ‘ তোমাদের বহির্ভূত ' এবং আর একটাতে ' পানি ' । কূপ খনন করতে হলে তারা এ তীরগুলো টানত এবং তার মধ্যে ' পানি ' লেখা তীরটিও থাকত । ফলাফল যা বেরুত , সেই অনুসারে কাজ করা হত ।
সেকালে আরবরা যখন কোন বালকের খাতনা করাতে , কোন কন্যার বিয়ে দিতে কিংবা কোন মৃতকে দাফন করতে চাইত , অথবা কারো জন্মসূত্র নিয়ে সন্দেহ দেখা দিত , তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হুবাল নামক দেবমূর্তির নিকট হাযির করত এবং সেই সাথে একশ দিরহাম , একটা বলির উটও নিয়ে যেত । অর্থ ও উট তীর টানা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিত । তারপর যার ব্যাপারে নিষ্পত্তি কাম্য , তাকে মূর্তির সামনে হাযির করে বলত : “ হে আমাদের দেবতা ! এ ব্যক্তি অমুকের সন্তান অমুক , তার ব্যাপারে আমরা তোমার নিকট থেকে অমুক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চাইছি । অতএব তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানিয়ে দাও । ” তারপর তীর টানার কাজে নিয়োজিত লোকটিকে তারা ভীর টানতে বলত । যদি ' তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে তারা বুঝত যে , সংশ্লিষ্ট শিশুটি বৈধ সন্তান । আর যদি ' তোমাদের বহির্ভূত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মিত্র বলে গণ্য হত । আর যদি ‘ সংযুক্ত ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ সন্তান তাদের মধ্যে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকত , তার বংশ মর্যাদা বা মৈত্রী ইত্যদি অনির্ধারিতই থাকত । আর যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত অন্য কোন কাজের প্রশ্নে ' হ্যাঁ ' লেখা তীর বেরুত , তাহলে ঐ কাজ নিঃসন্দেহে সম্পন্ন করত । কিন্তু ' না ' লেখা তীর বেরুলে ঐ বছরের জন্যে কাজটি স্থগিত রাখত । পরবর্তী বছর ঐ কাজটি সম্পর্কে পুনরায় একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করত এবং সমাধান চাইত । এভাবে তীরের ফায়সালাই ছিল তাদের কাছে সকল ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা । '
**টিকাঃ**
১ . কেউ কেউ বলেন , আরবরা যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করত , তখন তিনটি তীর টানত । একটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে কাজটি করতে আদেশ দিয়েছেন । ” অপরটিতে লেখা থাকত , “ আমার প্রভু আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন । ” আর তৃতীয়টায় লেখা থাকত , “ সিদ্ধান্ত স্থগিত ” । আদেশসূচক তীর বের হলে কাজটির বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া , নিষেধসূচক তীর বের হলে কাজটি পরিত্যাগ করা এবং স্থগিতাদেশসূচক তীর বের হলে কাজটি পুনরায় স্থগিত রাখা হত । সম্ভবত সাত তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এবং তিন তীরের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা এ উভয় পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করত ।