📄 যমযম পুনখনন এবং এ ব্যাপারে পূর্বে সংঘটিত বিষয়
যমযম পুনখনন এবং এ ব্যাপারে পূর্বে সংঘটিত বিষয়
( আবদুল মুত্তালিব যমযম খননের ব্যাপারে যে স্বপ্ন দেখেন )
এরপর আবদুল মুত্তালিব তার ঘরে স্বপ্নযোগে যমযম কূপ পুনঃখননের নির্দেশপ্রাপ্ত হলেন ।
* ইন ইসহাক বলেন : আমাকে ইয়াযীদ ইব্ন আবূ হাবীব মিসরী মারসাদ ইবন আবদুল্লাহ্ ইয়াযানী থেকে , তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুরায়র গাফিকী থেকে , তিনি আলী ইব্ন আবী তালিব - ( রা ) থেকে যমযম খনন সম্পর্কে যে তথ্য শুনিয়েছেন তার বিস্তারিত বিবরণ হলো :
আবদুল মুত্তালিব বলেন , একবার আমি আমার ঘরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে এসে বলেন , ' তায়্যিবা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ' তায়্যিবা ' কি ? তিনি বলেন , এরপর তিনি আমার নিকট থেকে চলে যান । পরের দিন আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম , আর তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' বাররা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ‘ বাররা ’ কি ? তিনি কিছু না বলে আমার কাছ থেকে চলে গেলেন । তৃতীয় দিন আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম , তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' মানা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , “ মানা ” কি ? তিনি কিছু না বলেই আমার কাছ থেকে চলে হেল । চতুর্থ দিনেও আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম । পুনরায় তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' যমযম ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ' যমযম ' কি ? তিনি বললেন , যা কোন দিন শুকাবে না , যার পানি কমবে না , বিপুল সংখ্যক হাজীকে তৃপ্ত করবে । কূপটি এখন গোবর ও রক্তে ভরা রয়েছে , যেখানে উঁইপোকা এবং পিঁপড়ার বাসা আছে ।
আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হারিস এবং কুরায়শদের মাঝে যমযম কূপ খননের সময় কলহ-
ইবন ইসহাক বলেন : যখন তাঁকে কূপের বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া হল , তার জায়গাও চিনিয়ে দেয়া হল এবং তিনি বুঝলেন যে , কথা মিথ্যা নয় , তখন তিনি তার সে সময়ের একমাত্র ছেলে হারিসসহ কোদাল নিয়ে বের হলেন এবং খননকাজ শুরু করলেন । যখন তার ভেতরের জিনিসগুলো বের হল , তখন আবদুল মুত্তালিব তাকবীর ধ্বনি দিলেন । কুরায়শরা বুঝতে পারল যে , তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে । তারা তাঁর পাশে এসে জমায়েত হল এবং বলল : “ হে আবদুল মুত্তালিব ! এ তো আমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল ( আ ) -এর কূপ । কাজেই এতে আমাদেরও হক আছে । অতএব এ খননকাজে আমাদেরও আপনার সঙ্গে শরীক রাখুন । তিনি বললেন , আমি এরূপ করব না । বস্তুত এ কাজের জন্য একমাত্র আমাকেই মনোনীত করা হয়েছে , তোমাদের নয় ।
কুরায়শরা বলল , আমাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করুন , অন্যথায় আমরা এ ব্যাপারে আপনার সাথে ঝগড়া না করে ছাড়ব না । আবদুল মুত্তালিব বললেন , তবে তোমরা আমাদের ও তোমাদের মাঝে মধ্যস্থতার জন্য তোমাদের পসন্দমত কাউকে মনোনীত কর । তারা বনূ সা'দি গোত্রের হুযায়মা জ্যোতিষীকে সালিস মনোনীত করল । আবদুল মুত্তালিব তা মেনে নিলেন । বর্ণনাকারী বলেন , এ জ্যোতিষী সিরিয়ার উঁচু এলাকায় বসবাস করত । আবদুল মুত্তালিব বনূ আবদে মানাফের কয়েকজন ও কুরায়শের প্রত্যেক গোত্রের একজনসহ একটি কাফেলা নিয়ে ঊষর শুষ্ক মরুময় পথে সেই জ্যোতিষীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন । হিজায ও সিরিয়ার মাঝপথে কোন এক মরুময় ময়দানে পৌছার পর তাদের সকলের পানি শেষ হয়ে গেল । ফলে তারা তুষ্ণার্ত হলেন এবং মৃত্যু ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প রইল না । কুরায়শের দু'একটি গোত্রের কাছে পানি চাইলেও তারা এ বলে পানি দিতে অস্বীকার করল যে , আমরা তো একই বিপদের সম্মুখীন । আবদুল মুত্তালিব এ পরিস্থিতি দেখে তার সাথীদের কাছে পরামর্শ চাইলেন । তারা বলল , আপনার সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নিব । কাজেই আপনার ইচ্ছামত আমাদের নির্দেশ দিন । আবদুল মুত্তালিব বললেন , আমার মতে তোমাদের এখনও যে শক্তি আছে , তা শেষ হওয়ার পূর্বে তোমরা প্রত্যেকে নিজের জন্য একটি কবর খনন কর । কেউ মরে গেলে সাথীরা তাকে তাঁর কবরে দাফন করে দেবে । অবশেষে তোমাদের একজন মৃতব্যক্তি দাফনহীন অবস্থায় থেকে যাবে । আর গোটা কাফেলার দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকার চাইতে একজনের দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকা অনেক ভাল । তারা বলল , আপনি যা করতে বললেন , তা খুবই ভাল । এরপর তারা তাদের স্ব - স্ব কবর খনন করল । আর সকলেই তৃষ্ণার্ত হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে রইল । আবদুল মুত্তালিব তার সাথীদের বললেন , এভাবে নিশ্চেষ্ট বসে থেকে নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখে সঁপে দেওয়া মোটেই বাঞ্ছনীয় নয় । চল , আমরা একদিকে রওয়ানা হয়ে যাই । হয়ত আল্লাহ কোথাও আমাদের পানির ব্যবস্থা করে দিবেন । তখন তারা চলা শুরু করল । কুরায়শের অন্য সাথীরা তাদের অবস্থা দেখছিল । এ সময় আবদুল মুত্তালিব তাঁর বাহনে এসে বসার পর সেটি তাঁকে নিয়ে উঠতেই তার পায়ের তলদেশ থেকে মিঠা পানির ঝর্ণা বেরিয়ে এলো । তখন আবদুল মুত্তালিব এবং তাঁর সঙ্গীরা তাক্বীর ধ্বনি দিয়ে নেমে পড়লেন এবং সকলে পানি পান করে পথের জন্য সাথেও নিয়ে নিলেন । এরপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়শের অন্যান্য সাথীদের ডেকে পানির ভাগ দিলেন । তারপর কুরায়শরা বলল , আল্লাহ্র কসম ! আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে । যমযম নিয়ে তোমার সাথে আমাদের আর কোনদিন কোন দ্বন্দ্ব হবে না । যে মহান সত্তা তোমাকে এ ধূসর শুষ্ক মরুময় এলাকায় পানি দিয়ে তৃপ্ত করলেন , নিঃসন্দেহে তিনিই তোমাকে যমযম দান করেছেন । তুমি সোজা তোমার কূপের কাছে ফিরে যাও । তখন আবদুল মুত্তালিব ফিরলেন , আর সাথে ফিরে এলো তাঁর সাথীরাও । তারা জ্যোতিষীর কাছে গেলেন না । এরপর কুরায়শরা যমযমের ব্যাপারে আবদুল মুত্তালিবকে আর কোনরূপ বাধা দেয়নি ।
দ্বিতীয় বর্ণনা : ইব্ন ইসহাক বলেন : যমযম সম্পর্কিত এ বর্ণনাটি আমি আলী ইব্ন আবূ তালিব ( রা ) -এর সূত্রে শুনেছি । আমি অনেক লোককে আবদুল মুত্তালিব থেকে এরূপ বর্ণনা করতে শুনেছি যে , যমযম খননের নির্দেশ দেওয়ার সময় তাঁকে বলা হয় :
ثم ادع بالماء الروى غير الكدر x يسقى حجيج الله في كل مير
ليس يخاف منه شيئ ما عمر
“ তারপর নির্মল ও প্রচুর পানির জন্য দু'আ কর । যাতে সে পানি হাজীদের হজ্জের সময় তৃপ্ত করতে থাকে । এ পানি যতদিন থাকবে , ততদিন এ পানি থেকে কোন ভয় ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না । ”
এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিব কুরায়শদের সংবাদ দিলেন যে , আমি তোমাদের জন্য যমযম খননের নির্দেশ পেয়েছি । তারা জিজ্ঞেস করল : সেটি কোথায় , তা কি আপনি জেনেছেন ? তিনি বললেন , না । তারা বলল , তবে আপনি সেখানে পুনরায় ফিরে যান , এ নির্দেশ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হলে তা আরও স্পষ্ট করে দেয়া হবে । আর শয়তানের পক্ষ থেকে হলে সে নির্দেশ আর ফিরে আসবে না । সুতরাং তিনি পুনরায় গিয়ে শুয়ে পড়লের , তখন স্বপ্নযোগে এক ব্যক্তি এসে নির্দেশ দিলেন , তুমি যমযম খনন কর । যদি তুমি এটি খনন কর , তবে তুমি লজ্জিত হবে না । এটা তোমার পূর্বসূরীদের পরিত্যক্ত সম্পদ , এ কখনো শুকাবে না এবং এর পানি কখনো কমবে না । মানব সমাজ থেকে আলাদা বাসকারী উটপাখির ন্যায় বিপুল সংখ্যক হাজীকে তৃপ্ত করবে , যা বন্টন করা হয় না । লোকেরা এর কাছে এসে গরীব - দুঃখীদের জন্য মানত আদায় করবে । আর এ যমযম হবে তোমার বংশধরদের জন্য মীরাস । এটা কোন সাধারণ জিনিস নয় । কূপটি এখন গোবর ও রক্তে ভরা আছে ।
ইবন ইসহাক বলেন : প্রচলিত ধারণা এই যে , আবদুল মুত্তালিবকে যখন যমযম খননের নির্দেশ দেয়া হয় , তখন তিনি এর সঠিক স্থান জানতে চাইলেন । তাঁকে বলা হল , সেটি পিঁপড়ার বাসার সন্নিকটে , যেখানে আগামীকাল কাক ঠোকর মারবে । আল্লাহ্ই ভাল জানেন , কোন বর্ণনাটি সঠিক । আবদুল মুত্তালিব সকালে উঠে তাঁর সে সময়ের একমাত্র পুত্র হারিসকে নিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে পেলেন এবং কাককেও ঠোকর মারতে দেখলেন । স্থানটি ছিল ইসাফ ও নায়েলা দেবীদ্বয়ের মাঝখানে , যেখানে কুরায়শরা তাদের পশু বলি দিত । তিনি নিশ্চিত হয়ে কোদাল নিয়ে খনন করতে উদ্যত হলেন । কুরায়শরা তাঁর দৃঢ় সংকল্প দেখে তাঁর কাছে এসে বলল , আল্লাহ্ শপথ ! আমরা যে মূর্তি দু'টির কাছে পশু বলি দিয়ে থাকি , সেখানে তোমাকে খুঁড়তে দেব না । তখন আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র হারিসকে বললেন , এদের আমার কাছ থেকে তাড়িয়ে দাও । এ নির্দেশ অবশ্যই পালন করব । কুরায়শরা তাঁর অবিচল প্রতিজ্ঞা দেখে তাঁকে কূপ খনন করতে বাধা দিল না । তারপর সামান্য খনন করতেই ভেতরের জিনিস প্রকাশ পেতে লাগল । আবদুল মুত্তালিব তাক্বীর ধ্বনি দিলেন । সবাই জানল যে , তিনি সত্য বলেছিলেন । আরও খনন করার পর তিনি তাতে স্বর্ণের দুটি হরিণ পেলেন । এ হরিণ দুটো জুরহুম মক্কা থেকে বিদায়কালে দাফন করে গিয়েছিলেন । তিনি তাতে ঝক্ঝকে সাদা অনেকগুলি তরবারি ও লৌহবর্ম পেলেন । তখন কুরায়শরা তাকে বলল :
হে আবদুল মুত্তালিব , এতে তোমার সাথে আমাদেরও অংশ রয়েছে । তিনি বললেন : মোটেও নয় ; বরং তোমরা আমার সাথে একটি ইনসাফভিত্তিক মীমাংসার জন্য তৈরি হও । আমরা এ বিষয়ে তীর দ্বারা লটারী করব । কুরায়শরা জিজ্ঞেস করল , তুমি তা কিভাবে করবে ? আবদুল মুত্তালিব বললেন : দুটি তীর কা'বাঘরের জন্য , দুটি আমার জন্য , আর দু'টি তোমাদের জন্য নির্ধারিত করব । যার তীর যে জিনিসের উপর পড়বে , সে জিনিস তার হবে আর যার তীর কিছুতেই পড়বে না , সে কিছুই পাবে না । কুরায়শরা বলল , এটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত মীমাংসা । এরপর তিনি দু'টি পীতবর্ণের তীর বায়তুল্লাহ্র জন্য , দুটি কৃষ্ণবর্ণের তীর আবদুল মুত্তালিবের জন্য , আর দুটি শুভ্র তীর কুরায়শদের জন্য নির্ধারিত করলেন । এ তীরগুলো বায়তুল্লাহ্র মাঝে রক্ষিত সবচাইতে বড় মূর্তি হোবল - এর কাছ থেকে তীর নিক্ষেপকারী লোকটির হাতে দিল । আবূ সুফইয়ান ইব্ন হার্ব উহুদের যুদ্ধের সময় এ মূর্তিটিকেই ডেকে বলেছিলেন ( Jo Jai ) হোবলের জয় হোক । এ সময় আবদুল মুত্তালিব আল্লাহ্র কাছে দু'আ করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন । তীর নিক্ষেপ করার পর পীতবর্ণের তীর দুটো স্বর্ণ হরিণের উপর পড়ল । ফলে তা কা'বাঘরের অংশ হয়ে গেল । আর আবদুল মুত্তালিব - এর কালো তীর দুটো তরবারি বর্মের উপর পড়ল । আর কুরায়শদের দু'টি তীর কিছুর উপর পড়ল না । আবদুল মুত্তালিব তরবারিগুলো বায়তুল্লাহ্র দরজাস্বরূপ লাগিয়ে দিলেন । আর স্বর্ণের হরিণ দুটো দরজায় দাঁড় করিয়ে দিলেন । কথিত আছে যে , এই প্রথম কা'বাঘরকে স্বর্ণ দ্বারা সজ্জিত করা হয় । তারপর আবদুল মুত্তালিব হাজীদের যমযমের পানি পান করানোর দায়িত্ব নিয়ে নিলেন ।