📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুত্তালিবের মৃত্যু এবং তার মৃত্যুতে শোকগাথা

📄 মুত্তালিবের মৃত্যু এবং তার মৃত্যুতে শোকগাথা


মুত্তালিবের মৃত্যু এবং তার মৃত্যুতে শোকগাথা
ইয়ামানের রাদমান এলাকায় মুত্তালিব মারা যান । জনৈক আরব কবি তাঁর উদ্দেশ্যে শোক প্রকাশ করে বলেন :
“ হাজীগণ কানায় কানায় পূর্ণ পেয়ালায় যমযমের পানি পান করেও মুত্তালিবের মৃত্যুর কারণে তৃষ্ণার্ত রয়ে গেল ।
“ হায় ! যদি কুরায়শ তার মৃত্যুর পর এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতো । ”
মাতরুদ ইবন কা'ব খুযাঈর কাছ যখন বনু আবদে মানাফের সর্বশেষ ব্যক্তি নাওফল ইবন আবদে মানাফের মৃত্যু সংবাদ এলো , তখন তিনি মুত্তালিব ও বনূ আবদে মানাফের শোকে এই কবিতা আবৃত্তি করেন :
“ হে নিঠুর রাত ! তুমি আমাকে অনেক অস্থিরতা ও পেরেশানীতে কাটাতে বাধ্য করেছ । “ হায় ! কি দুঃখ জ্বালা আমাকে সইতে হচ্ছে । হায় ! কি মরণ - যন্ত্রণা আমাকে বরদাশত করতে হচ্ছে !
“ আমার ভাই নাওফলের স্মরণে আমার হৃদয়ে অনেক বেদনাময় অতীত স্মৃতি ভেসে উঠে । আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় লাল লুঙ্গি এবং পরিচ্ছন্ন হলুদ চাদরের কথা ।
"চারজন ছিলেন নেতার পুত্র নেতা , তাদের নেতৃত্বের গুণ ছিল মজ্জাগত । “ রাদমান , সালমান ও গাযযা এলাকায় তারা সমাহিত । আর একজন লুকিয়ে আছেন বায়তুল্লাহ্র পূর্বদিকে এক না জানা কবরে ।
“ এঁদের মধ্যে আবদে মানাফ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ , আর তাঁরা সকলেই ছিলেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে । বনূ মুগীরা ( তথা আবদে মানাফ ) এবং তাদের সন্তানেরা জীবিত - মৃতদের মধ্যে সর্বোত্তম । "
আবদে মানাফের নাম ছিল মুগীরা । তাঁর পুত্রদের মধ্যে সর্ব প্রথম হাশিমের মৃত্যু হয় সিরিয়ার ‘ গায্যা ’ এলাকায় । এরপর মক্কায় আবদে শামসের , তারপর ইয়ামানের রাদমান নামক .. স্থানে মুত্তালিবের এবং ইরাকের উপকণ্ঠে সালমান নামক এলাকায় নাওফলের মৃত্যু হয় ।
কথিত আছে যে , লোকের মাতরূদের শোকগাথার প্রশংসা করে বলেছিল , আপনি সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করেছেন । আপনি যদি আরো বেশি কবিতা আবৃত্তি করতেন , তবে খুবই ভাল হতো । তখন তিনি বলেছিলেন : আমাকে কয়েক দিন সময় দাও । কিছুদিন বিরতির পর তিনি নিম্নের কবিতা রচনা করলেন :
“ হে নয়ন ! অকৃপণভাবে অশ্রু ঝরাও । বনূ মুগীরার শোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো ।
“ হে চোখ ! অবিরাম অশ্রু বর্ষণ কর । আমার বিপদের জন্য কাঁদো । সেই দানবীর , মহানুভব ও ভরসার পাত্র মানুষটির জন্য মনভরে কাঁদো ।
“ পূত - পবিত্র যার চরিত্র , সুদৃঢ় যার সংকল্প , কঠোর যার মেযাজ , ভয়ংকর দুর্যোগেও যিনি অবিচল ।
“ প্রথম দর্শনেই যাকে মনে হতো দৃঢ়চেতা , কোন দুর্বলতা ছিল না যার । কারো উপর নির্ভর করা ছিল যার স্বভাব বিরুদ্ধ , দৃঢ় সংকল্পের অনমনীয় অধিকারী দু'হাতে বিলাতেন উৎকৃষ্ট বস্তু । “ বংশ গরিমায় বনূ কা'বের মধ্যমণি যেন বাজপাখি , আভিজাত্যে সকলের মাঝে শীর্ষস্থানীয় । “ হে চোখ ! আরো বেশি করে অশ্রু ঝরাও দানবীর মুত্তালিবের স্মরণে । কেননা দানের ঢল থেমে গেছে ।
“ আজ সে আমাদের থেকে দূরে রাদমান এলাকায় পড়ে আছে । হায়রে মর্ম ব্যথা ! সে পড়ে আছে মৃতদের মাঝে ।
“ হে দুর্ভাগা ! কাঁদতেই যদি হয় , তবে বায়তুল্লাহ্ পূর্বদিকে পড়ে থাকা আবদে শামস - এর জন্য কাঁদো আর কাঁদো হাশিমের জন্য , যে শুয়ে আছে মরুভূমির এক নির্জন কবরে । গায্যার প্রবল বায়ু তার উপর বালুর স্তূপ সৃষ্টি করে ।
“ আর কাদো আমার অকৃত্রিম বন্ধু নাওফলের শোকে , সালমান এলাকার মরুভূমির একটি কবরে যে শুয়ে আছে ।
“ বাদামী বর্ণের উটনীতে , তাঁদের সওয়ার হওয়ার অপূর্ব দৃশ্য , আরব - আজমের কোথাও দেখিনি আমি ।
“ সে জনপদ আছ তাঁরা নেই , কিন্তু একদিন তাঁরাই ছিলেন নির্বাচিত সৈন্যদলের শোভা স্বরূপ । কালের থাবায় তাঁরা হারিয়ে গেছেন । আর তাঁদের তরবারি ভোঁতা হয়ে গেছে । প্রাণীমাত্রকেই মৃত্যুপথের যাত্রী হতে হবে ।
“ তাঁদের পরে সহাস্য বদন ও সালাম - কালাম ছাড়া মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার ।
“ হে চোখ ! আবুশ শু'স - এর শোকে কাঁদো । যার শোকে খোলা মাথায় শোক বিহ্বলা নারীর দল কবরের পাশে বাঁধা উটনীর মত ক্রন্দন করছে ।
“ তারা কাঁদছে এমন উত্তম ব্যক্তির জন্য , যিনি পদব্রজে চলতেন , তারা শোক প্রকাশ করছে অশ্রু ঝরানোর মাধ্যমে ।
“ তারা কাঁদছে সেই মহানুভব ব্যক্তির শোকে , যিনি ছিলেন মুক্তহস্ত ও অন্যায় আঘাতের প্রতিহতকারী এবং বহু যুদ্ধে বিজয়ী ।
“ তাদের এ কান্না উচ্চ মর্যাদায় আসীন আমরের শোকে । মৃত্যু যখন ঘনিয়ে এলো তখনও তিনি ছিলেন মহৎ চরিত্রের অধিকারী ও অতিথিপরায়ণ ।
“ তাঁর শোকে জেগে উঠা তাদের এ বুকফাটা কান্না , জানি না কতকাল দীর্ঘ হবে ।
“ কালের থাবা এ বিলাপিনীদের যখন তাঁর শোকে ঘর থেকে বের করে এনেছে , তখন তাদের দু'চোখ থেকে এমন অশ্রু ঝরছে , যেন মশকের দু'টি মুখ খুলে গেছে ।
“ সময় যখন নতুন নতুন বিপদ ডেকে আনলো , তখন তারাও কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে তৈরি হলো ।
“ আমি বিনিদ্র রজনী কাটাই , বেদনাবিধুর হৃদয়ে আকাশের তারা গুণতে থাকি । আমি কাঁদি আর সেই সাথে কাঁদে আমার অবুঝ মেয়েরাও ।
“ সমসাময়িকদের মাঝে যেমন তাঁদের সমকক্ষ কেউ নেই , তেমনি তাঁদের উত্তরসূরীদের মাঝেও তাঁদের মত কেউ নেই ।
“ সাধনার দৈন্যের সময় তাঁর পুত্ররাই সর্বোত্তম । তাঁরা নিজেরাও ছিলেন সর্বোত্তম ( অর্থাৎ চেষ্টা - সাধনা করে অন্যরা ক্লান্ত হয়ে গেলেও এরা ক্লান্ত হন না ) ।
“ তারা অনেক তেজী দ্রুতগামী ঘোড়া , লুণ্ঠন অভিযানে পারদর্শিনী ঘোটকী দান করেছেন । “ আরো দান করেছেন অনেক মযবূত হিন্দী তলোয়ার এবং কুয়োর রশির ন্যায় দীর্ঘ বর্শা । “ আর প্রার্থীদেরকে তারা দান করেছেন গর্বের ধন দাস - দাসী ।
“ আমি এবং অন্য গণনাকারীরা সবে মিলেও তাদের কীর্তিমালা গুণে শেষ করতে পারব না ।
“ আত্মগর্ব প্রচারের মজলিসে গর্ব করার মত পূত - পবিত্র বংশধারার এঁরাই অধিকারী ।
“ এ বাসগৃহের তাঁরা ছিলেন ভূষণ , কিন্তু তাঁরা না থাকায় এগুলো এখন বিরান নিঝুম এলাকায় পরিণত হয়েছে ।
“ আমি কথা বলছি , অথচ আমার চোখ থেকে ঝরছে অশ্রুর অবিরাম ধারা । আল্লাহ্ এ বিপদগ্রস্তদের নিজ রহমত থেকে বঞ্চিত না করুন । ”
ইবন হিশাম বলেন :
all অর্থ হল দান । আবূ খিরাশ হুয়ালী বলেন :
عجف أضيافي جميل بن معمر بذى فجر تأوي اليه الآراسل
“ দানশীল ও বিধবাদের আশ্রয়স্থল জামীল ইব্‌ন মা'মার আমার মেহমানদের অভূক্ত রেখেছে । ”
ইব্‌ন ইসহাক বলেন : আবুশ শু'স শাজিয়্যাত হলেন হাশিম ইব্‌ন আবদে মানাফ ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 'সিকায়া' 'রিফাদার' তত্ত্বাবধানে আবদুল মুত্তালিব

📄 'সিকায়া' 'রিফাদার' তত্ত্বাবধানে আবদুল মুত্তালিব


‘ সিকায়া ' ‘ রিফাদার ' তত্ত্বাবধানে আবদুল মুত্তালিব
চাচা মুত্তালিবের পর আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন হাশিম সিকায়া ও রিফাদার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন । এ দায়িত্ব ছাড়া তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ন্যায় কাওমের যাবতীয় দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দেন এবং সামাজিক প্রভাব - প্রতিপত্তি ও মর্যাদায় তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে যান ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যমযম পুনখনন এবং এ ব্যাপারে পূর্বে সংঘটিত বিষয়

📄 যমযম পুনখনন এবং এ ব্যাপারে পূর্বে সংঘটিত বিষয়


যমযম পুনখনন এবং এ ব্যাপারে পূর্বে সংঘটিত বিষয়
( আবদুল মুত্তালিব যমযম খননের ব্যাপারে যে স্বপ্ন দেখেন )
এরপর আবদুল মুত্তালিব তার ঘরে স্বপ্নযোগে যমযম কূপ পুনঃখননের নির্দেশপ্রাপ্ত হলেন ।
* ইন ইসহাক বলেন : আমাকে ইয়াযীদ ইব্‌ন আবূ হাবীব মিসরী মারসাদ ইবন আবদুল্লাহ্ ইয়াযানী থেকে , তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুরায়র গাফিকী থেকে , তিনি আলী ইব্‌ন আবী তালিব - ( রা ) থেকে যমযম খনন সম্পর্কে যে তথ্য শুনিয়েছেন তার বিস্তারিত বিবরণ হলো :
আবদুল মুত্তালিব বলেন , একবার আমি আমার ঘরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে এসে বলেন , ' তায়্যিবা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ' তায়্যিবা ' কি ? তিনি বলেন , এরপর তিনি আমার নিকট থেকে চলে যান । পরের দিন আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম , আর তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' বাররা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ‘ বাররা ’ কি ? তিনি কিছু না বলে আমার কাছ থেকে চলে গেলেন । তৃতীয় দিন আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম , তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' মানা ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , “ মানা ” কি ? তিনি কিছু না বলেই আমার কাছ থেকে চলে হেল । চতুর্থ দিনেও আমি একই স্থানে শুয়ে থাকলাম । পুনরায় তিনি আমার কাছে এসে বললেন , ' যমযম ' খনন কর । আমি জিজ্ঞেস করলাম , ' যমযম ' কি ? তিনি বললেন , যা কোন দিন শুকাবে না , যার পানি কমবে না , বিপুল সংখ্যক হাজীকে তৃপ্ত করবে । কূপটি এখন গোবর ও রক্তে ভরা রয়েছে , যেখানে উঁইপোকা এবং পিঁপড়ার বাসা আছে ।
আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হারিস এবং কুরায়শদের মাঝে যমযম কূপ খননের সময় কলহ-
ইবন ইসহাক বলেন : যখন তাঁকে কূপের বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া হল , তার জায়গাও চিনিয়ে দেয়া হল এবং তিনি বুঝলেন যে , কথা মিথ্যা নয় , তখন তিনি তার সে সময়ের একমাত্র ছেলে হারিসসহ কোদাল নিয়ে বের হলেন এবং খননকাজ শুরু করলেন । যখন তার ভেতরের জিনিসগুলো বের হল , তখন আবদুল মুত্তালিব তাকবীর ধ্বনি দিলেন । কুরায়শরা বুঝতে পারল যে , তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে । তারা তাঁর পাশে এসে জমায়েত হল এবং বলল : “ হে আবদুল মুত্তালিব ! এ তো আমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল ( আ ) -এর কূপ । কাজেই এতে আমাদেরও হক আছে । অতএব এ খননকাজে আমাদেরও আপনার সঙ্গে শরীক রাখুন । তিনি বললেন , আমি এরূপ করব না । বস্তুত এ কাজের জন্য একমাত্র আমাকেই মনোনীত করা হয়েছে , তোমাদের নয় ।
কুরায়শরা বলল , আমাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করুন , অন্যথায় আমরা এ ব্যাপারে আপনার সাথে ঝগড়া না করে ছাড়ব না । আবদুল মুত্তালিব বললেন , তবে তোমরা আমাদের ও তোমাদের মাঝে মধ্যস্থতার জন্য তোমাদের পসন্দমত কাউকে মনোনীত কর । তারা বনূ সা'দি গোত্রের হুযায়মা জ্যোতিষীকে সালিস মনোনীত করল । আবদুল মুত্তালিব তা মেনে নিলেন । বর্ণনাকারী বলেন , এ জ্যোতিষী সিরিয়ার উঁচু এলাকায় বসবাস করত । আবদুল মুত্তালিব বনূ আবদে মানাফের কয়েকজন ও কুরায়শের প্রত্যেক গোত্রের একজনসহ একটি কাফেলা নিয়ে ঊষর শুষ্ক মরুময় পথে সেই জ্যোতিষীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন । হিজায ও সিরিয়ার মাঝপথে কোন এক মরুময় ময়দানে পৌছার পর তাদের সকলের পানি শেষ হয়ে গেল । ফলে তারা তুষ্ণার্ত হলেন এবং মৃত্যু ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প রইল না । কুরায়শের দু'একটি গোত্রের কাছে পানি চাইলেও তারা এ বলে পানি দিতে অস্বীকার করল যে , আমরা তো একই বিপদের সম্মুখীন । আবদুল মুত্তালিব এ পরিস্থিতি দেখে তার সাথীদের কাছে পরামর্শ চাইলেন । তারা বলল , আপনার সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নিব । কাজেই আপনার ইচ্ছামত আমাদের নির্দেশ দিন । আবদুল মুত্তালিব বললেন , আমার মতে তোমাদের এখনও যে শক্তি আছে , তা শেষ হওয়ার পূর্বে তোমরা প্রত্যেকে নিজের জন্য একটি কবর খনন কর । কেউ মরে গেলে সাথীরা তাকে তাঁর কবরে দাফন করে দেবে । অবশেষে তোমাদের একজন মৃতব্যক্তি দাফনহীন অবস্থায় থেকে যাবে । আর গোটা কাফেলার দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকার চাইতে একজনের দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকা অনেক ভাল । তারা বলল , আপনি যা করতে বললেন , তা খুবই ভাল । এরপর তারা তাদের স্ব - স্ব কবর খনন করল । আর সকলেই তৃষ্ণার্ত হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে রইল । আবদুল মুত্তালিব তার সাথীদের বললেন , এভাবে নিশ্চেষ্ট বসে থেকে নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখে সঁপে দেওয়া মোটেই বাঞ্ছনীয় নয় । চল , আমরা একদিকে রওয়ানা হয়ে যাই । হয়ত আল্লাহ কোথাও আমাদের পানির ব্যবস্থা করে দিবেন । তখন তারা চলা শুরু করল । কুরায়শের অন্য সাথীরা তাদের অবস্থা দেখছিল । এ সময় আবদুল মুত্তালিব তাঁর বাহনে এসে বসার পর সেটি তাঁকে নিয়ে উঠতেই তার পায়ের তলদেশ থেকে মিঠা পানির ঝর্ণা বেরিয়ে এলো । তখন আবদুল মুত্তালিব এবং তাঁর সঙ্গীরা তাক্বীর ধ্বনি দিয়ে নেমে পড়লেন এবং সকলে পানি পান করে পথের জন্য সাথেও নিয়ে নিলেন । এরপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়শের অন্যান্য সাথীদের ডেকে পানির ভাগ দিলেন । তারপর কুরায়শরা বলল , আল্লাহ্র কসম ! আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে । যমযম নিয়ে তোমার সাথে আমাদের আর কোনদিন কোন দ্বন্দ্ব হবে না । যে মহান সত্তা তোমাকে এ ধূসর শুষ্ক মরুময় এলাকায় পানি দিয়ে তৃপ্ত করলেন , নিঃসন্দেহে তিনিই তোমাকে যমযম দান করেছেন । তুমি সোজা তোমার কূপের কাছে ফিরে যাও । তখন আবদুল মুত্তালিব ফিরলেন , আর সাথে ফিরে এলো তাঁর সাথীরাও । তারা জ্যোতিষীর কাছে গেলেন না । এরপর কুরায়শরা যমযমের ব্যাপারে আবদুল মুত্তালিবকে আর কোনরূপ বাধা দেয়নি ।
দ্বিতীয় বর্ণনা : ইব্‌ন ইসহাক বলেন : যমযম সম্পর্কিত এ বর্ণনাটি আমি আলী ইব্‌ন আবূ তালিব ( রা ) -এর সূত্রে শুনেছি । আমি অনেক লোককে আবদুল মুত্তালিব থেকে এরূপ বর্ণনা করতে শুনেছি যে , যমযম খননের নির্দেশ দেওয়ার সময় তাঁকে বলা হয় :
ثم ادع بالماء الروى غير الكدر x يسقى حجيج الله في كل مير
ليس يخاف منه شيئ ما عمر
“ তারপর নির্মল ও প্রচুর পানির জন্য দু'আ কর । যাতে সে পানি হাজীদের হজ্জের সময় তৃপ্ত করতে থাকে । এ পানি যতদিন থাকবে , ততদিন এ পানি থেকে কোন ভয় ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না । ”
এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিব কুরায়শদের সংবাদ দিলেন যে , আমি তোমাদের জন্য যমযম খননের নির্দেশ পেয়েছি । তারা জিজ্ঞেস করল : সেটি কোথায় , তা কি আপনি জেনেছেন ? তিনি বললেন , না । তারা বলল , তবে আপনি সেখানে পুনরায় ফিরে যান , এ নির্দেশ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হলে তা আরও স্পষ্ট করে দেয়া হবে । আর শয়তানের পক্ষ থেকে হলে সে নির্দেশ আর ফিরে আসবে না । সুতরাং তিনি পুনরায় গিয়ে শুয়ে পড়লের , তখন স্বপ্নযোগে এক ব্যক্তি এসে নির্দেশ দিলেন , তুমি যমযম খনন কর । যদি তুমি এটি খনন কর , তবে তুমি লজ্জিত হবে না । এটা তোমার পূর্বসূরীদের পরিত্যক্ত সম্পদ , এ কখনো শুকাবে না এবং এর পানি কখনো কমবে না । মানব সমাজ থেকে আলাদা বাসকারী উটপাখির ন্যায় বিপুল সংখ্যক হাজীকে তৃপ্ত করবে , যা বন্টন করা হয় না । লোকেরা এর কাছে এসে গরীব - দুঃখীদের জন্য মানত আদায় করবে । আর এ যমযম হবে তোমার বংশধরদের জন্য মীরাস । এটা কোন সাধারণ জিনিস নয় । কূপটি এখন গোবর ও রক্তে ভরা আছে ।
ইবন ইসহাক বলেন : প্রচলিত ধারণা এই যে , আবদুল মুত্তালিবকে যখন যমযম খননের নির্দেশ দেয়া হয় , তখন তিনি এর সঠিক স্থান জানতে চাইলেন । তাঁকে বলা হল , সেটি পিঁপড়ার বাসার সন্নিকটে , যেখানে আগামীকাল কাক ঠোকর মারবে । আল্লাহ্ই ভাল জানেন , কোন বর্ণনাটি সঠিক । আবদুল মুত্তালিব সকালে উঠে তাঁর সে সময়ের একমাত্র পুত্র হারিসকে নিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে পেলেন এবং কাককেও ঠোকর মারতে দেখলেন । স্থানটি ছিল ইসাফ ও নায়েলা দেবীদ্বয়ের মাঝখানে , যেখানে কুরায়শরা তাদের পশু বলি দিত । তিনি নিশ্চিত হয়ে কোদাল নিয়ে খনন করতে উদ্যত হলেন । কুরায়শরা তাঁর দৃঢ় সংকল্প দেখে তাঁর কাছে এসে বলল , আল্লাহ্ শপথ ! আমরা যে মূর্তি দু'টির কাছে পশু বলি দিয়ে থাকি , সেখানে তোমাকে খুঁড়তে দেব না । তখন আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র হারিসকে বললেন , এদের আমার কাছ থেকে তাড়িয়ে দাও । এ নির্দেশ অবশ্যই পালন করব । কুরায়শরা তাঁর অবিচল প্রতিজ্ঞা দেখে তাঁকে কূপ খনন করতে বাধা দিল না । তারপর সামান্য খনন করতেই ভেতরের জিনিস প্রকাশ পেতে লাগল । আবদুল মুত্তালিব তাক্বীর ধ্বনি দিলেন । সবাই জানল যে , তিনি সত্য বলেছিলেন । আরও খনন করার পর তিনি তাতে স্বর্ণের দুটি হরিণ পেলেন । এ হরিণ দুটো জুরহুম মক্কা থেকে বিদায়কালে দাফন করে গিয়েছিলেন । তিনি তাতে ঝক্‌ঝকে সাদা অনেকগুলি তরবারি ও লৌহবর্ম পেলেন । তখন কুরায়শরা তাকে বলল :
হে আবদুল মুত্তালিব , এতে তোমার সাথে আমাদেরও অংশ রয়েছে । তিনি বললেন : মোটেও নয় ; বরং তোমরা আমার সাথে একটি ইনসাফভিত্তিক মীমাংসার জন্য তৈরি হও । আমরা এ বিষয়ে তীর দ্বারা লটারী করব । কুরায়শরা জিজ্ঞেস করল , তুমি তা কিভাবে করবে ? আবদুল মুত্তালিব বললেন : দুটি তীর কা'বাঘরের জন্য , দুটি আমার জন্য , আর দু'টি তোমাদের জন্য নির্ধারিত করব । যার তীর যে জিনিসের উপর পড়বে , সে জিনিস তার হবে আর যার তীর কিছুতেই পড়বে না , সে কিছুই পাবে না । কুরায়শরা বলল , এটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত মীমাংসা । এরপর তিনি দু'টি পীতবর্ণের তীর বায়তুল্লাহ্র জন্য , দুটি কৃষ্ণবর্ণের তীর আবদুল মুত্তালিবের জন্য , আর দুটি শুভ্র তীর কুরায়শদের জন্য নির্ধারিত করলেন । এ তীরগুলো বায়তুল্লাহ্র মাঝে রক্ষিত সবচাইতে বড় মূর্তি হোবল - এর কাছ থেকে তীর নিক্ষেপকারী লোকটির হাতে দিল । আবূ সুফইয়ান ইব্‌ন হার্ব উহুদের যুদ্ধের সময় এ মূর্তিটিকেই ডেকে বলেছিলেন ( Jo Jai ) হোবলের জয় হোক । এ সময় আবদুল মুত্তালিব আল্লাহ্র কাছে দু'আ করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন । তীর নিক্ষেপ করার পর পীতবর্ণের তীর দুটো স্বর্ণ হরিণের উপর পড়ল । ফলে তা কা'বাঘরের অংশ হয়ে গেল । আর আবদুল মুত্তালিব - এর কালো তীর দুটো তরবারি বর্মের উপর পড়ল । আর কুরায়শদের দু'টি তীর কিছুর উপর পড়ল না । আবদুল মুত্তালিব তরবারিগুলো বায়তুল্লাহ্র দরজাস্বরূপ লাগিয়ে দিলেন । আর স্বর্ণের হরিণ দুটো দরজায় দাঁড় করিয়ে দিলেন । কথিত আছে যে , এই প্রথম কা'বাঘরকে স্বর্ণ দ্বারা সজ্জিত করা হয় । তারপর আবদুল মুত্তালিব হাজীদের যমযমের পানি পান করানোর দায়িত্ব নিয়ে নিলেন ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00