📄 হাশিমের বিয়ে
হাশিমের বিয়ে
হাশিম ইব্ন আবদে মানাফ মদীনায় এসে আদী ইব্ন নাজ্জার বংশীয় আমরের কন্যা সালমাকে বিয়ে করেন । তিনি এর আগে উহায়হা ইব্ন জুল্লাহ্ ইব্ন হারীশ - এর স্ত্রী ছিলেন । ইবন হিশাম বলেন : হারীশকে কেউ কেউ হারীসও বলেছেন । তিনি হল , জাহজাবী ইব্ন কুলফা ইব্ন আউফ ইব্ন আমর ইব্ন আউফ ইব্ন মালিক ইব্ন আওস । এ স্ত্রীর গর্ভে আমর ইবন উহায়হা নামে তার এক পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছিল । স্বগোত্রে এই নারীর এতটা মর্যাদা ছিল যে , তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের পূর্ণ অধিকার লাভের শর্তেই শুধু কোন পুরুষকে স্বামীরূপে গ্রহণ করতেন , যাতে অপসন্দ হলে সাথে সাথে তাকে ত্যাগ করতে পারতেন ।
📄 আবদুল মুত্তালিবের জন্ম এবং তাঁর এরূপ নামকরণের কারণ
আবদুল মুত্তালিবের জন্ম এবং তাঁর এরূপ নামকরণের কারণ
এ মহিলার গর্ভে হাশিমের পুত্র আবদুল মুত্তালিবের জন্ম হয় । সালমা তার নাম রাখেন শায়বা । হাশিম ছেলেকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত তার মার কাছেই রাখেন । হাশিমের তিরোধানের পর ছেলের চাচা মুত্তালিব ছেলেকে নেয়ার জন্য মদীনায় আগমন করেন । তখন সালমা বলেন , আমি কখনই একে আপনার সঙ্গে পাঠাব না । এতে মুত্তালিব বলেন , এ আমার সাবালক ভাতিজা । সমাজে সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় পরিবারের ছেলে । এখন নিজ গোত্র ছেড়ে প্রবাসে ভিন্ন গোত্রে পড়ে থাকা তার জন্য মোটেই সমীচীন নয় । কাজেই তাকে না নিয়ে আমি ফিরব না ।
লোকে বলে , শায়বা চাচা মুত্তালিবকে বলেছিলেন , মায়ের অনুমতি ছাড়া আমি যাব না । এরপর মায়ের অনুমতিক্রমে ছেলেকে নিয়ে মুত্তালিব মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন এবং তাকে উটের উপর নিজের পেছনে বসিয়ে নিলেন । এভাবেই তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন । তখন কুরায়শরা বললেন , একে মুত্তালিব দাস হিসাবে কিনে এনেছেন । সেখান থেকেই তার নাম আবদুল মুত্তালিব হয় । মুত্তালib বললেন , হে অপদার্থের দল । এতো আমার ভাই হাশিমের ছেলে । আমি তো একে মদীনা থেকে নিয়ে এসেছি ।
📄 মুত্তালিবের মৃত্যু এবং তার মৃত্যুতে শোকগাথা
মুত্তালিবের মৃত্যু এবং তার মৃত্যুতে শোকগাথা
ইয়ামানের রাদমান এলাকায় মুত্তালিব মারা যান । জনৈক আরব কবি তাঁর উদ্দেশ্যে শোক প্রকাশ করে বলেন :
“ হাজীগণ কানায় কানায় পূর্ণ পেয়ালায় যমযমের পানি পান করেও মুত্তালিবের মৃত্যুর কারণে তৃষ্ণার্ত রয়ে গেল ।
“ হায় ! যদি কুরায়শ তার মৃত্যুর পর এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতো । ”
মাতরুদ ইবন কা'ব খুযাঈর কাছ যখন বনু আবদে মানাফের সর্বশেষ ব্যক্তি নাওফল ইবন আবদে মানাফের মৃত্যু সংবাদ এলো , তখন তিনি মুত্তালিব ও বনূ আবদে মানাফের শোকে এই কবিতা আবৃত্তি করেন :
“ হে নিঠুর রাত ! তুমি আমাকে অনেক অস্থিরতা ও পেরেশানীতে কাটাতে বাধ্য করেছ । “ হায় ! কি দুঃখ জ্বালা আমাকে সইতে হচ্ছে । হায় ! কি মরণ - যন্ত্রণা আমাকে বরদাশত করতে হচ্ছে !
“ আমার ভাই নাওফলের স্মরণে আমার হৃদয়ে অনেক বেদনাময় অতীত স্মৃতি ভেসে উঠে । আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় লাল লুঙ্গি এবং পরিচ্ছন্ন হলুদ চাদরের কথা ।
"চারজন ছিলেন নেতার পুত্র নেতা , তাদের নেতৃত্বের গুণ ছিল মজ্জাগত । “ রাদমান , সালমান ও গাযযা এলাকায় তারা সমাহিত । আর একজন লুকিয়ে আছেন বায়তুল্লাহ্র পূর্বদিকে এক না জানা কবরে ।
“ এঁদের মধ্যে আবদে মানাফ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ , আর তাঁরা সকলেই ছিলেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে । বনূ মুগীরা ( তথা আবদে মানাফ ) এবং তাদের সন্তানেরা জীবিত - মৃতদের মধ্যে সর্বোত্তম । "
আবদে মানাফের নাম ছিল মুগীরা । তাঁর পুত্রদের মধ্যে সর্ব প্রথম হাশিমের মৃত্যু হয় সিরিয়ার ‘ গায্যা ’ এলাকায় । এরপর মক্কায় আবদে শামসের , তারপর ইয়ামানের রাদমান নামক .. স্থানে মুত্তালিবের এবং ইরাকের উপকণ্ঠে সালমান নামক এলাকায় নাওফলের মৃত্যু হয় ।
কথিত আছে যে , লোকের মাতরূদের শোকগাথার প্রশংসা করে বলেছিল , আপনি সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করেছেন । আপনি যদি আরো বেশি কবিতা আবৃত্তি করতেন , তবে খুবই ভাল হতো । তখন তিনি বলেছিলেন : আমাকে কয়েক দিন সময় দাও । কিছুদিন বিরতির পর তিনি নিম্নের কবিতা রচনা করলেন :
“ হে নয়ন ! অকৃপণভাবে অশ্রু ঝরাও । বনূ মুগীরার শোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো ।
“ হে চোখ ! অবিরাম অশ্রু বর্ষণ কর । আমার বিপদের জন্য কাঁদো । সেই দানবীর , মহানুভব ও ভরসার পাত্র মানুষটির জন্য মনভরে কাঁদো ।
“ পূত - পবিত্র যার চরিত্র , সুদৃঢ় যার সংকল্প , কঠোর যার মেযাজ , ভয়ংকর দুর্যোগেও যিনি অবিচল ।
“ প্রথম দর্শনেই যাকে মনে হতো দৃঢ়চেতা , কোন দুর্বলতা ছিল না যার । কারো উপর নির্ভর করা ছিল যার স্বভাব বিরুদ্ধ , দৃঢ় সংকল্পের অনমনীয় অধিকারী দু'হাতে বিলাতেন উৎকৃষ্ট বস্তু । “ বংশ গরিমায় বনূ কা'বের মধ্যমণি যেন বাজপাখি , আভিজাত্যে সকলের মাঝে শীর্ষস্থানীয় । “ হে চোখ ! আরো বেশি করে অশ্রু ঝরাও দানবীর মুত্তালিবের স্মরণে । কেননা দানের ঢল থেমে গেছে ।
“ আজ সে আমাদের থেকে দূরে রাদমান এলাকায় পড়ে আছে । হায়রে মর্ম ব্যথা ! সে পড়ে আছে মৃতদের মাঝে ।
“ হে দুর্ভাগা ! কাঁদতেই যদি হয় , তবে বায়তুল্লাহ্ পূর্বদিকে পড়ে থাকা আবদে শামস - এর জন্য কাঁদো আর কাঁদো হাশিমের জন্য , যে শুয়ে আছে মরুভূমির এক নির্জন কবরে । গায্যার প্রবল বায়ু তার উপর বালুর স্তূপ সৃষ্টি করে ।
“ আর কাদো আমার অকৃত্রিম বন্ধু নাওফলের শোকে , সালমান এলাকার মরুভূমির একটি কবরে যে শুয়ে আছে ।
“ বাদামী বর্ণের উটনীতে , তাঁদের সওয়ার হওয়ার অপূর্ব দৃশ্য , আরব - আজমের কোথাও দেখিনি আমি ।
“ সে জনপদ আছ তাঁরা নেই , কিন্তু একদিন তাঁরাই ছিলেন নির্বাচিত সৈন্যদলের শোভা স্বরূপ । কালের থাবায় তাঁরা হারিয়ে গেছেন । আর তাঁদের তরবারি ভোঁতা হয়ে গেছে । প্রাণীমাত্রকেই মৃত্যুপথের যাত্রী হতে হবে ।
“ তাঁদের পরে সহাস্য বদন ও সালাম - কালাম ছাড়া মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার ।
“ হে চোখ ! আবুশ শু'স - এর শোকে কাঁদো । যার শোকে খোলা মাথায় শোক বিহ্বলা নারীর দল কবরের পাশে বাঁধা উটনীর মত ক্রন্দন করছে ।
“ তারা কাঁদছে এমন উত্তম ব্যক্তির জন্য , যিনি পদব্রজে চলতেন , তারা শোক প্রকাশ করছে অশ্রু ঝরানোর মাধ্যমে ।
“ তারা কাঁদছে সেই মহানুভব ব্যক্তির শোকে , যিনি ছিলেন মুক্তহস্ত ও অন্যায় আঘাতের প্রতিহতকারী এবং বহু যুদ্ধে বিজয়ী ।
“ তাদের এ কান্না উচ্চ মর্যাদায় আসীন আমরের শোকে । মৃত্যু যখন ঘনিয়ে এলো তখনও তিনি ছিলেন মহৎ চরিত্রের অধিকারী ও অতিথিপরায়ণ ।
“ তাঁর শোকে জেগে উঠা তাদের এ বুকফাটা কান্না , জানি না কতকাল দীর্ঘ হবে ।
“ কালের থাবা এ বিলাপিনীদের যখন তাঁর শোকে ঘর থেকে বের করে এনেছে , তখন তাদের দু'চোখ থেকে এমন অশ্রু ঝরছে , যেন মশকের দু'টি মুখ খুলে গেছে ।
“ সময় যখন নতুন নতুন বিপদ ডেকে আনলো , তখন তারাও কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে তৈরি হলো ।
“ আমি বিনিদ্র রজনী কাটাই , বেদনাবিধুর হৃদয়ে আকাশের তারা গুণতে থাকি । আমি কাঁদি আর সেই সাথে কাঁদে আমার অবুঝ মেয়েরাও ।
“ সমসাময়িকদের মাঝে যেমন তাঁদের সমকক্ষ কেউ নেই , তেমনি তাঁদের উত্তরসূরীদের মাঝেও তাঁদের মত কেউ নেই ।
“ সাধনার দৈন্যের সময় তাঁর পুত্ররাই সর্বোত্তম । তাঁরা নিজেরাও ছিলেন সর্বোত্তম ( অর্থাৎ চেষ্টা - সাধনা করে অন্যরা ক্লান্ত হয়ে গেলেও এরা ক্লান্ত হন না ) ।
“ তারা অনেক তেজী দ্রুতগামী ঘোড়া , লুণ্ঠন অভিযানে পারদর্শিনী ঘোটকী দান করেছেন । “ আরো দান করেছেন অনেক মযবূত হিন্দী তলোয়ার এবং কুয়োর রশির ন্যায় দীর্ঘ বর্শা । “ আর প্রার্থীদেরকে তারা দান করেছেন গর্বের ধন দাস - দাসী ।
“ আমি এবং অন্য গণনাকারীরা সবে মিলেও তাদের কীর্তিমালা গুণে শেষ করতে পারব না ।
“ আত্মগর্ব প্রচারের মজলিসে গর্ব করার মত পূত - পবিত্র বংশধারার এঁরাই অধিকারী ।
“ এ বাসগৃহের তাঁরা ছিলেন ভূষণ , কিন্তু তাঁরা না থাকায় এগুলো এখন বিরান নিঝুম এলাকায় পরিণত হয়েছে ।
“ আমি কথা বলছি , অথচ আমার চোখ থেকে ঝরছে অশ্রুর অবিরাম ধারা । আল্লাহ্ এ বিপদগ্রস্তদের নিজ রহমত থেকে বঞ্চিত না করুন । ”
ইবন হিশাম বলেন :
all অর্থ হল দান । আবূ খিরাশ হুয়ালী বলেন :
عجف أضيافي جميل بن معمر بذى فجر تأوي اليه الآراسل
“ দানশীল ও বিধবাদের আশ্রয়স্থল জামীল ইব্ন মা'মার আমার মেহমানদের অভূক্ত রেখেছে । ”
ইব্ন ইসহাক বলেন : আবুশ শু'স শাজিয়্যাত হলেন হাশিম ইব্ন আবদে মানাফ ।
📄 'সিকায়া' 'রিফাদার' তত্ত্বাবধানে আবদুল মুত্তালিব
‘ সিকায়া ' ‘ রিফাদার ' তত্ত্বাবধানে আবদুল মুত্তালিব
চাচা মুত্তালিবের পর আবদুল মুত্তালিব ইব্ন হাশিম সিকায়া ও রিফাদার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন । এ দায়িত্ব ছাড়া তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ন্যায় কাওমের যাবতীয় দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দেন এবং সামাজিক প্রভাব - প্রতিপত্তি ও মর্যাদায় তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে যান ।