📄 মক্কার শাসকরূপে কুসাই এবং তাঁর মুজাম্মি' নামকরণের কারণ
ইবন হিশাম বলেন : অনেকে ‘ শাদ্দাখ ' - এর স্থলে ‘ শুদাখ ' বলেছেন ।
মক্কার শাসকরূপে কুসাই এবং তাঁর মুজাম্ম ' নামকরণের কারণ
ইব্ন ইসহাক বলেন : তারপর কুসাই বায়তুল্লাহ্ ও মক্কার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন এবং স্ব - গোত্রের লোকদের নিজ নিজ এলাকা থেকে মক্কায় এনে আবাদ করলেন ও তাদের সম্মতিক্রমে স্ব - গোত্রের ও মক্কাবাসীদের শাসকরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন । তবে তিনি সাফওয়ান , আদওয়ান , নাসা আ এবং মুররা ইবন আওফ - এর বংশধর তথা গোটা আরববাসীকে তাদের পূর্ব রীতিনীতিতে বহাল রাখলেন । কেননা তিনি নিজেও এগুলোকে অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় বিষয় বলে মনে করতেন । অবশেষে ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ্ সব কিছু নির্মূল করে দেন । কা'ব ইবন লুআই বংশে কুসাই হলেন প্রথম ব্যক্তি , যিনি শাসন ক্ষমতা এবং স্ব - গোত্রের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য লাভ করেছিলেন । তিনি কা'বাঘরের চাবি সংরক্ষণ , হাজীদের যমযমের পানি পান করানো ও আপ্যায়ন , পরামর্শ সভা পরিচালনা , যুদ্ধের ঝাণ্ডা বহন করা ইত্যাদি মক্কার যাবতীয় মর্যাদাপূর্ণ কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অধিকারী হয়েছিলেন । মক্কাকে তিনি স্ব - গোত্রের মাঝে চার ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন । কুরায়শের প্রত্যেক শাখা গোত্রকে তিনি তাদের পূর্বমর্যাদা প্রদান করেছিলেন । লোকদের ধারণা এই যে , কুরায়শরা হারামে অবস্থিত নিজেদের বাড়ির গাছগুলো কাটতে ভয় পাচ্ছিল । তখন কুসাই নিজের সহযোগীদের নিয়ে নিজ হাতে সেগুলো কেটেছিলেন । কুসাই মক্কার যাবতীয় মর্যাদাজনক কাজ সমন্বিত করেছিলেন । তাই কুরায়শরা তাকে ( ~~~~ ) বা একত্রকারী আখ্যা দিয়েছিল । তাঁর শাসন ছিল লোকদের জন্য কল্যাণপ্রসূ । তাই তার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও কুরায়শদের কোন বিবাহ মজলিস অনুষ্ঠিত হত না , কোন পরামর্শ সভা হত না , শত্রু গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝাণ্ডা অর্পণ করা হত না । কেবলমাত্র কুসাই - এর কোন ছেলেই তা কারো হাতে তুলে দিত । কোন কুরায়শী কন্যার কাঁচুলি পরার বয়স হলে তাঁর ঘরেই সে অনুষ্ঠান হত । সেখানেই কাঁচুলি তৈরি করে তাকে পরিয়ে দেয়া হত । তারপর তিনি নিজে তার বাড়িতে চলে যেতেন । সে কন্যাকে নিয়ে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন । এগুলো তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর কুরায়শদের মাঝে অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কাজ হিসাবে চালু ছিল । কুরায়শদের যাবতীয় সমস্যার মীমাংসার জন্য কা'বার মসজিদের দিকে মুখ করে তিনি একটি পরামর্শ সভা ঘর তৈরি করেছিলেন ।
ইবন হিশাম বলেন , কবির ভাষায় :
قصى لعمري كان يدعى مجمعا × به جمع
الله قبائل من فهر
“ আমার জীবনের কসম ! কুসাইকে যথার্থই মুজাম্মি ' ডাকা হত । কেননা তার মাধ্যমেই আল্লাহ্ পাক ফির বংশের সকল গোত্রকে একত্র করেছিলেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল মালিক ইব্ন রাশিদ তার পিতার সূত্রে আমাকে শুনিয়েছেন , তিনি বলেন , , আমি সাইব ইব্ন খাব্বাব ( রা ) ( byaial asbo খাস কামরার অধিকারী ) -কে বলতে শুনেছি যে , জনৈক ব্যক্তি উমর ইব্ন খাত্তাব ( রা ) -এর খিলাফত আমলে তাঁর কাছে কুসাই ইন কিলাবের প্রসংগ , তার আপন কওমকে ঐক্যবদ্ধ করা , খুযাআহ ও বাকর বংশীয়দের মক্কা থেকে বিতাড়িত করা , বায়তুল্লাহ্র তত্ত্বাবধান ও মক্কার শাসন ক্ষমতা অর্জনের কথা আলোচনা করলে হযরত উমর ( রা ) তা নাকচ করেননি , তা অস্বীকারও করেননি ।
📄 কুসাইয়ের সাহায্যে রিযাহর কবিতা এবং কুসাইয়ের পক্ষ হতে এর জবাব
কুসাইয়ের সাহায্যে রিযাহের কবিতা এবং কুসাইয়ের পক্ষ হতে এর জবাব
ইব্ন ইসহাক বলেন : কুসাই যুদ্ধ - বিগ্রহ থেকে অবসর হলে তার ভাই রিযাহ ইব্ন রাবি আ তাঁর স্ব - গোত্রীয় সাথীদের নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন । রিযাহ কুসাই - এর আহ্বানে সাড়া দেয়া সম্পর্কে বলেন :
“ কুসাই - এর দূত যখন এসে বলল , বন্ধুর ডাকে সাড়া দাও ,
তখন আমরা নিরলসভাবে তার দিকে ঘোড়া দৌড়ালাম ।
“ আমরা ঘোড়ায় চড়ে সারারাত , এমনকি ভোর পর্যন্ত চলতে থাকি , আর দিনের বেলা ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার জন্য লুকিয়ে থাকি ।
“ কুসাই প্রেরিত দূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের ঘোড়াগুলো এমন দ্রুত চলছিল , যেমন পাথর ভক্ষণকারী মুরগী পানির দিকে ছুটে যায় ।
“ আমরা ‘ আশমায ’ গোত্রদ্বয়সহ , প্রত্যেক বড় গোত্র থেকে উত্তম ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে দল গঠন করেছিলাম ।
“ হে ঘোড়ার দল ! তোমাদের কি হল , তোমরা অন্যান্য ঘোড়ার তুলনায় দ্রুত চলেও একরাতে হাজার মাইলের বেশি অতিক্রম করতে পারলে না ?
“ তারপর ঘোড়াগুলো যখন আসজাদ এলাকা অতিক্রম করল , মুতানাখ এলাকা থেকে সহজ পথ ধরল এবং ‘ ওয়ারিকান ' এলাকার এক অংশ থেকে অতিক্রম করে আরজ উপত্যকা অতিক্রম করল , যেখানে একটি গোত্র অবতরণ করেছিল—
“ তখন সে ঘোড়াগুলো কাঁটাবন দিয়ে অতিক্রম করছিল , যা ইতিপূর্বে কোনদিন চোখে দেখিনি । আর এই ঘোড়াগুলো মাররুয - যাত্রান থেকে মনযিল অভিমুখে রাতভর চলতে লাগল ।
“ আমরা প্রসূতি উটের কাছে তার বাচ্চাকে রাখছিলাম , যাতে সেগুলো ডাক শিখে নেয় ।
“ তারপর আমরা যখন মক্কায় পৌঁছলাম , তখন প্রতিটি গোত্রের বীর যোদ্ধাদের শোণিতধারা বইয়ে দিলাম ।
“ সেখানে আমরা ধারালো তরবারির সাহায্যে প্রতি চক্করে এক - এক আঘাতে তাদের মগজ উড়িয়ে দিয়েছি ।
“ আমরা তাদেরকে এমন দ্রুতগামী ঘোড়ার সাহায্যে এভাবে তাড়িয়ে নিচ্ছিলাম , যেমন পরাক্রমশালী বিজেতা পরাজিতদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় ।
“ আমরা খুযা'আ গোত্রের লোকদের তাদের ঘরেই হত্যা করেছি এবং বাকর গোত্রের লোকদেরও । আর আমরা একের পর এক অন্যান্য গোত্রের লোকদেরও হত্যা করেছি ।
“ আমরা তাদের আল্লাহ্ শহর থেকে এমনভাবে নির্বাসিত করেছি , যেন তারা ( এখানকার ) সমতল ভূমিতে কখনো অবতরণ করেনি ।
“ অবশেষে তাদের বন্দীরা সব আবদ্ধ হল লোহার শিকলে । আর প্রত্যেক গোত্র থেকে আমরা আমাদের প্রতিশোধ - স্পৃহা চরিতার্থ করেছি । ”
সা'লাবা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবয়ান ইব্ন হারিস ইব্ন সা'দ ইব্ন হুযায়ম কুযাঈ কুসাই - এর ডাকে সাড়া দেয়া প্রসঙ্গে বলেন :
“ আমরা জিনাব এলাকার উঁচু ভূমি থেকে দুর্বল পাতলা ঘোড়া নিয়ে তিহামার নিচু ভূমির দিকে রওয়ানা হয়ে ঊষর শুষ্ক এক মরুভূমিতে পৌঁছলাম ।
“ কাপুরুষ সূফা গোত্রের লোকেরা যুদ্ধের ভয়ে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাল ।
... “ আর বনূ আলীর লোকেরা যখন আমাদের দেখল , তখন তারা তরবারির দিকে এমনভাবে দৌড়ে গেল , যেমন উট তার বাথানের দিকে দ্রুত দৌড়ে যায় ।
কুসাই ইব্ন কিলাব বলেন : আমি মক্কার রক্ষক লুআই বংশের সন্তান , মক্কায় আমার বাড়ি । সেখানেই আমি লালিত - পালিত হয়েছি ।
বাহা উপত্যকা পর্যন্ত মা'আদ বংশের লোকেরা আমাকে ভালোভাবেই জানে । আর মারওয়া পাহাড়ের প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট । এখানে ' কায়যার ' ও নাবীত - এর সন্তানগণ একত্র না হলে আমি কখনো জয়ী হতে পারতাম না ।
রিযাহ ছিল আমার সাহায্যকারী আর তার জন্য আমি গর্বিত । মৃত্যু পর্যন্ত কোন অত্যাচারের ভয় আমার নেই ।
📄 'রিযাহ', 'নাহদ' ও 'হাওতিকা'র ঘটনা এবং কুসাই-এর কবিতা
“ রিযাহ ' ' নাহদ ' ও ' হাওতিকা'র ঘটনা এবং কুসাই - এর কবিতা
তারপর রিযাহ ইবন রাবী'আ নিজ এলাকায় গিয়ে বসবাস করতে লাগলেন । আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর এবং হুন্ন - এর সন্তান - সন্ততি বেশ ছড়িয়ে দিলেন । এদের সন্তানরাই হল বন্ উযরার দুই গোত্র । রিযাহ দেশে ফিরে আসার পর , তার সাথে কুযা'আ বংশের দুই গোত্রের বন্ নাহদ ইব্ন যায়দ এবং বনূ হাওতিকা ইব্ন আসলুম - এর সাথে কিছুটা মতবিরোধ সৃষ্টি হয় , রিযাহ তাদেরকে হুমকি দিলে তারা এদেশ ছেড়ে ইয়ামানে চলে যায় । আজও তারা ইয়ামানেই আছে । কুসাই ইন কিলাবের যেহেতু বনূ কুযা'আর সাথে হৃদ্যতা ছিল , তাই তাঁর কামনা ছিল , তারা নিজ এলাকাতেই থেকে উন্নতি লাভ করুক । কিন্তু রিযার - এ আচরণে কুসাই সন্তুষ্ট হতে পারেননি । অন্যদিকে আবার রিযাহের সঙ্গে তাঁর ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং তিনি ছিলেন তাঁর বিপদের বন্ধু । কারণ যখন তিনি ডেকেছিলেন , তখন রিযাহ সাড়া দিয়েছিলেন । তাই তিনি বলেন :
“ কে আছে যে আমার এ বার্তা রিযাহকে পৌঁছে দেবে । দু'টি কারণে আমি তোমাকে তিরস্কার করছি । প্রথমত বনূ নাহদ ইব্ন যায়দের ব্যাপারে তোমাকে তিরস্কার করছি , কেননা তুমি তাদের এবং আমার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছ । দ্বিতীয়ত আর ভর্ৎসনা করছি বনূ হাওতিকা ইব্ন আসলুমের ব্যাপারে । তাদের সাথে মন্দ আচরণ করা মানে আমার সাথেই মন্দ আচরণ করা । ”
ইবন হিশাম বলেন : অনেকের মতে কবিতাগুলো যুহায়র ইব্ন জানাব কালবীর ।
📄 কুসাই-এর বার্ধক্য
কুসাই - এর বার্ধক্য
ইবন ইসহাক বলেন : কুসাই - এর প্রথম সন্তান ছিল আবদুদ্দার । কিন্তু ' আবদে মানাফ পিতার আমলেই মর্যাদায় ও সর্ব অভিজ্ঞতায় শীর্ষস্থান লাভ করেছিলেন । আবদুল উয্যা ও আবদ নামে তার আরও দু'ছেলে ছিল । কুসাই বার্ধক্যে উপনীত হলে তিনি আবদুদ্দারকে বললেন : বৎস , আল্লাহর শপথ , তারা তোমাদের থেকে যতই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করুক না কেন , আমি তোমাকে তাদের পিছনে থাকতে দেব না । তুমি দরজা খুলে না দিলে তাদের কেউ কা'বাঘরে প্রবেশ করতে পারবে না । কুরায়শের কোন যুদ্ধের ঝাণ্ডা অর্পণ করা হবে না , যতক্ষণ না তুমি তা নিজ হাতে কারো হাতে তুলে দাও । মক্কাতে তোমার পাত্র ছাড়া কেউ যমযমের পানি পান করবে না । হাজীদের কেউ তোমার যিয়াফত ছাড়া অন্য কারো যিয়াফত খাবে না । কুরায়শদের কোন সমস্যার মীমাংসা তোমার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও হবে না ।
কুসাই নিজের ' দারুন নাদওয়া ' নামের ঘরটি তাকে প্রদান করলেন । সেখানেই কুরায়শরা তাদের নিজেরদের যাবতীয় বিয়য়ের ফয়সালা করত । কাবাঘরের চাবি সংরক্ষণ , হাজীদের যমযমের পানি পান করানো , মেহমানদারী , পরামর্শ সভা , যুদ্ধের ঝাণ্ডা প্রদান ইত্যাদির সব কর্তৃত্ব তিনি তাঁর হাতে সঁপে দিলেন ।