📄 খুযা'আ ও বাকর গোত্রের সাথে কুসাই-এর যুদ্ধ এবং ইয়া'মার ইন্ন'আওফের সালিসী
খুযা'আ ও বাকর গোত্রের সাথে কুসাই - এর যুদ্ধ এবং ইয়া‘মার ইবন ‘ আওফের সালিসী
এ পরিস্থিতি দেখে বনূ খুযা'আ ও বাকর আশংকা করল যে , কা'বাঘর ও মক্কার অন্যান্য বিষয়ে কুসাই অচিরেই আমাদের জন্যও বাধা হয়ে দাঁড়াবে , যেমন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সূফার অন্যরা , তাই তারা কুসাই - এর সংগ ত্যাগ করল । তখন কুসাই সকলকে একত্র করে নিজেই প্রথমে আক্রমণ করে বসলেন । তাঁর ভাই রিযাহ ইব্ন রাবিআহ কুযাআ গোত্রের সকল সাথীকে নিয়ে তাঁর সাথে যোগ দিল । অপরদিকে খুযাআ ও বাকর গোত্র কুসাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হল । তখন তুমুল যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রচুর সৈন্যক্ষয় হওয়ার পর তারা সন্ধি করার মনস্থ করল এবং আরবেরই এক ব্যক্তি ইয়া'মার ইবন আওফ ইব্ন কা'ব ইব্ন আমির ইব্ন লায়স ইব্ন বাকর ইব্ন আবদে মানাত ইব্ন কিনানাকে সালিস মনোনীত করল । তিনি ফায়সালা করলেন যে , পবিত্র কা'বা এবং মক্কার যাবতীয় বিষয়ে খুযাআ গোত্রের চেয়ে কুসাই অধিক হকদার । এ যুদ্ধে কুসাই কর্তৃক খুযা'আ ও বাকর গোত্রের নিহত লোকদের কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না । পক্ষান্তরে কুরায়শ বংশের খুযা'আ ও বাকর গোত্রের এবং কিনানা ও কুযা'আ গোত্র কর্তৃক নিহতদের পূর্ণ দিয়ত ( রক্তপণ্য ) দিতে হবে । আর কা'বা ও মক্কার ব্যাপারে কুসাই সম্পূর্ণ স্বাধীন ।
📄 ইয়া'মারের শাদ্দাখ নামকরণের কারণ
ইয়ামারের শাদ্দাখ নামকরণের কারণ
সেদিন হতে ইয়া'মার ইবন আওফ শাদ্দাখ উপাধি লাভ করেন । কেননা তিনি সেদিন রক্তপণ নাকচ করে দেন ।
📄 মক্কার শাসকরূপে কুসাই এবং তাঁর মুজাম্মি' নামকরণের কারণ
ইবন হিশাম বলেন : অনেকে ‘ শাদ্দাখ ' - এর স্থলে ‘ শুদাখ ' বলেছেন ।
মক্কার শাসকরূপে কুসাই এবং তাঁর মুজাম্ম ' নামকরণের কারণ
ইব্ন ইসহাক বলেন : তারপর কুসাই বায়তুল্লাহ্ ও মক্কার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন এবং স্ব - গোত্রের লোকদের নিজ নিজ এলাকা থেকে মক্কায় এনে আবাদ করলেন ও তাদের সম্মতিক্রমে স্ব - গোত্রের ও মক্কাবাসীদের শাসকরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন । তবে তিনি সাফওয়ান , আদওয়ান , নাসা আ এবং মুররা ইবন আওফ - এর বংশধর তথা গোটা আরববাসীকে তাদের পূর্ব রীতিনীতিতে বহাল রাখলেন । কেননা তিনি নিজেও এগুলোকে অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় বিষয় বলে মনে করতেন । অবশেষে ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ্ সব কিছু নির্মূল করে দেন । কা'ব ইবন লুআই বংশে কুসাই হলেন প্রথম ব্যক্তি , যিনি শাসন ক্ষমতা এবং স্ব - গোত্রের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য লাভ করেছিলেন । তিনি কা'বাঘরের চাবি সংরক্ষণ , হাজীদের যমযমের পানি পান করানো ও আপ্যায়ন , পরামর্শ সভা পরিচালনা , যুদ্ধের ঝাণ্ডা বহন করা ইত্যাদি মক্কার যাবতীয় মর্যাদাপূর্ণ কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অধিকারী হয়েছিলেন । মক্কাকে তিনি স্ব - গোত্রের মাঝে চার ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন । কুরায়শের প্রত্যেক শাখা গোত্রকে তিনি তাদের পূর্বমর্যাদা প্রদান করেছিলেন । লোকদের ধারণা এই যে , কুরায়শরা হারামে অবস্থিত নিজেদের বাড়ির গাছগুলো কাটতে ভয় পাচ্ছিল । তখন কুসাই নিজের সহযোগীদের নিয়ে নিজ হাতে সেগুলো কেটেছিলেন । কুসাই মক্কার যাবতীয় মর্যাদাজনক কাজ সমন্বিত করেছিলেন । তাই কুরায়শরা তাকে ( ~~~~ ) বা একত্রকারী আখ্যা দিয়েছিল । তাঁর শাসন ছিল লোকদের জন্য কল্যাণপ্রসূ । তাই তার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও কুরায়শদের কোন বিবাহ মজলিস অনুষ্ঠিত হত না , কোন পরামর্শ সভা হত না , শত্রু গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝাণ্ডা অর্পণ করা হত না । কেবলমাত্র কুসাই - এর কোন ছেলেই তা কারো হাতে তুলে দিত । কোন কুরায়শী কন্যার কাঁচুলি পরার বয়স হলে তাঁর ঘরেই সে অনুষ্ঠান হত । সেখানেই কাঁচুলি তৈরি করে তাকে পরিয়ে দেয়া হত । তারপর তিনি নিজে তার বাড়িতে চলে যেতেন । সে কন্যাকে নিয়ে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন । এগুলো তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর কুরায়শদের মাঝে অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কাজ হিসাবে চালু ছিল । কুরায়শদের যাবতীয় সমস্যার মীমাংসার জন্য কা'বার মসজিদের দিকে মুখ করে তিনি একটি পরামর্শ সভা ঘর তৈরি করেছিলেন ।
ইবন হিশাম বলেন , কবির ভাষায় :
قصى لعمري كان يدعى مجمعا × به جمع
الله قبائل من فهر
“ আমার জীবনের কসম ! কুসাইকে যথার্থই মুজাম্মি ' ডাকা হত । কেননা তার মাধ্যমেই আল্লাহ্ পাক ফির বংশের সকল গোত্রকে একত্র করেছিলেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল মালিক ইব্ন রাশিদ তার পিতার সূত্রে আমাকে শুনিয়েছেন , তিনি বলেন , , আমি সাইব ইব্ন খাব্বাব ( রা ) ( byaial asbo খাস কামরার অধিকারী ) -কে বলতে শুনেছি যে , জনৈক ব্যক্তি উমর ইব্ন খাত্তাব ( রা ) -এর খিলাফত আমলে তাঁর কাছে কুসাই ইন কিলাবের প্রসংগ , তার আপন কওমকে ঐক্যবদ্ধ করা , খুযাআহ ও বাকর বংশীয়দের মক্কা থেকে বিতাড়িত করা , বায়তুল্লাহ্র তত্ত্বাবধান ও মক্কার শাসন ক্ষমতা অর্জনের কথা আলোচনা করলে হযরত উমর ( রা ) তা নাকচ করেননি , তা অস্বীকারও করেননি ।
📄 কুসাইয়ের সাহায্যে রিযাহর কবিতা এবং কুসাইয়ের পক্ষ হতে এর জবাব
কুসাইয়ের সাহায্যে রিযাহের কবিতা এবং কুসাইয়ের পক্ষ হতে এর জবাব
ইব্ন ইসহাক বলেন : কুসাই যুদ্ধ - বিগ্রহ থেকে অবসর হলে তার ভাই রিযাহ ইব্ন রাবি আ তাঁর স্ব - গোত্রীয় সাথীদের নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন । রিযাহ কুসাই - এর আহ্বানে সাড়া দেয়া সম্পর্কে বলেন :
“ কুসাই - এর দূত যখন এসে বলল , বন্ধুর ডাকে সাড়া দাও ,
তখন আমরা নিরলসভাবে তার দিকে ঘোড়া দৌড়ালাম ।
“ আমরা ঘোড়ায় চড়ে সারারাত , এমনকি ভোর পর্যন্ত চলতে থাকি , আর দিনের বেলা ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার জন্য লুকিয়ে থাকি ।
“ কুসাই প্রেরিত দূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের ঘোড়াগুলো এমন দ্রুত চলছিল , যেমন পাথর ভক্ষণকারী মুরগী পানির দিকে ছুটে যায় ।
“ আমরা ‘ আশমায ’ গোত্রদ্বয়সহ , প্রত্যেক বড় গোত্র থেকে উত্তম ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে দল গঠন করেছিলাম ।
“ হে ঘোড়ার দল ! তোমাদের কি হল , তোমরা অন্যান্য ঘোড়ার তুলনায় দ্রুত চলেও একরাতে হাজার মাইলের বেশি অতিক্রম করতে পারলে না ?
“ তারপর ঘোড়াগুলো যখন আসজাদ এলাকা অতিক্রম করল , মুতানাখ এলাকা থেকে সহজ পথ ধরল এবং ‘ ওয়ারিকান ' এলাকার এক অংশ থেকে অতিক্রম করে আরজ উপত্যকা অতিক্রম করল , যেখানে একটি গোত্র অবতরণ করেছিল—
“ তখন সে ঘোড়াগুলো কাঁটাবন দিয়ে অতিক্রম করছিল , যা ইতিপূর্বে কোনদিন চোখে দেখিনি । আর এই ঘোড়াগুলো মাররুয - যাত্রান থেকে মনযিল অভিমুখে রাতভর চলতে লাগল ।
“ আমরা প্রসূতি উটের কাছে তার বাচ্চাকে রাখছিলাম , যাতে সেগুলো ডাক শিখে নেয় ।
“ তারপর আমরা যখন মক্কায় পৌঁছলাম , তখন প্রতিটি গোত্রের বীর যোদ্ধাদের শোণিতধারা বইয়ে দিলাম ।
“ সেখানে আমরা ধারালো তরবারির সাহায্যে প্রতি চক্করে এক - এক আঘাতে তাদের মগজ উড়িয়ে দিয়েছি ।
“ আমরা তাদেরকে এমন দ্রুতগামী ঘোড়ার সাহায্যে এভাবে তাড়িয়ে নিচ্ছিলাম , যেমন পরাক্রমশালী বিজেতা পরাজিতদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় ।
“ আমরা খুযা'আ গোত্রের লোকদের তাদের ঘরেই হত্যা করেছি এবং বাকর গোত্রের লোকদেরও । আর আমরা একের পর এক অন্যান্য গোত্রের লোকদেরও হত্যা করেছি ।
“ আমরা তাদের আল্লাহ্ শহর থেকে এমনভাবে নির্বাসিত করেছি , যেন তারা ( এখানকার ) সমতল ভূমিতে কখনো অবতরণ করেনি ।
“ অবশেষে তাদের বন্দীরা সব আবদ্ধ হল লোহার শিকলে । আর প্রত্যেক গোত্র থেকে আমরা আমাদের প্রতিশোধ - স্পৃহা চরিতার্থ করেছি । ”
সা'লাবা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবয়ান ইব্ন হারিস ইব্ন সা'দ ইব্ন হুযায়ম কুযাঈ কুসাই - এর ডাকে সাড়া দেয়া প্রসঙ্গে বলেন :
“ আমরা জিনাব এলাকার উঁচু ভূমি থেকে দুর্বল পাতলা ঘোড়া নিয়ে তিহামার নিচু ভূমির দিকে রওয়ানা হয়ে ঊষর শুষ্ক এক মরুভূমিতে পৌঁছলাম ।
“ কাপুরুষ সূফা গোত্রের লোকেরা যুদ্ধের ভয়ে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাল ।
... “ আর বনূ আলীর লোকেরা যখন আমাদের দেখল , তখন তারা তরবারির দিকে এমনভাবে দৌড়ে গেল , যেমন উট তার বাথানের দিকে দ্রুত দৌড়ে যায় ।
কুসাই ইব্ন কিলাব বলেন : আমি মক্কার রক্ষক লুআই বংশের সন্তান , মক্কায় আমার বাড়ি । সেখানেই আমি লালিত - পালিত হয়েছি ।
বাহা উপত্যকা পর্যন্ত মা'আদ বংশের লোকেরা আমাকে ভালোভাবেই জানে । আর মারওয়া পাহাড়ের প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট । এখানে ' কায়যার ' ও নাবীত - এর সন্তানগণ একত্র না হলে আমি কখনো জয়ী হতে পারতাম না ।
রিযাহ ছিল আমার সাহায্যকারী আর তার জন্য আমি গর্বিত । মৃত্যু পর্যন্ত কোন অত্যাচারের ভয় আমার নেই ।