📄 ইয়ামানে পারসিকদের অবস্থানকাল
ইয়ামানে পারসিকদের অবস্থানকাল
ইব্ন ইসহাক বলেন : ওয়াহরিয ও পারসিকরা ইয়ামানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং আজকের ইয়ামানবাসী তাদেরই বংশধর । আরিয়াতের ইয়ামানে প্রবেশ থেকে শুরু করে মাসরূক ইব্ন আবরাহার নিহত হওয়া এবং হাবশীদের সেখান থেকে বহিষ্কৃত হওয়া পর্যন্ত মোট ৭২ বছর তাদের রাজত্ব সেখানে স্থায়ী ছিল । তাদের মোট চারজন এ রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয় । আরিয়াত , আবরাহা , ইয়াকসুম ইব্ন আবরাহা এবং মাসরূক ইব্ন আবরাহা । ইবন হিশাম বলেন : ওয়াহরিযের মৃত্যুর পর পারস্য সম্রাট ওয়াহরিযের পুত্র মারযুবানকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করেন । মারযুবানের মৃত্যুর পর মারযুবানের পুত্র তাইনুজানকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করেন । তাইনুজানের পরে তার ছেলেকে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয় । পরে তাকে পদচ্যুত করে বাযানকে শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয় । এই বাযানের আমলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে আল্লাহ্ তা'আলা নবীরূপে প্রেরণ করেন ।
📄 মুহাম্মদ (সা) কর্তৃক পারস্য সম্রাটের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী
মুহাম্মদ (সা:) কর্তৃক পারস্য সম্রাটের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী
ইবন হিশাম বলেন : আমি যুহরী থেকে জানতে পেরেছি যে , পারস্য সম্রাট ইয়ামানের শাসক বাযানকে লিখেছিলেন যে , শুনতে পেলাম মক্কায় কুরায়শ বংশে এক ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছে , যে নিজেকে নবী মনে করে । তুমি তার কাছে যাও এবং তাকে তাওবা করতে বল । যদি সে তাওবা করে , তবে তো ভাল । অন্যথায় আমার কাছে তার মাথা কেটে পাঠিয়ে দাও । বাষান পারস্য সম্রাটের এ চিঠি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে পাঠিয়ে দিল । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাকে চিঠির জবাব এভাবে দিলেন : “ আল্লাহ্ আমার কাছে ওয়াদা করেছেন যে , পারস্য সম্রাট অমুক মাসের অমুক দিন নিহত হবে । ” বাযান চিঠি পেয়ে কি ঘটে তা দেখার জন্য অপেক্ষায় রইল । সে বলল : এ ব্যক্তি যদি সত্যিই নবী হয়ে থাকে , তা হলে সে যা বলেছে তা অচিরেই ঘটবে । পরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) যে দিনের কথা বলেছিলেন , ঠিক সে দিনই আল্লাহ্ কিসরাকে হত্যা করান । ইবন হিশাম বলেন : খসরু পারভেজ নিজ পুত্র শেরাওয়াই - এর হাতে নিহত হন । কবি খালিদ ইবন হিক শায়বানী পারস্য সম্রাটের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলেন : “ গোশত যেমন টুকরো টুকরো করা হয় , তেমনিভাবে পারস্য সম্রাটকে তার ছেলেরা তরবারি দিয়ে টুকরো টুকরো করেছে । প্রত্যেক জীবেরই মৃত্যু আছে , কাজেই তার কাছেও মৃত্যু এলো । ”
**টিকাঃ**
১. এ সময়কার পারস্য সম্রাট ছিলেন সম্রাট নওশেরওয়ার পৌত্র এবং সম্রাট হুরমুখের পুত্র পারভেজ । পারভেজ শব্দের অর্থ হলো সৌভাগ্যশালী বা বিজেতা । সূরা রূমের প্রথম আয়াতে পারস্য কর্তৃক রোম জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে এবং এ সূরা নাযিল হবার সময় পারভেজই রোম জয় করেছিল । কথিত আছে যে , পারভেজ একদিন স্বপ্ন দেখল , সে আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত এবং তিনি তাকে বলছেন : তোমার যথাসর্বস্ব লাঠিধারীর কাছে সোপর্দ করে দাও । এ স্বপ্ন দেখার পর থেকে সে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে । যখন নুমান ইবন মুনযির তাকে জানলেন যে , আরবের তিহামা অঞ্চলে একজন নবীর আবির্ভাব হয়েছে , তখন সে বুঝল যে , তার কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা একদিন ঐ নবীর হাতেই চলে যাবে । সে শাসনকার্য চালিয়ে যেতে থাকে । তার কাছেই নবী (সা:) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন । পারভেজের পৌত্র ইয়াযদগিরদ ছিল । পারস্যের শেষ সম্রাট । হযরত উমর ( রা ) -এর হাতে তার রাজত্বের অবসান ঘটে এবং হযরত উসমান ( রা ) -এর শাসন আমলে প্রথমদিকে পারস্যের ' মারব ' নামক স্থানে পলাতক থাকা অবস্থায় নিহত হয় ।
📄 বাযানের ইসলাম গ্রহণ
বাযানের ইসলাম গ্রহণ
যুরী বলেন , পারস্য সম্রাটের নিহত হওয়ার সংবাদ যখন বাযানের কাছে পৌঁছল , তখন সে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে তার নিজের এবং তার ইরানী সাথীদের ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়ে দিল । তার দূতেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে জিজ্ঞেস করল , ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! আমরা কাদের সংগে যুক্ত হব ? তিনি বললেন , তোমরা আমাদের তথা আমার পরিবারেরই সাথে যুক্ত হবে । ইবন হিশাম বলেন , আমি যুহরী থেকে জানতে পেরেছি যে , এ কারণেই হযরত সালমান ফারসীকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছিলেন : “ সালমান আমার পরিবারেরই একজন । ”
ইবন হিশাম বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর আগমন সম্পর্কেই সাতীহ্ এ বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে , একজন পুণ্যবান নবী , যাঁর কাছে ঊর্ধ্বাকাশ থেকে ওহী আসবে । " আর শিক বলেছিল : “ একজন নবীর আগমনে এ বিদেশী শাসনের অবসান ঘটবে , যিনি সত্য ও ন্যায় সহকারে আবির্ভূত হবেন । অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও গুণবান ব্যক্তি হবেন , তাঁর জাতি কিয়ামত পর্যন্ত রাজত্ব তথা শাসন ক্ষমতা ভোগ করবে । ”
**টিকাঃ**
১. সপ্তম হিজরীর ১০ ই জমাদিউল আউয়াল সোমবার দিবাগত রাতে পারস্য সম্রাট পারভেজ তার ছেলেদের হাতে নিহত হয় । অপরদিকে বাযান ১০ ম হিজরীতে ইয়ামানে ইসলাম গ্রহণ করেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সেখানকার ইরানী বংশোদ্ভূত লোকদের এ বছরেই ইসলামের দাওয়াত দেন । এ সময় যারা ইসলাম গ্রহণ করেন , তাদের মাঝে ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহ , ইবন মারহ ইবন যুকরাব , তাউস , যাদাওয়াহ এবং ফীরোয অন্যতম । শেষোক্ত দুই ব্যক্তি ইয়ামানের ভণ্ড নবী আসওয়াদ আনাসীকে হত্যা করেন ।
২. ইতিপূর্বে ফায়মিয়ূন ও ইব্ন সামিরের ঘটনা থেকে জানা গেছে যে , হিময়ারীরা ধর্মপ্রাণ ছিল ।
📄 ইয়ামানে পাথরে খোদিত ভবিষ্যদ্বাণী
ইয়ামানে পাথরে খোদিত ভবিষ্যদ্বাণী
: ইবন ইসহাক বলেন অতি প্রাচীনকালের যবুর গ্রন্থের উক্তি ইয়ামানের একটি পাথরে খোদিত ছিল : “ ইয়ামানের রাজত্ব কার ? ধর্মপ্রাণ হিময়ার গোত্রের ইয়ামানের রাজত্ব কার ? দুর্জন হাবশীদের ? ইয়ামানের রাজত্ব কার ? চির স্বাধীন পারসিকদের । ইয়ামানের রাজত্ব কার ? বণিক কুরায়শ গোত্রের । ”
কবি আশা শিক ও সাতীহের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়া সম্পর্কে তার কবিতায় উল্লেখ করেছেন । তিনি বলেন : ইয়ামামার কবি যারকা যেমন তীক্ষ্ণদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন , সাতীহ্ও তেমন ছিল । উল্লেখ্য যে , যারকা তিন মাইল দূর থেকে সকলকে চিনতে পারত ।
**টিকাঃ**
১. ইয়ামানে যুদ্ধ - বিগ্রহ , দাংগা - হাংগামা ও রক্তপাত ঘটানোর জন্যই হাবশীদের দুর্জয় বলা হয়েছে । তারা কা'বা শরীফকেও ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল । শেষ যামানায় কুরআন উঠে যাওয়ার পর তারা কা'বাকে ধ্বংস করবে । তখন মানুষের হৃদয় থেকে ঈমানও উঠে যাবে । আবূ দাউদ শরীফে দুর্বল সনদে এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন : হাবশীদের এড়িয়ে চল , যতক্ষণ তারা তোমাদের এড়িয়ে চলে । কেননা কা'বার গুপ্তধন কেবল একজন হাবশীই বের করবে ।
২. চির স্বাধীন পারসিক বলার কারণ এই যে , পৃথিবীতে মানব বসতির সূচনা থেকেই পারস্যে পুরুষানুক্রমিক রাজতন্ত্র চলে আসছে । ইরানীরা দাবি করে যে , জিয়োমিরতের আমল থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা:) -এর আবির্ভাবকাল পর্যন্ত তারা কোন বিদেশী রাজার অধীনও হয়নি এবং কোন বিদেশী শাসককে করও দেয়নি ।