📄 সায়ফ ইব্ন যূ-ইয়াযানের বিদ্রোহ ও ওহরীযের রাজত্ব লাভ
আবরাহার মৃত্যুর পর তার পুত্রদ্বয়ের রাজত্ব
ইবন ইসহাক বলেন : আবরাহার মৃত্যুর পর ইয়াকসুম ইব্ন আবraha এবং তারপর তার ভাই মাসরূক ইব্ন আবরাহা ইয়ামানে হাবশীদের বাদশাহ হন ।
সায়ফ ইব্ন যূ - ইয়াযানের বিদ্রোহ ও ওহরিযের রাজত্ব লাভ
ইয়ামানবাসীর ওপর আবিসিনীয় শাসকদের যুলুম - নির্যাতন যখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিল , তখন সায়ফ ইব্ন ঘূ - ইয়াযান হিময়ারী ওরফে আবূ মুররাহ্ বিদ্রোহ ঘোষণা করল । সে রোম সম্রাট সীজারের কাছে উপস্থিত হয়ে আবিসিনীয়দের যুলুম - শোষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল । সে সম্রাটকে বলল : আমাদের এই দুঃসহ অবস্থা থেকে রক্ষা করুন এবং আপনি নিজেই ওদের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করুন এবং রোম থেকে অন্য যে কোন লোককে ইয়ামানের শাসক করে পাঠান । কিন্তু রোম সম্রাট তার অভিযোগে কর্ণপাত করলেন না । ফলে , সে নুমান ইব্ন মুনযিরের কাছে গেল । তিনি হীরাতে ইরান সম্রাটের গভর্নর ছিলেন এবং সেই সাথে এর সন্নিহিত ইরাকী অঞ্চলও তার শাসনাধীন ছিল । নুমানের কাছে আবিসিনীয়দের যুলুমের কথা জানালে নুমান বলল : আমি প্রতি বছর একবার ইরান সম্রাটের সাথে দেখা করে থাকি । তুমি এখানে অবস্থান কর ও সেই সময়ের অপেক্ষা কর । সায়ফ তাই করল । তারপর যথাসময়ে তাকে নিয়ে পারস্য সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হল । পারস্য সম্রাট স্বীয় রাজসভায় বসতেন । সেখানে তার বিশালকায় মুকুট ' থাকতো । এই মুকুট ৩৩ মণ ( অর্থাৎ ২৬০ দিরহাম ) ওজনের জিনিস মাপার ‘ কানকাল ' - এর সমান ছিল বলে কথিত আছে । তাতে মণি - মুক্তা ও সোনা - রূপা খচিত ছিল । একটি সোনার শিকল দিয়ে তা লটকানো থাকত এবং তা ঐ মজলিসের একটি তাকের সাথে যুক্ত ছিল । সম্রাট এই মুকুটের ভার মাথায় বহন করতে সক্ষম ছিলেন না । মজলিসে বসার সময় তিনি কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতেন । তারপর নিজের কাপড়ে ঢাকা মাথাকে ঝুলন্ত মুকুটের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতেন । তারপর মজলিসের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে তিনি মাথার কাপড় খুলে ফেলতেন । তখন তাকে এমন ভয়ংকর দেখাত যে , যে ব্যক্তি তাকে আগে কখনো দেখেনি , সে দেখামাত্র ভয়ে উপুড় হয়ে প্রণিপাত করত । সায়ফ ইব্ন যু - ইয়াযানও তার দরবারে গিয়ে উপুড় হয়ে প্রণিপাত করল ।
**টিকাঃ**
১. কথিত আছে : এ মুকুটটি সম্রাট ইয়াদগিরদ ইব্ন শাহরিয়ারের পরাজয়ের পর তার কাছ থেকে ছিনিয়ে হযরত উমর ইবন খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে অর্পণ করা হয় । ইয়াযদগিরদ এটি পেয়েছিল তার দাদা নওশেরওয়া থেকে । হযরত উমর ( রা ) এই মুকুট বিশিষ্ট সাহাবী সুরাকা ইব্ন মালিক মুদলিজীর মাথায় পরিয়ে দেন । তারপর তাকে বলেন : বল , আল্লাহ্র জন্য সকল প্রশংসা , যিনি রাজাধিরাজ পারস্য সম্রাটের মুকুট ছিনিয়ে আনলেন এবং তা বনূ মুদলিজের বেদুঈন সুরাকার মাথায় স্থাপন করলেন । আর এটা ইসলামের গৌরব ও বরকত , আমাদের শক্তিতে নয় । হযরত উমর ( রা ) এটা সুরাকাকে এজন্য দিলেন যে , একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সুরাকাকে বলেছিলেন : “ হে সুরাকা , ইরান সম্রাটের মুকুট যদি তোমার মাথায় পরানো হয় , তাহলে তোমার কেমন লাগবে ? ”
📄 সায়ফের প্রতি পারস্য সম্রাটের সাহায্য
সায়ফের প্রতি পারস্য সম্রাটের সাহায্য
ইব্ন হিশাম বলেন : আমার কাছে আবূ উবায়দা বর্ণনা করেছেন যে , যখন সায়ফ ইন যূ - ইয়াযান পারস্য সম্রাটের দরবারে প্রবেশ করল , তখন মাথা নিচু করল । সম্রাট তা দেখে বললেন : এই নির্বোধ লোকটা এত উঁচু দরজা দিয়ে আমার দরবারে প্রবেশ করার সময়ও কেন মাথা নিচু করল ? সায়ফকে সম্রাট যা বলেছেন , তা জানান হলে সে বলল : আমার দুশ্চিন্তার কারণেই এটা করেছি । কারণ মনে দুশ্চিন্তা থাকলে দুনিয়ার সব কিছুই ছোট ও সংকীর্ণ মনে হয় ।
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর সে সম্রাটকে বলল : হে সম্রাট ! আমাদের দেশে বিদেশী হানাদাররা চড়াও হয়েছে । পারস্য সম্রাট বললেন : তারা কোন দেশী , আবিসিনীয় , না সিন্ধী ? সে বলল আবিসিনীয় । আমি এসেছি আপনার সাহায্য চাইতে । আমার দেশকে আপনি নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করে নিন । সম্রাট বললেন : তোমার দেশ আমার সাম্রাজ্যের সীমানা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত ; অথচ তা তেমন সম্পদশালী নয় । এমতাবস্থায় আমি সুদূর পারস্য থেকে আরবে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাই না । আমার এর প্রয়োজনও নেই । তারপর তাকে দশ হাজার দিরহাম সাহায্য দিলেন । কিছু উৎকৃষ্ট পোশাক - পরিচ্ছদও দিলেন । সayফ এ দশ হাজার দিরহাম নিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে সেখানেই জনসাধারণের মধ্য বিতরণ করা শুরু করল । এ খবর সম্রাটের কানে গেলে তিনি বললেন : এতো একটা অসাধারণ মানুষ দেখছি ! তারপর তাকে তাঁর দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন : তুমি রাজার কাছ থেকে সাহায্য নিতে এসেছ , অথচ সাহায্য পেয়ে তা রাজার লোকদের মধ্যেই বন্টন করছ ? সায়ফ বলল : এসব দিয়ে আমি কি করব ? আমি যে দেশ থেকে এসেছি তার পাহাড় - পর্বত সোনা - রূপায় পরিপূর্ণ । আমি সেই সম্পদের প্রতিই অধিকতর আগ্রহী । এ কথা শুনে সম্রাট তার উযীর - নাযীর ও সভাসদদের ডাকলেন এবং তাদেরকে বললেন : এই লোক যে পরিস্থিতির সম্মুখীন এবং যে উদ্দেশ্যে এসেছে , সে সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কি ? তাদের একজন বললেন : হে সম্রাট ! আপনার কারাগারে অনেক বন্দী আছে , যাদেরকে আপনি হত্যা করার জন্য আটকে রেখেছেন । ওদেরকে এ ব্যক্তির সাথে পাঠিয়ে দিলে মন্দ হয় না । ওরা যদি যুদ্ধ করে মারা পড়ে , তাহলে আপনি ওদের যে পরিণতি চেয়েছিলেন , সেটাই সফল হবে । আর যদি তারা বিজয়ী হয় , তা হলে আপনার রাজ্যের সীমানা কিছুটা বাড়বে । পারস্য সম্রাট এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং সমস্ত কারাবন্দীকে সায়ফের সাথে পাঠিয়ে দিলেন । এদের মোট সংখ্যা ছিল আটশত ।
📄 সায়ফের বিজয়
সায়ফের বিজয়
সম্রাট ওয়াহরিয় নামক একজন বন্দীকে অন্য সকল বন্দীর সেনাপতি বানিয়ে দিলেন । সে ছিল সকলের মাঝে প্রবীণ এবং সম্ভ্রান্ত । তারা আটটি জাহাজে করে রওয়ানা দিল । পথে দুটো জাহাজ সমুদ্রে ডুবে গেল । বাকী ছয়টি জাহাজ এসে উপকূলে ভিড়ল । তারপর সায়ফ নিজের গোত্রের যত বেশি সম্ভব লোকজনকে ওয়াহরিযের হাতে ন্যস্ত করল এবং তাকে বলল : আমার জনশক্তিকে তোমার জনশক্তির সাথে সংযুক্ত করে দিলাম ; যতক্ষণ না আমরা সবাই বিজয়ী হব অথবা সবাই মারা যাব । ওয়াহরিয বলল : ঠিকই বলেছেন । এ সময় ইয়ামানের রাজা আবরাহার ছেলে মাসরূক সসৈন্যে এসে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হল । ওয়াহরিয তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিজের এক ছেলেকে পাঠাল । তার উদ্দেশ্য ছিল মাসরূকের বাহিনীর রণদক্ষতা পরখ করা । কিন্তু ওয়াহরিযের ছেলে যুদ্ধে নিহত হল । এতে তার ক্রোধ আরো বেড়ে গেল । তারপর যখন উভয় বাহিনী মুখোমুখি হল , তখন ওয়াহরিয বলল : প্রতিপক্ষের রাজাকে দেখিয়ে দাও । সৈন্যরা বলল : হাতির পিঠে এক ব্যক্তিকে দেখছেন না , যার মাথায় মুকুট রয়েছে এবং তার দুই চোখের মাঝখানে একটি লাল মুক্তা রয়েছে ? সে বলল : হ্যাঁ , দেখেছি । সৈন্যরা বলল : ঐ লোকটিই ওদের রাজা । এরপর সে সৈন্যদের বলল : তোমরা ওকে এড়িয়ে চল । ফলে , সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করল । এরপর সে জিজ্ঞেস করল : এখন দেখ তো , সে কিসের উপর আরোহণ করে আছে ? সৈন্যরা বলল : সেতো এখন ঘোড়ার পিঠে । ওয়াহরিয বলল : তোমরা ওকে এড়িয়ে চল । এরপর সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রইল । কিছুক্ষণ পর ওয়াহরিয বলল : এখন দেখ তো , সে কিসের পিঠের ওপর ? তারা বলল , এখন সে খচ্চরের পিঠে বসে রয়েছে । ওয়াহরিয বলল : খচ্চর তো গাধার বাচ্চা , সে যখন গাধার বাচ্চার পিঠে চড়েছে , তখন তার পতন ও তার রাজত্বের অবসান আসন্ন । আমি তাকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ব । এরপর যদি দেখ , ইয়ামানরাজের সহচররা ছুটাছুটি করছে না , তাহলে তোমরা আমার আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত স্থির হয়ে থাকবে । কেননা রাজার সহচরদের স্থির থাকার অর্থ এই যে , আমার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে । আর যদি দেখ যে , রাজার বাহিনী তার চারপাশে বৃত্তের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে , তাহলে বুঝবে যে , আমার তীর লক্ষ্যভেদ করেছে এবং তোমরা তৎক্ষণাৎ তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে । এরপর সে ধনুক সংযোজন করল এবং আবরাহার ছেলে ইয়ামান রাজ মাসরূকের দুই চোখের মধ্যবর্তী মুক্তাটি লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ল । তীরটি মাথার অভ্যন্তরে ঢুকে পেছনে দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল । মাসরূক তার সওয়ারী জন্তুর পিঠের ওপর থেকে পড়ে গেল এবং আবিসিনীয় সৈন্যরা তাকে ঘিরে মাতম করতে লাগল । তৎক্ষণাৎ তাদের ওপর পারসিক বাহিনী হামলা চালাল । ফলে হাবশীরা পরাজিত হল । তাদের অনেকে নিহত হল এবং অন্যরা দিগ্বিদিক দিশেহারা হয়ে পালাল এরপর ওয়াহরিযের নেতৃত্বে তার বাহিনী সানা শহরের প্রবেশদ্বার ভেংগে সেখানে প্রবেশ করল এবং তাদের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিল ।
এ ঘটনা উপলক্ষে সায়ফ ইবন যূ - ইয়াযান হিময়ারী বিজয়গাথা রচনা করেন । যা নিম্নরূপ : “ লোকেরা ভেবেছিল রোম সম্রাট ও পারস্য সম্রাটের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেছে । অথচ এ গুজবের কারণে ক্ষোভ আরো বেড়েছে । আমরা মাসরূক রাজাকে হত্যা করেছি এবং উপত্যকাকে রক্তে রঞ্জিত করেছি । এখন জনগণের রাজা হলেন ওয়াহরিয । তিনি পানি মিশ্রিত মদ পান করেন , যতক্ষণ বন্দী ও সম্পদ হস্তগত না করেন :
ইবন হিশাম বলেন : আমার নিকট খাল্লাদ ইবন কুরবাতুস সাদৃসী - এর শেষের অংশ বনূ কায়স ইবন সালাবা গোত্রের আশা - র । তবে অন্যান্যরা তা অস্বীকার করেন ।
কবি আবূ সালত যে কবিতা রচনা করেন , তাতে তিনি সায়ফ ইব্ন যূ - ইয়াযানের রোম সম্রাট ও পারস্য সম্রাটের কাছে গিয়ে সাহায্য আনার সাহসী ভূমিকা এবং পারসিক বাহিনীর রণনৈপুণ্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন । ইবন ইসহাকের মতে কবি আবূ সালত ইব্ন আবূ রবীআ সাকাফী এবং ইব্ন হিশামের মতে উমাইয়া ইব্ন আবূ সালত বলেন :
“ সায়ফ ইব্ন যূ - ইয়াযানের মত লোকদের জন্য প্রতিশোধ নেয়ার সংকল্প করা শোভা পায় , যিনি শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের পাড়ে লুকিয়ে থাকেন । যখন তার ভ্রমণের সময় সমাগত হল , তখন তিনি রোম সম্রাটের কাছে গেলেন , কিন্তু তার কাছে যা চাইলেন তার কিছুই পেলেন না । এর দশ বছর পর তিনি পারস্যের সম্রাটের দিকে ঝুঁকলেন , নিজের ব্যক্তিগত সম্মান ও আর্থিক ক্ষতির বিনিময়ে । অবশেষে সেই চির স্বাধীনদের বংশধরদের কাছে গেলেন তাদেরকে শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে । আমার জীবনের শপথ ! আপনি খুবই দ্রুত প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেছেন । সেই বাহিনীটি তখন বিস্ময়করভাবে অভিযানে বেরুল যে , মনুষ্য সমাজে আমি তাদের সমতুল্য কাউকে দেখিনি । তারা সম্ভ্রান্ত , মহানুভব , লৌহ কঠিন সংকল্পে উজ্জীবিত , দুর্ধর্ষ দক্ষ তীরচালক , ঘন জংগলে শাবকদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দানকারী শার্দুলের দল , এমন বিশাল বিশাল দেহ নিয়ে তারা লড়াই করে যে , মনে হয় শুকনো বাঁশের ওপর হাওদার কাঠ যা অতি দ্রুততার সাথে লক্ষ্যভেদ করছে । আপনি ( হে ইবন যু - ইয়াযান ) , একদল সিংহ পাঠিয়েছেন কালো কুকুরগুলোর ওপর । ফলে তাদের পলায়নপর বাহিনী ভূমিতে পরাভূত হয়েছে । অতএব আপনি সানন্দে হেলান দিয়ে মাথায় মুকুট পরে গুমদানের শীর্ষে গিয়ে মদ পান করুন , যা আপনার একান্ত বৈধ ভবনে পরিণত হয়েছে ! তুমি সানন্দে মদ পান কর , কারণ শত্রুরা ধ্বংস হয়ে গেছে । তুমি উল্লাস কর ও গর্ব কর । এ হলো মহৎ গুণাবলী , পানি মিশ্রিত দুধের সেই দু'টি পাত্র নয় , যা একটু পরে পেশাবের পাত্রে পরিণত হয়ে গেছে । ”
ইবন হিশামের মতে শেষোক্ত লাইনটি অর্থাৎ “ এ হলো মহৎ গুণাবলী ....... আবূ সালতের নয় বরং নাবেগা জা'দীর রচিত । নাবেগার আসল নাম হলো কায়স ইবন আবদুল্লাহ , অন্যমতে হিব্বান ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন কায়স । তিনি বনূ জা'দা ইবন কা'ব ইবন রাবীজা ইবন আমির ইব্ন সা'সা'আ ইব্ন মুআবিয়া ইব্ন বাকর ইবন হাওয়াযিনের অন্তর্ভুক্ত এবং কবিতার এ লাইনটি তার রচিত একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ ।
ইবন ইসহাক বলেন আদী ইবন যায় হীরী , যিনি বনু তামীমের লোক ছিলেন , নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন ।
ইবন হিশামের মতে : তিনি বনূ তামীমের বনূ ইমরুল কায়স ইন যায়দ মানাত শাখার অন্তর্ভুক্ত । কারো কারো মতে , আদী হীরার অধিবাসীদের মধ্য থেকে ইবাদ নামক গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ।
“ সানা শহর তৈরির পর কী হলো , যা প্রচুর প্রতিভার অধিকারী শাসকবর্গ গড়ে তুলেছিল । যারা এগুলো নির্মাণ করেছিলেন , তারা এগুলোকে আকাশের বিক্ষিপ্ত মেঘমালা পর্যন্ত উন্নীত করেছিলেন এবং এখন তার সুউচ্চ কক্ষগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বিরাজমান । সেই কক্ষগুলো চারদিক থেকে পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত এবং চক্রান্তকারীদের চক্রান্ত থেকে নিরাপদ । আর সেগুলোর সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করা যায় না । হুতুম পেঁচার ডাকও সেখানে ভালো লাগে , যখন সন্ধ্যাবেলায় তার পাশাপাশি সাইরেন বাজানো হয় । এখানকার সকল উপকরণ , স্বাধীনচেতা বাহিনীর লোকদের এদিকে আকৃষ্ট করেছে । আর অশ্বারোহীরা এর শোভা বর্ধন করেছে ।
“ মৃতপ্রায় ভারবাহী খচ্চরগুলোকে পৃথক করে দেয়া হয়েছে , আর গাধার বাচ্চাগুলো তাদের সাথে ছুটে চলেছে । অবশেষে রাজণ্যবর্গ দুর্গের ওপর থেকে তাদের প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা অশ্বরোহী বাহিনীকে দেখতে পেলেন । যেদিন বর্বর ও ইয়াকসুমীদের এ বলে ডাকা হচ্ছিল যে , তাদের কোন পলায়নকারী পালিয়ে বাঁচতে পারবে না । আর সেদিনটি ছিল এমন , যা ( সায়ফ ও পারসিকদের ) অবশিষ্ট রেখেছে এবং যারা আগে ক্ষমতায় ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল , তাদের ধ্বংস করেছে । আর সেদিন ব্যক্তি দলে পরিণত হয়েছিল এবং দিলগুলো বহু আজব ঘটনার
সাক্ষীতে পরিণত হয়েছিল । সম্মানিত বনূ তুব্বার পর , এ দুর্গে পারস্যের নেতা স্বস্তির সাথে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন । ”
ইবন হিশাম বলেন : এ কবিতা উক্ত কবির একটি কাব্যগ্রন্থে রয়েছে । তবে “ যেদিন বর্বর ও ইয়াকসুমীদের এ বলো ডাকা . ” , এ লাইনটি আমাকে আবূ আনসারী আবৃত্তি করে শুনিয়েছে এবং সে তা মুফাযযাল যাব্বীর কাছ থেকে শুনে আমাকে শুনিয়েছে ।
সম্ভবত সাতীহ ও শিকের ভবিষ্যদ্বাণী এভাবেই সফল হল । সাতীহ বলেছিল , “ এডেন থেকে বেরিয়ে আসবে যূ - ইয়াযানের বাহিনী । তারা আবিসিনীয়দের কাউকে ইয়ামানে অবশিষ্ট রাখবে না । ” আর শিক বলেছিল , “ একজন তরুণ , যিনি নগণ্যও নন , নীচাশয়ও নন , যূ - ইয়াযানের বংশ থেকে আসবেন । ”
**টিকাঃ**
১. ঐতিহাসিক ইব্ন কুতায়বা লিখেছেন যে , সায়ফের বাহিনীতে সাড়ে সাত হাজার সৈনিক ছিল । এর সাথে বহু আরব গোত্র যোগ দিয়েছিল ।
১. গুমদান - ইয়াশরাহ ইব্ন ইয়াহসাব কর্তৃক নির্মিত একটি প্রাচীন রাজ প্রাসাদ । এর চারটি অংশ চার রঙের সাদা , লাল , সবুজ ও হলুদ । ভেতর সাতটি ছাদের ওপর আরো একটি প্রাসাদ ছিল । সবার ওপরে ছিল রঙিন মর্মর পাথরে নির্মিত একটি বৈঠকখানা , এর প্রতিটি খুঁটির ওপর সিংহের মূর্তি ছিল । বাতাস এলে এ সিংহমূর্তির পেছনে দিয়ে ঢুকে তা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেত । এতে হিংস্র প্রাণীর গর্জনের মত শব্দ শোনাত । কারো মতে , এটি হযরত সুলায়মান ( আ ) কর্তৃক নির্মিত । এ প্রাসাদ সম্পর্কে আরব কবিরা বহু কবিতা লিখেছেন । হযরত উসমান ( রা ) -এর আমলে এটি ধ্বংস করা হয় ।
📄 ইয়ামানে পারসিকদের অবস্থানকাল
ইয়ামানে পারসিকদের অবস্থানকাল
ইব্ন ইসহাক বলেন : ওয়াহরিয ও পারসিকরা ইয়ামানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং আজকের ইয়ামানবাসী তাদেরই বংশধর । আরিয়াতের ইয়ামানে প্রবেশ থেকে শুরু করে মাসরূক ইব্ন আবরাহার নিহত হওয়া এবং হাবশীদের সেখান থেকে বহিষ্কৃত হওয়া পর্যন্ত মোট ৭২ বছর তাদের রাজত্ব সেখানে স্থায়ী ছিল । তাদের মোট চারজন এ রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয় । আরিয়াত , আবরাহা , ইয়াকসুম ইব্ন আবরাহা এবং মাসরূক ইব্ন আবরাহা । ইবন হিশাম বলেন : ওয়াহরিযের মৃত্যুর পর পারস্য সম্রাট ওয়াহরিযের পুত্র মারযুবানকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করেন । মারযুবানের মৃত্যুর পর মারযুবানের পুত্র তাইনুজানকে ইয়ামানের শাসক নিযুক্ত করেন । তাইনুজানের পরে তার ছেলেকে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয় । পরে তাকে পদচ্যুত করে বাযানকে শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয় । এই বাযানের আমলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে আল্লাহ্ তা'আলা নবীরূপে প্রেরণ করেন ।