📄 আবরাহার কা'বা আক্রমণ
আবরাহার কা'বা আক্রমণ
পরদিন প্রত্যুষে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিতে লাগল । সে তার হস্তীবাহিনী ও সৈন্যবাহিনীকেও সুসংহত করল । তার হাতির নাম ছিল মাহমুদ । আবরাহার সংকল্প ছিল , কা'বাকে ধ্বংস করে ইয়ামানে ফিরে যাওয়া । হস্তী বাহিনীকে মক্কা অভিমুখে পরিচালিত করলে নুফায়ল ইব্ন হাবীব এগিয়ে এলো এবং আবরাহার হাতির পাশে দাঁড়াল । তারপর সে হাতির কান ধরে বলল : “ হে মাহমূদ , হাঁটু গেড়ে বসে পড় , নচেৎ যেখান থেকে এসেছ , সেখানে ভালোয় ভালোয় ফিরে যাও । জেনে রেখ , তুমি আল্লাহ্র পবিত্র নগরীতে রয়েছ । ” তারপর তার কান ছেড়ে দিতেই হাতি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল । নুফায়ল ইব্ন হাবীব বহু কষ্টে আবরাহার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে বেরিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠল । সৈন্যরা হাতিকে দাঁড় করাতে অনেক মারপিট করল , কিন্তু হাতি দাঁড়াল না । তারপর লোহার হাতিয়ার দিয়ে মাথায় আঘাত করা হল । ভাতেও হাতি নড়ল না । তারপর তাঁর শুঁড়ের ভেতর মতান্তরে পেটের ভেতরে আঁকাবাঁকা লাঠি ঢুকিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হল । তাতেও হাতিকে উঠানো গেল না । তারপর যেই তাকে ইয়ামানের দিকে ফিরতি যাত্রা করার জন্য ধাক্কা দেয়া হল , অমনি সে জোর কদমে ছুটতে জাগল । সিরিয়ার দিকে চালালেও জোরে জোরে চলতে লাগল । আবার যেই মক্কায় দিকে ভালানো হল , অমনি বসে পড়ল ।
**টিকাঃ**
২ হাতি হাঁটু গেড়ে বসতে পারে না । এখানে হাঁটু গেড়ে বসার অর্থ হচ্ছে মাটিতে শুয়ে পড়া । তবে সুহায়লীর মতে : হাতির একটা বিরল প্রজাতি আছে , উটের মত যা হাঁটু গেড়ে বসতে পারে ।
📄 আবরাহা ও তার বাহিনীর ওপর আল্লাহ্র শাস্তি
আবরাহা ও তার বাহিনীর ওপর আল্লাহর শাস্তি
ঠিক এ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলা সমুদ্রের দিক থেকে এক ধরনের পাখি পাঠালেন । প্রতিটি পাখির সাথে তিনটি করে পাথরের নুড়ি ছিল । একটা তার ঠোঁটে এবং দুটো দুই পায়ে । পাথরগুলো ছিল মটর কলাই ও ডালের মত ছোট । যার গায়েই পাথর পড়তে লাগল , সেই তৎক্ষণাৎ মরতে লাগল । কিন্তু সবার গায়ে তা পড়েনি । অনেকেই পালিয়ে যেখান থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে যেতে লাগল । সবাই নুফায়ল ইবন হাবীবকে খুঁজতে লাগল , যাতে সে তাদের ইয়ামানের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় । নুফায়ল আল্লাহ্ আযাব নামতে দেখে বলল :
“ এখন আল্লাহ্ নিজেই অপরাধীকে খুঁজছেন , কাজেই পালাবার উপায় নেই । নাক - কাটা আবরাহা আজ আর বিজয়ী হতে পারবে না , তাকে হারতেই হবে । ”
ইবন ইসহাক বলেন , নুফায়ল আরো আবৃত্তি করল :
“ হে রুদায়না ( মহিলার নাম ) , তুমি আমাদের পক্ষ থেকে মুবারকবাদ নাও । সকালবেলা আমরা তোমার ও তোমার লোকদের সাথে সুখেই ছিলাম ।
“ ওহে রুপায়না ! আমরা মুহাসাবের কাছে যে দৃশ্য দেখলাম , তা যদি তুমি দেখতে , তাহলে আমি যা করেছি তার জন্য আমার কাছে কৈফিয়ত তলব করতে না , বরং প্রশংসা করতে । আর আমরা যা হারিয়েছি সেজন্য আক্ষেপও করতে না ।
“ এক - একটি পাখি যেভাবে আমাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করছিল , তা দেখে আমি আল্লাহ্র শোকর আদায় করলাম এবং আমি ভয়ও করছিলাম যে , আমাদের ওপরও পাথর নিক্ষেপ হয় কিনা !
“ বাহিনীর সকলে কেবল নুফায়লকে খোঁজে । ভাবখানা এমন , যেন আবিসিনীয়দের কাছে আমি ঋণী । ”
এরপর আবরাহার সৈন্যরা পড়ি কি মরি করে যে যেদিকে পারল ছুটতে লাগল এবং যত্রতত্র মরে পড়ে থাকতে লাগল । আবরাহার শরীরে একটা পাথর লাগলে তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ পচে পচে খসে পড়তে লাগল । এক - এক টুকরো খসে পড়ে গেলে , বাকী অংশ থেকেও রক্ত ও পুঁজ পড়তে থাকল । তার সৈন্যরা তাকে ইয়ামানে নিয়ে গেল । সে যখন সানায় পৌঁছল , তখন একটা পাখির শাবকের চেয়ে বেশি মাংস তার দেহে অবশিষ্ট ছিল না । এরপর তার বুক ফেটে যখন হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে পড়ল , তখনই তার মৃত্যু হল ।
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াকুব ইবন উতবা জানিয়েছেন যে , ঐ বছরই সর্ব প্রথম আরব ভূখণ্ডে হাম ও বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং ঐ বছরই সর্বপ্রথম হানযাল , হারমাল ও উশার প্রভৃতি গাছে তিক্ত স্বাদযুক্ত ফল ধরে ।
📄 আল্লাহ্ হাতির ঘটনা ও কুরায়শদের ওপর নিজের কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দেন
আল্লাহ্ হাতির ঘটনা ও কুরায়শদের ওপর নিজের কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দেন
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর যখন আল্লাহ্ মুহাম্মদ (সা:) -কে নবুয়ওত দান করেন , তখন তিনি কুরায়শদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন যে , আবিসিনীয়দের আগ্রাসন থেকে তাদের রক্ষা করে তিনি তাদের উপর বিরাট করুণা ও অনুগ্রহ করেছেন এবং কুরায়শদের নিজস্ব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বহাল রাখতে সাহায্য করেছেন । তিনি বলেন :
b
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحُبِ الفِيلِ أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيلٍ * وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا آبَابِيلَ " تَرْمِيهِمَ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجِّيلٍ * فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفِ ما كُولٍ *
“ তুমি কি দেখনি , তোমার রব হাতিওয়ালাদের সাথে কেমন আচরণ করেছিলেন ? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি ? তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন । যারা তাদের উপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করে । তারপর তিনি তাদের ভক্ষিত তৃণের মত করেন । ( ১০৫ : ১-৫ )
আল্লাহ্ আরো বলেন :
الَّذِي أَطْعَمَهُمْ لا يَلْفِ قُرَيْشِ " الْفِهِمْ رِحْلَةَ الشَّتَاءِ وَالصَّيْفِ فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَذَا الْبَيْتِ ا مَن جُوعٍ " وَأَمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٌ :
“ যেহেতু কুরায়শদের আসক্তি আছে , আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্ম সফরের । তারা ইবাদত করুক এ ঘরের রক্ষকের , যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন । ” ( ১০৬ : ১-৪ )
অর্থাৎ এই ব্যাপারে নিরাপত্তা দিয়েছেন যে , তারা আগে যে অবস্থায় ছিল , তাতে কোন পরিবর্তন আসবে না । আর এটা করেছেন এ জন্য যে , তাদের জন্য অচিরেই যে কল্যাণের ব্যবস্থা করেছেন , তা যেন তারা ভোগ করতে সক্ষম হয় , যদি তা তারা গ্রহণ করে ( অর্থাৎ নবুয়ওত ও ইসলাম ) ।
ইবন হিশাম বলেন : আবাবীল শব্দের আভিধানিক অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে । এটি বহুবচন । এ শব্দটির একবচন ব্যবহৃত হয় না । আর সিজ্জীল অর্থ মাটি ও পাথর মিশ্রণে যে পাথর তৈরি হয় তার ভীষণ শক্ত রূপ । কোন কোন তাফসীরকার বলেন ফার্সীতে এটি সাহাজ ও জীল দুটি শব্দ , আরবিতে এক শব্দে রূপান্তরিত করা হয়েছে । আবূ উবায়দা বলেন : আসকে উসাফা ও আসীফাও বলা হয় । বনু রবী'আ ইবন মালিক ইবন যায়দ মানাত ইবন তামীমের আলকামা ইবন আবাদা বলেন : “ আসীফা বা পাতার ভারে নতমুখী শাখা পানি সিঞ্চিত করে । ” রাজি তাকে ‘ আস - সিমাকুল ' বা ভক্ষিত তৃণের মত করেছেন । এটি তার একটি কবিতার অংশ । ইবন হিশাম বলেন : নাহু শাস্ত্রে এর ব্যাখ্যা রয়েছে । ‘ ইলাফ ' অর্থ গ্রীষ্মে ও শীতকালের দুই সফরে সিরিয়া যাত্রা । আবু যায়দ আনসারী বলেন : “ আরররা আলিফাত ও ইলাফ একই অর্থে ব্যবহার করেন । “ যুর - রুম্মা বলেন : “ বালুর আকর্ষণ পাথুরে ভূমিতে দুপুরের রোদে উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করে । ” এটি তার এক কবিতার অংশ । মাতরূদ ইবন কা'ব থুযায়ী ইলাফের আরেক অর্থ হলো : নি'আমতপ্রাপ্তরা বলল তারাগুলো পরিবর্তিত হয় এবং পসন্দনীয় সফরের জন্য কাফেলাগুলো যাত্রা করে । বনূ যায়দ ইবন খুযায়মা ইবন মুদরিকা ইবন ইলয়াস ইবন মুযার ইবন নিযার ইবন মা'আদের কুমায়ত ইবন যায়দ বলেন : “ এ বছরেই এক হাজার উটের আগ্রহীরা ( উটের দুর্বলতার জন্য ) পায়ে হেঁটে চলে । কুমায়তের আরেকটি কবিতায় গোত্রের সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হওয়াকে ‘ ইলাফ ' বলেছেন । এটি তার এক অংশবিশেষ । ইলাফের আরেক অর্থ দুটি বস্তুকে একত্রিত করা । এর আরেকটি অর্থ এক লক্ষের চেয়ে কম হওয়া । আর আফ হচ্ছে শস্য বৃক্ষের পাতা , যা কাটা হয়নি । আর ইলাফ অর্থ আসক্ত হওয়া । কারো কারো মতে : ইলাফ অর্থ আল্ল্ফ অর্থাৎ হাজার উটের মালিক হওয়া । বিশিষ্ট কবি যুররুম্মা প্রথম অর্থে এবং কুমায়ত ইব্ন যায়দ দ্বিতীয় অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করেছেন । বইয়া ইবন আজ্জাজ বলেন : “ হাতির বাহিনীর ওপর যা নিক্ষেপ করা হয়েছিল , তাদের প্রতিও তাই নিক্ষেপ করা হয় । তাদের ওপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করা হয় । ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি তাদেরকে নিয়ে খেলছিল । ” এটি তার একটি কবিতার অংশ ।
📄 হাতির মাহুত ও সেনাপতির পরিণতি
হাতির মাহুত ও সেনাপতির পরিণতি
ইবন ইসহাক বলেন : হযরত আয়েশা ( রা ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেছেন , আবরাহার হাতির মাহুত ও হাতিবাহিনীর সেনাপতি এ দু'জনকে আমি অন্ধ ও পঙ্গু অবস্থায় মক্কায় মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে চেয়ে খেতে দেখেছি ।