📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইকরামা ইব্‌ন আমির কর্তৃক আসওয়াদকে অভিসম্পাত

📄 ইকরামা ইব্‌ন আমির কর্তৃক আসওয়াদকে অভিসম্পাত


ইকরামা ইবন আমির কর্তৃক আসওয়াদকে অভিসম্পাত
ইবন ইসহাক বলেন কা'বার চৌকাঠ ধরে আবদুল মুত্তালিবের ভাতিজা ইকরামা ইব আমির ইব্‌ন হাশিম ইব্‌ন আবদে মানাফ ইব্‌ন আবদিদ্দার ইব্‌ন কুসাই বলেন :
"হে আল্লাহ্ ! আসওয়াদ ইবন মাকসুদকে লাঞ্ছিত কর । কেননা গলায় কুরবানীর চিহ্ন লাগানো একশটি উট সে লুটে নিয়ে গেছে । হিরা ও সাবীর পর্বতের মাঝখান থেকে এ লুন্ঠন সম্পন্ন হয়েছে । এখন একমাত্র বিশাল মরুভূমির চৌহদ্দীতেই ওগুলো আটক থাকতে পারে , যদিও ওগুলো নিয়ে এখন নিছক জুয়ার তামাশাই চলছে । সে এগুলোকে কৃষ্ণকায় অনারব কাফিরদের হাতে সমর্পণ করে ফেলেছে । ওর সকল অভিলাষ তুমি ব্যর্থ করে দাও হে প্রভু ! ”
ইবন ইসহাক বলেন এরপর আবদুল মুত্তালিব কা'বার দরজার চৌকাঠ ছেড়ে দিলেন এবং তিনি ও তাঁর কুরায়শ সহচরবৃন্দ পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন । সেখানে বসে তাঁরা দেখতে লাগলেন আবরাহা মক্কায় ঢুকে কি করে ।

**টিকাঃ**
১. সুহায়লী এরপর আরো একটি পংক্তি উল্লেখ করেছেন । সেটি হচ্ছে : “ ক্রুশের পূজারী ও তার -ভক্তদের মুকাবিলায় আজ তোমার পূজারী ও ভক্তদের বিজয় দান কর । ”

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবরাহার কা'বা আক্রমণ

📄 আবরাহার কা'বা আক্রমণ


আবরাহার কা'বা আক্রমণ
পরদিন প্রত্যুষে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিতে লাগল । সে তার হস্তীবাহিনী ও সৈন্যবাহিনীকেও সুসংহত করল । তার হাতির নাম ছিল মাহমুদ । আবরাহার সংকল্প ছিল , কা'বাকে ধ্বংস করে ইয়ামানে ফিরে যাওয়া । হস্তী বাহিনীকে মক্কা অভিমুখে পরিচালিত করলে নুফায়ল ইব্‌ন হাবীব এগিয়ে এলো এবং আবরাহার হাতির পাশে দাঁড়াল । তারপর সে হাতির কান ধরে বলল : “ হে মাহমূদ , হাঁটু গেড়ে বসে পড় , নচেৎ যেখান থেকে এসেছ , সেখানে ভালোয় ভালোয় ফিরে যাও । জেনে রেখ , তুমি আল্লাহ্র পবিত্র নগরীতে রয়েছ । ” তারপর তার কান ছেড়ে দিতেই হাতি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল । নুফায়ল ইব্‌ন হাবীব বহু কষ্টে আবরাহার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে বেরিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠল । সৈন্যরা হাতিকে দাঁড় করাতে অনেক মারপিট করল , কিন্তু হাতি দাঁড়াল না । তারপর লোহার হাতিয়ার দিয়ে মাথায় আঘাত করা হল । ভাতেও হাতি নড়ল না । তারপর তাঁর শুঁড়ের ভেতর মতান্তরে পেটের ভেতরে আঁকাবাঁকা লাঠি ঢুকিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হল । তাতেও হাতিকে উঠানো গেল না । তারপর যেই তাকে ইয়ামানের দিকে ফিরতি যাত্রা করার জন্য ধাক্কা দেয়া হল , অমনি সে জোর কদমে ছুটতে জাগল । সিরিয়ার দিকে চালালেও জোরে জোরে চলতে লাগল । আবার যেই মক্কায় দিকে ভালানো হল , অমনি বসে পড়ল ।

**টিকাঃ**
২ হাতি হাঁটু গেড়ে বসতে পারে না । এখানে হাঁটু গেড়ে বসার অর্থ হচ্ছে মাটিতে শুয়ে পড়া । তবে সুহায়লীর মতে : হাতির একটা বিরল প্রজাতি আছে , উটের মত যা হাঁটু গেড়ে বসতে পারে ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবরাহা ও তার বাহিনীর ওপর আল্লাহ্র শাস্তি

📄 আবরাহা ও তার বাহিনীর ওপর আল্লাহ্র শাস্তি


আবরাহা ও তার বাহিনীর ওপর আল্লাহর শাস্তি
ঠিক এ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলা সমুদ্রের দিক থেকে এক ধরনের পাখি পাঠালেন । প্রতিটি পাখির সাথে তিনটি করে পাথরের নুড়ি ছিল । একটা তার ঠোঁটে এবং দুটো দুই পায়ে । পাথরগুলো ছিল মটর কলাই ও ডালের মত ছোট । যার গায়েই পাথর পড়তে লাগল , সেই তৎক্ষণাৎ মরতে লাগল । কিন্তু সবার গায়ে তা পড়েনি । অনেকেই পালিয়ে যেখান থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে যেতে লাগল । সবাই নুফায়ল ইবন হাবীবকে খুঁজতে লাগল , যাতে সে তাদের ইয়ামানের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় । নুফায়ল আল্লাহ্ আযাব নামতে দেখে বলল :
“ এখন আল্লাহ্ নিজেই অপরাধীকে খুঁজছেন , কাজেই পালাবার উপায় নেই । নাক - কাটা আবরাহা আজ আর বিজয়ী হতে পারবে না , তাকে হারতেই হবে । ”
ইবন ইসহাক বলেন , নুফায়ল আরো আবৃত্তি করল :
“ হে রুদায়না ( মহিলার নাম ) , তুমি আমাদের পক্ষ থেকে মুবারকবাদ নাও । সকালবেলা আমরা তোমার ও তোমার লোকদের সাথে সুখেই ছিলাম ।
“ ওহে রুপায়না ! আমরা মুহাসাবের কাছে যে দৃশ্য দেখলাম , তা যদি তুমি দেখতে , তাহলে আমি যা করেছি তার জন্য আমার কাছে কৈফিয়ত তলব করতে না , বরং প্রশংসা করতে । আর আমরা যা হারিয়েছি সেজন্য আক্ষেপও করতে না ।
“ এক - একটি পাখি যেভাবে আমাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করছিল , তা দেখে আমি আল্লাহ্র শোকর আদায় করলাম এবং আমি ভয়ও করছিলাম যে , আমাদের ওপরও পাথর নিক্ষেপ হয় কিনা !
“ বাহিনীর সকলে কেবল নুফায়লকে খোঁজে । ভাবখানা এমন , যেন আবিসিনীয়দের কাছে আমি ঋণী । ”
এরপর আবরাহার সৈন্যরা পড়ি কি মরি করে যে যেদিকে পারল ছুটতে লাগল এবং যত্রতত্র মরে পড়ে থাকতে লাগল । আবরাহার শরীরে একটা পাথর লাগলে তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ পচে পচে খসে পড়তে লাগল । এক - এক টুকরো খসে পড়ে গেলে , বাকী অংশ থেকেও রক্ত ও পুঁজ পড়তে থাকল । তার সৈন্যরা তাকে ইয়ামানে নিয়ে গেল । সে যখন সানায় পৌঁছল , তখন একটা পাখির শাবকের চেয়ে বেশি মাংস তার দেহে অবশিষ্ট ছিল না । এরপর তার বুক ফেটে যখন হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে পড়ল , তখনই তার মৃত্যু হল ।
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াকুব ইবন উতবা জানিয়েছেন যে , ঐ বছরই সর্ব প্রথম আরব ভূখণ্ডে হাম ও বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং ঐ বছরই সর্বপ্রথম হানযাল , হারমাল ও উশার প্রভৃতি গাছে তিক্ত স্বাদযুক্ত ফল ধরে ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আল্লাহ্ হাতির ঘটনা ও কুরায়শদের ওপর নিজের কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দেন

📄 আল্লাহ্ হাতির ঘটনা ও কুরায়শদের ওপর নিজের কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দেন


আল্লাহ্ হাতির ঘটনা ও কুরায়শদের ওপর নিজের কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দেন
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর যখন আল্লাহ্ মুহাম্মদ (সা:) -কে নবুয়ওত দান করেন , তখন তিনি কুরায়শদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন যে , আবিসিনীয়দের আগ্রাসন থেকে তাদের রক্ষা করে তিনি তাদের উপর বিরাট করুণা ও অনুগ্রহ করেছেন এবং কুরায়শদের নিজস্ব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বহাল রাখতে সাহায্য করেছেন । তিনি বলেন :
b
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحُبِ الفِيلِ أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيلٍ * وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا آبَابِيلَ " تَرْمِيهِمَ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجِّيلٍ * فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفِ ما كُولٍ *
“ তুমি কি দেখনি , তোমার রব হাতিওয়ালাদের সাথে কেমন আচরণ করেছিলেন ? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি ? তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন । যারা তাদের উপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করে । তারপর তিনি তাদের ভক্ষিত তৃণের মত করেন । ( ১০৫ : ১-৫ )
আল্লাহ্ আরো বলেন :
الَّذِي أَطْعَمَهُمْ لا يَلْفِ قُرَيْشِ " الْفِهِمْ رِحْلَةَ الشَّتَاءِ وَالصَّيْفِ فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَذَا الْبَيْتِ ا مَن جُوعٍ " وَأَمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٌ :
“ যেহেতু কুরায়শদের আসক্তি আছে , আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্ম সফরের । তারা ইবাদত করুক এ ঘরের রক্ষকের , যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন । ” ( ১০৬ : ১-৪ )
অর্থাৎ এই ব্যাপারে নিরাপত্তা দিয়েছেন যে , তারা আগে যে অবস্থায় ছিল , তাতে কোন পরিবর্তন আসবে না । আর এটা করেছেন এ জন্য যে , তাদের জন্য অচিরেই যে কল্যাণের ব্যবস্থা করেছেন , তা যেন তারা ভোগ করতে সক্ষম হয় , যদি তা তারা গ্রহণ করে ( অর্থাৎ নবুয়ওত ও ইসলাম ) ।
ইবন হিশাম বলেন : আবাবীল শব্দের আভিধানিক অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে । এটি বহুবচন । এ শব্দটির একবচন ব্যবহৃত হয় না । আর সিজ্জীল অর্থ মাটি ও পাথর মিশ্রণে যে পাথর তৈরি হয় তার ভীষণ শক্ত রূপ । কোন কোন তাফসীরকার বলেন ফার্সীতে এটি সাহাজ ও জীল দুটি শব্দ , আরবিতে এক শব্দে রূপান্তরিত করা হয়েছে । আবূ উবায়দা বলেন : আসকে উসাফা ও আসীফাও বলা হয় । বনু রবী'আ ইবন মালিক ইবন যায়দ মানাত ইবন তামীমের আলকামা ইবন আবাদা বলেন : “ আসীফা বা পাতার ভারে নতমুখী শাখা পানি সিঞ্চিত করে । ” রাজি তাকে ‘ আস - সিমাকুল ' বা ভক্ষিত তৃণের মত করেছেন । এটি তার একটি কবিতার অংশ । ইবন হিশাম বলেন : নাহু শাস্ত্রে এর ব্যাখ্যা রয়েছে । ‘ ইলাফ ' অর্থ গ্রীষ্মে ও শীতকালের দুই সফরে সিরিয়া যাত্রা । আবু যায়দ আনসারী বলেন : “ আরররা আলিফাত ও ইলাফ একই অর্থে ব্যবহার করেন । “ যুর - রুম্মা বলেন : “ বালুর আকর্ষণ পাথুরে ভূমিতে দুপুরের রোদে উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করে । ” এটি তার এক কবিতার অংশ । মাতরূদ ইবন কা'ব থুযায়ী ইলাফের আরেক অর্থ হলো : নি'আমতপ্রাপ্তরা বলল তারাগুলো পরিবর্তিত হয় এবং পসন্দনীয় সফরের জন্য কাফেলাগুলো যাত্রা করে । বনূ যায়দ ইবন খুযায়মা ইবন মুদরিকা ইবন ইলয়াস ইবন মুযার ইবন নিযার ইবন মা'আদের কুমায়ত ইবন যায়দ বলেন : “ এ বছরেই এক হাজার উটের আগ্রহীরা ( উটের দুর্বলতার জন্য ) পায়ে হেঁটে চলে । কুমায়তের আরেকটি কবিতায় গোত্রের সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হওয়াকে ‘ ইলাফ ' বলেছেন । এটি তার এক অংশবিশেষ । ইলাফের আরেক অর্থ দুটি বস্তুকে একত্রিত করা । এর আরেকটি অর্থ এক লক্ষের চেয়ে কম হওয়া । আর আফ হচ্ছে শস্য বৃক্ষের পাতা , যা কাটা হয়নি । আর ইলাফ অর্থ আসক্ত হওয়া । কারো কারো মতে : ইলাফ অর্থ আল্‌ল্ফ অর্থাৎ হাজার উটের মালিক হওয়া । বিশিষ্ট কবি যুররুম্মা প্রথম অর্থে এবং কুমায়ত ইব্‌ন যায়দ দ্বিতীয় অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করেছেন । বইয়া ইবন আজ্জাজ বলেন : “ হাতির বাহিনীর ওপর যা নিক্ষেপ করা হয়েছিল , তাদের প্রতিও তাই নিক্ষেপ করা হয় । তাদের ওপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করা হয় । ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি তাদেরকে নিয়ে খেলছিল । ” এটি তার একটি কবিতার অংশ ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00