📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবরাহার ওপর নাজাশীর ক্রোধ

📄 আবরাহার ওপর নাজাশীর ক্রোধ


আবরাহার ওপর নাজাশীর ক্রোধ
সমস্ত খবর শুনে নাজাশী আবরাহার ওপর ভীষণভাবে চটে গেলেন । তিনি বললেন : আমার নিযুক্ত সেনাপতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাকে হত্যাকারী এ আবরাহাকে আমি ক্ষমা করব না । তিনি এই বলে শপথও নিলেন যে , “ আমি তার শাসিত ইয়ামানকে পদদলিত করব এবং আবরাহার মাথার চুল কামিয়ে অপমানিত করব । ” নাজাশীর এই প্রতিক্রিয়া ও শপথের খবর শুনে আবরাহা ' নিজেই নিজের মাথা কামাল এবং ইয়ামান থেকে একব্যাগ ভর্তি মাটিসহ নাজাশীকে চিঠি লিখল :
‘ হে রাজন ! আরিয়াতও আপনার ক্রীতদাস ছিল , আমিও আপনার ক্রীতদাস । আমরা আমাদের ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছি । আমার সকল আনুগত্য তো আপনারই জন্য নিবেদিত । তবে আবিসিনীয় সৈন্যদের সেনাপতিত্বের জন্য আমিই ছিলাম অধিকতর যোগ্য , শক্তিশালী ও কর্তৃত্বশীল । আপনার শপথের কথা শোনামাত্রই আমি নিজের সমস্ত মাথা কামিয়েছি এবং আপনার পায়ে দলনের জন্য ইয়ামানের এক ব্যাগ মাটি পাঠিয়েছি , যাতে আপনার শপথ এখানে না এসেই পূর্ণ হয় ।
. নাজাশী এতে প্রীত হলেন এবং তাকে লিখলেন : আমার পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি ইয়ামানের শাসক হিসাবে কাজ চালিয়ে যাও । ফলে আবরাহা ইয়ামানের শাসক হিসাবে থেকে গেল ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবরাহার গীর্যা কুলায়স প্রসংগে

📄 আবরাহার গীর্যা কুলায়স প্রসংগে


আবরাহার গীর্জা কুলায়স প্রসংগে
এরপর আবরাহা ইয়ামানের সানা নগরীতে কুলায়স ' নামে এমন একটি গীর্জা নির্মাণ করল , যার সমতুল্য কোন ঘর তৎকালীন বিশ্বে ছিল না । তারপর সে নাজাশীকে লিখল : হে রাজন ! আমি আপনার জন্য এমন একটি গীর্জা নির্মাণ করেছি , যার সমতুল্য কোন গীর্জা ইতিপূর্বে আর কোন রাজার জন্য নির্মাণ করা হয়নি । আরবদের হজ্জকে আমি এ গীর্জার এলাকায় স্থানান্তরিত না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হব না । নাজাশীর কাছে লেখা আবরাহার এ চিঠির কথা আরবদের মধ্যে ফাঁস হয়ে গেলে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ল । বনূ কিনানার অন্তর্ভুক্ত বনূ ফুকায়ম ইবন আদী ইবন আমির ইব্‌ন সা'লাবা ইবন হারিস ইবন মালিক ইবন কিনানা ইবন খুযায়মা ইবন মুদরিকা ইবন ইলিয়াস মুযার গোত্রের একটি লোক সবচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ হয় আবরাহার ওপর । বছরে যে চারটি মাসে রক্তপাত নিষিদ্ধ চলে আসছিল , সেই চারটি মাসকে রদবদল করে রক্তপাত বৈধ করার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী একটি গোষ্ঠী তৎকালে আরবে সক্রিয় ছিল । এই গোষ্ঠীর নাম ছিল না সাআ । বনূ কিনানার ঐ বিক্ষুব্ধ লোকটি ছিল এ গোষ্ঠীভুক্ত । নাস্সাআ হলো : জাহিলিয়াত যুগে রজব , মুহাররম , যিলকদ ও যিলহজ্জ এ চারটি মাসে রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল এবং আবরাহা তা মেনে চলত । এ চারটি মাসে রক্তপাতকে হালাল করার কৌশল উদ্ভাবনের জন্য একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে । এরই নাম নাস্সাআ । তারা এ মাসগুলোর একটিকে হালাল ঘোষণা করে রক্তপাত ঘটাত । তারপর অন্য একটি হালাল মাসকে নিষিদ্ধ মাসে রূপান্তরিত করত । এতে হারাম মাসটি বিলম্বিত হতো এবং তার সংখ্যাও ঠিক থাকত ৷ এ সম্পর্কেই আল্লাহ্ সূরা তওবার এ আয়াত নাযিল করেন : “ নাসি ( বিলম্বিত করা ) হল আরো জঘন্যতর কুফরী কাজ । কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করার এটি একটি অপকৌশল । এক বছরে তারা রক্তপাতকে হালাল করে এবং আর এক বছরে তা হারাম করে । এভাবে আল্লাহ্র হারাম করা মাসের সংখ্যা পূর্ণ করে । ” ( ৯ : ৩৭ ) ইবন হিশাম বলেন : ' নিইউয়াতিউ ' অর্থ সম্মান করা । যেমন আজ্জাজ উরফে আবদুল্লাহ ইবন বুইয়া বনু সা'দ ইবন যায়ধ মানাত ইবন তামীম ইবন যুর ইবন উদ ইবন ভাবিখা ইবন ইলয়াস ইবন মুবার ইবন নিযার একটি কবিতায় বলেছেন ।

**টিকাঃ**
১. এটাই সেই ঐতিহাসিক গীর্জা যাকে আবরাহা পবিত্র কা'বার বিকল্প হিসাবে নির্মাণ করেছিল এবং চেয়েছিল যে , আরবরা কা'বার পরিবর্তে ঐ গীর্জাকে হজ্জের কেন্দ্র হিসাবে গ্রহণ করুক এবং ঐ গীর্জার এলাকায় হজ্জ স্থানান্তরিত হোক । এ গীর্জাটি ছিল এত উঁচু যে , এর ওপরে উঠে সে এডেন বন্দরকে দেখার অভিলাষী ছিল । আবরাহা এ গীর্জা নির্মাণে ইয়ামানবাসীদের বাধ্যতামূলক শ্রম ও সহযোগিতা আদায় করেছিল । গীর্জার অদূরেই অবস্থিত রাণী বিলকিসের প্রাচীন প্রসাদ থেকে রকমারি কারুকার্য খচিত ও স্বর্ণের নক্শা অংকিত শ্বেত মর্মর পাথর আনিয়ে এতে স্থাপন করা হয় । তাছাড়া হাতির দাঁত ও মূল্যবান আবস কাঠের তৈরি বহু মঞ্চ ও বেদী এবং স্বর্ণের তৈরি ক্রুশ তৈরি করে এতে বসান হয় । রওযুল উনুফ , প্রথম খণ্ড , ৬৩ পৃষ্ঠায় এই গীর্জার আরো বিস্তারিত বিবরণ দ্রষ্টব্য ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 নাসী প্রথার প্রথম প্রবর্তনকারী

📄 নাসী প্রথার প্রথম প্রবর্তনকারী


নাসী প্রথার প্রথম প্রবর্তনকারী
ইবন ইসহাক বলেন : আবূ শা‘সা কালাম্মাস ওরফে আজাজ ওরফে হুযায়ফা ইব্‌ন আবদ ইবন ফুকায়ম ইব্‌ন আলী ইবন আমির ইবন সা'লাবা ইবন হারিস ইবন মালিক ইবন কিনানা ইব্‌ন খুযায়মা হচ্ছে হারাম মাসকে হালাল করার উক্ত প্রথার প্রথম প্রবর্তক । তার পরে তার বংশধরেরা এটিকে চালু রাখে । সর্বশেষ ব্যক্তি এই বংশেরই আবূ সুমামা জুনাদা ইব্‌ন আওফ । এ ব্যক্তির জীবদ্দশাতেই ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে । আরবরা ইজ্জশেষে এ ব্যক্তির কাছে সমবেত হত । তারপর যিলকদ , যিলহজ্জ , মুহাররম ও রজব এ চার মাসকে প্রথমে হারাম বলে ঘোষণা করত । তারপর এ ব্যক্তি যদি কোন মাসকে হালাল করতে চাইত , তবে মুহাররমকে হালাল করত এবং তার পরিবর্তে সফর মাসকে হারাম ঘোষণা করত । সমবেত জনতাও তার এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাত । তারপর হাজীরা যখন ঘরে ফেরার ইচ্ছা করত । তখন সবাইকে একত্র করে বলত :
“ হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার জন্য দু'টি সফর মাসের একটিকে হালাল করলাম এবং অপরটিকে পরবর্তী বছরে পিছিয়ে দিলাম । ”
এ সময়ে বনূ ফিরাস ইবন গানামের উমায়র ইবন কায়য় ওরফে জত্ - তা'আন নাসী সম্পর্কে গর্ব প্রকাশ করে কবিতা আবৃত্তি করেন । এর কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপ :
“ বনু মা'দ জানে যে , আমার গোত্র খুবই সম্ভ্রান্ত ও উদারমনা ,
, এমন কে আছে , যাকে আমরা অসহায় ছেড়ে দিয়েছি ?
এমন কে আছে , যে আমাদের সাহচর্য পায়নি ?
মা'আদ গোত্রকে কি আমরা হারাম মাস পিছিয়ে দিয়ে সাহায্য করিনি ?
তাদের জন্য কি হারাম মাসকে হালাল করিনি ? ”
ইব্‌ন হিশাম বলেন : প্রথম নিষিদ্ধ মাস হল মুহাররম ।

**টিকাঃ**
১. সুহায়লী বর্ণনা করেন যে , আবূ সুমামা ইসলাম গ্রহণ করেছিল । হযরত উমর ( রা ) -এর আমলে সে হজ্জে হাযির হয় । সে সমবেত হাজীদের সম্বোধন করে বলল : ওহে হাজীগণ ! আমি তোমাদের কাছে এ মাস ভাড়া দিয়েছি ( অর্থাৎ সে এ মাসে রক্তপাত বৈধ মনে করত এবং এজন্য হাজীদের কাছ থেকে ভাড়া তথা এক ধরনের চাঁদা আদায় করতে চাইছিল ) । তখন হযরত উমর ( রা ) তাকে এক থাপ্পড় দিয়ে বললেন : চুপ কর ব্যাটা ! আল্লাহ্ এসব জাহিলী কাজকর্ম বাতিল করে দিয়েছেন ।
২. জাহিলী যুগে এ হারাম মাস পেছানোর প্রক্রিয়া ছিল দু'রকমের : একটি হলো- যেটি এখানে ইবন ইসহাক উল্লেখ করেছেন । অর্থাৎ মুহাররম মাসকে সফরে পিছিয়ে দেয়া । কারণ লুটপাট করা ও খুনের প্রতিশোধ নিতে তারা এতদিন অপেক্ষা করতে চাইত না । অপরটি হলো — হজ্জকেই তারা নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে দিত । তারা এটা করত সৌর বছরের হিসাবের নিরিখে । প্রতি বছর ভারা এগার দিন বা তার সামান্য বেশি সময় পেছাত । এভাবে তেত্রিশ বছরে সমস্ত বছর ঘুরে আসত এবং তেত্রিশ বছর পর হজ্জ আগের সময়ে অনুষ্ঠিত হত । এজন্য রাসূল (সা:) বিদায় হজ্জে বলেন : “ আল্লাহ্ তা'আলা যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছিলেন , সেদিন সময় যেভাবে চলছিল , এখন আবার সেই অবস্থায় ফিরে এসেছে । বিদায় হজ্জের বছর হজ্জ একচক্র ঘুরে আগের সময়ে এসেছিল । রাসূল (সা:) মদীনা থেকে মক্কায় গিয়ে ঐ হজ্জ ছাড়া আর কোন হজ্জ করেননি । কেননা মক্কা বিজিত হওয়ার আগে কাফিরদের নিয়ন্ত্রণাধীন হজ্জ নির্দিষ্ট সময়ের পরে অনুষ্ঠিত হত এবং উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করত ।
১. উমায়র অত্যন্ত দীর্ঘকায় ব্যক্তি ছিল । যুদ্ধে অবিচল থাকার জন্য তাকে জযলুত তাআন বলা হত ।
২- অন্যদের মতে প্রথম নিষিদ্ধ মাস যিলকদ । কেননা রাসূল (সা:) হারাম মাসের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে যিলকদ মাস দিয়ে শুরু করেছেন । মুহাররমকে প্রথম নিষিদ্ধ মাস বলার যুক্তি এই যে , ওটা বছরের প্রথম মাস । এ দ্বিমতের ফল দেখা দেবে এভাবে যে , যখন কেউ নিষিদ্ধ মাসে রোযা থাকার মানত করবে , তখন মুহাররমকে যারা প্রথম নিষিদ্ধ মাস বলেন , তাদের মতে মানতের রোযা মুহাররম থেকে শুরু এবং যিলহজ্জে শেষ করতে হবে । আর যিলকদকে প্রথম নিষিদ্ধ মাস ধরে নিলে যিলকদ থেকে শুরু এবং পরের বছর রজবে শেষ করতে হবে ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বিক্ষুব্ধ কিনানী কুলায়স গীর্জায় পায়খানা করল

📄 বিক্ষুব্ধ কিনানী কুলায়স গীর্জায় পায়খানা করল


বিক্ষুব্ধ কিনানী কুলায়স গীর্জায় পায়খানা করল
ইবন ইসহাক বলেন : বনূ কিনানার সেই বিক্ষুব্ধ লোকটি সন্তর্পণে বেরিয়ে পড়ল এবং কুলায়স গীর্জায় গিয়ে পায়খানা করে দিল । তারপর নিজ বাসস্থানে ফিরে গেল । আবরাহা এ খবর জানতে পেরে সকলকে জিজ্ঞেস করল , এ কাজটি কে করেছে ? তাকে জানানো হল যে , আপনি হজ্জ অনুষ্ঠানকে মক্কার কা'বাঘর থেকে এখানে নিয়ে আসবেন বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন , তা শুনে মক্কার কাবাঘরের নিকট বসবাসকারী জনৈক আরব রাগান্বিত হয়েছে এবং এ কাজটি করে সে বুঝাতে চেয়েছে যে , এ ঘর হজ্জের উপযুক্ত নয় ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00