📄 যুনুয়াসের পতন
যুনুয়াসের পতন
কালবিলম্ব না করে যুনুয়াস তার ইয়ামানী সৈন্য - সামন্ত ও অনুগত ইয়ামানী গোত্রগুলোকে সাথে নিয়ে আবিসিনীয় সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করল । উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধে যুনুয়াস পরাজিত হল । যুনুয়াস তখন নিজের ও নিজের জাতির শোচনীয় দশা দেখে স্বীয় ঘোড়া হাঁকিয়ে সমুদ্র অভিমুখে যাত্রা করল । ছুটতে ছুটতে সে সোজা সমুদ্রের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লা এবং ডুবে মারা গেল । এদিকে আরিয়াত ইয়ামানে প্রবেশ করে সেখানকার রাজা হয়ে গেল ।
এ পরিস্থিতি দেখে দাওস ও আবিসিনীয় সৈন্যের ইয়ামান অভিযানের ব্যাপারে জনৈক ইয়ামানবাসী মন্তব্য করলো :
“ দাওসের মতও নয় এবং তার উৎকৃষ্ট বস্তুর মতও নয় , যার সুরাহা হতে পারে না । ” পরবর্তীকালে এ কথা ইয়ামানে একটা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয় এবং তা আজও চালু আছে ।
**টিকাঃ**
১. এটি ইবন ইসহাকের বর্ণনা । অপর একটি বর্ণনা থেকে জানা যায় যে , যুনুয়াস যখন দেখল যে , আবিসিনীয় সৈন্যদের প্রতিরোধ করা তার সাধ্যের বাইরে , তখন সে একদিকে ইয়ামানের রাজধানী সানাকে আবিসিনিয়ার অংগীভূত করার প্রস্তাব দিল , আর অপরদিকে নিজের সৈন্যদেরকে গোপনে ডেকে অংগীকার নিল যে , তারা আবিসিনীয়দের বিরুদ্ধে তাকে পূর্ণ সহযোগিতা দেবে । সৈন্যরা নিজ নিজ দখলী সম্পত্তির ওপর নিজের মালিকানা বহাল রাখার শর্তে এ প্রস্তাবে রাযী হল । তারপর যুনুয়াস আবিসিনীয় সেনানায়কদের কাছে বিপুল সম্পদের উপঢৌকন নিয়ে হাযির হয়ে নিজের ও তার জনগণের নিরাপত্তা চেয়ে নিল । সেনানায়করা নাজাশীকে যুনুয়াসের সকর বক্তব্য জানালে নাজাশী সম্মতি দিলেন । এরপর যুনুয়াসের নির্দেশে তার সৈন্যরা গোপনে আবিসিনীয় সৈন্যদের হত্যা করতে লাগল । অধিকাংশ আৰিসিনীয় সৈন্য নিহত হওয়ার পর নাজাশী আবরাহা ও আরিয়াতের কাছে আরো সৈন্য পাঠালেন এবং যুনুয়াসকে হত্যা , ইয়ামানের এক - তৃতীয়াংশকে ধ্বংস ও এক - তৃতীয়াংশ নারী ও শিশুকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন । আবরাহা এ নির্দেশ পালন করল ।
📄 এ ঘটনা প্রসংগে যু-জাদান হিময়ারীর মন্তব্য
এ ঘটনা প্রসংগে যু — জাদান হিময়ারীর মন্তব্য
তিনি বলেন : “ শান্ত হও , কারণ অশ্রু বিসর্জন দ্বারা হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া যায় না । যে মরে গেছে , তার জন্য আক্ষেপ করতে করতে নিজেও মরো না । বায়নূন ও সিলহীন এবং এর ভিত্তি ও নিদর্শনাবলী ধ্বংস হওয়ার পরও কি মানুষ আর ঘর নির্মাণ করবে ? ”
তৎকালে বায়নূন , সিলহীন ও গুমদান নামে ইয়ামানে তিনটি দুর্গ ছিল । আরিয়াতের নেতৃত্বে আবিসিনীয় বাহিনী সেগুলো ধ্বংস করে । যু - জাদান তার এই দীর্ঘ কবিতায় গুমদান দুর্গ বিধ্বস্ত হওয়া নিয়েও শোক ও বিলাপ প্রকাশ করেন এবং এত ধ্বংস ও রক্তপাত সত্ত্বেও নিজ জাতিকে নব উদ্যমে বলীয়ান হওয়ার আহবান জানান । তিনি বলেন :
“ আমাকে বাধা দিও না , আর সত্যি বলতে কি তোমার বাধার আমি পরোয়াও করি না -তুমি আমাকে ঠেকিয়ে কখনো রাখতে পারবে না , আল্লাহ্ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন । তুমি আমার শক্তি খর্ব করে দিয়েছ , যখন আমরা গান - বাদ্যকারিদের গান - বাজনা শুনতে শুনতে তন্ময় হয়েছিলাম এবং উত্তম বিশুদ্ধ শরাব পান করছিলাম । আর মদপান আমার জন্য কোন লজ্জার ব্যাপার নয় , যতক্ষণ না আমার কোন সংগী সে ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ।
“ মৃত্যুকে কেউ প্রতিহত করতে পারে না যত রকমের ওষধু - ই সে সেবন করুক না কেন । এমনকি কোন সংসারত্যাগী দরবেশও স্বীয় নির্জন ধ্যানের কক্ষে মৃত্যু থেকে রেহাই পায় না , যে কক্ষের দেয়াল দুষ্প্রাপ্য পাখির ডিমের আশ্রয়স্থল । আর যে গুমাদানের ( ইয়ামামার রাজা হাউযা ইব্ন আলীর দুর্গ ) কথা আমি শুনেছি , যা পর্বতের উঁচু শিখরে লোকেরা বানিয়েছে , তাও মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবে না । সে দুর্গটি সংসার বিরাগী দরবেশদের জায়গায় অবস্থিত , যার নিচে রয়েছে কালো পাথর এবং কাদামাটি মিশ্রিত পিচ্ছিল ও মসৃণ পাথর , সেখানে রাতে তেলের প্রদীপসমূহ বিদ্যুত চমকানোর মত চকমক করে । আর সেখানে যে খেজুর গাছ লাগানো হয়েছে , তা কাঁচা খেজুরের ভারে নুয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে । শেষ পর্যন্ত দুর্গের সকল নতুন শোভা - সৌন্দর্য পুড়ে ছাই হয়ে গেল আর যু - নুয়াস দুর্বলতার কারণে আত্মসমর্পণ করল এবং স্বজাতিকে সংকট সম্পর্কে সাবধান করল । ”
এই নৃশংস গণহত্যা সম্পর্কে আরো বহু কবি বিলাপ ও শোক প্রকাশ করে কবিতা আবৃত্তি করেন । এর মাঝে রবীআ ইন যিবা সাকাফী এং আমর ইব্ন মা'দীকারব যুবায়দী অন্যতম । ইবন হিশাম বলেন : রবীআর মায়ের নাম হলো যিবা এবং তার নিজের নাম হলো রবীআ ইবন আবদী ইয়ালীল ইবন সালিম ইব্ন মালিক ইব্ন হুতায়ত ইব্ন জুশাম ইব্ন কাসী ।
রবীআ ইন যিবা সাকাফী এ সম্পর্কে বলেন : তোমার জীবনের শপথ ! মৃত্যু ও বার্ধক্য থেকে মানুষের রেহাই নেই । এ দুটো তাকে আক্রমণ করবেই । এর বাইরে তার কোন প্রশস্ত জায়গা নেই , কোন আশ্রয়স্থল নেই । হিময়ারের বহুসংখ্যক গোত্রের পর অন্যান্য গোত্রও কি প্রাতকালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে । হাজার হাজার যোদ্ধার কারণে , ঠিক যেমন বৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বের আকাশ । সেই সব যোদ্ধার চিৎকারধ্বনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা ঘোড়াগুলোকে বধির করে দেয় এবং ( শরীরের ) বিকট দুর্গন্ধ দ্বারা হানাদার শত্রু বাহিনীকে দূরে হটিয়ে দেয় । ( দূরে হটিয়ে দেয় ) মাটির স্তূপের ন্যায় দুর্ভেদ্য জিন বাহিনীকেও , যাদের কারণে গাছের কাঁচা ফলও শুকিয়ে যায় । ”
📄 যুবায়দ গোত্রের বংশনামা
আমর ইব্ন মা‘দীকারব যুবায়দী ' এবং কায়স ইব্ন মাকশুহ মুরাদীর মাঝে কোন ব্যাপারে বিরোধ ছিল । এক পর্যায়ে তার কাছে খবর পৌঁছে যে , কায়স তাঁকে হুমকি দিচ্ছে । তখন তিনি বাসকে লক্ষ্য করে এ কবিতা আবৃত্তি করেন । এতে তিনি হিময়ার ও তার প্রতাপের উল্লেখ করে বলেন : “ হে কায়স , তুমি কি যুরুআয়ন অথবা যুনুয়াসের মত শক্তিমান যে , আমাকে ইমকি দিচ্ছ । আর তোমার পূর্বে লোকদের মধ্যে বিপুল সম্পদ ও স্থিতিশীল রাজত্ব ছিল , যা আদ জাতির চেয়েও প্রাচীন , দুর্ধর্ষ ও প্রতাপশালী ছিল । অথচ সেই রাজ্যের অধিবাসীরা ধ্বংস হয়ে গেছে , আর সেই রাজ্য একটি মানবগোষ্ঠী থেকে আর একটি মানবগোষ্ঠীর নিকট হস্তান্তরিত হচ্ছে । ”
ফুৰায়দ গোত্রের বংশনামা
ইবন হিশাম বলেন : যুবায়দ ইব্ন সালামা ইব্ন মাযিন ইব্ন মুনাব্বিহ ইব্ন সা'ব ইব্ন সা'দ আশীরাহ্ ইব্ন মাযহিজ । মতান্তরে যুবায়দ ইব্ন মুনাব্বিহ্ ইব্ন সা'ব ইব্ন সা'দ আশীরাহ্ , অন্যমতে যুবায়দ ইব্ন সা'ব ইবন সা'দ । মুরাদের নাম ইহাবির ইবন মাযহিজ ।
আমর ইব্ন মা'দীকারব কোন উপরোক্ত কবিতা রচনা করেন , তার বিবরণ দিতে গিয়ে ইবন হিশাম বলেন : আবূ উবায়দা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে , আরমানিয়ায় যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সালমান ইব্ন রবীআ বাহিনীকে হযরত উমর ( রা ) এই মর্মে নির্দেশ দেন যে , তার সৈনিকদের ভিতরে যাদের ঘোড়ার পিতামাতা উভয়ে আরব , তাদেরকে যেন শংকর জাতীয় ঘোড়ার অধিকারী সৈনিকদের চেয়ে অধিক পারিশ্রমিক দেয়া হয় । নির্দেশ অনুযায়ী যখন ঘোড়া পর্যবেক্ষণ করা হল , তখন ' আমর ইব্ন ' মাদীকারবের ঘোড়া দেখে সালমান বলল : “ এক সংকর আর এক সংকরকে দেখে চিনেছে । ” এ কথা শুনে কায়স তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে হত্যার হুমকি দেন । এ হুমকি শুনেই আমর উপরোক্ত কবিতা রচনা করেন ।
**টিকাঃ**
১. তিনি একজন প্রখ্যাত সাহাবী ছিলেন , তাঁর কুনিয়াত ছিল আবূ সাওর । তিনি অসীম সাহস ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন । মা'দীকারব অর্থ কৃষকের চেহারা ।
২. ইনি মুরাদ বংশীয় নন , বরং মুরাদের মিত্র । তাঁর বংশ বাজীলা গোত্রের বনু আহমাস শাখার অন্তর্ভুক্ত ।
📄 শিক ও সাতীহের ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা
শিক ও সাতীহের ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা
ইবন হিশাম বলেন : আবিসিনীয় সৈন্যদের আগ্রাসন সম্পর্কে সাতীহ এবং সুদানী সৈন্যদের আগ্রাসন সম্পর্কে শিক যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল , তা আরিয়াত ও আবরাহার নেত্বত্বে প্রেরিত নাজাশী বাহিনীর ধ্বংসলীলা ও নাজরান দখলের ঘটনার মধ্য দিয়ে সত্য প্রমাণিত হয় ।