📄 তুব্বানের মক্কা গমন ও কা'বা প্রদক্ষিণ
তুব্বানের মক্কা গমন ও কা'বা প্রদক্ষিণ
ইব্ন ইসহাক বলেন : তুব্বান ও তার স্বজাতির লোকেরা মূর্তি পূজারী ছিল । তিনি মক্কা রওয়ানা হলেন আর ইয়ামান যেতে তাকে মক্কা হয়েই যেতে হতো । উসফান ও আমাজের মধ্যস্থলে পৌঁছলে তার কাছে হুযায়ল ইবন মুদরিকা ইন ইলয়াস ইবন মুযার ইব্ন নিযার ইন মা'আদ গোত্রের একটি দল উপস্থিত হলো । দলটি তুব্বানকে বললো : হে রাজা ! আমরা কি আপনাকে এমন একটি গুপ্ত ধনাগারের সন্ধান দেব না , যার কথা আপনার আগের কোন রাজা - বাদশাহরা জানতেন না ? সেখানে মণি - মুক্তা , হীরা - চুনি , পান্না , ও সোনা - রূপা আছে ? তুব্বান বললেন : হ্যাঁ , বল । তারা বলল : “ মক্কায় একটি ঘর আছে । মক্কার অধিবাসীরা তার ইবাদত করে এবং তার কাছে নামায পড়ে ।
- আসলে হুযায়লীরা তুব্বানকে এভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিল । কারণ তারা জানত যে , অতীতে যে রাজাই ঐ ঘরটি দখল করতে চেষ্টা বা ইচ্ছা করেছে , বা তার বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছে , সেই ধ্বংস হয়েছে । ভূব্বান হুযায়লীদের পরামর্শ মুতাবিক কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন । কিন্তু তার আগে পূর্বোল্লিখিত পণ্ডিতদ্বয়ের কাছে লোক পাঠালেন এবং তাদের মতামত জানতে চাইলেন । পণ্ডিতদ্বয় বলল : তোমাকে যারা এই পরামর্শ দিয়েছে , তারা তোমাকে ও তোমার সৈন্যসামন্তকে ধ্বংস করার ফন্দি এঁটেছে । আমাদের জানামতে পৃথিবীতে একমাত্র এই ঘরটিই রয়েছে , যাকে আল্লাহ্ তাঁর নিজস্ব ঘর হিসাবে গ্রহণ করেছেন । তোমাদের হুযায়লীরা যা করতে বলেছে , তা করলে তুমি এবং তোমার সহযাত্রীরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে । তিনি বললেন ; তা হলে ঐ ঘরের কাছে গিয়ে আমার কি করা উচিত বলে তোমরা মনে কর ? পন্ডিতদ্বয় বলল : কা'বার আশপাশের লোকেরা যা করে , তুমিও তাই করবে । ঘরটির চারপাশ প্রদক্ষিণ করবে , তার প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করবে । তারপর মাথা কামাবে । যতক্ষণ সেখানে থাকবে , বিনয়ী থাকবে । তুব্বান বললেন : তোমরা দু'জনে এ কাজ কর না কেন ? তারা বলল : আল্লাহ্র কসম । ওটা আমাদের পিতা ইবরাহীমের ঘর । ঐ ঘর সম্পর্কে তোমাকে যা বলেছি , তা সবই সত্য । কিন্তু মক্কাবাসী ঐ ঘরের চারপাশে মূর্তি স্থাপন করে এবং তার সামনে রক্তপাত করে আমাদের ওখানে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে । ওরা অপবিত্র মুশরিক । তুব্বান তাদের এ সব উক্তির সত্যতা এবং তাদের আন্তরিকতা হৃদয়ংগম করলেন । তারপর হুযায়লী দলটিকে ডেকে এনে তাদের হাত - পা কেটে শাস্তি দিলেন । তারপর মক্কা রওয়ানা হয়ে গেলেন । মক্কা পৌঁছে তিনি কা'বা ঘরের তওয়াফ করলেন , ঘরের কাছে কুরবানী করলেন , মাথা কামালেন এবং ছয় দিন মক্কায় ঘরের অবস্থান করলেন । এ সময় তিনি আরো কুরবানী করে মক্কাবাসীকে আপ্যায়ন করলেন । তাদেরকে তিনি মধু পান করালেন ।
📄 বায়তুল্লাহ্-এ গিলাফ চড়ান
বায়তুল্লাহ -এ গিলা চড়ান
এ সময় তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে , তিনি কা'বাকে গিলাফ দিয়ে ঢাকছেন । তদনুসারে তিনি মোটা কাপড় দিয়ে কা'বায় গিলাফ চড়ালেন । পুনরায় স্বপ্ন দেখলেন যে , আরো ভালো কাপড় দিয়ে গিলাফ চড়াচ্ছেন । সে অনুসারে তিনি পুনরায় মূল্যবান ইয়ামানী কাপড় মায়াফির দিয়ে গিলাফ চড়ালেন । তৃতীয়বার স্বপ্ন দেখে তুব্বান পুনরায় আরো মূল্যবান ইয়ামানী কাপড় দিয়ে ' কা'বায় গিলাফ চড়ালেন । বস্তুত জনশ্রুতি অনুসারে , তৃব্বানই প্রথম কা'বাকে গিলাফ দিয়ে আবৃত করেন । তিনি কা'বার মুতাওয়াল্লী জুরহুম গোত্রের লোকদের সময়মত কাবায় গিলাফ চড়াতে উপদেশ দেন । কা'বাকে মূর্তি পূজাসহ সকল কলুষতা থেকে পবিত্র - পরিচ্ছন্ন রাখতে , তার কাছে কোন রক্তপাত না করতে , মৃতদেহ ও ঋতুকালে ব্যবহৃত নেকড়া কা'বাঘরের কাছে না ফেলার নির্দেশ দেন । তুব্বান কা'বাঘরের জন্য একটি দরজা এবং চাবিও বানিয়ে দেন । সুবাইআ বিনতে আহাব ভিন্নমতে আজব ইব্ন যাবীনা ইব্ন জুযায়মা ইন আওফ ইব্ নাসর ইবন মুআবিয়া ইব্ন বাকর ইব্ন হাওয়াযিন ইব্ন মানসূর ইন ইকরামা ইবন খাসাফা ইবন কায়স ইব্ন আয়লান নামক তাঁর নিজের এক পুত্রকে কা'বার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং মক্কাকে যে কোন বিদ্রোহ ও বিশৃংখলা থেকে রক্ষা করার উপদেশ দেন । আর তুব্বান কা'বার যে মিত্ত করেন এবং এর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেন , তার স্মরণে সুবাইআ নিম্নোক্ত কবিতাটি রচনা করেন :
“ হে প্রিয় পুত্ৰ ! মক্কায় ছোট বা বড় কারো ওপরই যুলুম করো না । ”
“ হে আমার পুত্র ! মক্কার প্রতিটি সম্মানিত জিনিসকে রক্ষা করো এবং অহংকারে মত্ত হয়ো না । ”
“ হে আমার পুত্র ! মক্কায় যে ব্যক্তি যুলুম - নিপীড়ন চালাবে , সে সকল রকমের অকল্যাণের সম্মুখীন হবে । ”
“ হে আমার পুত্র ! এ ধরনের লোকের মুখ আগুনে দগ্ধ হবে । ”
“ হে আমার পুত্র ! তুমি এ ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছ । মক্কায় যুলুমকারীকে তুমি ধ্বংস হতে দেখেছ । ”
“ এ শহরটিকে এবং এর প্রান্তরে যে সব ভবন রয়েছে , আল্লাহ্ই তার রক্ষক । ”
“ আল্লাহ্ এর পাখিগুলোকেও নিরাপত্তা দিয়েছেন এবং মক্কার সাবীর পাহাড়ের হরিণীও নিরাপদ । ”
“ তুব্বান মক্কায় ঘর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এসেছিল এবং আল্লাহর ঘরে ইয়ামানী নকশীদার মূল্যবান কাপড় দিয়ে গিলাফ চড়িয়েছিল । ”
**টিকাঃ**
১. কথিত আছে যে , তুব্বানের প্রথম দু'বারের গিলাফ চড়ানোমাত্রই কা'বা শরীফ জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে গিলাফ ফেলে দেয় । কেবল তৃতীয়বার রেশমী গিলাফ চড়ালেই তখন কা'বা স্থির থাকে এবং তা গ্রহণ করে ।
২. ইবন ইসহাকের মতে হাজ্জাজ ইব্ন ইউসুফ সর্ব প্রথম কা'বা শরীফে মূল্যবান রেশমী গিলাফ চড়ান । দারা কুতনী উল্লেখ করেছেন যে , আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব ছোটবেলায় একবার হারিয়ে গেলে তাঁর মা ' নাতীলা বিনতে জানাব এরূপ মানত করেন যে , আব্বাসকে খুঁজে পেলে কা'বা শরীফে রেশমের গিলাফ চড়াবেন । পরে তাকে পাওয়ার পর রেশমের গিলাফ চড়ান । মতান্তরে বংশনামা বিশারদ জুবায়র বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন জুবায়র প্রথম কাবায় রেশমের গিলাফ চড়ান ।
৩. বনূ সাবাক ইব্ন আবদুদ্দার এবং বনূ আলী ইবন সা'দ ইবন তামীম - এই দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে এই কুরায়শ বংশীয়া মহিলা অত্র কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেন । উক্ত দুটো গোত্রই যুদ্ধের ফলে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ।
📄 ইয়ামানের ইয়াহুদী জাতির প্রতিষ্ঠা
“ আমার প্রভু তার রাজ্যের অধিবাসীদের তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন । ফলে , তিনি তার মানত পূরণ করলেন । ”
“ তিনি খালি পায়ে কা'বায় আসলেন এবং এর খোলা প্রান্তরে দু'হাজার উট কুরবানী করলেন । ”
“ সেই সব হৃষ্টপুষ্ট উটের গোশ্ত তিনি মক্কাবাসীদের খাওয়ালেন । ”
“ আরো পান করালেন পরিচ্ছন্ন মধু এবং নির্মল যবের খাবার । ”
হস্তি বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছে , আর লোকেরা দেখছিল যে , তাদের উপর ঐ জনপদে প্রস্তরখণ্ড বর্ষিত হচ্ছিল । ”
তাদের বাদশাহ ( আবরাহা ) -কে মক্কার দূরবর্তী স্থানে ধ্বংস করা হয়েছে । ”
“ অতএব , যখন তোমাকে কিছু বলা হবে , তখন তা মনোযোগ সহকারে শুনবে এবং বুঝতে চেষ্টা করবে যে , ঘটনাবলীর পরিণতি কি রকম হয়ে থাকে । ”
ইয়ামানে ইয়াহুদী জাতির প্রতিষ্ঠা
এরপর তুব্বান মক্কা থেকে ইয়ামান অভিমুখে যাত্রা করলেন । তার সাথে তার সৈন্য - সামন্ত এবং পণ্ডিতদ্বয়ও চললেন । অবশেষে ইয়ামানে পৌঁছে তিনি তার জাতিকে নিজের নতুন ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দাওয়াত দিলেন । কিন্তু তারা ইয়ামানে অবস্থিত আগুনের কাছ থেকে মতামত না নিয়ে নতুন ধর্ম গ্রহণ করবে না বলে তাকে জানিয়ে দিল ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবূ মালিক ইব্ন সা'লাবা ইব্ন আবূ মালিক কুরাযী জানিয়েছেন যে , তিনি ইবরাহীম ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ্র কাছে শুনেছেন : তুব্বান যখন ইয়ামানে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে নিকটবর্তী হলেন , তখন হিময়ার গোত্র তাকে বাধা দিল । তারা বলল : তুমি আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছ । কাজেই তুমি এ দেশে প্রবেশ করতে পারবে না । তখন তুব্বান তাদেরকে স্বীয় ধর্মের দিকে দাওয়াত দিলেন এবং বললেন : তোমাদের ধর্মের চাইতে এটা ভাল । তারা বলল : তা হলে আগুনের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত এনে দাও । তিনি বললেন : বেশ , তাই হবে । বর্ণনাকারী বলেন : ইয়ামানবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাস মুতাবিক তাদের মাঝে বিতর্কিত বিষয়ে আগুন ফয়সালা দিত । এই আগুন যালিমকে খেয়ে ফেলত , অথচ মযলূমের কোন ক্ষতি করত না । তখন ইয়ামানবাসী পৌত্তলিকগণ তাদের মূর্তিগুলো নিয়ে এবং যে সব জিনিস দ্বারা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করা যায় বলে তাদের ধর্মের রীতি ছিল , সে সব কিছু নিয়ে বেরিয়ে পড়ল । আর ইয়াহুদী পণ্ডিতদ্বয় তাদের আসমানী কিতাবকে ঘাড়ে ঝুলিয়ে নিয়ে চললেন । নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে তারা আগুনের উৎসমুখে বসে পড়লেন । কিছুক্ষণ পর আগুন তাদের দিকে বেরিয়ে এল । আগুনকে এগিয়ে আসতে দেখে পৌত্তলিকরা ভয় পেয়ে সরে পড়ল । উপস্থিত লোকেরা তাদের সাহস দিল , উৎসাহিত করল এবং ধৈর্যের সাথে যথাস্থানে বসে থাকতে বলল । তারা ধৈর্য ধারণ করে বসতেই আগুন তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলল এবং প্রতিমা ও অন্যান্য ধর্মীয় সাজ - সরঞ্জাম পুড়িয়ে ভস্ম করে দিল । হিময়ার গোত্রের যে কয়জন পুরোহিত ধর্মীয় সাজ - সরঞ্জাম বহন করছিল , তারাও ভস্মীভূত হয়ে গেল । এই সময় ইয়াহুদী পণ্ডিতদ্বয় তাদের কাঁধে ধর্মগ্রন্থ ঝুলিয়ে চক্কর দিতে লাগলেন । আগুনের তাপে তাদের কপাল সামান্য ঘেমেছিল , কিন্তু তাদের কোনই ক্ষতি হয়নি । এ দৃশ্য দেখে হিময়ার গোত্রের লোকেরা তুব্বানের ধর্ম গ্রহণ করল । সেই থেকে ইয়ামানে ইয়াহুদী ধর্মের পত্তন হলো ।
ইবন ইসহাক বলেন : কথিত আছে যে , ইয়াহুদী পণ্ডিতদ্বয় এবং হিময়ার গোত্রের পুরোহিতরা প্রথমে স্থির করেন যে , যে পক্ষ আগুনকে থামাতে পারবে , সে পক্ষই সঠিক বলে সাব্যস্ত হবে । তদনুসারে প্রথমে হিময়ারীরা মূর্তি সামনে নিয়ে আগুনের কাছে এগিয়ে গেল তা ঠেকানোর জন্য । কিন্তু তারা ঠেকানো তো দূরের কথা , দৌড়ে পালিয়েও আগুনের কবল থেকে রক্ষা পেল না । এরপর পণ্ডিতদ্বয় তাওরাত তিলাওয়াত করতে করতে আগুনের কাছে এগিয়ে যেতেই তা থেমে গেল । তখন হিময়ার গোত্র সকলে ঐ ইয়াহূদী পণ্ডিতদ্বয়ের ধর্মকে গ্রহণ করল ।
📄 রিয়াম নামক ঘর ভাংগার ঘটনা
রিয়াম নামক ঘর ভাংগার ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়ামানবাসীর রিয়াম নামক একটা ঘর ছিল । এ ঘরটিকে তারা ভক্তি ও সম্মান করত , তার সামনে কুরবানী করত এবং তার সাথে কথা বলত । এ সব কিছুই তাদের পৌত্তলিকতার আমলের ব্যাপার । এ অবস্থা দেখে ইয়াহুদী পণ্ডিতদ্বয় তুব্বানকে বললেন : এ হচ্ছে শয়তানের একটা ফিতনা । এ দ্বারা সে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে । এ বিভ্রান্তি ঘুচানোর জন্য আমাদের সুযোগ দিন । তুব্বান বললেন : ঠিক আছে । তোমাদের সুযোগ দেয়া হল । ইয়ামানবাসীর জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে , পণ্ডিতদ্বয় ঐ ঘরের ভিতর থেকে একটা কাল কুকুর বের করে তা হত্যা করে ফেলল । তারপর ঐ ঘরটিকে ভেংগে ফেলল । কথিত আছে যে , ঐ ঘরে যে রক্ত প্রবাহিত হত , তার চিহ্ন এখানো তাতে বিদ্যমান । ঐ ঘরে নানা রকমের বলি দেয়া হত বলেই সম্ভবত রক্তের এত দাগ সৃষ্টি হয়েছে ।
**টিকাঃ**
১. রিয়াম অর্থ দয়া । এই ঘরে বন্দনাকারীরা বিশ্বাস করত যে , এতে দেবদেবীর দয়া পাওয়া যাবে । এ জন্য এ ঘরের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে ।