📄 মদীনাবাসীর সাথে তুব্বানের যুদ্ধের ঘটনা
মদীনাবাসীদের সাথে তুব্বানের যুদ্ধের ঘটনা -
ইবন ইসহাক বলেন : বনূ নাজ্জার গোত্রের বনূ আদী শাখার আহমার নামক এক ব্যক্তি তুব্বানের অনুসারীদের একজনকে মদীনায় অবস্থানকালে হত্যা করে । হত্যার কারণ ছিল এই যে , আহমার তুব্বানের অনুসারী লোকটিকে তার এক খেজুর বাগানে খেজুর পাড়তে দেখছিল । সে তখন তাকে নিজের দা দিয়ে কোপ দিয়ে খুন করে ফেলে এবং বলে : " খেজুর গাছের যে তত্ত্বাবধান করে , খেজুর পাড়ার অধিকার তারই । " তুব্বানের কাছে এ খবর পৌছামাত্রই যুদ্ধ বেধে যায় । কিন্তু মদীনাবাসী তুব্বানের সাথে এমনভাবে যুদ্ধ চালায় যে , দিনের বেলায় তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং রাতের বেলায় তার আতিথেয়তা করে । তুব্বান তাদের এ আচরণ দেখে তাজ্জব হয়ে যান এবং মন্তব্য করেন যে , আল্লাহর শপথ ! আমাদের কাওম তো খুবই ভদ্র । এভাবে যুদ্ধে লিপ্ত থাকাকালে বনূ কুরায়যা গোত্রের দু'জন ইয়াহুদী পণ্ডিত " তুব্বানের সাথে দেখা করে । বনূ কুরায়যা গোত্রটি কুরায়যার বংশধর । এই কুরায়যা , নযীর , নাজ্জাম , ' আমর ( আসল নাম হাদাল ) এরা সবাই খাযরাজ ইব্ন সুরায়হ্ ইব্ন তাওসান ইব্ন সাবত ইবন ইয়াসা ইব্ন সাদ ইব্ন লাভী ইব্ন খায়র ইব্ন নাজ্জাম , ইব্ন তানহুম ইব্ন আযির ইবন ইযারা ইবন হারুন ইবন ইমরান ইব্ন ইয়াসহার ইবন কাহিস ইবন লাভী ইবন ইয়াকূব -- অপর নাম ইসরাঈল ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম ।
মদীনার এই দুই পণ্ডিত ছিলেন আল্লাহ্র কিতাবে বিশেষ পারদর্শী । তুব্বান মদীনা ও তার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করতে চান , এ কথা শুনে তারা তার সাথে দেখা করে । তখন তারা তাকে বলে : হে রাজা ! আপনার ইচ্ছা পরিত্যাগ করুন । যদি যিদ ধরেন , তা হলেও আপনার সামনে বাধা আসবে । ফলে আপনি যা চান তা করতে পারবেন না । অথচ অচিরেই আপনার ওপর যে শাস্তি নেমে আসবে তা ঠেকানোর কোন উপায় আপনার থাকবে না । তুব্বান বললেন : কি কারণে আমার ওপর শাস্তি নেমে আসবে ? তারা বলল : মদীনা শেষ যামানার নবীর হিজরতস্থল । কুরায়শদের দ্বারা তিনি পবিত্র স্থান থেকে বহিষ্কৃত হবেন এবং এখানে এসে বসবাস করবেন ।
এ কথা শুনে রাজা থামলেন । তাঁর মনে হল , লোক দুটো সত্যিই বিজ্ঞ । তাঁদের কথায় রাজা মুগ্ধ হলেন । তিনি মদীনা ত্যাগ করলেন এবং ঐ পণ্ডিতদ্বয়ের ধর্ম গ্রহণ করলেন । এ খবর " পেয়ে কবি খালিদ ইব্ন আবদুল উযয্যা ইব্ন গাযীয়্যা ইব্ন আমর ( ই আবদ ) ইবন আউফ ইব্ন গন্ম ইব্ন নাজ্জার আমর ইবন তাল্লার প্রশংসা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন কবিতাটির কয়েকটি লাইনের বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ :
**টিকাঃ**
১. ইবন হিশাম এ লাইনটি স্বীকার না করলেও তাঁর কিতাবুত্ - তীজানে এক সুদীর্ঘ কবিতায় এটি উল্লেখ করেছেন । তার প্রথম লাইনটি হলো : “ তোমার চোখে ঘুম নেই কেন ? মনে হয় যেন বিষাক্ত কাল কেউটে সাপের বিষ দিয়ে ঐ চোখে সুরমা লাগিয়েছ । ”
📄 আনসার গোত্রের দাবি
“ ভুব্বান কি স্বীয় পূর্বপুরুষ আমর ইব্ন তারার স্মৃতি মুছে ফেলল , নাকি তার স্মরণ নিষিদ্ধ করে দিল , অথবা তাকে সানন্দে ত্যাগ করলো ? নাকি তুমি নিজের যৌবন কালকে স্মরণ করেছ , ( হে তুব্বান ) কিন্তু তোমার যৌবনকে স্মরণ করার স্বরূপ কি ?
আসলে এটা কোন নগণ্য যুদ্ধ নয় । তবে যুবকদের জন্য এ ধরনের যুদ্ধ সবক গ্রহণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ।
তোমার পূর্বপুরুষ ' ইমরান বা আসাদকে জিজ্ঞেস কর , কেননা , শেষরাতের অন্ধকারে তাদের উপর যুদ্ধ চেপে বসেছিল । সে ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া উচিত আবূ কারিবের , পূর্ণ যুদ্ধ সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে ও সুগন্ধিদ্রব্য মেখে । তারপর তারা বলল , আমরা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাব ? বনূ আওফের , না বনূ নাজ্জারের । বনূ নাজ্জারের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে যাব । কেননা তারা আমাদের অনেক মানুষকে অসহায়ভাবে হত্যা করেছে । অবশ্যই আমরা তাদের থেকে বদলা নেব । তরবারি নিয়ে তারা সরাসরি তাদের মুকাবিলা করেছে । আর তাদের তরবারি চালনা এত প্রচণ্ড ছিল , তা অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণের মত ছিল ।
তাদের সাথেই ছিল আমর ইব্ন তাল্লা । আল্লাহ্ তার সম্প্রদায়কে তার দীর্ঘায়ু দিয়ে উপকৃত করুন । তিনি এমন নেতা , যিনি রাজাদের ওপরও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন । আর যে ব্যক্তি আমরের ক্ষতি বা মুকাবিলা করার চেষ্টা করত , সে সফলকাম হত না ।
আনসার গোত্রের দাবি
আনসারদের এই দলটি মনে করে যে , তুব্বান তাদের প্রতিবেশি ইয়াহুদী গোত্রটির ওপরই রুষ্ট ছিলেন এবং সে তাদের ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন ; কিন্তু তারা তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে । ফলে তিনি তাদের ত্যাগ করে চলে যান । এ জন্য তুব্বা তার কবিতায় বলেছিল : “ ইয়াসরিবে বসবাসকারী গোত্র দু'টির ওপর আমার সমস্ত আক্রোশ । দুষ্কর্ম ও অরাজকতার কারণে এরা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ।
ইবন হিশাম বলেন : এ লাইনটি যে কবিতায় রয়েছে , তা আসলে তুব্বানের রচিত নয় । এ কারণেই আমি এ কবিতার সত্যতা স্বীকার করি না ।
📄 তুব্বানের মক্কা গমন ও কা'বা প্রদক্ষিণ
তুব্বানের মক্কা গমন ও কা'বা প্রদক্ষিণ
ইব্ন ইসহাক বলেন : তুব্বান ও তার স্বজাতির লোকেরা মূর্তি পূজারী ছিল । তিনি মক্কা রওয়ানা হলেন আর ইয়ামান যেতে তাকে মক্কা হয়েই যেতে হতো । উসফান ও আমাজের মধ্যস্থলে পৌঁছলে তার কাছে হুযায়ল ইবন মুদরিকা ইন ইলয়াস ইবন মুযার ইব্ন নিযার ইন মা'আদ গোত্রের একটি দল উপস্থিত হলো । দলটি তুব্বানকে বললো : হে রাজা ! আমরা কি আপনাকে এমন একটি গুপ্ত ধনাগারের সন্ধান দেব না , যার কথা আপনার আগের কোন রাজা - বাদশাহরা জানতেন না ? সেখানে মণি - মুক্তা , হীরা - চুনি , পান্না , ও সোনা - রূপা আছে ? তুব্বান বললেন : হ্যাঁ , বল । তারা বলল : “ মক্কায় একটি ঘর আছে । মক্কার অধিবাসীরা তার ইবাদত করে এবং তার কাছে নামায পড়ে ।
- আসলে হুযায়লীরা তুব্বানকে এভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিল । কারণ তারা জানত যে , অতীতে যে রাজাই ঐ ঘরটি দখল করতে চেষ্টা বা ইচ্ছা করেছে , বা তার বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছে , সেই ধ্বংস হয়েছে । ভূব্বান হুযায়লীদের পরামর্শ মুতাবিক কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন । কিন্তু তার আগে পূর্বোল্লিখিত পণ্ডিতদ্বয়ের কাছে লোক পাঠালেন এবং তাদের মতামত জানতে চাইলেন । পণ্ডিতদ্বয় বলল : তোমাকে যারা এই পরামর্শ দিয়েছে , তারা তোমাকে ও তোমার সৈন্যসামন্তকে ধ্বংস করার ফন্দি এঁটেছে । আমাদের জানামতে পৃথিবীতে একমাত্র এই ঘরটিই রয়েছে , যাকে আল্লাহ্ তাঁর নিজস্ব ঘর হিসাবে গ্রহণ করেছেন । তোমাদের হুযায়লীরা যা করতে বলেছে , তা করলে তুমি এবং তোমার সহযাত্রীরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে । তিনি বললেন ; তা হলে ঐ ঘরের কাছে গিয়ে আমার কি করা উচিত বলে তোমরা মনে কর ? পন্ডিতদ্বয় বলল : কা'বার আশপাশের লোকেরা যা করে , তুমিও তাই করবে । ঘরটির চারপাশ প্রদক্ষিণ করবে , তার প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করবে । তারপর মাথা কামাবে । যতক্ষণ সেখানে থাকবে , বিনয়ী থাকবে । তুব্বান বললেন : তোমরা দু'জনে এ কাজ কর না কেন ? তারা বলল : আল্লাহ্র কসম । ওটা আমাদের পিতা ইবরাহীমের ঘর । ঐ ঘর সম্পর্কে তোমাকে যা বলেছি , তা সবই সত্য । কিন্তু মক্কাবাসী ঐ ঘরের চারপাশে মূর্তি স্থাপন করে এবং তার সামনে রক্তপাত করে আমাদের ওখানে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে । ওরা অপবিত্র মুশরিক । তুব্বান তাদের এ সব উক্তির সত্যতা এবং তাদের আন্তরিকতা হৃদয়ংগম করলেন । তারপর হুযায়লী দলটিকে ডেকে এনে তাদের হাত - পা কেটে শাস্তি দিলেন । তারপর মক্কা রওয়ানা হয়ে গেলেন । মক্কা পৌঁছে তিনি কা'বা ঘরের তওয়াফ করলেন , ঘরের কাছে কুরবানী করলেন , মাথা কামালেন এবং ছয় দিন মক্কায় ঘরের অবস্থান করলেন । এ সময় তিনি আরো কুরবানী করে মক্কাবাসীকে আপ্যায়ন করলেন । তাদেরকে তিনি মধু পান করালেন ।
📄 বায়তুল্লাহ্-এ গিলাফ চড়ান
বায়তুল্লাহ -এ গিলা চড়ান
এ সময় তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে , তিনি কা'বাকে গিলাফ দিয়ে ঢাকছেন । তদনুসারে তিনি মোটা কাপড় দিয়ে কা'বায় গিলাফ চড়ালেন । পুনরায় স্বপ্ন দেখলেন যে , আরো ভালো কাপড় দিয়ে গিলাফ চড়াচ্ছেন । সে অনুসারে তিনি পুনরায় মূল্যবান ইয়ামানী কাপড় মায়াফির দিয়ে গিলাফ চড়ালেন । তৃতীয়বার স্বপ্ন দেখে তুব্বান পুনরায় আরো মূল্যবান ইয়ামানী কাপড় দিয়ে ' কা'বায় গিলাফ চড়ালেন । বস্তুত জনশ্রুতি অনুসারে , তৃব্বানই প্রথম কা'বাকে গিলাফ দিয়ে আবৃত করেন । তিনি কা'বার মুতাওয়াল্লী জুরহুম গোত্রের লোকদের সময়মত কাবায় গিলাফ চড়াতে উপদেশ দেন । কা'বাকে মূর্তি পূজাসহ সকল কলুষতা থেকে পবিত্র - পরিচ্ছন্ন রাখতে , তার কাছে কোন রক্তপাত না করতে , মৃতদেহ ও ঋতুকালে ব্যবহৃত নেকড়া কা'বাঘরের কাছে না ফেলার নির্দেশ দেন । তুব্বান কা'বাঘরের জন্য একটি দরজা এবং চাবিও বানিয়ে দেন । সুবাইআ বিনতে আহাব ভিন্নমতে আজব ইব্ন যাবীনা ইব্ন জুযায়মা ইন আওফ ইব্ নাসর ইবন মুআবিয়া ইব্ন বাকর ইব্ন হাওয়াযিন ইব্ন মানসূর ইন ইকরামা ইবন খাসাফা ইবন কায়স ইব্ন আয়লান নামক তাঁর নিজের এক পুত্রকে কা'বার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং মক্কাকে যে কোন বিদ্রোহ ও বিশৃংখলা থেকে রক্ষা করার উপদেশ দেন । আর তুব্বান কা'বার যে মিত্ত করেন এবং এর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেন , তার স্মরণে সুবাইআ নিম্নোক্ত কবিতাটি রচনা করেন :
“ হে প্রিয় পুত্ৰ ! মক্কায় ছোট বা বড় কারো ওপরই যুলুম করো না । ”
“ হে আমার পুত্র ! মক্কার প্রতিটি সম্মানিত জিনিসকে রক্ষা করো এবং অহংকারে মত্ত হয়ো না । ”
“ হে আমার পুত্র ! মক্কায় যে ব্যক্তি যুলুম - নিপীড়ন চালাবে , সে সকল রকমের অকল্যাণের সম্মুখীন হবে । ”
“ হে আমার পুত্র ! এ ধরনের লোকের মুখ আগুনে দগ্ধ হবে । ”
“ হে আমার পুত্র ! তুমি এ ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছ । মক্কায় যুলুমকারীকে তুমি ধ্বংস হতে দেখেছ । ”
“ এ শহরটিকে এবং এর প্রান্তরে যে সব ভবন রয়েছে , আল্লাহ্ই তার রক্ষক । ”
“ আল্লাহ্ এর পাখিগুলোকেও নিরাপত্তা দিয়েছেন এবং মক্কার সাবীর পাহাড়ের হরিণীও নিরাপদ । ”
“ তুব্বান মক্কায় ঘর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এসেছিল এবং আল্লাহর ঘরে ইয়ামানী নকশীদার মূল্যবান কাপড় দিয়ে গিলাফ চড়িয়েছিল । ”
**টিকাঃ**
১. কথিত আছে যে , তুব্বানের প্রথম দু'বারের গিলাফ চড়ানোমাত্রই কা'বা শরীফ জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে গিলাফ ফেলে দেয় । কেবল তৃতীয়বার রেশমী গিলাফ চড়ালেই তখন কা'বা স্থির থাকে এবং তা গ্রহণ করে ।
২. ইবন ইসহাকের মতে হাজ্জাজ ইব্ন ইউসুফ সর্ব প্রথম কা'বা শরীফে মূল্যবান রেশমী গিলাফ চড়ান । দারা কুতনী উল্লেখ করেছেন যে , আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব ছোটবেলায় একবার হারিয়ে গেলে তাঁর মা ' নাতীলা বিনতে জানাব এরূপ মানত করেন যে , আব্বাসকে খুঁজে পেলে কা'বা শরীফে রেশমের গিলাফ চড়াবেন । পরে তাকে পাওয়ার পর রেশমের গিলাফ চড়ান । মতান্তরে বংশনামা বিশারদ জুবায়র বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন জুবায়র প্রথম কাবায় রেশমের গিলাফ চড়ান ।
৩. বনূ সাবাক ইব্ন আবদুদ্দার এবং বনূ আলী ইবন সা'দ ইবন তামীম - এই দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে এই কুরায়শ বংশীয়া মহিলা অত্র কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেন । উক্ত দুটো গোত্রই যুদ্ধের ফলে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ।