📄 হায়াতুন নবী (সঃ) এর আক্বীদা
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বীদা হল, নবী কারীম (সঃ) তাঁর কবর মোবারকে সম্পূর্ণ জীবিত অবস্থায় রয়েছেন, যেমন শহীদগণ তাদের কবরে জীবিত থাকেন। নব্য সালাফিয়্যাতের দাবীদার ওহাবীরা এটাকে অস্বীকার করলেও তাদের ইমাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) নবী কারীম (সঃ) এর কবর কিংবা অন্য কারও কবরের নিকট দু'য়া-মুনাজাত ইত্যাদির কঠোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তিনি নবী কারীম (সঃ) সহ অন্যান্য ওলী-আল্লাহদের কবর থেকে যে বিভিন্ন আওয়াজ শ্রবণের কথা বর্ণিত আছে, সেটা স্বীকার করে লিখেছেন-
ولا يدخل في هذا الباب، ما يروى من أن قوما سمعوا رد السلام من قبر النبي صلى الله عليه وسلم، أو قبور غيره من الصالحين. وأن سعيد بن المسيب كان يسمع الأذان من القبر ليالي الحرة. ونحو ذلك. فهذا كله حق ليس مما نحن فيه، والأمر أجل من ذلك وأعظم
“[কবরের নিকট মুনাজাত ইত্যাদির নিষেধাজ্ঞার মাঝে] ঐ সমস্ত বিষয় অন্তর্ভূক্ত হবে না, যেগুলো বিভিন্ন আউলিয়াদের থেকে বর্ণিত আছে যেমন, কেউ কেউ নবী কারীম (সঃ) এবং অন্যান্য আউলিয়াদের কবর থেকে সালামের উত্তর শুনেছেন । হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) গ্রীষ্মের রাতে নবী কারীম (সঃ) এর করব থেকে আজানের ধ্বনি শ্রবণ করতেন। এ সমস্ত বিষয় সবই সত্য । আমাদের আলোচ্য বিষয় এগুলো নয়।”
[ইকতেযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম, পৃষ্ঠা-২৫৪, (শামেলা)]
📄 নবীজী (সঃ) এর কর্তৃক মানুষের অভিযোগ শ্রবণ
كذلك أيضا ما يروى أن رجلا جاء إلى قبر النبي صلى الله عليه وسلم، فشكا إليه الجدب عام الرمادة، فرآه وهو يأمره أن يأتي عمر ، فيأمره أن يخرج يستسقي بالناس فإن هذا ليس من هذا الباب.
“তেমনিভাবে উপরোক্ত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নবী কারীম (সঃ) এর নিকট যে সমস্ত অভিযোগ করা হয় এবং সাহায্য প্রার্থনা করা হয়, সেগুলো অন্তর্ভূক্ত হবে না। যেমন, বর্ণিত আছে, রমাদার বছর এক ব্যক্তি নবী কারীম (সঃ) এর কবরের নিকট এল এবং তাঁর নিকট অনাবৃষ্টির অভিযোগ করল । ঐ ব্যক্তি দেখল যে, নবী কারীম (সঃ) তাকে হযরত উমর (রাঃ) এর নিকট যাওয়ার আদেশ দিলেন এবং হযরত উমরকে আদেশ দিলেন যে, তিনি যেন সকলকে নিয়ে ইস্তেসকার নামায আদায় করেন। এ সমস্ত বিষয়ও আমাদের আলোচনার অন্তর্ভূক্ত নয়”
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর উপরোক্ত বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোন সমস্যার কারণে নবী কারীম (সঃ) এর নিকট অভিযোগ করা জায়েয। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন-
وكذلك سؤال بعضهم للنبي صلى الله عليه وسلم، أو لغيره من أمته حاجة فتقضى له، فإن هذا قد وقع كثيرا، وليس هو مما نحن فيه
“তেমনিভাবে বিভিন্ন মানুষ নবী কারীম (সঃ) এবং তাঁর উম্মতের কারও কারও নিকট বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের কথা বললে তাদের সে প্রয়োজন পূরণ হওয়ার যে সমস্ত ঘটনা বর্ণিত আছে, সেগুলোও আমাদের আলোচনার অন্তর্ভূক্ত নয়। কেননা এধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে । আমাদের আলোচ্য বিষয় মূলত এটি নয়”
[ইকতেযাউ সিরাতিল মুস্তাকিম, পৃষ্ঠা-২৫৪.]
📄 আল্লামা ইবনু আদিল হাদী কর্তৃক আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর প্রশংসা
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আব্দুল হাদী আল-মুকাদ্দেসী আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর জীবনী লিখেছেন। আল্লামা ইবনে আব্দুল হাদী আল-মুকাদ্দেসী (রহঃ) “আল-উকুদুদ দুররিয়া ফি মানাকিবি ইবনে তাইমিয়া” নামক কিতাবে ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর প্রশংসায় অনেক ক্বাসিদা উল্লেখ করেছেন।
আল্লামা ইবনে আব্দুল হাদী (রহঃ) লিখেছেন-
يا غنية المبتغين الرشدمانحهم * * فتوح غيب أتى من عند باريه
“হে অনুসন্ধানীদের অভিষ্ট লক্ষ্যস্থল, হে হেদায়াতের আলোক বর্তিকা! প্রভূর নিকট থেকে আগত হে গায়েব উন্মোচন কারী!”
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৪৫৯]
...
ولما تبدى نور نعشك لامعا ... تمنت بنات النعش أن تتحطما
وودت بأن تدنو الثريا إلى الثرى ... نثارا عليه رفعة وتعظما
نزلت على أهل المقابر رحمة ... وأنقذتهم من ظلمة الظلم والظما
...
“যখন তার খাটিয়ার নূর উদ্ভাসিত হল, দিগন্তের তারকা-রাজি ভেঙ্গে পড়ার আকাংখ্যা করল । তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও সম্মানে আকাশের তারকারাজি জমিনের সাথে মিশে যেতে চাইল । কবর বাসীর উপর রহমত বর্ষিত হল, এবং তাদের পিপাসা নিবারণ করল এবং তাদেরকে যুলুমের অন্ধকার থেকে মুক্ত করল ।”
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৪৭৭]
أنت روح الوجود في عصرك الآ * * ن وقلب الورى وعين الزمان
“তুমি বর্তমান সময়ের অস্তিত্বের রুহ, জগতের প্রাণ, যামানার চক্ষু”
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৪৫৬]
وله مقام في الوصول لربه ... ومقامه نطقت بها الأقتام ...
وتصوف وتقشف وتعفف ... وقراءة وعبادة وصيام ...
وعناية وحماية ووقاية ... وصيانة وأمانة ومقام ...
وله كرامات سمت وتعددت ... ولها على مر الدهور دوام ...
“আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে তার বিশেষ মাকام রয়েছে। তার এ মাকাম সম্পর্কে মনীষীদের স্বীকারোক্তি রয়েছে।... তিনি “তাছাউফ” অর্জন করেছেন, দুনিয়া বিরাগী হয়েছেন, চরিত্রকে করেছেন নির্মল। “কুরআন তেলাওয়াত, ইবাদত ও সিয়াম সাধনা করেছেন। সচেতনতা, সংরক্ষণশীলতা, পরহেযগারীতা, ও আমানতদারীতায় তার ছিল বিশেষ মাকাম । “তাঁর অনেক বড় বড় কারামত রয়েছে । যুগের বিবর্তনে যা অবিনশ্বর।”
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৫০০]
قطب الزمان وتاج الناس كلهم و ... روح المعاني حوى كل العبادات ...
حبر الوجود فريد في معارفه ... أفنى بسيف الهدى أهل الضلالات
“তিনি ছিলেন যামানার কুতুব, সকলের মাথার মুকুট ও মর্মের কেন্দ্রবিন্দু । প্রত্যেক ইবাদতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যামানার মহাজ্ঞানী, মা'রেফাতে একক ব্যক্তিত্ত্ব। তিনি হেদায়াতের তলোয়ার দিয়ে ভ্রষ্টতাকে নিঃশেষ করেছেন”
আল্লামা ইবনু আব্দুল হাদী (রহঃ) লিখেছেন-
وليس يقع من مثله أمر ينقم منه عليه إلا أنه يكون أمرا قد لبس عليه ونسب إلى ما لا ينسب مثله إليه والتطويل على الحضرة العالية لا يليق إن يكن في الدنيا قطب فهو القطب على التحقيق
“তাঁর থেকে এমন কোন বিষয় প্রকাশিত হয়নি, যার কারণে তিনি সমালোচনার যোগ্য হবেন। তবে কিছু বিষয় এমন রয়েছে যা তাঁর উপর আরোপ করা হয়েছে এবং তাঁর দিকে এমন কিছু বিষয় সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যা সমীচীন নয় । হযরতে আলিয়ার ব্যাপারে অনৈতিক উক্তি করা উচিৎ নয় । দুনিয়াতে যদি প্রকৃত কোন কুতুব থাকে, তবে প্রকৃতপক্ষে তিনিই হলেন কুতুব।”
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৩৭৩]
ড. সাইয়্যেদ সবীহ আল্লামা ইবনে আব্দুল হাদী (রহঃ) এর উক্তি উল্লেখ করে বলেছেন- ওহাবীরা কুতুব, আব্দাল এগুলো অস্বীকার করে এবং তাছাউফকে কুফুর, শিরক ইত্যাদি আখ্যায়িত করে । অথচ তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, সেগুলো তারা জানে না ।
[আখতাউ ইবনে তাইমিয়া ফি হক্কি রাসূলিল্লাহি (সঃ) ও আহলি বাইতিহি, এর ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৯]
আল্লামা ইবনু আব্দিল হাদী (রহঃ) লিখেছেন-
كان تاج العارفين لوقتنا
“তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের তাজুল আরেফীন (আরেফীনদের মাথার মুকুট)
[আল-উকুদুদ দুররিয়া মিন মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-৪৮৬]
📄 আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর কারামত
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) “মাদারিজুস সালিকিন শরহু মানাযিলিস সাঈরিন” নামক কিতাবে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর কারামতের কথা উল্লেখ করেছেন । আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) লিখেছেন-
أخبر الناس والأمراء سنة اثنتين وسبعمائة لما تحرك التتار وقصدوا الشام : أن الدائرة والهزيمة عليهم وأن الظفر والنصر للمسلمين وأقسم على ذلك أكثر من سبعين يمينا فيقال له : قل إن شاء الله فيقول : إن شاء الله تحقيقا لا تعليقا وسمعته يقول ذلك قال : فلما أكثروا على قلت : لا تكثروا كتب الله تعالى في اللوح المحفوظ : أنهم مهزومون في هذه الكرة وأن النصر لجيوش الإسلام
“তাতারীরা যখন মুসলিম উম্মাহের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনা অভিযান পরিচালনা করে এবং শামে আক্রমণের উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন ৭০২ হিঃ সনে শায়েখ (রহঃ) সাধারণ মানুষ এবং আমীর-উমারাদেরকে সংবাদ দিলেন যে, “তাতারীরা পরাজিত হবে এবং মুসলমানরা বিজয় ও সাহায্য লাভ করবে।”। তিনি তাঁর কথার উপর সত্তরটিরও বেশি কসম খেয়েছেন। তাঁকে বলা হল, আপনি ইনশাআল্লাহ বলুন! অতঃপর তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবে ইনশাআল্লাহ বলছি, সম্ভাবনা হিসেবে নয়। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যখন তারা আমার উপর পীড়াপীড়ি করল, আমি তাদেরকে বললাম, তোমরা পীড়াপীড়ি কর না, আল্লাহ তায়ালা লউহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন যে, তারা পরাজিত হবে এবং মুসলমানরা বিজয়ী হবে।
[মাদারিজুস সালিকিন, খ--২, পৃষ্ঠা-৪৮৯]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) আরও অনেক কারামতের কথা উল্লেখ করেছেন, ইবনে আব্দুল হাদী মুকাদ্দেসী (রহঃ) এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ)। বিস্তারিত জানার জন্য আগ্রহী পাঠক, মাদারিজুস সালিকীন ও আ'লামুল আলিয়্যা গ্রন্থদ্বয় দেখতে পারেন।