📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 ফানা, হালত ও মাকামের ব্যাখ্যা

📄 ফানা, হালত ও মাকামের ব্যাখ্যা


الْفَنَاءَ ثَلَاثَةُ أَنْوَاعِ " : نَوْعٌ لِلْكَامِلِينَ مِنْ الْأَنْبِيَاءِ وَالْأَوْلِيَاءِ ؛ وَنَوْعٌ لِلْقَاصِدِينَ مِنْ الْأَوْلِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ ؛ وَنَوْعٌ لِلْمُنَافِقِينَ الْمُلْحِدِينَ الْمُشَبِّهِينَ . ( فَأَمَّا الْأَوَّلُ ) فَهُوَ " الْفَنَاءُ عَنْ إِرَادَةِ مَا سِوَى اللَّهِ " بِحَيْثُ لَا يُحِبُّ إِلَّا اللَّهَ . وَلَا يَعْبُدُ إِلَّا إِيَّاهُ وَلَا يَتَوَكَّلُ إِلَّا عَلَيْهِ وَلَا يَطْلُبُ غَيْرَهُ ؛ وَهُوَ الْمَعْنَى الَّذِي يَجِبُ أَنْ يُقْصَدَ بِقَوْلِ الشَّيْخِ أَبِي يَزِيدَ حَيْثُ قَالَ : أُرِيدُ أَنْ لَا أُرِيدَ إِلَّا مَا يُرِيدُ . أَيْ الْمُرَادُ الْمَحْبُوبُ الْمَرْضِيُّ ؛ وَهُوَ الْمُرَادُ بِالْإِرَادَةِ الدِّينِيَّةِ وَكَمَالُ الْعَبْدِ أَنْ لَا يُرِيدَ وَلَا يُحِبَّ وَلَا يَرْضَى إِلَّا مَا أَرَادَهُ اللَّهُ وَرَضِيَهُ وَأَحَبَّهُ وَهُوَ مَا أَمَرَ بِهِ أَمْرَ إِيجَابٍ أَوْ اسْتِحْبَابٍ ؛ وَلَا يُحِبُّ إِلَّا مَا يُحِبُّهُ اللهُ كَالْمَلَائِكَةِ وَالْأَنْبِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَهَذَا مَعْنَى قَوْلِهِمْ فِي قَوْلِهِ : { إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ } قَالُوا : هُوَ السَّلِيمُ مِمَّا سِوَى اللَّهِ أَوْ مِمَّا سِوَى عِبَادَةِ اللَّهِ . أَوْ مِمَّا سِوَى إِرَادَةِ اللَّهِ . أَوْ مِمَّا سِوَى مَحَبَّةِ اللَّهِ فَالْمَعْنَى وَاحِدٌ وَهَذَا الْمَعْنَى إِنْ سُمِّيَ فَنَاءً أَوْ لَمْ يُسَمَّ هُوَ أَوَّلُ الْإِسْلَامِ وَآخِرُهُ. وَبَاطِنُ الدِّينِ وَظَاهِرُهُ
“ফানা তিন প্রকার । প্রথম প্রকার নবী ও কামেল ওলীদের ফানা। দ্বিতীয় প্রকার হল, ক্বাসেদীন তথা আল্লাহর ওলী ও সৎকর্মশীলদের ফানা । তৃতীয় প্রকার ফানা হল, মুনাফেক ও ধর্মদ্রোহী সাদৃশ্যদানকারীদের ফানা ।
প্রথম প্রকারের ফানা হল, গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে নিজের ইচ্ছাকে মিটিয়ে দেয়া অর্থাৎ বান্দা একমাত্র আল্লাহকেই মহব্বত করবে এবং একমাত্র তারই ইবাদত করবে, তার উপরই তাওয়াক্কুল করবে এবং তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না। শায়েখ আবু ইয়াযীদ বুস্তামী (রহঃ) এর উক্তির উদ্দেশ্য এটিই। তিনি বলেন-“আমি কামনা করি যে, তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুর ইচ্ছা করব না” অর্থাৎ তাঁর প্রিয় ও সন্তুষ্টপূর্ণ ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা । আর দ্বীনি বিষয়ে যে কোন ইচ্ছার ক্ষেত্রে এটিই কাম্য। বান্দা তখনই কামেল হবে, যখন সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুর ইচ্ছা করবে না, আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত কোন কিছুতে সন্তুষ্ট হবে না এবং আল্লাহর মহব্বত ব্যতীত কোন কিছুকে মহব্বত করবে না । আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেছেন, তা হয়ত আবশ্যকীয় কিংবা মুস্তাহাব পর্যায়ের। আল্লাহ যাকে মহব্বত করেন তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে মহব্বত করবে না, যেমন ফেরেশতা, নবীগন ও সৎকর্মশীলগণ । পবিত্র কুরআনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে তারা এটি উদ্দেশ্য নিয়েছেন । আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ )সদিন কারও সম্পদ ও সন্তান কোন উপকারে আসবে না । তবে যে ব্যক্তি পরিচ্ছন্ন হৃদয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে)
সূফীগণ বলেছেন- আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছু থেকে মুক্ত হৃদয় অথবা আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত অন্য সকল কিছু থেকে মুক্ত, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত সকল কিছু থেকে মুক্ত অথবা আল্লাহর মহব্বত ব্যতীত সকল কিছু থেকে মুক্ত হৃদয়ে যে উপস্থিত হবে । এ সকল অর্থের উদ্দেশ্য এক। আর একে ফানা বলা হয়। এখন কেউ একে ফানা বলুক চাই না বলুক, এটিই মূলতঃ ইসলামের শুরু, এটিই শেষ, এটি দ্বীনের বাহ্যিক (জাহের) এবং এটিই দ্বীনের বাতেন (অভ্যন্তর)।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১০, পৃষ্ঠা-২১৯]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) “ফানার” দ্বিতীয় প্রকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-
وَأَمَّا النَّوْعُ الثَّانِي : فَهُوَ " الْفَنَاءُ عَنْ شُهُودِ السِّوَى " . وَهَذَا يَحْصُلُ لِكَثِيرِ مِنْ السَّالِكِينَ ، فَإِنَّهُمْ لِفَرْطِ الْحِذَابِ قُلُوبِهِمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَعِبَادَتِهِ وَمَحَبَّتِهِ وَضَعْفِ قُلُوبِهِمْ عَنْ أَنْ تَشْهَدَ غَيْرَ مَا تَعْبُدُ وَتَرَى غَيْرَ مَا تَقْصِدُ ؛ لَا يَخْطُرُ بِقُلُوبِهِمْ غَيْرُ اللَّهِ ؛ بَلْ وَلَا يَشْعُرُونَ ؛ كَمَا قِيلَ فِي قَوْلِهِ : { وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا } قَالُوا : فَارِعًا مَنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ ذِكْرِ مُوسَى . وَهَذَا كَثِيرٌ يَعْرِضُ لِمَنْ فَقَمَهُ أَمْرٌ مِنْ الْأُمُورِ إِمَّا حُبُّ وَإِمَّا خَوْفٌ . وَإِمَّا رَجَاءٌ يُبْقِي قَلْبَهُ مُنْصَرِفًا عَنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا عَمَّا قَدْ أَحَبَّهُ أَوْ خَافَهُ أَوْ طَلَبَهُ ؛ بِحَيْثُ يَكُونُ عِنْدَ اسْتِغْرَاقِهِ فِي ذَلِكَ لَا يَشْعُرُ بِغَيْرِهِ . فَإِذَا قَوِيَ عَلَى صَاحِبِ الْفَنَاءِ هَذَا فَإِنَّهُ يَغِيبُ بِمَوْجُودِهِ عَنْ وُجُودِهِ وَبِمَشْهُودِهِ عَنْ شُهُودِهِ وَبِمَذْكُورِهِ عَنْ ذِكْرِهِ وَبِمَعْرُوفِهِ عَنْ مَعْرِفَتِهِ حَتَّى يَفْنَى مَنْ لَمْ يَكُنْ وَهِيَ الْمَخْلُوقَاتُ الْمُعَبَّدَةُ مِمَّنْ سِوَاهُ وَيَبْقَى مَنْ لَمْ يَزُلْ وَهُوَ الرَّبُّ تَعَالَى وَالْمُرَادُ فَنَاؤُهَا فِي شُهُودِ الْعَبْدِ وَذِكْرِهِ وَفَنَاؤُهُ عَنْ أَنْ يُدْرِكَهَا أَوْ يَشْهَدَهَا . وَإِذَا قَوِيَ هَذَا ضَعُفَ الْمُحِبُّ حَتَّى اضْطَرَبَ فِي تَمْيِيزِهِ فَقَدْ يَظُنُّ أَنَّهُ هُوَ مَحْبُوبُهُ كَمَا يُذْكَرُ : أَنَّ رَجُلًا أَلْقَى نَفْسَهُ فِي الْيَمِّ فَأَلْقَى مُحِبُّهُ نَفْسَهُ خَلْفَهُ فَقَالَ : أَنَا وَقَعْتُ فَمَا أَوْقَعَكَ خَلْفِي قَالَ : غِبْتُ بِكَ عَنِّي فَظَنَنْتُ أَنَّكَ أَنِي
“দ্বিতীয় প্রকার হল, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর দর্শন ও চিন্তা থেকে ফানা হওয়া । এটি অনেক সালেকেরই অর্জিত হয়ে থাকে। কেননা তারা আল্লাহর যিকিরের প্রতি অধিক আসক্তি, অধিক ইবাদত ও মহব্বত এবং অন্তরের মুজাহাদার মাধ্যমে এমন স্তরে উন্নীত হন যে, তাদের অন্তর মা'বুদ ব্যতীত অন্য কিছুকে প্রত্যক্ষ করে না, মা'বুদ ব্যতীত অন্য কারও প্রতি তাদের ক্বলব ধাবিত হয় না । আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু তাদের কল্পনায়ও আসে না বরং তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু অনুভব করতে পারেন না। যেমন হযরত মুসা (আঃ) এর মা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
“সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসা জনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। [সূরা ক্বাসাস-১০]
সূফীগণ বলেছেন- তাঁর হৃদয় মুসা (আঃ) এর স্মরণ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে ঘটে থাকে । যেমন কেউ অধিক ভয়, মহব্বত কিংবা অধিক আশায় নিপতিত হলে তার অন্তর অন্য সব কিছু থেকে খালি হয়ে যায় এবং তার অন্তর ভয়, মহব্বত কিংবা আশা ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে তার উদ্দিষ্ট বিষয়ে এতটা নিমগ্ন থাকে যে, অন্য কিছুর অস্তিত্বই অনুভব করতে পারে না। “ফানার” অধিকারীর উপর যখন এ অবস্থা প্রবল হয়, তখন সে তার অস্তিত্ব ভুলে যায়, নিজের ধ্যান থেকে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, নিজের কথা ভুলে আল্লাহকে স্মরণ করে এমনকি অস্তিত্বহীন সকল কিছু তাঁর নিকট ফানা হয়ে যায়, অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য যা কিছুর ইবাদত করা সব কিছু অস্তিত্বহীন মনে হয় এবং এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই তাঁর অন্তরে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং মূল উদ্দেশ্য হল, বান্দার ধ্যান থেকে এবং বান্দার স্মরণ থেকে মাখলুকাত ফানা হওয়া এবং বান্দা এ সমস্ত জিনিসের অস্তিত্ব অনুভব কিংবা ধ্যান থেকে ফানা হওয়া । এ অবস্থা যখন প্রবল হয়, তখন প্রেমিক দূর্বল হয়ে পড়ে এমনকি তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতার মাঝে ত্রুটি দেখা যায়, তখন সে নিজেকেই তার প্রেমাস্পদ মনে করতে শুরু করে। যেমন, বলা হয়, এক ব্যক্তি নিজেকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে তার প্রেমিকও তার পিছে পিছে ঝাঁপ দিয়েছে। তখন সে তার প্রেমিককে জিজ্ঞেস করল যে, আমি নিজে পড়েছি, তোমাকে কে নিক্ষেপ করল? সে বলল- তোমার ধ্যানে আমি আমার নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেছি । আমি মনে করেছি তুমিই আমি ।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১০, পৃষ্ঠা-২১৯]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وَفِي هَذَا الْفَنَاءِ قَدْ يَقُولُ : أَنَا الْحَقُّ أَوْ سُبْحَانِي أَوْ مَا فِي الْحُبَّةِ إِلَّا اللَّهُ إِذَا فَنِيَ بِمَشْهُودِهِ عَنْ شُهُودِهِ وَبِمَوْجُودِهِ عَنْ وُجُودِهِ . وَبِمَذْكُورِهِ عَنْ ذِكْرِهِ وَبِمَعْرُوفِهِ عَنْ عِرْفَانِهِ . كَمَا يَحْكُونَ أَنَّ رَجُلًا كَانَ مُسْتَغْرِقًا فِي مَحَبَّةِ آخَرَ فَوَقَعَ الْمَحْبُوبُ فِي الْيَمِّ فَأَلْقَى الْآخَرُ نَفْسَهُ خَلْفَهُ فَقَالَ مَا الَّذِي أَوْقَعَكَ خَلْفِي ؟ فَقَالَ : غِبْت بِكَ عَنِّي فَظَنَنْت أَنَّكَ أَنِّي . وَفِي مِثْلِ هَذَا الْمَقَامِ يَقَعُ السُّكْرُ الَّذِي يُسْقِطُ التَّمْيِيزَ مَعَ وُجُودِ حَلَاوَةِ الْإِيمَانِ كَمَا يَحْصُلُ بِسُكْرِ الْخَمْرِ وَسُكْرِ عَشِيقِ الصُّوَرِ . وَكَذَلِكَ قَدْ يَحْصُلُ الْفَنَاءُ بِحَالِ خَوْفٍ أَوْ رَجَاءٍ كَمَا يَحْصُلُ بِحَالِ حُبِّ فَيَغِيبُ الْقَلْبُ عَنْ شُهُودِ بَعْضِ الْحَقَائِقِ وَيَصْدُرُ مِنْهُ قَوْلٌ أَوْ عَمَلٌ مِنْ جِنْسِ أُمُورِ السُّكَارَى وَهِيَ شَطَحَاتُ بَعْضِ الْمَشَايِخِ : كَقَوْلِ بَعْضِهِمْ : أَنْصِبُ خَيْمَتِي عَلَى جَهَنَّمَ وَنَحْوِ ذَلِكَ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الْمُخَالِفَةِ لِلشَّرْعِ ؛ وَقَدْ يَكُونُ صَاحِبُهَا غَيْرَ مَأْثُومٍ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَيُشْبِهُ هَذَا الْبَابُ أَمْرَ حُفَرَاءِ الْعَدُوِّ وَمَنْ يُعِينُ كَافِرًا أَوْ ظَالِمًا بِحَالِ وَيَزْعُمُ أَنَّهُ مَغْلُوبٌ عَلَيْهِ . وَيَحْكُمُ عَلَى هَؤُلَاءِ أَنَّ أَحَدَهُمْ إِذَا زَالَ عَقْلُهُ بِسَبَبٍ غَيْرِ مُحَرَّمٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمْ فِيمَا يَصْدُرُ عَنْهُمْ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَفْعَالِ الْمُحَرَّمَةِ بِخِلَافِ مَا إِذَا كَانَ سَبَبُ زَوَالِ الْعَقْلِ وَالْغَلَبَةِ أَمْرًا مُحَرَّمًا . وَهَذَا كَمَا قُلْنَا فِي عُقَلَاءِ الْمَجَانِينِ والمولهين الَّذِينَ صَارَ ذَلِكَ لَهُمْ مَقَامًا دَائِمًا كَمَا أَنَّهُ يَعْرِضُ هَؤُلَاءِ فِي بَعْضِ الْأَوْقَاتِ كَمَا قَالَ بَعْضُ الْعُلَمَاءِ ذَلِكَ فِي مَنْ زَالَ عَقْلُهُ حَتَّى تَرَكَ شَيْئًا مِنْ الْوَاجِبَاتِ . إِنْ كَانَ زَوَالُهُ بِسَبَبٍ غَيْرِ مُحَرَّمٍ مِثْلِ الْإِغْمَاءِ بِالْمَرَضِ أَوْ أُسْقِيَ مُكْرَهًا شَيْئًا يُزِيلُ عَقْلَهُ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَإِنْ زَالَ بِشُرْبِ الْخَمْرِ وَنَحْوِ ذَلِكَ مِنْ الْأَحْوَالِ الْمُحَرَّمَةِ أَثِمَ بِتَرْكِ الْوَاجِبِ وَكَذَلِكَ الْأَمْرُ فِي فِعْلِ الْمُحَرَّمِ وَكَمَا أَنَّهُ لَا جُنَاحَ عَلَيْهِمْ فَلَا يَجُوزُ الاقْتِدَاءُ بِهِمْ وَلَا حَمْلُ كَلَامِهِمْ وَفِعَالِهِمْ عَلَى الصِّحَّةِ بَلْ هُمْ فِي الْخَاصَّةِ مِثْلُ الْغَافِلِ وَالْمَجْنُونِ فِي التَّكَالِيفِ
“এ ফানার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সূফীগণ বলেছেন, আমি হক্ব (আল্লাহ), আমার সত্ত্বা সুমহান, অথবা আমার জামার নিচে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই নয়। যখন তারা নিজের ধ্যান থেকে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, নিজের অস্তিত্ব থেকে আল্লাহর অস্তিত্বে নিমজ্জিত হয়, নিজের স্মরণ থেকে আল্লাহর স্মরণে অবগাহন করে এবং নিজের মা'রেফাত থেকে আল্লাহর মা'রেফাতে ডুব দেয় তখন এ ধরণের পরিস্থিতির স্বীকার হয়। যেমন, ঘটনা বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তি অন্য কারও মহব্বতে নিমজ্জিত ছিল । কোন একদিন প্রেমাস্পদ সাগরে পড়ে গেলে প্রেমিকও তার পিছে পিছে নিজেকে সাগরে নিক্ষেপ করল। প্রেমাস্পদ জিজ্ঞেস করল, তোমাকে কে ফেলল? তখন সে বলল, আমি তোমার মাঝে হারিয়ে গেছি, আমি মনে করেছি, তুমিই আমি। এ অবস্থায় মানুষের মাঝে মাতাল অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা তার বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা দূর করে দেয়, কিন্তু ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে থাকে, যেমন মদ্যপ ব্যক্তি মদের স্বাদ এবং গাইরুল্লাহর প্রেমিক তার প্রেমের স্বাদ আস্বাদন করে। কখনও ভয় ও আশার কারণে “ফানা” এর অবস্থা সৃষ্টি হয়, যেমন মহব্বতের কারণেও ফানার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় অন্তর কিছু কিছু হাকীকত বুঝতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং তার থেকে এমন কিছু কাজ বা কথা প্রকাশ পায়, যা মাতালদের থেকে পাওয়া যায়।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
"قد يقع بعض من غلب عليه الحال في نوع من الحلول والاتحاد .. لماورد عليه ماغيب عقله أولإناه عما سوى محبوبه,ولم يكن ذلك بذنب منه كان معذورًا غير معاقب عليه مادام غير عاقل ... وهذا كما يحكى : أن رجلين كان أحدهما يحب الآخر فوقع المحبوب في اليم, فألقى الآخر نفسه خلفه فقال : أناوقعت فما الذي أوقعك ؟ فقال : غبت بك عني , فظننت أنك أني. فهذه الحال تعتري كثير من أهل المحبة والإرادة في جانب الحق, وفي غير جانبه ... فإنه يغيب بمحبوبه عن حبه وعن نفسه, وبمذكوره عن ذكره ... فلا يشعر حينئذ بالتميز ولا بوجوده, فقد يقول في هذه الحال : أنا الحق أوسبحاني أوما في الجبة إلا الله ونحوذلك...
“কিছু মাজযুবের উপর যখন তাদের হালত প্রবল হয়ে যায়, তাদের থেকে এমন কিছু কথা প্রকাশ পায় যা “হুলুল” (অনুপ্রবেশ) ও ইত্তেহাদ (সত্ত্বাগত একাত্মতা) এর অন্তর্ভূক্ত । তার উপর আরোপিত বিষয়ের কারণে তার আকুল চলে যায়, অথবা তাঁর মাহবুবের প্রতি প্রবল আসক্তির কারণে । এটি তার পক্ষ থেকে কোন গোনাহর কারণে নয়। এক্ষেত্রে তিনি মা'জুর এবং যতক্ষণ তিনি আক্বলহীন থাকবেন ততক্ষণ কোন শাস্তির যোগ্য হবেন না । তাদের অবস্থা ঐ ব্যক্তির ঘটনার মত যার সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, দু'ব্যক্তি একে অপরকে মহব্বত করত । প্রেমাস্পদ সাগরে পড়ে গেলে প্রেমিকও সাগরে পড়ে যায়। তখন প্রেমাস্পদ বলল, আমি পড়ে গেছি, তোমাকে কে ফেলল? প্রেমিক বলল- আমি তোমার মাঝে হারিয়ে গেছি, আমি ধারণা করেছি, আমি তুমিই ।
...এ সমস্ত অবস্থা মহব্বত ও ইরাদার অধিকারী অনেককে হকের পথে পরিচালিত করে, অনেককে তা অন্য দিকে পরিচালিত করে। কেননা সে তার প্রেমাস্পদের মাঝে হারিয়ে যায় এমনিক নিজের প্রেম ও অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে ভুলে যায়, যিকিরের মাধ্যমে সে আল্লাহর ইশকের মাঝে হারিয়ে যায়, তখন তার কোন পার্থক্য জ্ঞান থাকে না এবং সে নিজের অস্তিত্ত্ব বুঝতে পারে না। এ অবস্থায় কখনও তারা বলে থাকে যে, আমি হক্ব, আমার সত্ত্বা মহান, অথবা আমার জামার নিচে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই নয় ইত্যাদি।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--২, পৃষ্ঠা-৩৯৬]

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 সূফীদের হালত অবস্থায় তাদের থেকে শরীয়ত বিরোধী কথার হুকুম

📄 সূফীদের হালত অবস্থায় তাদের থেকে শরীয়ত বিরোধী কথার হুকুম


এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وَيَحْكُمُ عَلَى هَؤُلَاءِ أَنَّ أَحَدَهُمْ إِذَا زَالَ عَقْلُهُ بِسَبَبٍ غَيْرِ مُحَرَّمٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمْ فِيمَا يَصْدُرُ عَنْهُمْ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَفْعَالِ الْمُحَرَّمَةِ بِخِلَافِ مَا إِذَا كَانَ سَبَبُ زَوَالِ الْعَقْلِ وَالْغَلَبَةِ أَمْرًا مُحَرَّمًا
“সূফীদের এধরণের বক্তব্যের হুকুম হল, তাদের আকুল যদি হারাম কোন কারণ ব্যতীত চলে যায়, তবে তাদের থেকে যে সমস্ত হারাম কথা ও কাজ প্রকাশ পায় তার জন্য তিনি গোনাহগার হবেন না। তবে যদি তার আকুল চলে যাওয়ার কারণ কোন হারাম বিষয় হয়, তবে তার হুকুম ভিন্ন। (অর্থাৎ সে গোনাহগার ও শাস্তিযোগ্য হবে)।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১০, পৃষ্ঠা-৩৪০]

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 হুলুলের আকীদা থেকে সূফীগণ মুক্ত

📄 হুলুলের আকীদা থেকে সূফীগণ মুক্ত


আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وَلَيْسَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْمَعْرِفَةِ بِاللَّهِ يَعْتَقِدُ حُلُولَ الرَّبِّ تَعَالَى بِهِ ، أَوْ بِغَيْرِهِ مِنْ الْمَخْلُوقَاتِ وَلَا اتِّحَادَهُ بِهِ وَإِنَّ سَمْعَ شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ مَنْقُولُ عَنْ بَعْضٍ أَكَابِرِ الشُّيُوخِ . فَكَثِيرٌ مِنْهُ مَكْذُوبٌ اخْتَلَقَهُ الْأَفَّاكُونَ مِنْ الاتحادية المباحية ؛ الَّذِينَ أَضَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ وَأَلْحَقَهُمْ بِالطَّائِفَةِ النَّصْرَانِيَّةِ
“আল্লাহর মা'রেফাত লাভে ধন্য কেউ আল্লাহর ব্যাপারে এ আক্বীদা পোষণ করেন না যে, আল্লাহ তার মাঝে কিংবা অন্য কোন মাখলুকের মাঝে প্রবেশ করেছে (হুলুলের আক্বীদা) এবং তারা আল্লাহর সত্ত্বার সাথে একীভূত (ইত্তেহাদ) হওয়ার আক্বীদাও পোষণ করেন না। কোন কোন শায়েখ থেকে এজাতীয় যে সমস্ত বক্তব্য বর্ণিত আছে, এর অধিকাংশ মিথ্যা, যা সৃষ্টি করেছে ইত্তেহাদের আক্বীদায় বিশ্বাসী এক শ্রেণীর বিভ্রান্ত লোক. যাদেরকে শয়তান বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদেরকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত করেছে”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-৭৪-৭৫]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন,
ثُمَّ الصُّوفِيَّةُ الْمَشْهُورُونَ عِنْدَ الْأُمَّةِ - الَّذِينَ لَهُمْ لِسَانُ صِدْقٍ فِي الْأُمَّةِ - لَمْ يَكُونُوا يَسْتَحْسِنُونَ مِثْلَ هَذَا ؛ بَلْ يَنْهَوْنَ عَنْهُ وَلَهُمْ فِي الْكَلَامِ فِي ذَمّ صُحْبَةِ الْأَحْدَاثِ وَفِي الرَّدِّ عَلَى أَهْلِ الْخُلُولِ وَبَيَانِ مُبَايَنَةِ الْخَالِقِ : مَا لَا يَتَّسِعُ هَذَا الْمَوْضِعُ لِذِكْرِهِ
“উম্মতের মাঝে প্রসিদ্ধ সূফীগণ, উম্মতের মাঝে যারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাদের কেউ এ ধরণের আক্বীদা পছন্দ করতেন না। বরং তারা এ থেকে নিষেধ করতেন । আল্লাহর যাতের সাথে নশ্বর (হাদেস) কোন বিষয় সম্পৃক্ত কারীদের তারা নিন্দা করেছেন। হুলুলের আক্বীদা পোষকারীদের মত খ-ন করেছেন এবং খালেক ও মাখলুক ভিন্ন হওয়ার আক্বীদা পোষণ করেছেন। এখানে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ নেই।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১৫, পৃষ্ঠা-৪২৭]
এজন্য আল্লামা শা'রাণী (রহঃ) বলেন-
ولعمري إذا كان عُبَّاد الأوثان لم يتجرؤوا على أن يجعلوا آلهتهم عين الله ؛ بل قالوا: ما نعبدهم إلا ليقربونا إلى الله زلفى، فكيف يُظن بأولياء الله تعالى أنهم يدعون الاتحاد بالحق على حد ما تتعقله العقول الضعيفة ؟! هذا كالمحال في حقهم رضي الله تعالى عنهم، إذ ما من ولي إلا وهو يعلم أن حقيقته تعالى مخالفة لسائر الحقائق، وأنها خارجة عن جميع معلومات الخلائق، لأن الله بكل شيء محيط
“আমার জীবনের শপথ! যখন মূর্তিপূজকেরা একথা বলার দুঃসাহস দেখায় না যে, তারা যার পূজা করছে, সেটিই আল্লাহ, বরং তারা বলে, আমরা তাদের ইবাদত করি যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করিয়ে দেয়, সুতরাং কিভাবে ওলীআল্লাহদের সম্পর্কে একথা বলা হবে যে, তারা কোনভাবে আল্লাহ তায়ালার সাথে একীভূত (ইত্তেহাদ) হওয়ার দাবী করেছেন! কারও ন্যূনতম আকুল থাকলে সে এধরণের কথা বলবে না। তাদের সম্পর্কে এধরণের কথা বলা অসম্ভব । কেননা প্রত্যেক ওলীই জানেন যে, আল্লাহর যাতের হাকীকত সস্ত মাখলুকের হাকীকত থেকে ভিন্ন এবং আল্লাহর হাকীকত সমস্ত মাখলুকাতের ইলমের সীমার বাইরে । কেননা আল্লাহ তায়ালা সমস্ত কিছু বেষ্টন করে আছেন।”
[আল-ইয়াক্বিত ওয়াল জাওয়াহির, খ--১, পৃষ্ঠা-৮৩]

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 সূফীগণ তাকদীর থেকে মুক্ত

📄 সূফীগণ তাকদীর থেকে মুক্ত


নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার আক্বীদা অস্বীরকারী কাফের হবে না। এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وَلَوْ كَفَرَ هَؤُلَاءِ لَزِمَ تَكْفِيرُ كَثِيرٍ مِنْ الشَّافِعِيَّةِ ، وَالْمَالِكِيَّةِ ، وَالْحَنَفِيَّةِ ، وَالْحَنْبَلِيَّةِ ، وَالْأَشْعَرِيَّةِ ، وَأَهْلِ الْحَدِيثِ ، وَالتَّفْسِيرِ ، وَالصُّوفِيَّةِ : الَّذِينَ لَيْسُوا كُفَّارًا بِاتِّفَاقِ الْمُسْلِمِينَ
“যদি এদেরকে কাফের বলা হয়, তবে শাফেয়ী, মালেকী, হানাফী, হাম্বলী, আশআরী, মুহাদ্দিস, মুফাসসির এবং সূফীদের অনেককে কাফের বলা আবশ্যক হয়ে পড়ে । “মসুলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত বিষয় হল, পূর্বোক্ত কেউ কাফের নয়”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--৩৫, পৃষ্ঠা-১০১]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00