📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, আজ মুসলিম উম্মাহ ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায় অতিক্রম করছে। উম্মাহের ঘাড়ে পশ্চাৎপদতার যে জগদ্বল পাথর জেঁকে বসেছে তার বহুবিধ কারণ রয়েছে। একদিকে অমুসলিমদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ষড়যন্ত্র অন্যদিকে মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কলহ। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি আজ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন থাবায় আক্রান্ত । এমন কোন দিন অতিবাহিত হয় না, যেদিন মুসলিম উম্মাহের রক্ত আল্লাহর জমিন রঞ্জিত হয় না । অমুসলিমদের আক্রমণের স্বীকার মুসলিম উম্মাহের করুণ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিই অবগত ।
দ্বিতীয়তঃ মুসলিম উম্মাহ নিজেই তাঁর পশ্চাৎপদতার জন্য দায়ী। আজ তারা নিজেদের আচার-আচরণ, সামাজিকতা, রাজনীতি ও অর্থনীতি সবকিছুই অমুসলিমদের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছে । এ সমস্ত ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ধর্মের চিহ্নটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না । যেসমস্ত মুসলমান সঠিকভাবে ধর্মপালনে আগ্রহী এবং ধর্মের বিধি-বিধানের প্রতি যত্নশীল, তারাও আবার শতধা বিভক্ত । মুসলিম উম্মাহের এই বিভক্তিতে ঈন্ধন যোগানর জন্য মাথা গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন ফেরকা । ফেতনাবাজ শ্রেণী মুসলিম উম্মাহের এই নিদারূণ মুহূর্তেও ফেতনার ঢোল পিটাচ্ছে। উম্মাহের প্রতি করূণার পরিবর্তে মুসলিম উম্মাহকেক একে অপরের প্রতি লেলিয়ে দিচ্ছে, ঘৃণার বিষ-পাম্প তাদের মন ও মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ফলে তারা আপন মুসলিম ভাইকে এতটা ঘৃণা করছে, যতটা না তারা কাফের-মুশরিককে করে । আমরা প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। বিচ্ছিন্নতাবাদ, ফেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে ফেরকাটি বর্তমান সময়ে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, সেটি হল, সালাফী বা আহলে হাদীস ফেতনা, যা ওহাবী ফেতনা নামেও পরিচিত। শিয়া, কাদিয়ানী, ভ-পীর, কবরপূজারী এবং নাস্তিক- মুরতাদদের ফেতনায় উম্মাহের দেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, নব্য সৃষ্ট ফেতনাটি মুসলিম উম্মাহের সেই ক্ষতে মলম লাগানর পরিবর্তে লবণ লাগানর পথে অগ্রসর। ফলে সালাফিয়‍্যাতের নামে বিকৃতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রাসূল (সঃ) যেই চার মিশন নিযে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন অর্থাৎ দাওয়াত, তা'লীম, তাযকিয়া ও জিহাদ এর প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এই ফেতনাবাজ শ্রেণী ফেতনার জন্ম দিয়েছে।
আক্বিদা থেকে শুরু করে ইসলামের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে তারা সংস্কারের নামে নতুন ধ্যাণ-ধারণা প্রবর্তন করেছে এবং নব্য সৃষ্ট ধ্যাণ-ধারণা প্রতিষ্ঠার পিছনে তারা তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করছে। ফলে ইলমের স্বল্পতার কারণে মুসলিম উম্মাহের একটা শ্রেণী তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের চিন্তা-চেতনা এবং ধ্যাণ-ধারণার বিদ্যালয়ে যারা পাঠ নিয়েছে, তারা মুসলিম সমাজে বিচ্ছিন্নতা, ঘৃণা, অপবাদ এবং কাঁদা-ছোঁড়াছুঁড়ির মহড়া দিচ্ছে। তারা নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র মসজিদ নির্মাণ করেছে এবং স্বতন্ত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিম সমাজের একটা অংশকে তাদের অনুগামী বানিয়ে সে অংশকে বৃহত্তর মুসলিম সমাজ থেকে পৃথক করেছে। তারা মুসলমানদের সমাজে বাস করে, অথচ আপন মুসলিম ভাই সম্পর্কে এমন ধারণা ও ঘৃণা পোষণ করে যে, মুসলমানদের শত্রুতাও তা করে না। একই কাতারে নামায আদায় করে, অথচ নিজের পাশের মুসল্লী ভাইকে মুশরিক বলতে দ্বিধা করে না, এমনকি তারা যে ইমামের পিছে নামায আদায় করছে, সেও তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায় না । অথচ তারা যে ধ্যাণ-ধারণার উপর ভিত্তি করে এগুলো করছে, তা তাদের হাতেই সৃষ্ট, সালাফে-সালেহীন তাদের এ সমস্ত কর্মকা- থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, যেমন ইহুদীদের অপবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন হযরত মারিয়াম (আঃ) ।
রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত চার মিশনের কোনটিই তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি। সর্বক্ষেত্রে সংস্কারের নামে তারা তাদের নিজস্ব ধ্যাণ-ধারণার অনুপ্রবেশ করিয়েছে। আক্বীদার ক্ষেত্রে তারা এমন কিছু ধ্যাণ-ধারণার জন্ম দিয়েছে, যার সাথে সালাফে-সালেহীনের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই, যার অধিকাংশ হিজরী অষ্টম শতাব্দী কিংবা তার পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। যেমন তারা আল্লাহর জন্য জিসম, দিক ও সীমা সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালার সাথে নশ্বর বিষয় যুক্ত হওয়ার আক্বিদা তাদের হাতেই সৃষ্ট। এছাড়াও তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য বসার আক্বিদা এবং জাহান্নামের আগুন শেষ হওয়া ইত্যাদি আক্বিদা পোষণ করে । আর যারা তাদের সৃষ্ট আক্বিদায় বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদেরকে কাফের, মুশরিক, জাহমিয়া, মুয়াত্তিলা, পথভ্রষ্ট.. ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে।
ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে তারা সংস্কারের নামে তাকলীদকে হারাম করেছে এবং মাযহাবের অনুসারীদেরকে কাফের, মুশরিক, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি বলতে দ্বিধা করেনি। যেহেতু ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে হিজরী তৃতীয় শতকের পর থেকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুফাসসির, ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক কোন না কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, এজন্য পূর্বের কেউ তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি ।
نعم هكذا يضللون ويكفّرون ويبدعون أئمة السلفية وسادتهم وباسم « السلفية » - فيا سبحان الله - وكما يقال : ( الجنون فنون ) . ونسأل الله العافية
“আর এভাবেই তারা সালাফে-সালেহীন ও পূর্ববর্তী ইমামদের পথভ্রষ্ট, কাফের, বিদআতী ইত্যাদি বলে থাকে। আর এ সব কিছু তারা সালাফিয়্যাতের নামে করে থাকে । সুবহানাল্লাহ! তাদের অবস্থা তো এমন যে, বলা হয়ে থাকে, “আল-জুনুনু ফুনুন" (পাগলামির বিভিন্ন আর্ট বা শিল্প রয়েছে)। আমরা আল্লাহর নিকট এর থেকে পরিত্রাণ কামনা করি। [মাওকিফু আইম্মাতিল হারাকাতিস সালাফিয়্যা ফিত তাছাউফি ওয়াছ ছুফিয়্যা' এর ভূমিকা, আব্দুল হাফিয বিন মালিক আব্দুল হক মক্কী, পৃষ্ঠা-৮]
ইলমে হাদীস বিশেষ করে ইলমুল জারাহ ওয়াত তা'দীলের ক্ষেত্রে তারা তাদের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পরস্পর সংঘর্ষপূর্ণ মতামত দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উসূলে হাদীসের নিয়ম ভঙ্গ করে খিয়ানতের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ হাদীসের কিতাব সমূহকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী 'সহীহ' ও 'যয়ীফ' এ দু'ভাগে ভাগ করে কিতাব রচনা করেছে। এক্ষেত্রে মারাত্মক যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা হল, উম্মতের অনেকে তাঁদের সংঘর্ষপূর্ণ মতামতের ব্যাপারে অবগত না হয়ে তাদের অন্ধানুকরণ করছে । দেখা গেছে, একই হাদীসকে ভিন্ন ভিন্ন কিতাবে সহীহ ও যয়ীফ বলেছেন। সম্প্রতি ১৪২৪ হিঃ সনে জর্দানের দারুন নাফাইস থেকে প্রকাশিত আওদা বিন হাসান আওদা এর একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি এমন পাঁচশত হাদীস উল্লেখ করেছেন, যে সমস্ত হাদীসকে শেখ নাসীরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) তাঁর বিভিন্ন কিতাবে কখনও যয়ীফ আবার কখনও সহীহ বলেছেন। বর্তমানে সালাফীদের কারণে ইলমে হাদীস যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার আলোচনা করেছেন শায়েখ মামদুহ তাঁর “আল-ইত্তিজাহাতুল হাদিসিয়্যা” নামক বিখ্যাত গ্রন্থে। আগ্রহী পাঠকগণ কিতাবটি অধ্যয়ন করতে পারেন ।
রাসূল (সঃ) এর জীবনের অন্যতম একটি মিশন ছিল, জিহাদ তথা কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে সশস্ত্র যুদ্ধ)। ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে এক্ষেত্রেও সালাফীরা তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে এবং এমন কিছু মূলনীতি তৈরি করেছে যার মাধ্যমে তারা উম্মতকে এই ফরয আমল থেকে বিরত রাখতে পারে। তাদের এসমস্ত ভ্রান্ত নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন শায়েখ ড. আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية )আল-খুতুতুল আরিযা লি- আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক গ্রন্থে। এছাড়াও শায়েখ আব্দুল আযিয বিন মানসুর তাঁর الرد علي أدعياء السلفيبة )আর-রদ্দু আলা আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবে জিহাদ সম্পর্কে সালাফীদের ভ্রান্তি আলোচনা করেছেন । ড. শায়যী তাঁর কিতাবে সালাফীদের যে সমস্ত মূলনীতি উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে ১৯ নং মূলনীতি হল, الجهاد تكليف ما لا يطاق في هذا الزمان ولا إثم في تركه )এই যামানায় জিহাদ হল, এমন বিধান যা পালন করা সম্ভব নয়, সুতরাং তা ছেড়ে দিলে কোন গোনাহ হবে না)
সালাফীদের ২০ নং মূলনীতি হল, أفضل الجهاد اليوم ترك الجهاد ، وأفضل الإعداد ترك الإعداد )বর্তমানে উত্তম জিহাদ হল, জিহাদ ছেড়ে দেয়া এবং উত্তম প্রস্তুতি হল, কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করা)
রাসূল (সঃ) অন্যান্য আমল যেমন, দাওয়াত ও তাবলীগ এবং ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সমস্ত দল কাজ করে যাচ্ছে, সালাফীরা তাদের গোমরা, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি আখ্যায়িত করেছে । অনেকে তাদেরকে কাফির মুশরিক বলতে দ্বিধা করে না ।
শায়েখ ইউসুফ বিন সায়্যেদ হাশেম রিফায়ী তাঁর পুস্তিকা نصيحة لإخواننا علماء نجد (নজদের আলেমদের প্রতি নসিহত)। নজদের উলামায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন-
إذا اختلف معكم أحد في موضوع أو أمر فقهي أو عقدي أصدرتم كتبًا في ذمه وتبديعه أو تشريكه
ফিকহ, আক্বিদা অথবা অন্য কোন বিষয়ে তোমাদের সাথে কেউ যখন মতানৈক্য করে, তখন তোমরা তাকে নিন্দা করে, বিদআতী ও মুশরীক আখ্যায়িত করে কিতাব প্রকাশ করে থাকো।
لقد كفرتم الصوفية، ثم الأشاعرة، وأنكرتم واستنكرتم تقليد واتباع المذاهب الأربعة : أبي حنيفة ومالك والشافعي وأحمد بن حنبل
“তোমরা সর্বপ্রথম সূফীদেরকে কাফের বলেছো, অতঃপর আশআরীদেরকে । তোমরা চার মাযহাবের তাকলীদ ও অনুসরণকে অস্বীকার করেছ কিংবা অপছন্দ করেছ অর্থাৎ আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, পৃষ্ঠা-২৮-২৯]
٤٠ - كفرتم الصوفية ثم الأشاعرة والماتريدية وهم سواد المسلمين ، ثم التفتم إلى الأخوان ، ثم التبليغيين ثم بقية الدعاة والمفكرين . . فماذا أبقيتم غيركم من المسلمين؟
“তোমরা সূফীদেরকে কাফের বলেছ । অতঃপর আশআরী ও মাতুরীদেরকে কাফের বলেছ; অথচ এরা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম । অতঃপর তোমরা ইখওয়ানুল মুসলিমীন, তাবলীগ এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দায়ী ও ইসলামী চিন্তাবিদদের কাফের সাব্যস্ত করেছ। তোমরা নিজেদেরকে ব্যতীত আর কাদেরকে মুসলমান হিসেবে বাকী রেখেছ?”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, ইউসুফ বিন সাইয়্যেদ হাশেম রিফাঈ, পৃষ্ঠা- ৭১]
سلطتم من المرتزقة الذين تحتضنونهم من رمى بالضلالة والغواية الجماعات والهيئات الإسلامية العاملة في حقل الدعوة، والناشطة لإعلاء كلمة الله تعالى، والآمرة بالمعروف والناهية عن المنكر، كـ " التبليغ " و " الإخوان المسلمين " ، والجماعة " الديوبندية " التي تمثل علماء الهند وباكستان وبنغلاديش،
“তোমাদের খাদ্যে পালিত এবং তোমাদের কোলে আশ্রিতরা দাওয়াতের ময়দানে কর্মরত বিভিন্ন জামাত ও সংগঠন যারা আল্লাহ কালিমা সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মত আমল আঞ্জাম দিচ্ছে, তাদেরকে ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত হওয়ার ফতোয়া দান করে। যেমন- তাবলীগ, ইখওয়ানুল মুসলিমীন, দেওবন্দী জামাত যার অধিকাংশ হল, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, ইউসুফ বিন সাইয়্যেদ হাশেম রিফাঈ, পৃষ্ঠা- ৩০]
শায়েখ ড.আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية (আল-খুতুতুল আরিযা লি-আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবে জামাত ইসলাম সম্পর্কে সালাফীদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে লিখেছেন-
الأصل الثالث عشر لأصول أتباع السلفية الجديدة هو قولهم أن الجماعات الإسلامية ماهي إلا امتداد للفرق الضالة من معتزلة وأشاعرة وخوارج وقدرية وجهمية ، تنتهج منهج الخلف في العقيدة ، فأصبح بدل أن يقال هؤلاء أشاعرة وهؤلاء معتزلة صار يقال هؤلاء أخوان ، وهؤلاء تبليغ..
“নব্য সালাফিয়‍্যাতের দাবীদারদের ১৩ নং মূলনীতি হল, জামাত ইসলাম মূলতঃ ভ্রান্ত দল। এটি মু'তাযেলা, আশআরী, খারেযী, ক্বাদেরীয়া, জাহমিয়াদের সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরা পরবর্তীদের আক্বিদায় বিশ্বাসী। 'এরা হল আশআরী, এরা হল, মু'তাযেলী' এ কথার পরিবর্তে এখন তারা বলে, 'এরা হল, ইখওয়ান, এরা হল তাবলীগ...”
[আল-জামে ফির রদ্দি আলাল জামিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-১১৭]
সালাফীরা আশআরী আক্বিদায় বিশ্বাসীদেরকে কাফের বলে থাকে এবং হাফেয ইবনে হাজার আলকালানী (রহঃ), ইমাম নববী (রহঃ) আশআরী আক্বিদায় বিশ্বাসী হওয়ায় তাদের বিখ্যাত কিতাব, ফাতহুল বারী ও রিয়াযুস সালিহীন পুড়িয়ে ফেলার মত প্রকাশ করে । তাদের আক্বিদার বিরোধী হওয়ার কারণে তারা ফাতহুল বারির উপর, আক্বিদাতুত ত্বাহাবী উপর টিকা সংযোজন করেছে এবং এ কিতাবগুলির মাঝে তাদের নিজস্ব আক্বিদাগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) “আক্বিদাতুত ত্বাহাবী” এর টিকা সংযোজন করেছেন। শায়েখ বিন বাযের কিতাবের নাম হল, “তা'লিকাতু বিন বায আলা আক্বিদাতিত ত্বহাবী”। এছাড়াও সালাফী আলেমদের লিখিত কিতাব, التعليقات الأثرية على العقيدة الطحاوية لأئمة الدعوة السلفية )আত-তা'লিকাতুত আছারিয়া আলা আক্বিদাতিত ত্বাহাবীয়া লি-আইম্মাতিদ দাওয়াতিস সালাফিয়্যা)। আক্বিদাতুত ত্বহাবীর উপর সংযোজিত টীকা লেখায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযিয বিন মানে (রহঃ), শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) এবং শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) । আক্বিদাতুত ত্বাহাবীর উপর সংযোজিত শায়েখ বিন বাযের একটি টীকা উদ্ধৃতি হিসেবে এখানে উল্লেখ করছি। এতে পাঠকবৃন্দের নিকট সুস্পষ্ট হবে যে, তারা কিভাবে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ইসলামী আক্বিদায় অনুপ্রবেশ করিয়েছে। আল্লাহ তায়ালার দিক সম্পর্কে ইমাম ত্বহাবী (রহঃ) আক্বিদাতুত ত্বহাবীয়াতে লিখেছেন-
وتَعالَى عَنِ الحُدُودِ والغَايَاتِ
“আল্লাহ তায়ালা সব ধরণের হদ, সীমা ও পরিমাপ থেকে পবিত্র”
শায়েখ বিন বায (রহঃ) আল্লাহ তায়ালার জন্য হদ বা সীমা সাব্যস্ত করতে গিয়ে ইমাম ত্বহাবীর উক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করেছেন-
فمراده بالحدود يعني التي يعلمها البشر فإثبات الحد في الاستواء أو غيره فمراده حد يعلمه الله سبحانه ولا يعلمه العباد
“অর্থাৎ এখানে হদ বা সীমা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে সীমা সম্পর্কে মানুষ অবগত... ইসতিওয়া বা এজাতীয় শব্দ দ্বারা যে হদ বা সীমা নির্ধারিত হয় তার দ্বারা এমন সীমা উদ্দেশ্য যা আল্লাহ তায়ালা জানেন, বান্দা জানে না।”
অথচ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত “আল্লাহ তায়ালা যে সব ধরণের হদ বা সীমা থেকে পবিত্র, এ আক্বিদায় বিশ্বাসী, যা সুস্পষ্টভাষায় ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) উল্লেখ করেছেন।
সালাফীরা দিক সম্পর্কে তাদের নিজস্ব আক্বিদা কিভাবে সংযোজন করেছে পাঠক বৃন্দ লক্ষ্য করুন! ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) লিখেছেন-
لا تحويه الجِهَاتُ السِّنُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ
“আল্লাহ তায়ালাকে ছয় দিকের কোন দিক পরিবেষ্টন করে না যেমন সৃষ্ট অন্য কোন বস্তু তাকে পরিবেষ্টন করে না।”
শায়েখ বিন বায (রহঃ) লিখেছেন-
مراده الجهات الست المخلوقة، وليس مراده نفي علو الله واستوائه على عرشه؛ لأن ذلك ليس داخلا في الجهات الست، بل هو فوق العالم ومحيط به
“ছয় দিক দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মাখলুক বা সৃষ্ট ছয় দিক। এর দ্বারা আল্লাহর জন্য 'জিহাতে উলু' ও ইসতেওয়া আলাল আরশকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা “জিহাতে উলু” তথা উপরের দিক ছয় দিকের অন্তর্ভূক্ত নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের উপরে এবং মহাবিশ্বকে বেষ্টন করে আছে”
[“তা'লিকাতু বিন বায আলা আক্বিদাতিত ত্বহাবী” পৃষ্ঠা-৫, মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায, খ--২, পৃষ্ঠা-৭৮ (শামেলা)]
ইবনে বায (রহঃ) কিভাবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদাকে তাদের আক্বিদার সাথে মিশ্রিত করেছেন, তা স্পষ্ট। এখানে তিনি সংঘর্ষ পূর্ণ অনেক গুলো কথা একত্র করেছেন, যা আলোচনা করার জায়গা এটি নয় । আমাদের উদ্দেশ্য হল, সালাফীরা কিভাবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদাকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছেন এবং একে ইসলামের আক্বিদা বলে প্রচার করছেন সেটা উল্লেখ করা”
রাসূল (সঃ) এর চার আমলের অন্যতম আমল হল, তাযকিয়াতুন নফস তথা আত্মশুদ্ধি অর্জন। যাকে পরিভাষায়, তাছাউফ, সুফিয়্যা, ইত্যাদি বলা হয়। ইসলামের অন্যান্য আমলের মত তাছাউফও সালাফীদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বরং অন্যান্য আমলের প্রতি তাদের আক্রমণের তুলনায় তারা তাছাউফের বুকে যে খঞ্জর বসিয়েছে তা আরও বেশি মারাত্মক ও বিষাক্ত । এটাও তারা সালাফিয়‍্যাত তথা সালাফে- সালেহীনের অনুসণের নামে করেছে । তাছাউফের প্রতি তাদের কতটা আক্রোশ ও বিদ্বেষ তা তাদের কথা থেকেই লক্ষ্য করুণ!
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী (রহঃ) এর বিখ্যাত কিতাব "ইহইয়াউ উলুমুদ দ্বীন”-এ উল্লেখিত হাদীসগুলোর উৎস উল্লেক করে এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন আল্লামা হাফেয যাবিদি (রহঃ)। সম্প্রতি “ইহইয়াউ উলুমুদ দ্বীন” এর হাদীসগুলোর উৎস সম্পর্কে যারা কিতাব লিখেছেন যেমন-আল্লামা ইরাকী (রহঃ), আল্লামা সুবকী (রহঃ) এবং আল্লামা যাবিদি (রহঃ), তাদের লিখিত কিতাবগুলি থেকে চয়ন করে আবু আব্দুল্লাহ মাহমুদ বিন মুহাম্মাদ আল-হাদ্দাদ একটি কিতাব লিখেছেন। এ কিতাবের ভূমিকায় আল্লামা মোর্তজা যাবিদি (রহঃ) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এ লেখক লিখেছেন-
حنفي المذهب أشعري العقيدة قادري الإرادة نقشبندي السلوك والقادرية والنقشبندية من طرق الصوفية، وهي كلها سبل الشياطين
“আল্লামা যাবিদি (রহঃ) ছিলেন, হানাফী মাযহাবের অনুসারী, আক্বিদার ক্ষেত্রে আশআরী, তাছাউফের ক্ষেত্রে ক্বাদেরী ও নকশবন্দী। ক্বাদেরিয়া ও নকশ বন্দিয়া হল সুফীদের তরীকা, আর এ সব তরীকা হল শয়তানের তরীকা”
আমরা আল্লাহর কাছে এ ধরণের উক্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ قَالَ مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে আমার ওলীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করল, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।" [বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৫০২]
তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের নগ্ন মিথ্যাচার দেখলে একজন মুসলমানের লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যাবে। একি কোন মুসলমানের ভাষা! সুবহানাল্লাহ! পূর্ববর্তীদের অনুসরণের মুখোশে সেই পূর্ববর্তীদের প্রতি এতটা মিথ্যাচার! এতটা ঘৃণা! এতটা বিদ্বেষ! তারা কিভাবে সালাফী হওয়ার দাবী করে!?
প্রিয় পাঠক! সালাফে-সালেহীনের অনুসরণের মুখোশে তাদের প্রতি মিথ্যাচার লক্ষ্য করুন! শায়েখ আব্দুর রহমান ওকীল তাঁর مصرع التصوف )মাসরাউত তাছাউফ) নামক কিতাবের ভূমিকায় লিখেছেন-
إن التصوف.. ابتدعه الشيطان ليسخر معه عباد الله في حربه الله ولرسله ، إنه قناع المجوس يتراءى بأنه لرباني ، بل قناع كل عدو صوفي للدين الحق فتش فيه تجد برهمية وبوذية وزرادشتية ومانوية وديصانية ، تجد أفلاطونية وغنوصية ، تجد فيه يهودية ونصرانية ووثنية جاهلية
“নিশ্চয় শয়তান তাছাউফ আবিষ্কার করেছে যেন এর মাধ্যমে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর সাথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে আল্লাহর বান্দাদেরকে তার অনুগামী বানাতে পারে । এটি অগ্নিপূজকদের আখড়া যেখানে সে নিজেকে মনে যে, সে আল্লাহর ওলী । বরং এটি আল্লাহর দ্বীনের শত্রু সূফিদের আখড়া। তুমি তাতে খুজে দেখ! তাতে ব্রাহ্মণবাদ, বৌদ্ধ ধর্ম, যারাদুশতী, মনাতত্ত্ব (Manichaeanism), দিসানী দেখতে পাবে। দেখবে প্লেটোর মতবাদ (Platonism) ও গনুসী মতবাদ । তাতে পাবে ইহুদী ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম, হিন্দু ধর্ম ও জাহিলিয়্যাত।”
[মাসরাউত তাছাউফ, পৃষ্ঠা-১৯]
উপরোক্ত সালাফীর উক্তি থেকে সালাফীদের আসল চেহারা উপলব্ধি করতে কারও কষ্ট হবে না। আল্লাহ আমাদেরকে এধরণের সালাফিয়্যাত থেকে মুক্তি দান করুন।
والله يشهد أن « السلفية » لاعلاقة لها البتة بكل ذلك ، ولا يقول بشيء من ذلك أي من السلف الصالح رضي الله عنهم ، إلا إن أرادوا بالسلف : سلفهم من الخوارج والمفسدين ونحوهم . فنعم - وأما سلف المسلمين « السلف ،، الصالح » فإنهم بريئون ورب الكعبة من هذه الضلالات
আল্লাহ তায়ালা সাক্ষী রয়েছেন যে, এধরণের কর্মকা-ের সাথে সালাফে-সালেহীনের কোন সম্পর্ক নেই। সালাফে-সালেহীনের কেউ এধরণের কথা বলেননি। হ্যাঁ, তারা যদি সালাফ বা পূর্ববর্তী লোক বলতে তাদের পূর্ববর্তী খারেজী ও এজাতীয় ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য নেয়, তাহলে তা ঠিক। কা'বার রবের শপথ! মুসলমানদের পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ (সালাফে-সালেহীন) এধরণের ভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত”
[মাওকিফু আইম্মাতিল হারাকাতিস সালাফিয়্যা ফিত তাছাউফি ওয়াছ ছুফিয়্যা' এর ভূমিকা, আব্দুল হাফিয বিন মালিক আব্দুল হক মক্কী, পৃষ্ঠা-৭]
বিজ্ঞ পাঠক! সালাফীদের তাছাউফ বিদ্বেষ ও ইলমি খিয়ানতের চিত্র দেখুন! সালাফীদের ইমামতুল্য আলেম শায়েখ আবু বকর জাবের আল-জাযাইরি “ইলাত তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লা” নামক কিতাবে লিখেছেন-
والتعريف الصحيح للتصوف هو : أنه بدعة » ضلالة » من شر البدع ، وأكثرها اضلالا وأكبرها ضلالة إذ لم يعرف التصوف في من
“তাছাউফের সঠিক সংজ্ঞা হল, এটি বিদআত (১), যালালাত বা ভ্রষ্টতা (২), সর্বনিকৃষ্ট বিদআত (৩) তার চেয়েও ভযঙ্কর ভ্রষ্টতা (৪) ও বড় বিভ্রান্তি (৫)”
[ইলাত-তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লাহ, পৃষ্ঠা-১৪]
বিজ্ঞ পাঠক! লক্ষ্য করুণ! মাত্র তিন লাইনে পাঁচটি নিন্দনীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন । আল্লাহু আকবার! এটাই কি তাদের সালাফিয়‍্যাতের আদর্শ! এর প্রতিই কি তারা বিশ্ববাসীকে ফ্রি বই বিতরণ করে দাওয়াত দিয়ে থাকে!?
তাদের সম্পর্কে শায়েখ ড.আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية )আল-খুতুতুল আরিযা লি-আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন-
فهذه هي الطبعة الثانية من الخطوط العريضة لاصول أدعياء السلفية ، جمعنا فيها مجموعة أخرى من أصول هذه المجموعة التي ظهرت على المسلمين بالتبديع والتفسيق والتجريم ، والتكفير ، واستعملت كل ألفاظ التنفير والتحقير مع دعاة الإسلام خاصة ، كوصفهم بالزندقة، والإلحاد، والخروج... الخ
“এটি খুতুতুল আরিযা নামক কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণ। এতে আমি সেই দলের মূলনীতিগুলো উল্লেখ করেছি যারা মুসলিম উম্মাহের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেছে মুসলমানদেরকে বিদআতী, ফাসেক, পাপী, কাফের ইদ্যাদি সাব্যস্ত করার জন্য। এক্ষেত্রে উম্মাহের দায়ীদের ব্যাপারে তারা সবধরণের নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য শব্দ ব্যবহার করেছে যেমন- তাদেরকে যিন্দিক, মুরতাদ, খারেজী... ইত্যাদি বলেছে।”
[আল-জামে ফির রদ্দি আলাল জামিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-১০৫]
সালাফিয়্যাতের দাবীদার আবু বকর জাযায়েরীর উক্ত সংজ্ঞার সাথে সালাফীদের ইমামদের ইমাম শায়েখ ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর ছাত্র আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) তাছাউফ সম্পর্কে কী বলেছেন একটু লক্ষ্য করুণ!
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) তাঁর طريق الهجرتین ত্বরিকুল হিযরাতাইন( নামক কিতাবে লিখেছেন-
ومنها أن هذا العلم "التصوف" هو من أشرف علوم العباد وليس بعد علم التوحيد أشرف منه وهو لا يناسب إلا النفوس الشريفة ولا يناسب النفوس الدنيئة المهينة
“এই ইলম তথা তাছাউফের ইলম বান্দার সমস্ত ইলমের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ইলম । ইলমুত তাওহীদ তথা তাওহীদের ইলমের পরে এর চেয়ে উত্তম ইলম আর নেই । এই ইলমের জন্য শুধু উত্তম ও সম্মানিত হৃদয় উপযুক্ত, কোন নিকৃষ্ট, নীচ হৃদয় এর উপযুক্ত নয়”[ত্বরিকুল হিযরাতাইন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ), পৃষ্ঠা-২৬0-261]
সালাফীরা যেহেতু আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ), তাঁর ছাত্র আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী (রহঃ) এর অনুসরণ করার দাবী করে এজন্য আমরা এ রিসালায় তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের ইমাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করেছি । আমার উদ্দেশ্য যেহেতু সংক্ষিপ্ত একটি রিসালা তৈরি করা এজন্য তাছাউফ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার অনেক উক্তি এখানে উল্লেখ করা হয়নি। আল্লাহ পাক তাওফীক দিলে পরবর্তীতে যদি বড় আকারে প্রকাশ করার সুযোগ হয় তখন ইনশাআল্লাহ আরও কিছু সংযোজন করে দেয়ার আশা রাখি।
সালাফীদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবু বকর জাবের জাযায়েরী উল্লেখ করেছেন-
الدعوة السلفية التي أحياها بعد موتها في العالم الإسلامي الإمامان الجليلان: أحمد بن عبد الحليم بن تيمية في الديار الشامية، و محمد ابن عبد الوهاب في الديار النجدية
“সালাফী দাওয়াতের মৃত্যু হওয়ার পর যারা একে মুসলিম বিশ্বে পুনরুজ্জীবিত করেছেন তারা হলেন, দু'জন মহান ইমামঃ আহমাদ বিন আব্দুল হালিম বিন তাইমিয়া (রহঃ), তিনি শামে এ আন্দোলনকে জীবিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব, তিনি নজদ এলাকায় এ আন্দোলনকে জীবিত করেছেন”
[ইলাত-তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লা! পৃষ্ঠা-৮]
আল্লাহ পাক তাওফীক দিলে তাছাউফ সম্পর্কে এ রচনাগুলো ইনশাআল্লাহ কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হবে । তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের অন্যান্য অনুসরণীয় ব্যক্তিদের অভিমত সম্বলিত আরেকটি পর্ব শীঘ্রই প্রকাশের আশা রাখি।
তাছাউফ ও তাছাউফের ইমামদের সম্পর্কে অনেকের ধারণা হল যে, তারা দ্বীন প্রতিষ্টায় ও দ্বীন প্রচারে বিশেষ করে জিহাদ থেকে বিমূখ । আল্লাহ পাক রহমত করলে অচিরেই “আল্লাহর পথের মুজাহিদ সূফীগণ” নামে একটি রিসালা প্রকাশ করব । আগ্রহী পাঠকগণ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি ব্যক্তিত্ত্ব ও ক্ষণজন্মা মণীষী সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) এর বিখ্যাত কিতাব “তারীখে দাওয়াত ও আযীমত” পাঠ করতে পারেন। এটি বাংলা ভাষায় সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস নামে প্রকাশিত হয়েছে।
তাছাউফ সম্পর্কে আমাদের সর্বশেষ কথা হল, ইলমে তাছাউফ সব ধরণের বিদআতী, শিরকী, কুফরী কর্মকা- থেকে মুক্ত। যে সমস্ত পীরপূজারী, কবরপূজারী, মাজারপূজারী, ভ-, ধর্ম ব্যাবসায়ী গদ্দিনশীন নিজেদেরকে তাছাউফের সাথে সম্পৃক্ত করে, তাদের মাঝে এবং তাছাউফের মাঝে এতটা দূরত্ব যেমন পূর্ব-পশ্চিয়ের মাঝে, বরং আসমান যমিনের মাঝে যে দূরত্ব তাছাউফ থেকে এরা তার চেয়েও বেশি দূরে।
শরীয়তের প্রত্যেকটি ইলম যেমন ইলমে হাদীস, ফিকহ, তাফসীরের ক্ষেত্রে যেমন বড় বড় ইমাম রয়েছেন, তেমনি সেসমস্ত মিথ্যুক দাজ্জালও রয়েছে যারা জাল হাদীস তৈরি করেছে, ফতোয়ার নামে দ্বীন নিয়ে খেলা করেছে এবং তাফসীরের নামে কুরআন বিকৃত করেছে । কিন্তু যখন এ সমস্ত ইলম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তখন কেবল বড় বড় ইমামদের দ্বারাই এর পরিমাপ করা হয় । একইভাবে ইলমে তাছাউফের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহের সর্বজন স্বীকৃত বড় বড় ওলী রয়েছেন, আবার সেই সমস্ত ভ-ও রয়েছে যারা তাছাউফের নামে দ্বীনকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু আমরা যদি তাছাউফকে বুঝতে চাই, তবে এসমস্ত ভ-দেরকে দিয়ে তাছাউফকে ওজন করা যাবে না, কেননা এরা তো তাছাউফ থেকে লক্ষ- কোটি মাইল দূরে, এরা তো তাছাউফের মাঝেই প্রবেশ করেনি, কিভাবে এদের মাধ্যমে তাছাউফকে পরিমাপ করা হবে?
দ্বিতীয়তঃ শরীয়তের বিরোধী পৃথিবীর কোন ইলমই ইলম নয়, চাই তা বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইন বা অন্য কিছু হোক। তাছাউফের মাঝে কেউ যদি এমন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত করে, যা শরীয়তে বিরোধী, তবে তা সর্বযুগের সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাতিল, ভ্রান্ত ও প্রত্যাখ্যাত ।
রিসালাটি প্রকাশে অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছে। আল্লাহ পাক তাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন!
বিজ্ঞ পাঠকের সমীপে নিবেদন এই যে, রিসালাটিতে ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে আমাদেরকে অবহিত করে বাধিত করবেন, পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা হবে ইনশাআল্লাহ!
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করেন এবং আখেরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন । আমীন!
বিনীত
ইজহারুল ইসলাম
(২/১০/১২, রাত-১.৫৬)

টিকাঃ
১ এ পুস্তিকার ভূমিকা লিখেছেন শাযেখ ড. সাইদ রমজান বাউতী ।

অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, আজ মুসলিম উম্মাহ ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায় অতিক্রম করছে। উম্মাহের ঘাড়ে পশ্চাৎপদতার যে জগদ্বল পাথর জেঁকে বসেছে তার বহুবিধ কারণ রয়েছে। একদিকে অমুসলিমদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ষড়যন্ত্র অন্যদিকে মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কলহ। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি আজ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন থাবায় আক্রান্ত । এমন কোন দিন অতিবাহিত হয় না, যেদিন মুসলিম উম্মাহের রক্ত আল্লাহর জমিন রঞ্জিত হয় না । অমুসলিমদের আক্রমণের স্বীকার মুসলিম উম্মাহের করুণ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিই অবগত ।
দ্বিতীয়তঃ মুসলিম উম্মাহ নিজেই তাঁর পশ্চাৎপদতার জন্য দায়ী। আজ তারা নিজেদের আচার-আচরণ, সামাজিকতা, রাজনীতি ও অর্থনীতি সবকিছুই অমুসলিমদের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছে । এ সমস্ত ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ধর্মের চিহ্নটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না । যেসমস্ত মুসলমান সঠিকভাবে ধর্মপালনে আগ্রহী এবং ধর্মের বিধি-বিধানের প্রতি যত্নশীল, তারাও আবার শতধা বিভক্ত । মুসলিম উম্মাহের এই বিভক্তিতে ঈন্ধন যোগানর জন্য মাথা গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন ফেরকা । ফেতনাবাজ শ্রেণী মুসলিম উম্মাহের এই নিদারূণ মুহূর্তেও ফেতনার ঢোল পিটাচ্ছে। উম্মাহের প্রতি করূণার পরিবর্তে মুসলিম উম্মাহকেক একে অপরের প্রতি লেলিয়ে দিচ্ছে, ঘৃণার বিষ-পাম্প তাদের মন ও মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ফলে তারা আপন মুসলিম ভাইকে এতটা ঘৃণা করছে, যতটা না তারা কাফের-মুশরিককে করে । আমরা প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। বিচ্ছিন্নতাবাদ, ফেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে ফেরকাটি বর্তমান সময়ে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, সেটি হল, সালাফী বা আহলে হাদীস ফেতনা, যা ওহাবী ফেতনা নামেও পরিচিত। শিয়া, কাদিয়ানী, ভ-পীর, কবরপূজারী এবং নাস্তিক- মুরতাদদের ফেতনায় উম্মাহের দেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, নব্য সৃষ্ট ফেতনাটি মুসলিম উম্মাহের সেই ক্ষতে মলম লাগানর পরিবর্তে লবণ লাগানর পথে অগ্রসর। ফলে সালাফিয়‍্যাতের নামে বিকৃতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রাসূল (সঃ) যেই চার মিশন নিযে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন অর্থাৎ দাওয়াত, তা'লীম, তাযকিয়া ও জিহাদ এর প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এই ফেতনাবাজ শ্রেণী ফেতনার জন্ম দিয়েছে।
আক্বিদা থেকে শুরু করে ইসলামের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে তারা সংস্কারের নামে নতুন ধ্যাণ-ধারণা প্রবর্তন করেছে এবং নব্য সৃষ্ট ধ্যাণ-ধারণা প্রতিষ্ঠার পিছনে তারা তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করছে। ফলে ইলমের স্বল্পতার কারণে মুসলিম উম্মাহের একটা শ্রেণী তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের চিন্তা-চেতনা এবং ধ্যাণ-ধারণার বিদ্যালয়ে যারা পাঠ নিয়েছে, তারা মুসলিম সমাজে বিচ্ছিন্নতা, ঘৃণা, অপবাদ এবং কাঁদা-ছোঁড়াছুঁড়ির মহড়া দিচ্ছে। তারা নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র মসজিদ নির্মাণ করেছে এবং স্বতন্ত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিম সমাজের একটা অংশকে তাদের অনুগামী বানিয়ে সে অংশকে বৃহত্তর মুসলিম সমাজ থেকে পৃথক করেছে। তারা মুসলমানদের সমাজে বাস করে, অথচ আপন মুসলিম ভাই সম্পর্কে এমন ধারণা ও ঘৃণা পোষণ করে যে, মুসলমানদের শত্রুতাও তা করে না। একই কাতারে নামায আদায় করে, অথচ নিজের পাশের মুসল্লী ভাইকে মুশরিক বলতে দ্বিধা করে না, এমনকি তারা যে ইমামের পিছে নামায আদায় করছে, সেও তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায় না । অথচ তারা যে ধ্যাণ-ধারণার উপর ভিত্তি করে এগুলো করছে, তা তাদের হাতেই সৃষ্ট, সালাফে-সালেহীন তাদের এ সমস্ত কর্মকা- থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, যেমন ইহুদীদের অপবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন হযরত মারিয়াম (আঃ) ।
রাসূল (সঃ) কর্তৃক আনীত চার মিশনের কোনটিই তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি। সর্বক্ষেত্রে সংস্কারের নামে তারা তাদের নিজস্ব ধ্যাণ-ধারণার অনুপ্রবেশ করিয়েছে। আক্বীদার ক্ষেত্রে তারা এমন কিছু ধ্যাণ-ধারণার জন্ম দিয়েছে, যার সাথে সালাফে-সালেহীনের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই, যার অধিকাংশ হিজরী অষ্টম শতাব্দী কিংবা তার পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। যেমন তারা আল্লাহর জন্য জিসম, দিক ও সীমা সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালার সাথে নশ্বর বিষয় যুক্ত হওয়ার আক্বিদা তাদের হাতেই সৃষ্ট। এছাড়াও তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য বসার আক্বিদা এবং জাহান্নামের আগুন শেষ হওয়া ইত্যাদি আক্বিদা পোষণ করে । আর যারা তাদের সৃষ্ট আক্বিদায় বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদেরকে কাফের, মুশরিক, জাহমিয়া, মুয়াত্তিলা, পথভ্রষ্ট.. ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে।
ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে তারা সংস্কারের নামে তাকলীদকে হারাম করেছে এবং মাযহাবের অনুসারীদেরকে কাফের, মুশরিক, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি বলতে দ্বিধা করেনি। যেহেতু ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে হিজরী তৃতীয় শতকের পর থেকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুফাসসির, ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক কোন না কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, এজন্য পূর্বের কেউ তাদের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি ।
نعم هكذا يضللون ويكفّرون ويبدعون أئمة السلفية وسادتهم وباسم « السلفية » - فيا سبحان الله - وكما يقال : ( الجنون فنون ) . ونسأل الله العافية
“আর এভাবেই তারা সালাফে-সালেহীন ও পূর্ববর্তী ইমামদের পথভ্রষ্ট, কাফের, বিদআতী ইত্যাদি বলে থাকে। আর এ সব কিছু তারা সালাফিয়্যাতের নামে করে থাকে । সুবহানাল্লাহ! তাদের অবস্থা তো এমন যে, বলা হয়ে থাকে, “আল-জুনুনু ফুনুন" (পাগলামির বিভিন্ন আর্ট বা শিল্প রয়েছে)। আমরা আল্লাহর নিকট এর থেকে পরিত্রাণ কামনা করি। [মাওকিফু আইম্মাতিল হারাকাতিস সালাফিয়্যা ফিত তাছাউফি ওয়াছ ছুফিয়্যা' এর ভূমিকা, আব্দুল হাফিয বিন মালিক আব্দুল হক মক্কী, পৃষ্ঠা-৮]
ইলমে হাদীস বিশেষ করে ইলমুল জারাহ ওয়াত তা'দীলের ক্ষেত্রে তারা তাদের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পরস্পর সংঘর্ষপূর্ণ মতামত দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উসূলে হাদীসের নিয়ম ভঙ্গ করে খিয়ানতের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ হাদীসের কিতাব সমূহকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী 'সহীহ' ও 'যয়ীফ' এ দু'ভাগে ভাগ করে কিতাব রচনা করেছে। এক্ষেত্রে মারাত্মক যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা হল, উম্মতের অনেকে তাঁদের সংঘর্ষপূর্ণ মতামতের ব্যাপারে অবগত না হয়ে তাদের অন্ধানুকরণ করছে । দেখা গেছে, একই হাদীসকে ভিন্ন ভিন্ন কিতাবে সহীহ ও যয়ীফ বলেছেন। সম্প্রতি ১৪২৪ হিঃ সনে জর্দানের দারুন নাফাইস থেকে প্রকাশিত আওদা বিন হাসান আওদা এর একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি এমন পাঁচশত হাদীস উল্লেখ করেছেন, যে সমস্ত হাদীসকে শেখ নাসীরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) তাঁর বিভিন্ন কিতাবে কখনও যয়ীফ আবার কখনও সহীহ বলেছেন। বর্তমানে সালাফীদের কারণে ইলমে হাদীস যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার আলোচনা করেছেন শায়েখ মামদুহ তাঁর “আল-ইত্তিজাহাতুল হাদিসিয়্যা” নামক বিখ্যাত গ্রন্থে। আগ্রহী পাঠকগণ কিতাবটি অধ্যয়ন করতে পারেন ।
রাসূল (সঃ) এর জীবনের অন্যতম একটি মিশন ছিল, জিহাদ তথা কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে সশস্ত্র যুদ্ধ)। ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে এক্ষেত্রেও সালাফীরা তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে এবং এমন কিছু মূলনীতি তৈরি করেছে যার মাধ্যমে তারা উম্মতকে এই ফরয আমল থেকে বিরত রাখতে পারে। তাদের এসমস্ত ভ্রান্ত নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন শায়েখ ড. আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية )আল-খুতুতুল আরিযা লি- আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক গ্রন্থে। এছাড়াও শায়েখ আব্দুল আযিয বিন মানসুর তাঁর الرد علي أدعياء السلفيبة )আর-রদ্দু আলা আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবে জিহাদ সম্পর্কে সালাফীদের ভ্রান্তি আলোচনা করেছেন । ড. শায়যী তাঁর কিতাবে সালাফীদের যে সমস্ত মূলনীতি উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে ১৯ নং মূলনীতি হল, الجهاد تكليف ما لا يطاق في هذا الزمان ولا إثم في تركه )এই যামানায় জিহাদ হল, এমন বিধান যা পালন করা সম্ভব নয়, সুতরাং তা ছেড়ে দিলে কোন গোনাহ হবে না)
সালাফীদের ২০ নং মূলনীতি হল, أفضل الجهاد اليوم ترك الجهاد ، وأفضل الإعداد ترك الإعداد )বর্তমানে উত্তম জিহাদ হল, জিহাদ ছেড়ে দেয়া এবং উত্তম প্রস্তুতি হল, কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করা)
রাসূল (সঃ) অন্যান্য আমল যেমন, দাওয়াত ও তাবলীগ এবং ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সমস্ত দল কাজ করে যাচ্ছে, সালাফীরা তাদের গোমরা, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি আখ্যায়িত করেছে । অনেকে তাদেরকে কাফির মুশরিক বলতে দ্বিধা করে না ।
শায়েখ ইউসুফ বিন সায়্যেদ হাশেম রিফায়ী তাঁর পুস্তিকা نصيحة لإخواننا علماء نجد (নজদের আলেমদের প্রতি নসিহত)। নজদের উলামায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন-
إذا اختلف معكم أحد في موضوع أو أمر فقهي أو عقدي أصدرتم كتبًا في ذمه وتبديعه أو تشريكه
ফিকহ, আক্বিদা অথবা অন্য কোন বিষয়ে তোমাদের সাথে কেউ যখন মতানৈক্য করে, তখন তোমরা তাকে নিন্দা করে, বিদআতী ও মুশরীক আখ্যায়িত করে কিতাব প্রকাশ করে থাকো।
لقد كفرتم الصوفية، ثم الأشاعرة، وأنكرتم واستنكرتم تقليد واتباع المذاهب الأربعة : أبي حنيفة ومالك والشافعي وأحمد بن حنبل
“তোমরা সর্বপ্রথম সূফীদেরকে কাফের বলেছো, অতঃপর আশআরীদেরকে । তোমরা চার মাযহাবের তাকলীদ ও অনুসরণকে অস্বীকার করেছ কিংবা অপছন্দ করেছ অর্থাৎ আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, পৃষ্ঠা-২৮-২৯]
٤٠ - كفرتم الصوفية ثم الأشاعرة والماتريدية وهم سواد المسلمين ، ثم التفتم إلى الأخوان ، ثم التبليغيين ثم بقية الدعاة والمفكرين . . فماذا أبقيتم غيركم من المسلمين؟
“তোমরা সূফীদেরকে কাফের বলেছ । অতঃপর আশআরী ও মাতুরীদেরকে কাফের বলেছ; অথচ এরা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম । অতঃপর তোমরা ইখওয়ানুল মুসলিমীন, তাবলীগ এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দায়ী ও ইসলামী চিন্তাবিদদের কাফের সাব্যস্ত করেছ। তোমরা নিজেদেরকে ব্যতীত আর কাদেরকে মুসলমান হিসেবে বাকী রেখেছ?”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, ইউসুফ বিন সাইয়্যেদ হাশেম রিফাঈ, পৃষ্ঠা- ৭১]
سلطتم من المرتزقة الذين تحتضنونهم من رمى بالضلالة والغواية الجماعات والهيئات الإسلامية العاملة في حقل الدعوة، والناشطة لإعلاء كلمة الله تعالى، والآمرة بالمعروف والناهية عن المنكر، كـ " التبليغ " و " الإخوان المسلمين " ، والجماعة " الديوبندية " التي تمثل علماء الهند وباكستان وبنغلاديش،
“তোমাদের খাদ্যে পালিত এবং তোমাদের কোলে আশ্রিতরা দাওয়াতের ময়দানে কর্মরত বিভিন্ন জামাত ও সংগঠন যারা আল্লাহ কালিমা সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মত আমল আঞ্জাম দিচ্ছে, তাদেরকে ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত হওয়ার ফতোয়া দান করে। যেমন- তাবলীগ, ইখওয়ানুল মুসলিমীন, দেওবন্দী জামাত যার অধিকাংশ হল, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম”
[নসিহাতুন লি-ইখওয়ানিনা উলামায়ে নজদ, ইউসুফ বিন সাইয়্যেদ হাশেম রিফাঈ, পৃষ্ঠা- ৩০]
শায়েখ ড.আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية (আল-খুতুতুল আরিযা লি-আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবে জামাত ইসলাম সম্পর্কে সালাফীদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে লিখেছেন-
الأصل الثالث عشر لأصول أتباع السلفية الجديدة هو قولهم أن الجماعات الإسلامية ماهي إلا امتداد للفرق الضالة من معتزلة وأشاعرة وخوارج وقدرية وجهمية ، تنتهج منهج الخلف في العقيدة ، فأصبح بدل أن يقال هؤلاء أشاعرة وهؤلاء معتزلة صار يقال هؤلاء أخوان ، وهؤلاء تبليغ..
“নব্য সালাফিয়‍্যাতের দাবীদারদের ১৩ নং মূলনীতি হল, জামাত ইসলাম মূলতঃ ভ্রান্ত দল। এটি মু'তাযেলা, আশআরী, খারেযী, ক্বাদেরীয়া, জাহমিয়াদের সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরা পরবর্তীদের আক্বিদায় বিশ্বাসী। 'এরা হল আশআরী, এরা হল, মু'তাযেলী' এ কথার পরিবর্তে এখন তারা বলে, 'এরা হল, ইখওয়ান, এরা হল তাবলীগ...”
[আল-জামে ফির রদ্দি আলাল জামিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-১১৭]
সালাফীরা আশআরী আক্বিদায় বিশ্বাসীদেরকে কাফের বলে থাকে এবং হাফেয ইবনে হাজার আলকালানী (রহঃ), ইমাম নববী (রহঃ) আশআরী আক্বিদায় বিশ্বাসী হওয়ায় তাদের বিখ্যাত কিতাব, ফাতহুল বারী ও রিয়াযুস সালিহীন পুড়িয়ে ফেলার মত প্রকাশ করে । তাদের আক্বিদার বিরোধী হওয়ার কারণে তারা ফাতহুল বারির উপর, আক্বিদাতুত ত্বাহাবী উপর টিকা সংযোজন করেছে এবং এ কিতাবগুলির মাঝে তাদের নিজস্ব আক্বিদাগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) “আক্বিদাতুত ত্বাহাবী” এর টিকা সংযোজন করেছেন। শায়েখ বিন বাযের কিতাবের নাম হল, “তা'লিকাতু বিন বায আলা আক্বিদাতিত ত্বহাবী”। এছাড়াও সালাফী আলেমদের লিখিত কিতাব, التعليقات الأثرية على العقيدة الطحاوية لأئمة الدعوة السلفية )আত-তা'লিকাতুত আছারিয়া আলা আক্বিদাতিত ত্বাহাবীয়া লি-আইম্মাতিদ দাওয়াতিস সালাফিয়্যা)। আক্বিদাতুত ত্বহাবীর উপর সংযোজিত টীকা লেখায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযিয বিন মানে (রহঃ), শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) এবং শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) । আক্বিদাতুত ত্বাহাবীর উপর সংযোজিত শায়েখ বিন বাযের একটি টীকা উদ্ধৃতি হিসেবে এখানে উল্লেখ করছি। এতে পাঠকবৃন্দের নিকট সুস্পষ্ট হবে যে, তারা কিভাবে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ইসলামী আক্বিদায় অনুপ্রবেশ করিয়েছে। আল্লাহ তায়ালার দিক সম্পর্কে ইমাম ত্বহাবী (রহঃ) আক্বিদাতুত ত্বহাবীয়াতে লিখেছেন-
وتَعالَى عَنِ الحُدُودِ والغَايَاتِ
“আল্লাহ তায়ালা সব ধরণের হদ, সীমা ও পরিমাপ থেকে পবিত্র”
শায়েখ বিন বায (রহঃ) আল্লাহ তায়ালার জন্য হদ বা সীমা সাব্যস্ত করতে গিয়ে ইমাম ত্বহাবীর উক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করেছেন-
فمراده بالحدود يعني التي يعلمها البشر فإثبات الحد في الاستواء أو غيره فمراده حد يعلمه الله سبحانه ولا يعلمه العباد
“অর্থাৎ এখানে হদ বা সীমা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে সীমা সম্পর্কে মানুষ অবগত... ইসতিওয়া বা এজাতীয় শব্দ দ্বারা যে হদ বা সীমা নির্ধারিত হয় তার দ্বারা এমন সীমা উদ্দেশ্য যা আল্লাহ তায়ালা জানেন, বান্দা জানে না।”
অথচ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত “আল্লাহ তায়ালা যে সব ধরণের হদ বা সীমা থেকে পবিত্র, এ আক্বিদায় বিশ্বাসী, যা সুস্পষ্টভাষায় ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) উল্লেখ করেছেন।
সালাফীরা দিক সম্পর্কে তাদের নিজস্ব আক্বিদা কিভাবে সংযোজন করেছে পাঠক বৃন্দ লক্ষ্য করুন! ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) লিখেছেন-
لا تحويه الجِهَاتُ السِّنُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ
“আল্লাহ তায়ালাকে ছয় দিকের কোন দিক পরিবেষ্টন করে না যেমন সৃষ্ট অন্য কোন বস্তু তাকে পরিবেষ্টন করে না।”
শায়েখ বিন বায (রহঃ) লিখেছেন-
مراده الجهات الست المخلوقة، وليس مراده نفي علو الله واستوائه على عرشه؛ لأن ذلك ليس داخلا في الجهات الست، بل هو فوق العالم ومحيط به
“ছয় দিক দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মাখলুক বা সৃষ্ট ছয় দিক। এর দ্বারা আল্লাহর জন্য 'জিহাতে উলু' ও ইসতেওয়া আলাল আরশকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা “জিহাতে উলু” তথা উপরের দিক ছয় দিকের অন্তর্ভূক্ত নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের উপরে এবং মহাবিশ্বকে বেষ্টন করে আছে”
[“তা'লিকাতু বিন বায আলা আক্বিদাতিত ত্বহাবী” পৃষ্ঠা-৫, মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায, খ--২, পৃষ্ঠা-৭৮ (শামেলা)]
ইবনে বায (রহঃ) কিভাবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদাকে তাদের আক্বিদার সাথে মিশ্রিত করেছেন, তা স্পষ্ট। এখানে তিনি সংঘর্ষ পূর্ণ অনেক গুলো কথা একত্র করেছেন, যা আলোচনা করার জায়গা এটি নয় । আমাদের উদ্দেশ্য হল, সালাফীরা কিভাবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদাকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছেন এবং একে ইসলামের আক্বিদা বলে প্রচার করছেন সেটা উল্লেখ করা”
রাসূল (সঃ) এর চার আমলের অন্যতম আমল হল, তাযকিয়াতুন নফস তথা আত্মশুদ্ধি অর্জন। যাকে পরিভাষায়, তাছাউফ, সুফিয়্যা, ইত্যাদি বলা হয়। ইসলামের অন্যান্য আমলের মত তাছাউফও সালাফীদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বরং অন্যান্য আমলের প্রতি তাদের আক্রমণের তুলনায় তারা তাছাউফের বুকে যে খঞ্জর বসিয়েছে তা আরও বেশি মারাত্মক ও বিষাক্ত । এটাও তারা সালাফিয়‍্যাত তথা সালাফে- সালেহীনের অনুসণের নামে করেছে । তাছাউফের প্রতি তাদের কতটা আক্রোশ ও বিদ্বেষ তা তাদের কথা থেকেই লক্ষ্য করুণ!
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী (রহঃ) এর বিখ্যাত কিতাব "ইহইয়াউ উলুমুদ দ্বীন”-এ উল্লেখিত হাদীসগুলোর উৎস উল্লেক করে এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন আল্লামা হাফেয যাবিদি (রহঃ)। সম্প্রতি “ইহইয়াউ উলুমুদ দ্বীন” এর হাদীসগুলোর উৎস সম্পর্কে যারা কিতাব লিখেছেন যেমন-আল্লামা ইরাকী (রহঃ), আল্লামা সুবকী (রহঃ) এবং আল্লামা যাবিদি (রহঃ), তাদের লিখিত কিতাবগুলি থেকে চয়ন করে আবু আব্দুল্লাহ মাহমুদ বিন মুহাম্মাদ আল-হাদ্দাদ একটি কিতাব লিখেছেন। এ কিতাবের ভূমিকায় আল্লামা মোর্তজা যাবিদি (রহঃ) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এ লেখক লিখেছেন-
حنفي المذهب أشعري العقيدة قادري الإرادة نقشبندي السلوك والقادرية والنقشبندية من طرق الصوفية، وهي كلها سبل الشياطين
“আল্লামা যাবিদি (রহঃ) ছিলেন, হানাফী মাযহাবের অনুসারী, আক্বিদার ক্ষেত্রে আশআরী, তাছাউফের ক্ষেত্রে ক্বাদেরী ও নকশবন্দী। ক্বাদেরিয়া ও নকশ বন্দিয়া হল সুফীদের তরীকা, আর এ সব তরীকা হল শয়তানের তরীকা”
আমরা আল্লাহর কাছে এ ধরণের উক্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ قَالَ مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে আমার ওলীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করল, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।" [বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৫০২]
তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের নগ্ন মিথ্যাচার দেখলে একজন মুসলমানের লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যাবে। একি কোন মুসলমানের ভাষা! সুবহানাল্লাহ! পূর্ববর্তীদের অনুসরণের মুখোশে সেই পূর্ববর্তীদের প্রতি এতটা মিথ্যাচার! এতটা ঘৃণা! এতটা বিদ্বেষ! তারা কিভাবে সালাফী হওয়ার দাবী করে!?
প্রিয় পাঠক! সালাফে-সালেহীনের অনুসরণের মুখোশে তাদের প্রতি মিথ্যাচার লক্ষ্য করুন! শায়েখ আব্দুর রহমান ওকীল তাঁর مصرع التصوف )মাসরাউত তাছাউফ) নামক কিতাবের ভূমিকায় লিখেছেন-
إن التصوف.. ابتدعه الشيطان ليسخر معه عباد الله في حربه الله ولرسله ، إنه قناع المجوس يتراءى بأنه لرباني ، بل قناع كل عدو صوفي للدين الحق فتش فيه تجد برهمية وبوذية وزرادشتية ومانوية وديصانية ، تجد أفلاطونية وغنوصية ، تجد فيه يهودية ونصرانية ووثنية جاهلية
“নিশ্চয় শয়তান তাছাউফ আবিষ্কার করেছে যেন এর মাধ্যমে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর সাথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে আল্লাহর বান্দাদেরকে তার অনুগামী বানাতে পারে । এটি অগ্নিপূজকদের আখড়া যেখানে সে নিজেকে মনে যে, সে আল্লাহর ওলী । বরং এটি আল্লাহর দ্বীনের শত্রু সূফিদের আখড়া। তুমি তাতে খুজে দেখ! তাতে ব্রাহ্মণবাদ, বৌদ্ধ ধর্ম, যারাদুশতী, মনাতত্ত্ব (Manichaeanism), দিসানী দেখতে পাবে। দেখবে প্লেটোর মতবাদ (Platonism) ও গনুসী মতবাদ । তাতে পাবে ইহুদী ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম, হিন্দু ধর্ম ও জাহিলিয়্যাত।”
[মাসরাউত তাছাউফ, পৃষ্ঠা-১৯]
উপরোক্ত সালাফীর উক্তি থেকে সালাফীদের আসল চেহারা উপলব্ধি করতে কারও কষ্ট হবে না। আল্লাহ আমাদেরকে এধরণের সালাফিয়্যাত থেকে মুক্তি দান করুন।
والله يشهد أن « السلفية » لاعلاقة لها البتة بكل ذلك ، ولا يقول بشيء من ذلك أي من السلف الصالح رضي الله عنهم ، إلا إن أرادوا بالسلف : سلفهم من الخوارج والمفسدين ونحوهم . فنعم - وأما سلف المسلمين « السلف ،، الصالح » فإنهم بريئون ورب الكعبة من هذه الضلالات
আল্লাহ তায়ালা সাক্ষী রয়েছেন যে, এধরণের কর্মকা-ের সাথে সালাফে-সালেহীনের কোন সম্পর্ক নেই। সালাফে-সালেহীনের কেউ এধরণের কথা বলেননি। হ্যাঁ, তারা যদি সালাফ বা পূর্ববর্তী লোক বলতে তাদের পূর্ববর্তী খারেজী ও এজাতীয় ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য নেয়, তাহলে তা ঠিক। কা'বার রবের শপথ! মুসলমানদের পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ (সালাফে-সালেহীন) এধরণের ভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত”
[মাওকিফু আইম্মাতিল হারাকাতিস সালাফিয়্যা ফিত তাছাউফি ওয়াছ ছুফিয়্যা' এর ভূমিকা, আব্দুল হাফিয বিন মালিক আব্দুল হক মক্কী, পৃষ্ঠা-৭]
বিজ্ঞ পাঠক! সালাফীদের তাছাউফ বিদ্বেষ ও ইলমি খিয়ানতের চিত্র দেখুন! সালাফীদের ইমামতুল্য আলেম শায়েখ আবু বকর জাবের আল-জাযাইরি “ইলাত তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লা” নামক কিতাবে লিখেছেন-
والتعريف الصحيح للتصوف هو : أنه بدعة » ضلالة » من شر البدع ، وأكثرها اضلالا وأكبرها ضلالة إذ لم يعرف التصوف في من
“তাছাউফের সঠিক সংজ্ঞা হল, এটি বিদআত (১), যালালাত বা ভ্রষ্টতা (২), সর্বনিকৃষ্ট বিদআত (৩) তার চেয়েও ভযঙ্কর ভ্রষ্টতা (৪) ও বড় বিভ্রান্তি (৫)”
[ইলাত-তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লাহ, পৃষ্ঠা-১৪]
বিজ্ঞ পাঠক! লক্ষ্য করুণ! মাত্র তিন লাইনে পাঁচটি নিন্দনীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন । আল্লাহু আকবার! এটাই কি তাদের সালাফিয়‍্যাতের আদর্শ! এর প্রতিই কি তারা বিশ্ববাসীকে ফ্রি বই বিতরণ করে দাওয়াত দিয়ে থাকে!?
তাদের সম্পর্কে শায়েখ ড.আব্দুর রাজ্জাক বিন খলিফা শায়যী তাঁর الخطوط العريضة لأدعياء السلفية )আল-খুতুতুল আরিযা লি-আদইয়াইস সালাফিয়্যা) নামক কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন-
فهذه هي الطبعة الثانية من الخطوط العريضة لاصول أدعياء السلفية ، جمعنا فيها مجموعة أخرى من أصول هذه المجموعة التي ظهرت على المسلمين بالتبديع والتفسيق والتجريم ، والتكفير ، واستعملت كل ألفاظ التنفير والتحقير مع دعاة الإسلام خاصة ، كوصفهم بالزندقة، والإلحاد، والخروج... الخ
“এটি খুতুতুল আরিযা নামক কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণ। এতে আমি সেই দলের মূলনীতিগুলো উল্লেখ করেছি যারা মুসলিম উম্মাহের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেছে মুসলমানদেরকে বিদআতী, ফাসেক, পাপী, কাফের ইদ্যাদি সাব্যস্ত করার জন্য। এক্ষেত্রে উম্মাহের দায়ীদের ব্যাপারে তারা সবধরণের নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য শব্দ ব্যবহার করেছে যেমন- তাদেরকে যিন্দিক, মুরতাদ, খারেজী... ইত্যাদি বলেছে।”
[আল-জামে ফির রদ্দি আলাল জামিয়া, খ--১, পৃষ্ঠা-১০৫]
সালাফিয়্যাতের দাবীদার আবু বকর জাযায়েরীর উক্ত সংজ্ঞার সাথে সালাফীদের ইমামদের ইমাম শায়েখ ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর ছাত্র আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) তাছাউফ সম্পর্কে কী বলেছেন একটু লক্ষ্য করুণ!
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) তাঁর طريق الهجرتین ত্বরিকুল হিযরাতাইন( নামক কিতাবে লিখেছেন-
ومنها أن هذا العلم "التصوف" هو من أشرف علوم العباد وليس بعد علم التوحيد أشرف منه وهو لا يناسب إلا النفوس الشريفة ولا يناسب النفوس الدنيئة المهينة
“এই ইলম তথা তাছাউফের ইলম বান্দার সমস্ত ইলমের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ইলম । ইলমুত তাওহীদ তথা তাওহীদের ইলমের পরে এর চেয়ে উত্তম ইলম আর নেই । এই ইলমের জন্য শুধু উত্তম ও সম্মানিত হৃদয় উপযুক্ত, কোন নিকৃষ্ট, নীচ হৃদয় এর উপযুক্ত নয়”[ত্বরিকুল হিযরাতাইন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ), পৃষ্ঠা-২৬0-261]
সালাফীরা যেহেতু আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ), তাঁর ছাত্র আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী (রহঃ) এর অনুসরণ করার দাবী করে এজন্য আমরা এ রিসালায় তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের ইমাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করেছি । আমার উদ্দেশ্য যেহেতু সংক্ষিপ্ত একটি রিসালা তৈরি করা এজন্য তাছাউফ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার অনেক উক্তি এখানে উল্লেখ করা হয়নি। আল্লাহ পাক তাওফীক দিলে পরবর্তীতে যদি বড় আকারে প্রকাশ করার সুযোগ হয় তখন ইনশাআল্লাহ আরও কিছু সংযোজন করে দেয়ার আশা রাখি।
সালাফীদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবু বকর জাবের জাযায়েরী উল্লেখ করেছেন-
الدعوة السلفية التي أحياها بعد موتها في العالم الإسلامي الإمامان الجليلان: أحمد بن عبد الحليم بن تيمية في الديار الشامية، و محمد ابن عبد الوهاب في الديار النجدية
“সালাফী দাওয়াতের মৃত্যু হওয়ার পর যারা একে মুসলিম বিশ্বে পুনরুজ্জীবিত করেছেন তারা হলেন, দু'জন মহান ইমামঃ আহমাদ বিন আব্দুল হালিম বিন তাইমিয়া (রহঃ), তিনি শামে এ আন্দোলনকে জীবিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব, তিনি নজদ এলাকায় এ আন্দোলনকে জীবিত করেছেন”
[ইলাত-তাছাউফ ইয়া ইবাদাল্লা! পৃষ্ঠা-৮]
আল্লাহ পাক তাওফীক দিলে তাছাউফ সম্পর্কে এ রচনাগুলো ইনশাআল্লাহ কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হবে । তাছাউফ সম্পর্কে সালাফীদের অন্যান্য অনুসরণীয় ব্যক্তিদের অভিমত সম্বলিত আরেকটি পর্ব শীঘ্রই প্রকাশের আশা রাখি।
তাছাউফ ও তাছাউফের ইমামদের সম্পর্কে অনেকের ধারণা হল যে, তারা দ্বীন প্রতিষ্টায় ও দ্বীন প্রচারে বিশেষ করে জিহাদ থেকে বিমূখ । আল্লাহ পাক রহমত করলে অচিরেই “আল্লাহর পথের মুজাহিদ সূফীগণ” নামে একটি রিসালা প্রকাশ করব । আগ্রহী পাঠকগণ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি ব্যক্তিত্ত্ব ও ক্ষণজন্মা মণীষী সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) এর বিখ্যাত কিতাব “তারীখে দাওয়াত ও আযীমত” পাঠ করতে পারেন। এটি বাংলা ভাষায় সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস নামে প্রকাশিত হয়েছে।
তাছাউফ সম্পর্কে আমাদের সর্বশেষ কথা হল, ইলমে তাছাউফ সব ধরণের বিদআতী, শিরকী, কুফরী কর্মকা- থেকে মুক্ত। যে সমস্ত পীরপূজারী, কবরপূজারী, মাজারপূজারী, ভ-, ধর্ম ব্যাবসায়ী গদ্দিনশীন নিজেদেরকে তাছাউফের সাথে সম্পৃক্ত করে, তাদের মাঝে এবং তাছাউফের মাঝে এতটা দূরত্ব যেমন পূর্ব-পশ্চিয়ের মাঝে, বরং আসমান যমিনের মাঝে যে দূরত্ব তাছাউফ থেকে এরা তার চেয়েও বেশি দূরে।
শরীয়তের প্রত্যেকটি ইলম যেমন ইলমে হাদীস, ফিকহ, তাফসীরের ক্ষেত্রে যেমন বড় বড় ইমাম রয়েছেন, তেমনি সেসমস্ত মিথ্যুক দাজ্জালও রয়েছে যারা জাল হাদীস তৈরি করেছে, ফতোয়ার নামে দ্বীন নিয়ে খেলা করেছে এবং তাফসীরের নামে কুরআন বিকৃত করেছে । কিন্তু যখন এ সমস্ত ইলম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তখন কেবল বড় বড় ইমামদের দ্বারাই এর পরিমাপ করা হয় । একইভাবে ইলমে তাছাউফের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহের সর্বজন স্বীকৃত বড় বড় ওলী রয়েছেন, আবার সেই সমস্ত ভ-ও রয়েছে যারা তাছাউফের নামে দ্বীনকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু আমরা যদি তাছাউফকে বুঝতে চাই, তবে এসমস্ত ভ-দেরকে দিয়ে তাছাউফকে ওজন করা যাবে না, কেননা এরা তো তাছাউফ থেকে লক্ষ- কোটি মাইল দূরে, এরা তো তাছাউফের মাঝেই প্রবেশ করেনি, কিভাবে এদের মাধ্যমে তাছাউফকে পরিমাপ করা হবে?
দ্বিতীয়তঃ শরীয়তের বিরোধী পৃথিবীর কোন ইলমই ইলম নয়, চাই তা বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইন বা অন্য কিছু হোক। তাছাউফের মাঝে কেউ যদি এমন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত করে, যা শরীয়তে বিরোধী, তবে তা সর্বযুগের সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাতিল, ভ্রান্ত ও প্রত্যাখ্যাত ।
রিসালাটি প্রকাশে অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছে। আল্লাহ পাক তাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন!
বিজ্ঞ পাঠকের সমীপে নিবেদন এই যে, রিসালাটিতে ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে আমাদেরকে অবহিত করে বাধিত করবেন, পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা হবে ইনশাআল্লাহ!
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করেন এবং আখেরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন । আমীন!
বিনীত
ইজহারুল ইসলাম
(২/১০/১২, রাত-১.৫৬)

টিকাঃ
১ এ পুস্তিকার ভূমিকা লিখেছেন শাযেখ ড. সাইদ রমজান বাউতী ।

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার নিকট তাছাউফের উৎপত্তি

📄 আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার নিকট তাছাউফের উৎপত্তি


أول ما ظهرت الصوفية من البصرة وأول من بنى دويرة الصوفية بعض أصحاب عبد الواحد بن زيد وعبد الواحد من أصحاب الحسن وكان في البصرة من المبالغة في الزهد والعبادة والخوف ونحو ذلك ما لم يكن في سائر أهل الأمصار ولهذا كان يقال فقه كوفي وعبادة بصرية
“তাছাউফের ধ্যান-ধারণা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় বসরা থেকে এবং আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) এর কিছু সাগরেদ সর্বপ্রথম তাছাউফের ইমারত তৈরি করেন। আব্দুল ওয়াহেদ (রহঃ) হাসান বসরীর সাগরেদ ছিলেন। আর বসরায় তখন যুহদ, ইবাদত ও আল্লাহর ভয়ের এতটা আধিক্য ছিল যে, তা অন্য কোন মুসলিম জনপদে দৃষ্ট হত না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, ফিকহুন কুফিউন ও ইবাদাতুন বিসরিয়াতুন (কুফার ফিকহ ও বসরার ইবাদত)।
(মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-৬)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وعبد الواحد بن زيد وأن كان مستضعفاً في الرواية إلا أن العلماء لا يشكون في ولايته وصلاحه
আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে যদিও যয়ীফ ছিলেন তবে উলামায়ে কেরাম তার বেলায়াত (বুযুর্গী), ও সৎ হওয়ার ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেন না।”
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়ার ১১ খ-ের ২৮২ পৃষ্ঠায় “আল্লাহর বন্ধু ও শয়তানের বন্ধুর মাঝে পার্থক্য” এ শিরোনামের অধীনে আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) কে আল্লাহর বন্ধু তথা আউলিয়াউর রহমানের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এবং তিনি كرمات حصلت للصابة والتابعين و الصالحين (সাহাবী, তাবেয়ী ও সালেহীনদের কারামত) এ শিরোনামের অধীনে হযরত আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) এর কারামত উল্লেখ করেছেন।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২৮২]

টিকাঃ
2 عبد الواحد بن زيد أبو عبيدة البصرى شيخ الصوفية وواعظهم لحق الحسن البصرى وغيره وقال الجوزجاني : سيئ المذهب، ليس من معادن الصدق . توفى بعد الخمسين ومائة من الهجرة . [ سير أعلام النبلاء 7178 180، ميزان الاعتدال 2372، 376 ] قال إبن تيمية رحمه الله | ولا يلتفتون إلى قول الجوزجاني فأنه متعنت كما هو مشهور عنه

أول ما ظهرت الصوفية من البصرة وأول من بنى دويرة الصوفية بعض أصحاب عبد الواحد بن زيد وعبد الواحد من أصحاب الحسن وكان في البصرة من المبالغة في الزهد والعبادة والخوف ونحو ذلك ما لم يكن في سائر أهل الأمصار ولهذا كان يقال فقه كوفي وعبادة بصرية
“তাছাউফের ধ্যান-ধারণা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় বসরা থেকে এবং আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) এর কিছু সাগরেদ সর্বপ্রথম তাছাউফের ইমারত তৈরি করেন। আব্দুল ওয়াহেদ (রহঃ) হাসান বসরীর সাগরেদ ছিলেন। আর বসরায় তখন যুহদ, ইবাদত ও আল্লাহর ভয়ের এতটা আধিক্য ছিল যে, তা অন্য কোন মুসলিম জনপদে দৃষ্ট হত না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, ফিকহুন কুফিউন ও ইবাদাতুন বিসরিয়াতুন (কুফার ফিকহ ও বসরার ইবাদত)।
(মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-৬)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وعبد الواحد بن زيد وأن كان مستضعفاً في الرواية إلا أن العلماء لا يشكون في ولايته وصلاحه
আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে যদিও যয়ীফ ছিলেন তবে উলামায়ে কেরাম তার বেলায়াত (বুযুর্গী), ও সৎ হওয়ার ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেন না।”
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়ার ১১ খ-ের ২৮২ পৃষ্ঠায় “আল্লাহর বন্ধু ও শয়তানের বন্ধুর মাঝে পার্থক্য” এ শিরোনামের অধীনে আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) কে আল্লাহর বন্ধু তথা আউলিয়াউর রহমানের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এবং তিনি كرمات حصلت للصابة والتابعين و الصالحين (সাহাবী, তাবেয়ী ও সালেহীনদের কারামত) এ শিরোনামের অধীনে হযরত আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ (রহঃ) এর কারামত উল্লেখ করেছেন।
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২৮২]

টিকাঃ
2 عبد الواحد بن زيد أبو عبيدة البصرى شيخ الصوفية وواعظهم لحق الحسن البصرى وغيره وقال الجوزجاني : سيئ المذهب، ليس من معادن الصدق . توفى بعد الخمسين ومائة من الهجرة . [ سير أعلام النبلاء 7178 180، ميزان الاعتدال 2372، 376 ] قال إبن تيمية رحمه الله | ولا يلتفتون إلى قول الجوزجاني فأنه متعنت كما هو مشهور عنه

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর নিকট “সূফী” এর সংজ্ঞা

📄 আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর নিকট “সূফী” এর সংজ্ঞা


আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়ায় লিখেছেন-
هو . أي الصوفي . في الحقيقة نوع من الصديقين فهو الصديق الذي اختص بالزهد والعبادة على الوجه الذي اجتهدوا فيه فكان الصديق من أهل هذه الطريق كما يقال : صديقو العلماء وصديقو الأمراء فهو أخص من الصديق المطلق ودون الصديق الكامل الصديقية من الصحابة والتابعين وتابعيهم فإذا قيل عن أولئك الزهاد والعباد من البصريين أنهم صديقون فهو كما يقال عن أئمة الفقهاء من أهل الكوفة أنهم صديقون أيضاً كل بحسب الطريق الذي سلكه من طاعة الله ورسوله بحسب اجتهاده وقد يكونون من أجل الصديقين بحسب زمانهم فهم من أكمل صديقي زمانهم والصديق من العصر الأول أكمل منه والصديقون درجات وأنواع
“প্রকৃতপক্ষে সূফী হলেন, সিদ্দিকিনদের একটি প্রকার। সূফী হলেন এমন সিদ্দিক যে তাঁর ইজতেহাদ অনুযায়ী যুহদ ও ইবাদতের মাঝে মগ্ন থাকে। এ অর্থে সূফী হলেন সিদ্দিক । যেমন বলা হয়, আলেমদের সিদ্দিকিন ও আমীরদের সিদ্দিকিন। সুতরাং সূফী সাধারণ সিদ্দিক থেকে বিশেষিত (খাস) এবং সিদ্দিকে কামেল তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীন থেকে নিম্ন স্তরের । অতএব, বসরার ঐ সমস্ত যাহেদ ও আবেদগণ সম্পর্কে বলা হবে যে, তারা সিদ্দিকিন, যেমন কুফার ফকীহ ইমামগণের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, তারাও সিদ্দিকিন । প্রত্যেক দলই তাঁদের ইজতেহাদ অনুযায়ী আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর অনুসরণ করেছেন। কখনও সূফীগণ তাদের যামানার শ্রেষ্ঠ সিদ্দিকিন হিসেবে পরিগণিত হবেন। অতএব, সূফীগণ তাদের যামানার কামেল সিদ্দিকীন । আর প্রথম যামানার সিদ্দিকগণ হলেন এদের চেয়েও কামেল । আর সিদ্দিকিনদের রয়েছে বিভিন্ন স্তর ও প্রকার।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১৬, পৃষ্ঠা-১১]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
"وأما جمهور الأمة وأهل الحديث والفقه والتصوف فعلى ما جاءت به الرسل وما جاء عنهم من الكتب والاثارة من العلم وهم المتبعون للرسالة اتباعا محضا لم يشوبوه بما يخالفه
“সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহ, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও সূফীগণ রাসূলদের আনীত বিষয়ের উপর এবং তাদের থেকে যেসমস্ত কিতাব ও ইলমের ধারা এসেছে তার উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। এরা হলেন, রাসূল (সঃ) এর রেসালাতের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং একে রেসালাতের বিরোধী কোন বিষয় দ্বারা দূষিত করেন না”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১২, পৃষ্ঠা-৩৬]

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়ায় লিখেছেন-
هو . أي الصوفي . في الحقيقة نوع من الصديقين فهو الصديق الذي اختص بالزهد والعبادة على الوجه الذي اجتهدوا فيه فكان الصديق من أهل هذه الطريق كما يقال : صديقو العلماء وصديقو الأمراء فهو أخص من الصديق المطلق ودون الصديق الكامل الصديقية من الصحابة والتابعين وتابعيهم فإذا قيل عن أولئك الزهاد والعباد من البصريين أنهم صديقون فهو كما يقال عن أئمة الفقهاء من أهل الكوفة أنهم صديقون أيضاً كل بحسب الطريق الذي سلكه من طاعة الله ورسوله بحسب اجتهاده وقد يكونون من أجل الصديقين بحسب زمانهم فهم من أكمل صديقي زمانهم والصديق من العصر الأول أكمل منه والصديقون درجات وأنواع
“প্রকৃতপক্ষে সূফী হলেন, সিদ্দিকিনদের একটি প্রকার। সূফী হলেন এমন সিদ্দিক যে তাঁর ইজতেহাদ অনুযায়ী যুহদ ও ইবাদতের মাঝে মগ্ন থাকে। এ অর্থে সূফী হলেন সিদ্দিক । যেমন বলা হয়, আলেমদের সিদ্দিকিন ও আমীরদের সিদ্দিকিন। সুতরাং সূফী সাধারণ সিদ্দিক থেকে বিশেষিত (খাস) এবং সিদ্দিকে কামেল তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীন থেকে নিম্ন স্তরের । অতএব, বসরার ঐ সমস্ত যাহেদ ও আবেদগণ সম্পর্কে বলা হবে যে, তারা সিদ্দিকিন, যেমন কুফার ফকীহ ইমামগণের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, তারাও সিদ্দিকিন । প্রত্যেক দলই তাঁদের ইজতেহাদ অনুযায়ী আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর অনুসরণ করেছেন। কখনও সূফীগণ তাদের যামানার শ্রেষ্ঠ সিদ্দিকিন হিসেবে পরিগণিত হবেন। অতএব, সূফীগণ তাদের যামানার কামেল সিদ্দিকীন । আর প্রথম যামানার সিদ্দিকগণ হলেন এদের চেয়েও কামেল । আর সিদ্দিকিনদের রয়েছে বিভিন্ন স্তর ও প্রকার।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১৬, পৃষ্ঠা-১১]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
"وأما جمهور الأمة وأهل الحديث والفقه والتصوف فعلى ما جاءت به الرسل وما جاء عنهم من الكتب والاثارة من العلم وهم المتبعون للرسالة اتباعا محضا لم يشوبوه بما يخالفه
“সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহ, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও সূফীগণ রাসূলদের আনীত বিষয়ের উপর এবং তাদের থেকে যেসমস্ত কিতাব ও ইলমের ধারা এসেছে তার উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। এরা হলেন, রাসূল (সঃ) এর রেসালাতের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং একে রেসালাতের বিরোধী কোন বিষয় দ্বারা দূষিত করেন না”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১২, পৃষ্ঠা-৩৬]

📘 ইবন তাইমিয়ার দৃষ্টিতে তাসাউফ > 📄 তাছাউফ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) ও অন্যান্য ইমামগণ

📄 তাছাউফ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) ও অন্যান্য ইমামগণ


আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) মাজমুউল ফাতাওয়ায় লিখেছেন-
" أما لفظ الصوفية فانه لم يكن مشهورا في القرون الثلاثة وإنما اشتهر التكلم به بعد ذلك وقد نقل التكلم به عن غير واحد من الأئمة والشيوخ كالإمام احمد بن حنبل وأبي سليمان الداراني وغيرهما وقد روى عن سفيان الثورى أنه تكلم به وبعضهم يذكر ذلك عن الحسن البصرى". اهـ
“সূফী শব্দটি প্রথম তিন জামানায় তেমন প্রসিদ্ধ ছিল না। এটি এর পরে প্রসিদ্ধি লাভ করে । এ ব্যাপারে অনেক ইমাম ও শায়েখদের বক্তব্য রয়েছে। যেমন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ), আবু সুলাইমান দারানী (রহঃ)। সূফিয়ান সাউরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম আলোচনা করেছেন, কেউ কেউ হাসান বসরী (রহঃ) এর কথা উল্লেখ করেছেন।” [মাজমুউল ফাতাওয়া- খ--১১, পৃষ্ঠা-৫]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وأولياء الله هم المؤمنون المتقون، سواء سمى أحدهم فقيرًا أو صوفيًا أو فقيها أو عالما أو تاجرًا أو جنديًا أو صانعًا أو أميرًا أو حاكمًا أو غير ذلك
“আল্লাহর ওলী হলেন, মত্তাকী মুমিনগণ। চাই তাদেরকে ফকীর, সূফী, ফকীহ, আলেম, ব্যবসায়ী, সৈনিক, কারিগর, আমীর কিংবা বিচারক বলা হোক না কেন।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২২]
ثُمَّ هُمْ إِمَّا قَائِمُونَ بِظَاهِرِ الشرع فَقَطْ كَعُمُومٍ أَهْلِ الْحَدِيثِ وَالْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ فِي الْعِلْمِ بِمَنْزِلَةِ الْعِبَادِ الظَّاهِرِينَ فِي الْعِبَادَةِ . وَإِمَّا عَالِمُونَ بِمَعَانِي ذَلِكَ وَعَارِفُونَ بِهِ فَهُمْ فِي الْعُلُومِ كَالْعَارِفِينَ مِنْ الصُّوفِيَّةِ الشَّرْعِيَّةِ . فَهَؤُلَاءِ هُمْ عُلَمَاءُ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ الْمَحْضَةِ وَهُمْ أَفْضَلُ الْخَلْقِ وَأَكْمَلُهُمْ وَأَقْوَمُهُمْ طَرِيقَةً
“অতঃপর কিতাব ও সুন্নাহের অনুসারীগণ হয়ত শুধু এর বাহ্যিকের উপর আমল করবেন যেমন, সাধারণ মুহাদ্দিস ও সাধারণ মুমিনগণ, যারা ইবাদতের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ইলমের উপর আমল করে থাকেন; কিংবা কুরআন ও সুন্নাহের গভীর মর্ম ও অর্থ সম্পর্কে অবগত হবেন, যেমন সূফীগণ। এরা হলেন, মুহাম্মাদ (সঃ) এর একনিষ্ঠ উম্মত । এরা সমস্ত সৃষ্টির মাঝে উত্তম ও কামেল এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ পথের পথিক।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--২০, পৃষ্ঠা-৩৬]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
طائفة ذمت الصوفية والتصوف وقالوا أنهم مبتدعون خارجون عن السنة ونقل عن طائفة من الأئمة في ذلك من الكلام ما هو معرفون وتبعهم على ذلك طوائف من أهل الفقه والكلام وطائفة غلت فيهم وادعوا أنهم أفضل الخلق وأكملهم بعد الأنبياء وكلا طرفي هذه الأمور ذميم, والصواب أنهم مجتهدون في طاعة الله كما اجتهد غيرهم من أهل طاعة الله ففيهم السابق المقرب بحسب اجتهاده وفيهم المقتصد الذي هو من أهل اليمين وفي كل من الصنفين من قد يجتهد فيخطىء وفيهم من يذنب فيتوب أو لا يتوب ومن المنتسبين إليهم من هو ظالم لنفسه عاص لربه وقد انتسب إليهم من أهل البدع والزندقة ولكن عند المحققين من أهل التصوف ليسوا منهم
“একদল তাছাউফ ও সূফীদের নিন্দা করে এবং বলে যে, তারা বিদআতী, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বহির্ভূত। আবার কতিপয় ইমামদের থেকে এদের সম্পর্কে প্রশংসাপূর্ণ উক্তি বর্ণিত আছে, যা প্রসিদ্ধ এবং তাদেরকে ফকীহ ও মুতাকাল্লিমীনদের কিছু দল অনুসরণ করেছে। আরেক দল তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ী করেছে এবং তারা দাবী করেছে যে, সূফীগণ নবীদের পরে সৃষ্টির মাঝে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ । বাস্তবতা হল, উভয়টি তথা সূফীদের নিন্দা ও তাদের অতিরিক্ত মর্যাদা দান নিন্দনীয়। সঠিক কথা হল, সূফীগণ আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইজতেহাদ করে থাকেন যেমন অন্যরা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইজতেহাদ করেন । ইজতেহাদের তারতম্যের কারণে তাদের মাঝে কেউ কেউ অগ্রগামী নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং কেউ কেউ মধ্যম স্তরের যে হল, ডানপন্থী (আসহাবুল ইয়ামীন)। এ উভয় প্রকারের মাঝে এমন লোক রযেছে যারা কখনও ইজতেহাদ করে এবং তাদের এ ইজতেহাদে ভুল হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ রয়েছে, যারা গোনাহ করে এবং তওবা করে অথবা তওবা করে না। আবার এমন কিছু লোক সূফীদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবী করেছে যারা নিজেদের উপর অত্যাচারকারী ও প্রভূর অবাধ্যতাকারী । কখনও কখনও বিদআতী ও যিদ্দিক শ্রেণীর কেউ কেউ তাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবী করেছে, কিন্তু গবেষক সূফীদের নিকটে এরা সূফীদের অন্তর্ভূক্ত নয়।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া-খ--১১, পৃষ্ঠা-১৭]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
لفظ الفقر والتصوف قد أدخل فيه أمور يحبها الله ورسوله فتلك يؤمر بها ، وإن سميت فقرا وتصوفا ؛ لأن الكتاب والسنة إذا دل على استحبابها لم يخرج ذلك بأن تُسمى باسم أخر . كما يدخل في ذلك أعمال القلوب كالتوبة والصبر والشكر والرضا والخوف والرجاء والمحبة والأخلاق المحمودة
“ফকিরি এবং তাছাউফের মাঝে এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) পছন্দ করেন। সুতরাং শরীয়তে এর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে; যদিও এর নাম তাছাউফ কিংবা ফকিরি রাখা হয়। কেননা কিতাব ও সুন্নাহ যখন এর মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ পেশ করে, তখন একে অন্য কোন নামে নামকরণ দ্বারা মুল বিষয় থেকে এটি বের হয়ে যাবে না। যেমন তাছাউফের মাঝে অন্তর্ভূক্ত হবে অন্তরের আমলসমূহ তথা, তওবা, সবর, শুকুর, রিযা (সন্তুষ্টি), খাওফ (ভয়), রজা (আশা), মহব্বত ও আখলাকে মাহমুদা (প্রশংসনীয় গুণাবলী)”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২৮-২৯]
وَهُمْ يَسِيرُونَ بِالصُّوفِي إِلَى مَعْنَى الصِّدِّيقِ وَأَفْضَلُ الْخَلْقِ بَعْدَ الْأَنْبِيَاءِ الصِّدِّيقُونَ
“সূফী শব্দকে তারা মূলতঃ সিদ্দিকীনদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন । আর নবীদের পরে সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠ হলেন, সিদ্দিকীন ।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-১৬]

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) মাজমুউল ফাতাওয়ায় লিখেছেন-
" أما لفظ الصوفية فانه لم يكن مشهورا في القرون الثلاثة وإنما اشتهر التكلم به بعد ذلك وقد نقل التكلم به عن غير واحد من الأئمة والشيوخ كالإمام احمد بن حنبل وأبي سليمان الداراني وغيرهما وقد روى عن سفيان الثورى أنه تكلم به وبعضهم يذكر ذلك عن الحسن البصرى". اهـ
“সূফী শব্দটি প্রথম তিন জামানায় তেমন প্রসিদ্ধ ছিল না। এটি এর পরে প্রসিদ্ধি লাভ করে । এ ব্যাপারে অনেক ইমাম ও শায়েখদের বক্তব্য রয়েছে। যেমন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ), আবু সুলাইমান দারানী (রহঃ)। সূফিয়ান সাউরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম আলোচনা করেছেন, কেউ কেউ হাসান বসরী (রহঃ) এর কথা উল্লেখ করেছেন।” [মাজমুউল ফাতাওয়া- খ--১১, পৃষ্ঠা-৫]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
وأولياء الله هم المؤمنون المتقون، سواء سمى أحدهم فقيرًا أو صوفيًا أو فقيها أو عالما أو تاجرًا أو جنديًا أو صانعًا أو أميرًا أو حاكمًا أو غير ذلك
“আল্লাহর ওলী হলেন, মত্তাকী মুমিনগণ। চাই তাদেরকে ফকীর, সূফী, ফকীহ, আলেম, ব্যবসায়ী, সৈনিক, কারিগর, আমীর কিংবা বিচারক বলা হোক না কেন।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২২]
ثُمَّ هُمْ إِمَّا قَائِمُونَ بِظَاهِرِ الشرع فَقَطْ كَعُمُومٍ أَهْلِ الْحَدِيثِ وَالْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ فِي الْعِلْمِ بِمَنْزِلَةِ الْعِبَادِ الظَّاهِرِينَ فِي الْعِبَادَةِ . وَإِمَّا عَالِمُونَ بِمَعَانِي ذَلِكَ وَعَارِفُونَ بِهِ فَهُمْ فِي الْعُلُومِ كَالْعَارِفِينَ مِنْ الصُّوفِيَّةِ الشَّرْعِيَّةِ . فَهَؤُلَاءِ هُمْ عُلَمَاءُ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ الْمَحْضَةِ وَهُمْ أَفْضَلُ الْخَلْقِ وَأَكْمَلُهُمْ وَأَقْوَمُهُمْ طَرِيقَةً
“অতঃপর কিতাব ও সুন্নাহের অনুসারীগণ হয়ত শুধু এর বাহ্যিকের উপর আমল করবেন যেমন, সাধারণ মুহাদ্দিস ও সাধারণ মুমিনগণ, যারা ইবাদতের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ইলমের উপর আমল করে থাকেন; কিংবা কুরআন ও সুন্নাহের গভীর মর্ম ও অর্থ সম্পর্কে অবগত হবেন, যেমন সূফীগণ। এরা হলেন, মুহাম্মাদ (সঃ) এর একনিষ্ঠ উম্মত । এরা সমস্ত সৃষ্টির মাঝে উত্তম ও কামেল এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ পথের পথিক।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--২০, পৃষ্ঠা-৩৬]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
طائفة ذمت الصوفية والتصوف وقالوا أنهم مبتدعون خارجون عن السنة ونقل عن طائفة من الأئمة في ذلك من الكلام ما هو معرفون وتبعهم على ذلك طوائف من أهل الفقه والكلام وطائفة غلت فيهم وادعوا أنهم أفضل الخلق وأكملهم بعد الأنبياء وكلا طرفي هذه الأمور ذميم, والصواب أنهم مجتهدون في طاعة الله كما اجتهد غيرهم من أهل طاعة الله ففيهم السابق المقرب بحسب اجتهاده وفيهم المقتصد الذي هو من أهل اليمين وفي كل من الصنفين من قد يجتهد فيخطىء وفيهم من يذنب فيتوب أو لا يتوب ومن المنتسبين إليهم من هو ظالم لنفسه عاص لربه وقد انتسب إليهم من أهل البدع والزندقة ولكن عند المحققين من أهل التصوف ليسوا منهم
“একদল তাছাউফ ও সূফীদের নিন্দা করে এবং বলে যে, তারা বিদআতী, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বহির্ভূত। আবার কতিপয় ইমামদের থেকে এদের সম্পর্কে প্রশংসাপূর্ণ উক্তি বর্ণিত আছে, যা প্রসিদ্ধ এবং তাদেরকে ফকীহ ও মুতাকাল্লিমীনদের কিছু দল অনুসরণ করেছে। আরেক দল তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ী করেছে এবং তারা দাবী করেছে যে, সূফীগণ নবীদের পরে সৃষ্টির মাঝে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ । বাস্তবতা হল, উভয়টি তথা সূফীদের নিন্দা ও তাদের অতিরিক্ত মর্যাদা দান নিন্দনীয়। সঠিক কথা হল, সূফীগণ আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইজতেহাদ করে থাকেন যেমন অন্যরা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইজতেহাদ করেন । ইজতেহাদের তারতম্যের কারণে তাদের মাঝে কেউ কেউ অগ্রগামী নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং কেউ কেউ মধ্যম স্তরের যে হল, ডানপন্থী (আসহাবুল ইয়ামীন)। এ উভয় প্রকারের মাঝে এমন লোক রযেছে যারা কখনও ইজতেহাদ করে এবং তাদের এ ইজতেহাদে ভুল হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ রয়েছে, যারা গোনাহ করে এবং তওবা করে অথবা তওবা করে না। আবার এমন কিছু লোক সূফীদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবী করেছে যারা নিজেদের উপর অত্যাচারকারী ও প্রভূর অবাধ্যতাকারী । কখনও কখনও বিদআতী ও যিদ্দিক শ্রেণীর কেউ কেউ তাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবী করেছে, কিন্তু গবেষক সূফীদের নিকটে এরা সূফীদের অন্তর্ভূক্ত নয়।”
[মাজমুউল ফাতাওয়া-খ--১১, পৃষ্ঠা-১৭]
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-
لفظ الفقر والتصوف قد أدخل فيه أمور يحبها الله ورسوله فتلك يؤمر بها ، وإن سميت فقرا وتصوفا ؛ لأن الكتاب والسنة إذا دل على استحبابها لم يخرج ذلك بأن تُسمى باسم أخر . كما يدخل في ذلك أعمال القلوب كالتوبة والصبر والشكر والرضا والخوف والرجاء والمحبة والأخلاق المحمودة
“ফকিরি এবং তাছাউফের মাঝে এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) পছন্দ করেন। সুতরাং শরীয়তে এর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে; যদিও এর নাম তাছাউফ কিংবা ফকিরি রাখা হয়। কেননা কিতাব ও সুন্নাহ যখন এর মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ পেশ করে, তখন একে অন্য কোন নামে নামকরণ দ্বারা মুল বিষয় থেকে এটি বের হয়ে যাবে না। যেমন তাছাউফের মাঝে অন্তর্ভূক্ত হবে অন্তরের আমলসমূহ তথা, তওবা, সবর, শুকুর, রিযা (সন্তুষ্টি), খাওফ (ভয়), রজা (আশা), মহব্বত ও আখলাকে মাহমুদা (প্রশংসনীয় গুণাবলী)”
[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-২৮-২৯]
وَهُمْ يَسِيرُونَ بِالصُّوفِي إِلَى مَعْنَى الصِّدِّيقِ وَأَفْضَلُ الْخَلْقِ بَعْدَ الْأَنْبِيَاءِ الصِّدِّيقُونَ
“সূফী শব্দকে তারা মূলতঃ সিদ্দিকীনদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন । আর নবীদের পরে সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠ হলেন, সিদ্দিকীন ।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, খ--১১, পৃষ্ঠা-১৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00