📄 গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত
গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত।
এক শ্রেণী হলো আল্লাহর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান বান্দাহর দল। যারা আল্লাহর মহব্বত, বন্দেগী ও আনুগত্যের নির্ভেজাল পথের অনুসারী।
আর দ্বিতীয় শ্রেণী হলো মুশরিকের দল। এ দল নফসের খাহেশের পূজারী। আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম ও আলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে প্রথম দলের ইমাম বানিয়েছেন। যেভাবে তিনি ফিরআউন ও আলে ফিরআউনকে দ্বিতীয় দলের নেতা বানিয়েছেন।
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلاً جَعَلْنَا صُلِحِينَ وَجَعَلْنَا هُمْ أئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا - الانبياء : ۷۲-۷۳
"আমি ইবরাহীমকে বখশিশ হিসেবে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুবকে। তাদের প্রত্যেককে আমি সালেহ এবং ঈমানদার বানিয়েছি। তারা আমার হুকুম অনুসারে মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখাতো।" -সূরা আল আম্বিয়া : ৭২-৭৩
এভাবে ফিরআউন ও আলে ফিরআউন সম্পর্কে বলা হয়েছে :
وَجَعَلْنُهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ - قصص : ٤١
"আর আমি তাদেরকে গোমরাহীর নেতা বানিয়েছি। তারা মানুষকে জাহান্নামের পথে ডেকে আনতো।"-সূরা আল কাসাস: ৪১
📄 ওয়াহদাতুল ওয়াজুদের ফিতনা
এ ধরনের ফিরআউনী গুমরাহী উৎস সম্পর্কে তাদের এ ধারণা যে, আল্লাহ তা'আলার রেযা ও কাযা এবং মর্যী ও মাশিয়ত দুটো একই জিনিস। আর এদের পরিণতিও এ নির্ভেজাল কুফরী ধারণার উপর গিয়ে ঠেকে যে খালিক ও মাখলুক উভয়টা একই জিনিস। যিনি খালিক তিনিই মাখলুক আর যিনি মাখলুক তিনিই খালিক। তাদের জিদ হলো, মাখলুকও খালিকের সমতুল্য। অথচ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘোষণা হলো:
أَفَرَءَ يْتُمْ مَا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ ، فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّلِي إِلَّا رَبَّ العَلَمِينَ - الشعراء : ٧٥-٧٧
"তোমরা কি দেখেছ যে, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা যেসব জিনিসকে মাবুদ বানিয়ে রেখেছো তা সবই পরওয়ারদিগারে আলম ছাড়া, আমার দুশমন।"-সূরা আশ শুআরা: ৭৫-৭৭
আমি আগেই বলেছি যে, কিছুসংখ্যক মাশায়েখের সন্দেহপূর্ণ কথা- বার্তার ভিত্তিতেই এ মতের সৃষ্টি হয়েছে। এ হতভাগ্যরা এ ধরনের বক্র- চিন্তা ও দুর্বল ব্যাখ্যার এই রোগে নিমজ্জিত হয়েছে যার শিকারে পরিণত হয়েছিল নাসারা জাতি।
📄 ফানাফিল্লাহ
এসব সন্দেহপূর্ণ শব্দাবলীর মধ্যে দৃষ্টান্ত হিসেবে 'ফানাহ' শব্দটি দেখা যাক। তাদের এ একটি শব্দের আড়ালে কেমন বিপজ্জনক এবং আপদমস্তক শিরক ও নাস্তিকতা লুকিয়ে আছে।
'ফানাহ' তিন প্রকার। প্রথম প্রকার হলো, কামেল লোকদের ফানাহ। এতে আম্বিয়া ও অলীগণ শামিল রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকার 'ফানাহ'র কাসেদীনের এতে সালেহীন ও কম মর্যাদার অলীগণ।
তৃতীয় প্রকার 'ফানাহ' হলো মুনাফিক ও মুশরিকদের।
প্রথম শ্রেণীর 'ফানাহ' হাকীকত হলো, আবেদের দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আল্লাহর সাথেই ভালোবাসা জুড়ে নিতে হবে। তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। ভরসা করতে হবে তাঁরই উপর। তাঁর কাছেই চাইতে হবে সকল রকম সাহায্য-সহযোগিতা। বন্দেগীর পরিপূর্ণতার লক্ষণই হলো বান্দাহ তাই পসন্দ করবে যা আল্লাহ পসন্দ করেন। তাকেই ভালোবাসবে যিনি আল্লাহর নিকট মাহবুব হবেন। যেমন ফেরেশতা, আম্বিয়া ও সুলাহা। যাদের মনের অবস্থা হবে কুরআনে বর্ণিত অবস্থার মত 'কালবে সালীম'। সালীম অর্থ হলো সুরক্ষিত। এজন্য কালবে সালীম হলো সেই কালব, যে কালব আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহর ইবাদাত ছাড়া, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া অথবা আল্লাহর মহব্বত ছাড়া অন্য সকলের মহব্বত থেকে পূত-পবিত্র ও সুরক্ষিত থাকবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও বন্দেগীর এ অবস্থাকে আপনি 'ফানাহ' শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করুন অথবা অন্য কোনো শব্দ দ্বারা আমি এ নিয়ে আর বহস্ করবো না। অবশ্য কথা হলো প্রকৃত ইসলাম এটাই।
দ্বিতীয় প্রকার 'ফানাহ' হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো খেয়াল ও মুশাহিদা হতে হৃদয় একেবারেই পবিত্র থাকবে। অধিকাংশ 'সালেক'ই এ অবস্থায়ই থাকে। এর কারণ হলো এরা গোপনভাবে আল্লাহর মহব্বত, ইবাদাত, ও তাঁর যিকিরের দিকে পরিপূর্ণভাবে ঝুঁকে থাকে। এদিকে মনের দিক থেকে যেহেতু সে দুর্বল থাকে এজন্য জালাল ও জামালে খোদাওয়ান্দির ব্যাপারে ভীত ও পেরেশান থাকে। এদের এমন শক্তি অবশিষ্ট থাকে না যে, আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে সে দেখতে পারে। এর ফল দাঁড়ায় যে, গায়রুল্লাহ তাদের মনে আদপেই প্রবেশ করতে পারে না। বরং তারা গায়রুল্লাহর অনুভূতি পর্যন্ত ভুলে যায়। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মায়ের মনের অবস্থা এমনই ছিলো, তিনি যখন তাঁর ছেলেকে আল্লাহর হুকুমে দরিয়ার ঢেউয়ের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
أَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَرِعًا ط - القصص : ১০
"মূসার মায়ের হৃদয় খালি হয়ে গিয়েছিলো।" -সূরা আল কাসাস : ১০
"খালি হয়ে গিয়েছিলো" অর্থাৎ মূসার যিকির-ফিকির ছাড়া তার মনে আর অন্য কোনো কথা ছিলো না, এ হৃদয়ে শুধু মূসা আর মূসাই অবশিষ্ট রয়েছে। এ ধরনের অবস্থা সাধারণত এমন ব্যক্তির উপর আপতিত হয় যার উপর মহব্বত অথবা ভয় ও আশার অসাধারণ জযবা হঠাৎ করে কজা করে নেয়। যে জিনিসকে তারা ভালোবাসে অথবা ভয় করে অথবা প্রত্যাশা করে থাকে, তার মনে ওইসব জিনিস ছাড়া অন্য কোনো জিনিসের ধারণা রাস্তা খুঁজে পায় না। অতএব যিক্র ইলাহীর মধ্যে এ অবস্থা পেশ হওয়া একটি বাস্তব ঘটনা। যখন কোনো যিকিরকারী এ অবস্থার সম্মুখীন হয়, তখন তার ভেতর থেকে 'আমি', 'তুমির' পার্থক্য উঠে যায়। সে তার প্রিয়কে পেয়ে স্বয়ং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গাফেল হয়ে যায়। সে নিজে যা দেখতে পায় তার মধ্যে মিশে গিয়ে নিজেকেই ভুলে বসে। তার অন্তরদৃষ্টি শুধু একটি যাতে আজালী ও হাকীকী অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলাকেই বিদ্যমান দেখতে পায়। আর অবশিষ্ট গোটা বিশ্ব তার কাছে কোনো জিনিস বলেই মন হয় না। এ অবস্থা তীব্র হলে সালেকের মন এত দুর্বল হয়ে যায় যে, সে 'আমি' আর 'তুমি'র মধ্যে পার্থক্য করতে হয়রান হয়ে যায়। তখন তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সে নিজেই নিজের মাহবুব।
📄 কামিল শাইখের সঠিক ব্যাখ্যা
হক ও মারেফাতের বুযুর্গগণ যে বাক্যগুলো বলেছেন যেমন:
مَا أَرَى غَيْرَ اللَّهِ - "আমি আল্লাহকে ছাড়া আর কিছু দেখি না।”
অথবা لَا أَنْظُرُ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ - "আমি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো দিকে দৃষ্টি দেই না” ইত্যাদি।
তাদের এসব কথাবার্তার অর্থ হলো, "আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে বিশ্ব চরাচরের পরওয়ারদিগার অথবা খালিক অথবা পরিচালক অথবা ইলাহ দেখি না" এবং "আমি কোনো গায়রুল্লাহর থেকে মহব্বত ও ভালোবাসা অথবা আশা পোষণ করি না।" (এদের এসব দাবীর যুক্তিগুলো স্পষ্ট) মানুষের দৃষ্টি ওই জিনিসের দিকেই পতিত হয় যা তার মনে রেখাপাত করে। যার সাথে তার মহব্বত আছে অথবা যাকে তিনি ভয় করেন। নতুবা যে জিনিসের সাথে তার না কোনো ভালোবাসা আছে, না আছে কোনো শত্রুতা, না আছে কোনো লোভ, আর না আছে কোনো ভয়, এমন ধরনের জিনিসের প্রতি তার কখনো দৃষ্টি আকর্ষিত হবে না। আর কখনো যদি তার দৃষ্টি ঘটনাক্রমে ওই দিকে পড়েও যায় তবে তার দৃষ্টান্ত এমন যেমন পথ চলতে চলতে কারো দৃষ্টি কংকর কি পাথরের উপর পড়ে যায়। অতএব যারা সত্যিকারের বুযুর্গানে দীন তাদের নিকট এটা একটা সত্যিকারের ব্যাপার। তাও আবার প্রশংসার যোগ্য। উপরে উল্লেখিত কথার এটাই হলো তাদের আসল দাবী। তারা এ বাক্যগুলোর মধ্যে তাওহীদ ও ইখলাসে পরিপূর্ণ এবং নিরেট সত্য কথার ঘোষণা করেছেন যে, বান্দাহকে গায়রুল্লাহর দিকে দৃষ্টি না দেয়া উচিত। এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিকে ভালোবাসা, ভয় অথবা আরজুর দৃষ্টি দেয়া ঠিক নয়।
এর বিপরীতে তার মন মাখলুকাতের সকল যিকির ফিকির থেকে খালি ও মুক্ত হওয়া উচিত। আর যখনই সে এগুলোর দিকে তাকাবে তখন আল্লাহ প্রদত্ত নূরের চোখে তাকাবে। হকের কান দিয়ে শুনবে, হকের চোখ দিয়ে দেখবে, হকের হাত দিয়ে ধরবে, হকের পা দিয়ে চলবে। ঐ জিনিসকে ভালোবাসবে যেসব জিনিস আল্লাহ ভালোবাসেন। ওইসব কথাবার্তাকে ঘৃণা করবে, যেসব কথাবার্তা আল্লাহ ঘৃণা করেন। এ দুনিয়ার কাজে কারবারে আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে গোটা মাখলুকাতের বিরোধিতা এবং শত্রুতাকেও পরওয়া করবে না। এটাই হলো ওই দিল যা 'সলীম' এবং 'একনিষ্ঠ' যাকে আরেফ ও মুওয়াহেদ বলা হয়েছে। যার উপাধি মু'মিন মুসলিম হিসেবে শোভা পায়। যেমনভাবে
'ফানাহর' তৃতীয় প্রকারটি অর্থাৎ ফানা ফিল ওয়াজুদ ফিরআউন ও তার অনুসারীর বৈশিষ্ট্য, তেমনি এ প্রকারটি আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের অনুসারীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অর্ন্তগত।
ফানার এ প্রকারটাই আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রশংসনীয়। যত সত্যপন্থী এবং অনুসরণের যোগ্য মাশায়েখ অতিবাহিত হয়েছেন, তাঁরা সকলেই আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে এ ধারণা ও আকীদা পোষণ করতেন যে, তিনি সকল মাখলুক থেকে একেবারেই পৃথক অস্তিত্ব। তিনি চিরন্তন, আর অবশিষ্ট সব সৃষ্টি ধ্বংসশীল। আর চিরন্তন সত্তা ধ্বংসশীল বস্তু থেকে পৃথক ও একেবারেই স্পষ্ট হওয়া একটি জরুরী ব্যাপার। এসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ রাহে সুলুকে সংঘটিত হওয়া সন্দেহ হৃদয়ের রোগসমূহ সম্পর্কেও লোকদেরকে অবহিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, কিছু কিছু লোক সুলুকে বাতেনের সময় তো মাখলুকাতের মুশাহিদা করেন কিন্তু হৃদয়ে পার্থক্য করার শক্তি না থাকার কারণে মাখলুককেও খালিক বলে মনে করে বসে। ঠিক যেমন কোনো ব্যক্তি সূর্যের কিরণ দেখে ধারণা করে বসে, এটাই সূর্য। অথচ প্রকৃত ব্যাপার তা নয়।