📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 শান ও সম্পদের ভালোবাসা

📄 শান ও সম্পদের ভালোবাসা


রাসূল (স) দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلَى كُلَّهُ صَالِحًا وَاجْعَلْهُ لِوَجْهِكَ خَالِصًا وَلَا تَجْعَلْ لِأَحَدٍ فِيهِ شَيْئًا .
“হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রতিটি কাজকে শুধু তোমার জন্যই একনিষ্ঠ বানাও। এতে অন্য কারো যেনো কোনো অংশ না থাকে।”
গোলামীর পথে দ্বিতীয় বাধা হলো ধন-সম্পদের আকর্ষণ। আমিত্বের অধ্যয়ন থেকে জানা যায়, মানুষের মধ্যে সাধারণত এমন এমন গোপন প্রত্যাশা লুক্কায়িত থাকে যা আল্লাহর সত্যিকারের ভালোবাসা, বন্দেগী ও ইখলাসের বীজের উপর আবরণ ফেলে দেয়, যাতে তা বাড়তে ও অগ্রসর হতে না পারে। শাদ্দাদ ইবনে আউস (র) আহলে আরবকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন:
“হে আরববাসী! তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ভয় যে বিষয়ে তা হলো তোমাদের 'রিয়া' ও 'নক্সের গোপন লালসা'।”
স্বয়ং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের সর্বোচ্চ হন্তা সম্পর্কে নিম্নোক্ত শব্দগুলো দিয়ে সাবধান করেছেন:
مَا ذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلاً فِي ذَرِيبَةٍ غَنَمٍ بِأَفْسَدِ لَهَا مِنْ حَرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ لِشَرفِ دينه - رواه احمد وترمذى
"দুটি ভুখা চিতাকে বকরীর পালে ছেড়ে দেয়া হলেও বকরীদের জন্য তা এত ধ্বংসাত্মক নয়, যত বড় ধ্বংসাত্মক ধন-সম্পদের লোভী মানুষ দীন ও ঈমানের জন্য।”-আহমাদ, তিরমিযি
বুঝা গেলো, যে অন্তরে সত্য ও খাঁটি দীন স্থান পাবে, সে অন্তরে ধন-সম্পদ ও শান-শওকতের স্থান নেই। কারণ মানুষের মন যখন আল্লাহর ভালোবাসা ও ইবাদাতের আসল মজা পায় তখন তার দৃষ্টিতে এর চেয়ে বড় মজাদার জিনিস আর কিছু থাকে না। তখন অন্য কোনো দিকে যাবার তার কোনো প্রয়োজনও পড়ে না। এ কারণেই সরলমতি মু'মিনরা সকল প্রকার খারাপ কাজ ও কথা থেকে এর সাহায্যে মাহফুয থাকে। কুরআনে পাকে এরশাদ হয়েছে:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ، إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
“এরূপ ঘটল, যাতে করে আমরা ইউসুফের থেকে অন্যায়, পাপ ও নির্লজ্জতা দূরীভূত করে দেই। আসলে সে আমার বাছাই করা বান্দাদের একজন।”-সূরা ইউসুফ: ২৪
এর কারণ একেবারেই স্পষ্ট। খালিস বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও আল্লাহর ইবাদাতের এমন মজা ও স্বাদ পায় যা গায়রুল্লাহর বন্দেগী হতে তাকে ফিরিয়ে রাখে। কারণ তার হৃদয়ে ঈমানের চেয়ে বেশী প্রিয়, সুস্বাদু, আনন্দদায়ক ও সম্মোহনের অধিকারী আর কোনো জিনিস নেই। আর এই বাতিনী অবস্থা আল্লাহর দিকে তার হৃদয়কে টেনে নিয়ে যায়। সবসময়ই তাঁর দিকে মাথা নত রাখে। তাঁর যিকিরে হৃদয়কে মগ্ন রাখে। তাঁর ভয়ে বান্দা ভীত-প্রকম্পিত এবং রহমতের প্রত্যাশী থাকে। আল্লাহ এরশাদ করছেন-
مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيبِ ق : ٣٣
“যে ব্যক্তি গায়েবিভাবে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে এবং তাঁর দরবারে নৈকট্যের আবেগাপ্লুত হৃদয় নিয়ে হাজির হয়।" -সূরা কাফ: ৩৩
ভালোবাসার প্রাকৃতিক দাবীই হলো, প্রেমিক যদি একদিকে প্রেমাস্পদের মিলনের আশায় আন্দোলিত থাকে তাহলে সাথে সাথে আবার না পাবার হতাশার দুর্ভোগে ভুগতে থাকে। এ কারণেই আল্লাহর বান্দা ও তার প্রেমিক সবসময়ই আশা-নিরাশার দ্বিগুণ ভাবাবেগ পোষণ করে:
يَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَه - - بنى اسرائيل : ٥٧
"তারা হয়ে থাকে তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর আযাবের ভয়ে ভীত।"-সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৭
কুরআনের এ শব্দগুলো এ সত্যেরই আয়না। মানুষের নক্স মূলত দুটি অবস্থার যে কোনো একটিতে নিমজ্জিত থাকে। হয় সে এক আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাহ ও দাস হবে অথবা মাখলুকের বান্দা হয়ে থাকবে। আর বিভিন্ন রকমের শয়তান তার দিল ও দেমাগের উপর ছায়া বিস্তার করে রাখবে। এছাড়া তৃতীয় আর কোনো সুরত নেই। কারণ মানুষের হৃদয় যদি গায়রুল্লাহ হতে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর জন্য পাগলপারা না হয়ে যায় তাহলে শিরকের নাজাসাতের সাথে তার মিশে যাওয়া এক নিশ্চিত ব্যাপার। কুরআন মাজীদ যে ঈমানের দাবী করে তার মর্ম এর থেকে একটুও ভিন্ন নয়।
আল্লাহ বলেছেন :
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ... ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ الروم: ৩০-৩১
"অতএব তোমরা একাগ্রচিত্তে তোমাদের চেহারা আল্লাহর দীনের দিকে ফিরিয়ে দাও ...... এটাই সোজা সুদৃঢ় দীন। কিন্তু এ সম্পর্কে অনেক লোকই জানে না। তাঁর প্রতি অবনত হয়ে তাঁকে ভয় কর। আর নামায কায়েম করো। মুশরিকদের মধ্যে পরিগণিত হয়ো না।" -সূরা আর রূম : ৩০-৩১

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত

📄 গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত


গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত।
এক শ্রেণী হলো আল্লাহর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান বান্দাহর দল। যারা আল্লাহর মহব্বত, বন্দেগী ও আনুগত্যের নির্ভেজাল পথের অনুসারী।
আর দ্বিতীয় শ্রেণী হলো মুশরিকের দল। এ দল নফসের খাহেশের পূজারী। আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম ও আলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে প্রথম দলের ইমাম বানিয়েছেন। যেভাবে তিনি ফিরআউন ও আলে ফিরআউনকে দ্বিতীয় দলের নেতা বানিয়েছেন।
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلاً جَعَلْنَا صُلِحِينَ وَجَعَلْنَا هُمْ أئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا - الانبياء : ۷۲-۷۳
"আমি ইবরাহীমকে বখশিশ হিসেবে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুবকে। তাদের প্রত্যেককে আমি সালেহ এবং ঈমানদার বানিয়েছি। তারা আমার হুকুম অনুসারে মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখাতো।" -সূরা আল আম্বিয়া : ৭২-৭৩
এভাবে ফিরআউন ও আলে ফিরআউন সম্পর্কে বলা হয়েছে :
وَجَعَلْنُهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ - قصص : ٤١
"আর আমি তাদেরকে গোমরাহীর নেতা বানিয়েছি। তারা মানুষকে জাহান্নামের পথে ডেকে আনতো।"-সূরা আল কাসাস: ৪১

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ওয়াহদাতুল ওয়াজুদের ফিতনা

📄 ওয়াহদাতুল ওয়াজুদের ফিতনা


এ ধরনের ফিরআউনী গুমরাহী উৎস সম্পর্কে তাদের এ ধারণা যে, আল্লাহ তা'আলার রেযা ও কাযা এবং মর্যী ও মাশিয়ত দুটো একই জিনিস। আর এদের পরিণতিও এ নির্ভেজাল কুফরী ধারণার উপর গিয়ে ঠেকে যে খালিক ও মাখলুক উভয়টা একই জিনিস। যিনি খালিক তিনিই মাখলুক আর যিনি মাখলুক তিনিই খালিক। তাদের জিদ হলো, মাখলুকও খালিকের সমতুল্য। অথচ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘোষণা হলো:
أَفَرَءَ يْتُمْ مَا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ ، فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّلِي إِلَّا رَبَّ العَلَمِينَ - الشعراء : ٧٥-٧٧
"তোমরা কি দেখেছ যে, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা যেসব জিনিসকে মাবুদ বানিয়ে রেখেছো তা সবই পরওয়ারদিগারে আলম ছাড়া, আমার দুশমন।"-সূরা আশ শুআরা: ৭৫-৭৭
আমি আগেই বলেছি যে, কিছুসংখ্যক মাশায়েখের সন্দেহপূর্ণ কথা- বার্তার ভিত্তিতেই এ মতের সৃষ্টি হয়েছে। এ হতভাগ্যরা এ ধরনের বক্র- চিন্তা ও দুর্বল ব্যাখ্যার এই রোগে নিমজ্জিত হয়েছে যার শিকারে পরিণত হয়েছিল নাসারা জাতি।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ফানাফিল্লাহ

📄 ফানাফিল্লাহ


এসব সন্দেহপূর্ণ শব্দাবলীর মধ্যে দৃষ্টান্ত হিসেবে 'ফানাহ' শব্দটি দেখা যাক। তাদের এ একটি শব্দের আড়ালে কেমন বিপজ্জনক এবং আপদমস্তক শিরক ও নাস্তিকতা লুকিয়ে আছে।
'ফানাহ' তিন প্রকার। প্রথম প্রকার হলো, কামেল লোকদের ফানাহ। এতে আম্বিয়া ও অলীগণ শামিল রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকার 'ফানাহ'র কাসেদীনের এতে সালেহীন ও কম মর্যাদার অলীগণ।
তৃতীয় প্রকার 'ফানাহ' হলো মুনাফিক ও মুশরিকদের।
প্রথম শ্রেণীর 'ফানাহ' হাকীকত হলো, আবেদের দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আল্লাহর সাথেই ভালোবাসা জুড়ে নিতে হবে। তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। ভরসা করতে হবে তাঁরই উপর। তাঁর কাছেই চাইতে হবে সকল রকম সাহায্য-সহযোগিতা। বন্দেগীর পরিপূর্ণতার লক্ষণই হলো বান্দাহ তাই পসন্দ করবে যা আল্লাহ পসন্দ করেন। তাকেই ভালোবাসবে যিনি আল্লাহর নিকট মাহবুব হবেন। যেমন ফেরেশতা, আম্বিয়া ও সুলাহা। যাদের মনের অবস্থা হবে কুরআনে বর্ণিত অবস্থার মত 'কালবে সালীম'। সালীম অর্থ হলো সুরক্ষিত। এজন্য কালবে সালীম হলো সেই কালব, যে কালব আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহর ইবাদাত ছাড়া, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া অথবা আল্লাহর মহব্বত ছাড়া অন্য সকলের মহব্বত থেকে পূত-পবিত্র ও সুরক্ষিত থাকবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও বন্দেগীর এ অবস্থাকে আপনি 'ফানাহ' শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করুন অথবা অন্য কোনো শব্দ দ্বারা আমি এ নিয়ে আর বহস্ করবো না। অবশ্য কথা হলো প্রকৃত ইসলাম এটাই।
দ্বিতীয় প্রকার 'ফানাহ' হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো খেয়াল ও মুশাহিদা হতে হৃদয় একেবারেই পবিত্র থাকবে। অধিকাংশ 'সালেক'ই এ অবস্থায়ই থাকে। এর কারণ হলো এরা গোপনভাবে আল্লাহর মহব্বত, ইবাদাত, ও তাঁর যিকিরের দিকে পরিপূর্ণভাবে ঝুঁকে থাকে। এদিকে মনের দিক থেকে যেহেতু সে দুর্বল থাকে এজন্য জালাল ও জামালে খোদাওয়ান্দির ব্যাপারে ভীত ও পেরেশান থাকে। এদের এমন শক্তি অবশিষ্ট থাকে না যে, আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে সে দেখতে পারে। এর ফল দাঁড়ায় যে, গায়রুল্লাহ তাদের মনে আদপেই প্রবেশ করতে পারে না। বরং তারা গায়রুল্লাহর অনুভূতি পর্যন্ত ভুলে যায়। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মায়ের মনের অবস্থা এমনই ছিলো, তিনি যখন তাঁর ছেলেকে আল্লাহর হুকুমে দরিয়ার ঢেউয়ের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
أَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَرِعًا ط - القصص : ১০
"মূসার মায়ের হৃদয় খালি হয়ে গিয়েছিলো।" -সূরা আল কাসাস : ১০
"খালি হয়ে গিয়েছিলো" অর্থাৎ মূসার যিকির-ফিকির ছাড়া তার মনে আর অন্য কোনো কথা ছিলো না, এ হৃদয়ে শুধু মূসা আর মূসাই অবশিষ্ট রয়েছে। এ ধরনের অবস্থা সাধারণত এমন ব্যক্তির উপর আপতিত হয় যার উপর মহব্বত অথবা ভয় ও আশার অসাধারণ জযবা হঠাৎ করে কজা করে নেয়। যে জিনিসকে তারা ভালোবাসে অথবা ভয় করে অথবা প্রত্যাশা করে থাকে, তার মনে ওইসব জিনিস ছাড়া অন্য কোনো জিনিসের ধারণা রাস্তা খুঁজে পায় না। অতএব যিক্র ইলাহীর মধ্যে এ অবস্থা পেশ হওয়া একটি বাস্তব ঘটনা। যখন কোনো যিকিরকারী এ অবস্থার সম্মুখীন হয়, তখন তার ভেতর থেকে 'আমি', 'তুমির' পার্থক্য উঠে যায়। সে তার প্রিয়কে পেয়ে স্বয়ং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গাফেল হয়ে যায়। সে নিজে যা দেখতে পায় তার মধ্যে মিশে গিয়ে নিজেকেই ভুলে বসে। তার অন্তরদৃষ্টি শুধু একটি যাতে আজালী ও হাকীকী অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলাকেই বিদ্যমান দেখতে পায়। আর অবশিষ্ট গোটা বিশ্ব তার কাছে কোনো জিনিস বলেই মন হয় না। এ অবস্থা তীব্র হলে সালেকের মন এত দুর্বল হয়ে যায় যে, সে 'আমি' আর 'তুমি'র মধ্যে পার্থক্য করতে হয়রান হয়ে যায়। তখন তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সে নিজেই নিজের মাহবুব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00