📄 মহব্বতের সঠিক মানদণ্ড
প্রেম ভালোবাসা পথের এ-ই হলো ওই বিপজ্জনক অবস্থা এসব অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা প্রেম-ভালোবাসার একটি কষ্টিপাথর ঠিক করে দিয়েছেন। যাতে প্রেমের প্রত্যেক দাবীদার ব্যক্তি এর উপর ভিত্তি করে তাদের ভালোবাসার দাবীকে যাচাই করতে পারে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ - ال عمران : ۳۱
"বলো হে নবী! যদি তোমরা সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালো-বাসবেন।"-সূরা আলে ইমরান: ৩১
আল্লাহকে ভালোবাসার সত্যিকার দাবীদার ওই ব্যক্তিকে বলা যায়, যে ব্যক্তি রাসূলে করীমের অনুসরণ করাকে নিজের চলার পথ বানাবে। এ সত্য বুঝাবার জন্য কোনো অধ্যায় সংযোজনের প্রয়োজন নেই যে, রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণই ইবাদাতের আসল কথা।
কুরআন আরো এক কদম আগে বেড়ে হুব্বে ইলাহী ও হুব্বে রাসূলের এক উজ্জ্বল মানদণ্ড কায়েম করেছে। সে মানদণ্ড হলো 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'। জিহাদের হাকীকত হলো, আল্লাহ তা'আলার হুকুম আহকাম পালনে পরম সন্তুষ্টি এবং নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে চরম ঘৃণার সাথে পরিহার করে চলা। আল্লাহ তা'আলা তাঁর খাস মাহবুব বান্দাদের এবং যাদের নিকট আল্লাহ মাহবুব, তাদের ব্যাপারে একটি পার্থক্য সূচক বর্ণনা দিয়েছেন:
اَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ : يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"তারা মু'মিনদের জন্য খুবই সহৃদয় আর কাফেরদের উপর বজ্র কঠিন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে থাকে।" -সূরা আল মায়েদা : ৫৪
এ কারনেই উম্মতের ভালোবাসা ও ইবাদাত বিগত দিনের উম্মতদের তুলনায় বেশী পরিপূর্ণ। আর এ উম্মতের ভিতরে রাসূলে করীমের সাহাবা এবং মানুষের তুলনায় আল্লাহর মহব্বত ও ইবাদাতে বেশী কামেল। অথবা যারা রাসূলুল্লাহর এসব সাহাবাদের সঠিক নমুনা বনে যাবে, যারা এদের যত বেশী অনুসরণ করবে, ভালবাসা ও ইবাদাত ততোটাই পরিপূর্ণ হবে।
আল্লাহ তা'আলার মহব্বতের এ মানদণ্ড ও আমলী কাজ সামনে রেখে ওইসব লোকদের কথাবার্তা ও কাজকর্মের দিকে দৃষ্টিপাত করুন, যারা নিজেদেরকে আল্লাহর মহব্বত ও তাঁর প্রেমের ইজারাদার বলে মনে করে, অথচ দিনরাত রাসূলের সুন্নাত ও তাঁর হুকুম-আহকামের বিপরীত কাজ করে এবং এমন আকীদা ও ধ্যান-ধারণা পোষণ করে যা দীন ও শরীআতের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়।
শরীআতের অনুসরণ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-ই হলো খাঁটি আল্লাহর প্রেমিক ও মিথ্যা প্রেমিকদের মধ্যে পার্থক্যের মানদণ্ড। এ পার্থক্য দ্বারাই আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত প্রেমিক ও অলি এবং ভালোবাসার মৌখিক দাবীদারদের মধ্যে আসল পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। এ মৌখিক দাবীদারগণ মহব্বত করার দাবীর সাথে সাথে শরীআত বিরোধী কাজ ও কথা এবং নিজেদের মনগড়া বেদআতের তাবেদারী করতে থাকে। অথবা তারা মহব্বতের এমন মনগড়া ব্যাখ্যা করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিটা জিনিসকে মহব্বত করতে হবে। এমন কি কুফরী, ফাসেকী, নাফরমানীর মত জিনিসকেও ভালোবাসতে হবে।
আসলে এটাই হলো মহব্বতের ওই বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গি, যে মহব্বত ইহুদী নাসারা জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নাম সর্বস্ব ইসলামের সুফিদের মৌখিক এ মহব্বতের দাবীও ইহুদী নাসারাদের মহব্বতের দাবীর মতই। তারা বলতো, আমরা আল্লাহর ছেলে ও তার প্রিয়। যদিও এ হিসেবে যে, এদের কুফরী, এদের কুফরীর সীমা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে না। এদেরকে ইহুদী নাসারাদের সমান গুমরাh বলা যেতে পারে না। কিন্তু যদি আর একটি দিক দিয়ে চিন্তা করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, এদের এ দাবী ইহুদী নাসারাদের দাবী হতেও নিকৃষ্টতম ও ধ্বংসকারী। কারণ এদের মধ্যে শরীআতের বিরোধিতার সাথে সাথে মুনাফিকীর জীবানুও বিদ্যমান। আর একথা আমাদের সকলেরই জানা যে, মুনাফিকের ঠিকানা জাহান্নামের সবচেয়ে নিম্নস্তরে।
তাওরাত ও ইনজীল কিতাবে আল্লাহর মহব্বতের যে তালিম দেয়া হয়েছে ঠিক সেই তালিম কুরআন মাজীদেও দেয়া হয়েছে। যদিও এসব কিতাবের শব্দাবলী ও ভাষা এবং আসল তালিমের ব্যাপারে তাদের অনুসারীদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। কিন্তু এরপরও এটা একটা অতি সত্য কথা, আল্লাহর মহব্বতের তালিম প্রকৃত অর্থে হেদায়াতে রাব্বানী হবার ব্যাপারে কারো মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। বরং এ শিক্ষা তাদের কাছে ইনজীলের শরীআতের সবচেয়ে বড় ও বুনিয়াদী শিক্ষা হিসেবে পরিগণিত।
ইনজীল বলেঃ "হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, মন-দিল, আকল-বুদ্ধি ও অন্তর দিয়ে খোদাওয়ান্দকে মহব্বত করো।"
আজও নাসারা সম্প্রদায় দাবী করছে, তারা হুব্বে ইলাহীর উপর কায়েম আছেই। আর তাদের মধ্যে যে তাকওয়া ও পরহেযগারী পাওয়া যায় তা সে ওসিয়তেরই প্রভাব। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তা নয়। প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহ তা'আলার সত্যিকারের মহব্বত থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে নিয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা যা পসন্দ করেন তা তারা করে না। বরং যে জিনিস আল্লাহর অপসন্দ ও যাতে অনন্তুষ্ট হন, তারা তা-ই করে। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি তাদের মোটেই পরওয়া নেই। এর ফলেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সকল আমল নষ্ট করে দিয়েছেন। একদিকে তারা তথাকথিত আল্লাহ প্রেমের নেশায় বেহুঁশ হয়ে আছে। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিদ্রোহী ও অভিশপ্তদের তালিকায় শামিল করে নিয়েছেন। আল্লাহর সুন্নাত হলো, তিনি কেবল সেইসব লোকদেরই ভালোবাসেন এবং অনুগ্রহ করেন যারা তাঁকে সত্যিকার মহব্বত করে।
এটা কিভাবে হতে পারে যে, বান্দাহ যে আল্লাহকে ভালোবাসে আর আল্লাহ তাকে ভালোবাসে না? প্রকৃত ব্যাপার হলো বান্দাহ আল্লাহকে যতটুকু ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ততটুকুই ভালোবাসেন। আর এর ফল বান্দাহকে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশী দিয়ে থাকেন। হাদীসে কুদসীতে আছে:
مَنْ تَقَرَّبَ إِلَى شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَمَنْ نَقَرَبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ بَاعًا وَمَنْ أَتَانِي يَمْشِي أَنَبْتَهُ هَرُوَلَةً - رواه البخاري و مسلم
"যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক বাহু এগিয়ে আসি। আর যে আমার দিকে এক বাহু এগিয়ে আসে আমি তার দিকে একগজ এগিয়ে আসি। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।"
কুরআনে একথাগুলো বার বার উচ্চারিত হয়েছে : "আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।” "অনুগ্রহকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন।” "তাওবাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন।"
শুধু তাই নয়, বরং কুরআন সুন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী তো আল্লাহ তা'আলা সেসব লোকদেরকেই তাঁর প্রেমের সার্টিফিকেট দান করেন যারা ফরয, ওয়াযিব আদায় করে, নফল বন্দেগী বেশী বেশী পালন করে।
একটি বিখ্যাত হাদীসে কুদসীতে আছে :
لا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَى بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبُّهُ فَإِذَا أُحِبُّهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي いい يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يَبْصُرُ بِهِ - رواه البخاري
"নফল বন্দেগীর মাধ্যমে বান্দাহ আমার নিকটবর্তী হয়। এভাবে সে আমার প্রিয় হয়ে উঠে। এমনকি এক সময় আসে যখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে।”