📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন

📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন


সাধারণভাবে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব ছিলেন। আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর খলীল। মনে করা হয়, মহব্বতের দরজা 'খুল্লাতে'র চেয়ে উঁচু। কিন্তু এ ধারণার পেছনে কোনো প্রমাণ নেই। সহীহ হাদীস দ্বারা একথা ভালোভাবে প্রমাণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তা'আলার খলীল ছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম উভয় কিতাবেই এ রেওয়ায়াত বিদ্যমান আছে। বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيْلاً كَمَا اتَّخَذَا إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً -
"নিসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর খলীল বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাঁর খলীল বানিয়েছিলেন।"
এভাবে আর একটি হাদীসও আগে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আমি আল্লাহ তা'আলার খলীল। তাই এখন আমার আর কাউকে খলীল বানাবার অবকাশ নেই।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ঈমানের স্বাদ ও মজা

📄 ঈমানের স্বাদ ও মজা


উপরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, 'মহব্বতে ইলাহী' অর্থ হলো ওই সব কাজ-কর্মকে পসন্দ করা হবে যা আল্লাহ পসন্দ করেন। শরীআতের দলীলের আলোকেই আমি 'মহব্বতে ইলাহীর' এ ব্যাখ্যা করেছি।
এ প্রসঙ্গে বুখারী, মুসলিমের উপরে উল্লেখিত হাদীসটির তাৎপর্যপূর্ণ শব্দমালার প্রতি লক্ষ্য করুন। সেখানে বলা হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি জিনিস পাওয়া যাবে সে ব্যক্তিই ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। এভাবে কথা বলার কারণ হলো, মানুষ তখনই কোনো জিনিসের স্বাদ পায় যখন সে জিনিসের উপর হৃদয়ে অনুরাগ ও আর্কষণ বদ্ধমূল হয়। কোনো জিনিসের প্রতি যখন ভালোবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয় তখন সে জিনিস পেলে মনে এক প্রশান্তি তৃপ্তি ও পুলক শিহরণ জাগে। স্বাদ শব্দটি এমন একটি বিশেষ অবস্থার নাম যা রুচি সম্মত ও আকর্ষিত জিনিস অনুভব ও হাসিল করার পর মনে সৃষ্টি হয়। কোনো দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীর মতে আকর্ষিক জিনিস ভোগ ও লাভ করার অপর নাম হলো স্বাদ। একথাটা এত ওযনহীন ও অমূলক কথা যে, এর প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন নেই। কারণ এ ভোগ ও লাভই তো হলো আকর্ষণ ও স্বাদের মধ্যমণি। শুধু স্বাদই স্বয়ং নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে খাবারের ব্যাপারটি নিন। খাবার মানুষের জন্য একটি চিত্তাকর্ষক জিনিস। যখন সে খাবার খেয়ে ফেলে তখন এর স্বাদ অনুভব করে। তারপর একথা বলা কতটুকু ভুল যে, খাবার খাওয়াটাই হলো স্বাদ। এভাবে দৃষ্টিশক্তির কথা ধরুন। মানুষ কোনো প্রিয় জিনিস দেখার পর তার মনে একটা তৃপ্তি লাভ করে। তাই বুঝা গেলো যে, তৃপ্তি লাভ হয় ওই প্রিয় জিনিস দেখার ও দৃষ্টিপাতের পর। এ কারণে নজর এক জিনিস আর স্বাদ ও তৃপ্তি আর এক জিনিস যা দেখার পরই সৃষ্টি হয়। কুরআনের শব্দাবলীও এ সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়:
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ : - الزخرف : ۷۱
"মন ভুলানো ও চোখের আস্বাদনের জিনিসসমূহ সেখানে বর্তমান থাকবে।"-সূরা আয যুখরুফ: ৭১
এতে বুঝা গেলো শুধু দেখার নামই লয্যত (স্বাদ) নয় নতুবা এভাবে বলা হতো না যে, চোখ তাকে দেখেই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে।
অন্যান্য অনুভূতি সম্পন্ন ব্যাপারগুলোরও এ একই অবস্থা। আনন্দ ও বিপদের যেসব অবস্থা আত্মা অনুভব করবে তা কোনো না কোনো পসন্দনীয় জিনিস অথবা অপসন্দনীয় জিনিস লাভের ও ভোগের অনুভূতিরই ফলাফল। স্বয়ং অনুভূতি ও উপলব্ধির ফল নয়। অতএব ঈমানের স্বাদ ও এর থেকে প্রাপ্ত মজা ও আনন্দ আল্লাহ তা'আলাকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসারই ফল। তিনটি কথা পুরোপুরিভাবে বুঝার পরই এ ফল লাভ হতে পারে।
এক: এ ভালোবাসায় পরিপূর্ণতা থাকতে হবে।
দুই: ভালোবাসা বাড়তে থাকতে হবে।
তিন: এ ভালোবাসার পথে প্রতিবন্ধক এমন সবকিছুকে ঘৃণা ও প্রতিরোধ করতে হবে।
"ভালোবাসার পরিপূর্ণতার” অর্থ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পৃথিবীর সবকিছু হতে বেশী প্রিয় হবে। শুধু একথা বললেই হবে না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাস্তবেই সর্বাধিক ভালোবাসতে হবে।
ভালোবাসা বৃদ্ধি হবার দাবী হলো, যদি বান্দা অন্য কাউকেও ভালোবাসে সে ভালোবাসাও আল্লাহর জন্য হতে হবে। মূল ভালোবাসা তার জন্যে হবে না-হবে আল্লাহর জন্য। তার প্রতি ভালোবাসা হবে আল্লাহর ভালোবাসা কেন্দ্রিক। ভালোবাসার পথের প্রতিবন্ধকজনিত প্রতিটি জিনিসকে ঘৃণা করার অর্থ হলো, ঈমানের বিপরীত জিনিস কুফর ও শিরককে আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকেও অধিক অপসন্দ করা।
এসব কথা বুঝার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মু'মিনদেরকে ভালোবাসাও প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে ভালোবাসার সমতুল্য। অর্থাৎ তার একটা অংশ। রাসূলের প্রতি মহব্বত এজন্য যে, রাসূল আল্লাহ তা'আলাকে সবচেয়ে বেশী মহব্বত করতেন। এ কারণেই আল্লাহর প্রিয়দের প্রতি মহব্বত অবশ্যম্ভাবী। এখন 'মহব্বতের' বিপরীত 'খুল্লাতের" অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করুন। কিভাবে এতে গায়রুল্লাহর জন্য এক কণাও কোনো অংশ নেই। মূলগতভাবেও নেই, আংশিকভাবেও নেই। বরং তা আল্লাহর জন্যই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। এর দ্বারা 'মহব্বতের' চেয়ে 'খুল্লাতে'র শ্রেষ্ঠত্ব দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায়।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 আল্লাহর মহব্বতের ব্যাপারে চিন্তা ও আমলের ত্রুটি

📄 আল্লাহর মহব্বতের ব্যাপারে চিন্তা ও আমলের ত্রুটি


মোটকথা আল্লাহর মহব্বত ও খুল্লাতের মধ্যেই 'ইবাদাতে ইলাহীর' প্রকৃত রহস্য লুকায়িত। কিন্তু কত জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তি অতিবাহিত হয়েছেন যারা এ সূত্র বুঝতে পারেননি। তাদের ধারণা ইবাদাত বন্দেগী তো শুধু বিনয় ও নিজকে ছোট জানার একটা নিরস অজিফা। এতে আবার মহব্বতের স্বাদ কোথায়? কারণ মহব্বত তো হৃদয়ের একটি কামনা বাসনার মিলিতরূপ। আর দ্বিতীয় পক্ষের তরফ থেকে আনন্দ উল্লাস প্রকাশের নাম। একথা তো খুবই স্পষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলার জাত এ ধরনের কথাবার্তা হতে একেবারই দূরে। এ জন্য এটা কিভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ তা'আলাকে একজন 'মাহবুব' বা একজন 'মুহিব'-এর অবস্থান দেয়া যায়। এ ধারণাটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মহব্বতের সঠিক অর্থ না বুঝারই ফল। এ ধরনের ভুল বুঝার আশংকায় হযরত যুননূন মিসরী (র) তাঁর সামনে 'মইব্বতে ইলাহীর' উল্লেখ করা হলে বলেছিলেন:
"চুপ থাকো। এ ব্যাপারে কোনো কথা বলো না। তোমার একথা যেনো সাধারণ লোকদের কানে না যায়, তারা আল্লাহর মহব্বতের দাবী করতে শুরু করে।"
বস্তুত কিছু আলেম ওইসব লোকের সাথে উঠাবসা মাকরুহ বলে দিয়েছে, যারা আল্লাহ তা'আলার ভয়-ভীতির যিকির ও ধারণা দেয়া ছাড়া শুধু তার মহব্বতের কথাই বলে। এ ব্যাপারে একজন বুযুর্গের কথা হৃদয়ের মাঝে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মত। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত শুধু মহব্বতের সাথে করে সে হলো 'যিন্দিক' অর্থাৎ কাফির। আর যে ব্যক্তি শুধু আশা নিয়ে ইবাদাত করে সে 'মুরযি' আশাবাদী। আর যে ব্যক্তি শুধু ভয়ের সাথে ইবাদাত করে সে 'হারুরী”। তাওহীদবাদী মু'মিন কেবল সে ব্যক্তি যে মহব্বত, ভয় ও আশা এ তিনটি জিনিসের সাথে ইবাদাত করে।"
পরবর্তীকালের সূফীদের মধ্যে এমন সব লোকের আবির্ভাব ঘটে যারা মহব্বতের দাবীর ব্যাপারে নিজেদের সীমারেখা ভুলে গিয়ে সীমালংঘন করে বসেছিলো। এমন কি এদের মধ্যে এক রকমের অহংকার পর্যন্ত সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তারা এমন দাবীও করে যা ইবাদাতের বিপরীত। তারা নিজেদের মধ্যে এমন সব খোদায়ী গুণের দাবী করে যা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারো মধ্যে থাকতে পারে না। তারা নিজেদেরকে এমন মর্যাদাবান বলে প্রকাশ করে যা নবী-রাসূলদের মর্যাদার চেয়েও উপরে।
তারা নিজেদের জন্য আল্লাহর নিকট এমন গুণাবলী দাবী করে, যেসব গুণাবলী শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এমন কি নবীগণও যার উপযুক্ত নয়।
এ হলো ওইসব বিপজ্জনক গোমরাহী যার শয়তানী জালে তরীকতের বড় বড় শেখগণও আটকা পড়েছে। তাদের এত বড় ভুলে নিমজ্জিত হবার কারণ তারা ইবাদাতের মর্ম বুঝতে পারেনি এবং ইবাদাতের হক আদায় করতে পারেনি। বরং এর কারণ সেই বিবেক বুদ্ধির ত্রুটি যা ছাড়া বান্দা নিজের পরিচয়ও জানতে পারে না। আসল বুদ্ধি যখন ভুল পথে চলে এবং দীনের জ্ঞান যখন পুরোপুরি লাভ হয় না, তখন যদি নফসের মধ্যে আল্লাহর মহব্বতের জযবা পয়দা হয়ে যায়, তখন তা মহব্বতের দৃষ্টিতে দেখেন। কেননা আল্লাহ কোনো বান্দাহকে এতটুকুনই ভালোবাসেন যতটুকুন তার মধ্যে ঈমান ও তাকওয়া থাকে। আর যে ব্যক্তি মনে করে মাহবুবে খোদা হবার পর কোনো গুনাহই তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে মনে করে, "যেহেতু আমি সুঠামদেহী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাই আমি যত বিষই পান করি না কেনো এবং অবিরত খেতে থাকি না কেনো এতে আমার কোনো অনিষ্ট বা ক্ষতি হবে না। বিবেক-বুদ্ধির এ শত্রুরা যদি কুরআনের প্রতি দৃষ্টিপাত করতো এবং আম্বিয়ায়ে কিরামের জীবনাদর্শ মনোনিবেশ সহকারে অবলোকন করতো যে, মানব জাতির এ সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানগণকেও কখনো কখনো আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে তাওবা অলক্ষ্যে অজান্তে আবার নিজ থেকেই বেরিয়ে যায়। তখন সে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে বসে। বস্তুত ভালোবাসার মধ্যে মানবীয় দুর্বলতার মুশাহিদা করা যায়। এরপর নক্স যখন শয়তানের প্রতারণার স্বীকার হয়ে যায় তখন মুখ দিয়ে বড় বড় বুলি বেরুতে থাকে। সে স্পষ্ট করে বলতে শুরু করে, আমি তো আল্লাহর আশেক। আমি যা চাইবো করবো। এতে আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু এ ধরনের কথাবার্তা যে সরাসরি গুমরাহী তা স্পষ্ট। আর ঠিক এ ধরনের কথাবার্তা ইহুদী নাসারাদের মুখ থেকে বের হতো। তারা বলতোঃ
"আমরা আল্লাহর পুত্রের ও তাঁর খুবই মাহবুব"
একথার জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
তোমরা তো তাঁর পুত্রের মাহবুব হবার কথা দাবী করছো কিন্তু একথা কি বলতে পারো, তিনি কেন তোমাদেরকে আযাবের পর আযাব দিয়ে যাচ্ছেন? "পুত্র আর প্রিয় হবার" এটা কি আলামত? অতএব এ নফস হলো একটি বিপজ্জনক ধোঁকা। নতুবা প্রকৃত সত্য কথা হলো, যিনি আসলে আল্লাহর 'মাহবুব' হবেন তিনি তো তার নক্সকে শুধু এমন কাজে লাগাবেন যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি উৎপাদনের কারণ হবে। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হবে এমন কাজ তিনি কখনো করবেন না।
যে ব্যক্তি গুনাহ কবীরা করে, নাফরমানীর পর নাফরমানী করে, আল্লাহ তা'আলা তার খারাপ আমলগুলোকে এমনভাবে ঘৃণা ও রাগত দৃষ্টিতে দেখেন, যেভাবে তিনি তার ভালো আমলগুলোকেও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেন। আল্লাহ তাআলার এ প্রিয় বান্দা নবী-রাসূলগণকে নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী আত্মগঠনের জন্য বিভিন্ন বিপদাপদ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হয়েছে। তাহলেই তারা জানতে পারতো অনিষ্ট ও ক্ষতি করার ব্যাপারে গুনাহ হলো এমন ধারালো হাতিয়ার এবং নিজের লাভ আদায়ের ব্যাপারে এত নির্দয় নিষ্ঠুর প্রমাণিত যে আল্লাহর অনেক বড় বড় খাস বান্দাহকেও ছাড়েননি। আর এটা ঠিক প্রকৃতির দাবীও। স্বয়ং মানুষ মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ নীতিমালার কার্যকারিতা দেখতে পাওয়া যায়। এক ব্যক্তির আশেক যদি তার মাশুকের খেয়াল-খুশী রুচিমর্জি সম্পর্কে অবগত না হয় এবং সে অনুযায়ী কাজ না করে বরং নিজের প্রেমের আবেগের ইশারার উপর নাচতে থাকে তাহলে অবশ্যই তার এ আচরণ মাশুকের তথা প্রেমাস্পদের অসন্তুষ্টি ও অতৃপ্তিরই নয় বরং শত্রুতা ও মনোপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্ভাগ্যবশত বেশ কিছুসংখ্যক আহলে সুলুক আল্লাহর ভালবাসার ধারণা দিতে গিয়ে দ্বীনের ব্যাপারে কিছু ভুল কথাবার্তা বলেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুমের সীমারেখার পরওয়াও করেননি। আবার কখনো আল্লাহর হকসমূহকে এড়িয়ে চলেছেন। আবার কখনো তা নির্দ্বিধায় বাতিল দাবীও করেছেন। একজন আহলে সুলুক বলেছেন: "আমার যে কোনো মুরিদ একজন ব্যক্তিকেও জাহান্নামে দিয়েছে, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
কেউ কেউ বলেছেন: "যে কোনো মুরীদ একজন মু'মিনকেও জাহান্নামে থাকতে দিয়েছে আমি তার উপর অসন্তুষ্ট।”
তৃতীয় একজনকে শুনানো হয়েছে: "কিয়ামতের দিন আমার খিমা বা তাবু স্থাপিত হবে জাহান্নামের দরজায়। যাতে একজন লোককেও জাহান্নামে প্রবেশ করতে দেয়া না হয়।”
একথা ও এ ধরনের আরো অনেক কথা বিভিন্ন প্রখ্যাত প্রখ্যাত মাশায়েখরা বলেছেন বলে প্রচার আছে। এসব কথাবার্তা, এসব লোক সম্পর্কে হয় মিথ্যামিথ্যি প্রচার করা হচ্ছে, আর যদি সত্যি সত্যি এসব কথা তারা বলে থাকেন, তাহলে এসবই ভিত্তিহীন মিথ্যাকথা। এসব কথাবার্তা তারা সচেতন ভাবে বলেননি। বরং নেশাগ্রস্থ বেহুঁশ অবস্থার এসব কথাবার্তা। আর নেশাগ্রস্থ অবস্থায় মানুষের হুঁশ থাকে না। অথবা এ অবস্থায় মানুষের বিবেচনা শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। কি বলছে না বলছে সে তা বুঝতে পারে না। এ কারণেই নেশাগ্রস্থ অবস্থা কেটে যাবার পর এদের অনেকেই এসব কথাবার্তার জন্যও ইস্তেগফার করেছেন। ঠিক এ ব্যাপারটি ওইসব সুফীদের মধ্যে কাজ করেছে, যারা প্রেমাস্পদের গুণাগুণ শুনার অবকাশ রেখেছেন।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 মহব্বতের সঠিক মানদণ্ড

📄 মহব্বতের সঠিক মানদণ্ড


প্রেম ভালোবাসা পথের এ-ই হলো ওই বিপজ্জনক অবস্থা এসব অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা প্রেম-ভালোবাসার একটি কষ্টিপাথর ঠিক করে দিয়েছেন। যাতে প্রেমের প্রত্যেক দাবীদার ব্যক্তি এর উপর ভিত্তি করে তাদের ভালোবাসার দাবীকে যাচাই করতে পারে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ - ال عمران : ۳۱
"বলো হে নবী! যদি তোমরা সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালো-বাসবেন।"-সূরা আলে ইমরান: ৩১
আল্লাহকে ভালোবাসার সত্যিকার দাবীদার ওই ব্যক্তিকে বলা যায়, যে ব্যক্তি রাসূলে করীমের অনুসরণ করাকে নিজের চলার পথ বানাবে। এ সত্য বুঝাবার জন্য কোনো অধ্যায় সংযোজনের প্রয়োজন নেই যে, রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণই ইবাদাতের আসল কথা।
কুরআন আরো এক কদম আগে বেড়ে হুব্বে ইলাহী ও হুব্বে রাসূলের এক উজ্জ্বল মানদণ্ড কায়েম করেছে। সে মানদণ্ড হলো 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'। জিহাদের হাকীকত হলো, আল্লাহ তা'আলার হুকুম আহকাম পালনে পরম সন্তুষ্টি এবং নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে চরম ঘৃণার সাথে পরিহার করে চলা। আল্লাহ তা'আলা তাঁর খাস মাহবুব বান্দাদের এবং যাদের নিকট আল্লাহ মাহবুব, তাদের ব্যাপারে একটি পার্থক্য সূচক বর্ণনা দিয়েছেন:
اَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ : يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
"তারা মু'মিনদের জন্য খুবই সহৃদয় আর কাফেরদের উপর বজ্র কঠিন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে থাকে।" -সূরা আল মায়েদা : ৫৪
এ কারনেই উম্মতের ভালোবাসা ও ইবাদাত বিগত দিনের উম্মতদের তুলনায় বেশী পরিপূর্ণ। আর এ উম্মতের ভিতরে রাসূলে করীমের সাহাবা এবং মানুষের তুলনায় আল্লাহর মহব্বত ও ইবাদাতে বেশী কামেল। অথবা যারা রাসূলুল্লাহর এসব সাহাবাদের সঠিক নমুনা বনে যাবে, যারা এদের যত বেশী অনুসরণ করবে, ভালবাসা ও ইবাদাত ততোটাই পরিপূর্ণ হবে।
আল্লাহ তা'আলার মহব্বতের এ মানদণ্ড ও আমলী কাজ সামনে রেখে ওইসব লোকদের কথাবার্তা ও কাজকর্মের দিকে দৃষ্টিপাত করুন, যারা নিজেদেরকে আল্লাহর মহব্বত ও তাঁর প্রেমের ইজারাদার বলে মনে করে, অথচ দিনরাত রাসূলের সুন্নাত ও তাঁর হুকুম-আহকামের বিপরীত কাজ করে এবং এমন আকীদা ও ধ্যান-ধারণা পোষণ করে যা দীন ও শরীআতের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়।
শরীআতের অনুসরণ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-ই হলো খাঁটি আল্লাহর প্রেমিক ও মিথ্যা প্রেমিকদের মধ্যে পার্থক্যের মানদণ্ড। এ পার্থক্য দ্বারাই আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত প্রেমিক ও অলি এবং ভালোবাসার মৌখিক দাবীদারদের মধ্যে আসল পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। এ মৌখিক দাবীদারগণ মহব্বত করার দাবীর সাথে সাথে শরীআত বিরোধী কাজ ও কথা এবং নিজেদের মনগড়া বেদআতের তাবেদারী করতে থাকে। অথবা তারা মহব্বতের এমন মনগড়া ব্যাখ্যা করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিটা জিনিসকে মহব্বত করতে হবে। এমন কি কুফরী, ফাসেকী, নাফরমানীর মত জিনিসকেও ভালোবাসতে হবে।
আসলে এটাই হলো মহব্বতের ওই বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গি, যে মহব্বত ইহুদী নাসারা জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নাম সর্বস্ব ইসলামের সুফিদের মৌখিক এ মহব্বতের দাবীও ইহুদী নাসারাদের মহব্বতের দাবীর মতই। তারা বলতো, আমরা আল্লাহর ছেলে ও তার প্রিয়। যদিও এ হিসেবে যে, এদের কুফরী, এদের কুফরীর সীমা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে না। এদেরকে ইহুদী নাসারাদের সমান গুমরাh বলা যেতে পারে না। কিন্তু যদি আর একটি দিক দিয়ে চিন্তা করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, এদের এ দাবী ইহুদী নাসারাদের দাবী হতেও নিকৃষ্টতম ও ধ্বংসকারী। কারণ এদের মধ্যে শরীআতের বিরোধিতার সাথে সাথে মুনাফিকীর জীবানুও বিদ্যমান। আর একথা আমাদের সকলেরই জানা যে, মুনাফিকের ঠিকানা জাহান্নামের সবচেয়ে নিম্নস্তরে।
তাওরাত ও ইনজীল কিতাবে আল্লাহর মহব্বতের যে তালিম দেয়া হয়েছে ঠিক সেই তালিম কুরআন মাজীদেও দেয়া হয়েছে। যদিও এসব কিতাবের শব্দাবলী ও ভাষা এবং আসল তালিমের ব্যাপারে তাদের অনুসারীদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। কিন্তু এরপরও এটা একটা অতি সত্য কথা, আল্লাহর মহব্বতের তালিম প্রকৃত অর্থে হেদায়াতে রাব্বানী হবার ব্যাপারে কারো মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। বরং এ শিক্ষা তাদের কাছে ইনজীলের শরীআতের সবচেয়ে বড় ও বুনিয়াদী শিক্ষা হিসেবে পরিগণিত।
ইনজীল বলেঃ "হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, মন-দিল, আকল-বুদ্ধি ও অন্তর দিয়ে খোদাওয়ান্দকে মহব্বত করো।"
আজও নাসারা সম্প্রদায় দাবী করছে, তারা হুব্বে ইলাহীর উপর কায়েম আছেই। আর তাদের মধ্যে যে তাকওয়া ও পরহেযগারী পাওয়া যায় তা সে ওসিয়তেরই প্রভাব। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তা নয়। প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহ তা'আলার সত্যিকারের মহব্বত থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে নিয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা যা পসন্দ করেন তা তারা করে না। বরং যে জিনিস আল্লাহর অপসন্দ ও যাতে অনন্তুষ্ট হন, তারা তা-ই করে। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি তাদের মোটেই পরওয়া নেই। এর ফলেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সকল আমল নষ্ট করে দিয়েছেন। একদিকে তারা তথাকথিত আল্লাহ প্রেমের নেশায় বেহুঁশ হয়ে আছে। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিদ্রোহী ও অভিশপ্তদের তালিকায় শামিল করে নিয়েছেন। আল্লাহর সুন্নাত হলো, তিনি কেবল সেইসব লোকদেরই ভালোবাসেন এবং অনুগ্রহ করেন যারা তাঁকে সত্যিকার মহব্বত করে।
এটা কিভাবে হতে পারে যে, বান্দাহ যে আল্লাহকে ভালোবাসে আর আল্লাহ তাকে ভালোবাসে না? প্রকৃত ব্যাপার হলো বান্দাহ আল্লাহকে যতটুকু ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ততটুকুই ভালোবাসেন। আর এর ফল বান্দাহকে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশী দিয়ে থাকেন। হাদীসে কুদসীতে আছে:
مَنْ تَقَرَّبَ إِلَى شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَمَنْ نَقَرَبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ بَاعًا وَمَنْ أَتَانِي يَمْشِي أَنَبْتَهُ هَرُوَلَةً - رواه البخاري و مسلم
"যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক বাহু এগিয়ে আসি। আর যে আমার দিকে এক বাহু এগিয়ে আসে আমি তার দিকে একগজ এগিয়ে আসি। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।"
কুরআনে একথাগুলো বার বার উচ্চারিত হয়েছে : "আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।” "অনুগ্রহকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন।” "তাওবাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন।"
শুধু তাই নয়, বরং কুরআন সুন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী তো আল্লাহ তা'আলা সেসব লোকদেরকেই তাঁর প্রেমের সার্টিফিকেট দান করেন যারা ফরয, ওয়াযিব আদায় করে, নফল বন্দেগী বেশী বেশী পালন করে।
একটি বিখ্যাত হাদীসে কুদসীতে আছে :
لا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَى بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبُّهُ فَإِذَا أُحِبُّهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي いい يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يَبْصُرُ بِهِ - رواه البخاري
"নফল বন্দেগীর মাধ্যমে বান্দাহ আমার নিকটবর্তী হয়। এভাবে সে আমার প্রিয় হয়ে উঠে। এমনকি এক সময় আসে যখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00