📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 আল্লাহর দাসত্বের পূর্ণাংগ নমুনা ইবরাহীম (আ)

📄 আল্লাহর দাসত্বের পূর্ণাংগ নমুনা ইবরাহীম (আ)


قُلْ أَفَرَءَ يْتُمْ مَّا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِي اللَّهُ بِضُرٍ هَلْ هُنَّ كَشِفْتُ ضَرَه أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكْتُ رَحْمَتِهِ ، قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ ، عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ - زمر : ۳۸
“(হে নবী!) এদের বলো, এটাই যখন প্রকৃত কথা তখন তোমরা কি মনে করো আল্লাহ যদি আমার কোনো ক্ষতি করতে চান তাহলে তোমাদের দেব-দেবীরা যাদেরকে আল্লাহকে বাদ দিয়ে ডাকছো আমাকে রক্ষা করতে পারবে? কিংবা আল্লাহ যদি আমার প্রতি কোনো অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কি এরা সেই রহমতকে রুখে রাখতে পারবে? হে নবী! বলে দাও, আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। তাঁর উপর নির্ভরশীলগণ তাঁরই উপর নির্ভর করে থাকে।"-সূরা আয যুমার: ৩৮
এ ধরনের আরো অনেক আয়াত কুরআন মাজীদে বিদ্যমান আছে। এ সব আয়াত সাক্ষ্য দিচ্ছে, প্রত্যেক কাজের কার্যকারণের মূল চাবিকাঠি আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর জাতির বিতর্ক ও ধমকের জবাবে এ অকাট্য সত্যকেই পেশ করে বলেছেন:
وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا - - الانعام : ۸۱
"তোমরা যাকে (আল্লাহর) শরীক বানাচ্ছো তাকে আমি ভয় করি না। কিন্তু যদি আমার রব কিছু চান তবে তা অবশ্যই হতে পারে।"
আল্লাহর বান্দা হিসেবে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পূর্ণ মর্যাদা ও উসওয়ায়ে কামালের অধিকারী। আল্লাহর গোটা যমীন শিরকের অন্ধকারে যখন ডুবে যাচ্ছিলো তখনই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাওহীদ, ইবাদাত ও ইখলাসের নূর নিয়ে সত্যের অনুসারী ও নিবেদিতদের ইমাম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি আল্লাহর দাসত্বের পূর্ণাংগ নমুনা। সে ব্যাপারে আল্লাহ স্বয়ং কুরআনে এরশাদ করেছেন:
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَةٍ فَاتَمُهُنَّ ، قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا ، قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ، قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّلِمِينَ - البقرة : ١٢٤
“ইবরাহীমকে তাঁর রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে জাতির নেতা বানাবো। ইবরাহীম বললো—আর আমার বংশের মধ্যে? আল্লাহ বললেন, আমার ওয়াদা যালেমদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।” -সূরা আল বাকারা : ১২৪
লক্ষ্য করুন, এখানেও আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় এ ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নেতৃত্বের এ ওয়াদা শুধু মু'মিন ও গোলামীর সীমারেখা মেনে চলা লোকদের জন্য। যালিমদের জন্য নয়। আর এটা জানাকথা যে, শিরকই হলো বড় যুলুম।
إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ - لقمن : ١٣
“প্রকৃত কথা এই যে, শিরক অতি বড় যুলুমের কাজ।”
ইবাদাতের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় কামিয়াব হবার জন্যই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নেতৃত্বের পদমর্যাদা লাভ করতে পেরেছিলেন। তাই আল্লাহর বন্দেগীর দৃষ্টান্তমূলক মানদণ্ড হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিলো। আর আল্লাহ তাঁর বংশধরদেরকে নবুওয়াতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামাত দ্বারা গৌরবান্বিত করেছিলেন। তাঁর পরে যে নবীই প্রেরিত হয়েছিলেন তাঁর বংশেই প্রেরিত হয়েছিলেন। অতএব স্বয়ং শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হুকুম দেয়া হয়েছে।
أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا - النحل : ١٢٣
“চারদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এনে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করো।”-সূরা আন নাহল : ১২৩
আর এক জায়গায় ইহুদী ও খৃস্টানদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার নাযিল করা হেদায়াতে ইহুদী ও খৃস্টানদের সাম্প্রদায়িকতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
بَلْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا - البقرة : ١٣٥
“মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণের মাঝেই আল্লাহর হেদায়াত নিহিত।”-সূরা আল বাকারা : ১৩৫
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের শানে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যেঃ
إِنْ إِبْرَاهِيمَ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ - رواه مسلم
“ইবরাহীম জগতের সর্বোত্তম ব্যক্তি।”
এ কারনেই আল্লাহ তা'আলার দরবার হতে তাঁকে “খলিলুল্লাহ” আখ্যা দেয়া হয়েছে। এর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর কোনো খিতাব হতে পারে না।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 খুন্নাত শব্দের অর্থ

📄 খুন্নাত শব্দের অর্থ


খুল্লাত শব্দ হতে খলীল শব্দ গঠিত হয়েছে, খলীল শব্দের আখ্যা হতে আর বড় কোনো আখ্যা নেই। একথার দলিল স্বয়ং “খলীল” ও “খুল্লাত” শব্দের মধ্যেই নিহিত। ‘খুল্লাত' শব্দের অর্থই হলো আল্লাহর সাথে বান্দার সীমাহীন ভালোবাসা। আর এ ভালোবাসা, গোলামী ও বন্দেগী করার পরিপূর্ণতার উপর নির্ভরশীল। বান্দার সাথে আল্লাহ তা'আলার সীমাহীন ভালোবাসার উপরও তা নির্ভর করে। যে ভালোবাসা বান্দার জন্য আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে ‘রব’ মানা অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। আগেই বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইবাদাত ও বন্দেগী হলো চরম সীমার বিনয় ও ভালোবাসার সমষ্টির নাম। এজন্য ‘খুল্লাতের’ মর্যাদা মহব্বতের মানের চেয়ে অনেক উন্নত। আর এটাই সবচেয়ে উঁচু পদমর্যাদা যা আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহমত ও নেয়ামাত হিসেবে দান করেছেন। তাই তো এ দুনিয়ার কোনো মানুষ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ‘খলিল’ ছিলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذَا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ خَلِيْلًا لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا وَلَكِنْ صَاحِبُكُمْ خَلِيْلُ اللَّهِ - متفق عليه
"আমি যদি দুনিয়াবাসীদের কাউকে আমার খলিল বানাতাম, তাহলে আবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বানাতাম। কিন্তু আমি তো আল্লাহ তাআলার খলিল।"-বুখারী, মুসলিম
বুঝা গেলো মানুষ কোনো একজনেরই খালিল হতে পারে। খুল্লাত-এর মধ্যে কোনো অংশীদারীত্ব নেই। একজন কবি কতো সুন্দর বলেছেন:
قَدْ تَخَلَّلَتْ مَسْلَكَ الرُّوحِ مِنِّى وَبِذَا اسْمِي الْخَلِيلُ خَلِيلاً .
"মোর সাথে প্রিয়তমা মিশে গেছে মোর জীবনের মতো খলীলের নাম খলীল হলো মিশে যাবার কারণেই তো"

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 মহব্বত আর খুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য

📄 মহব্বত আর খুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য


'মহব্বত' ও 'খুল্লাতের' মধ্যে পার্থক্য হলো 'খুল্লাত' হয়ে যাবে একান্ত এবং নির্ভেজাল আর মহব্বতের মধ্যে তা পাওয়া যায়। 'খুল্লাত' শুধু একজনের সাথেই হওয়া সম্ভব। কিন্তু মহব্বত একের অধিক লোকের সাথে হতে পারে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে খুল্লাতের সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে আর অন্য কাউকে খলীল বানাতে অস্বীকার করে দিয়েছেন। আবার আল্লাহ তা'আলার সাথে মহব্বত রাখা সত্ত্বেও অনেক মানুষের নিজের হাবীব (বন্ধু) বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত উসামা সম্পর্কে বলেছেন: হে আমার আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি। অতএব তুমিও তাদের ভালোবাস। এভাবে নারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আর পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি সবচেয়ে বড় মাহবুব হিসেবে গণ্য করেছেন। আল্লাহর রাসূলের কাلامের পর আল্লাহর কালামের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। স্থানে স্থানে দেখতে পাবেন যে, “আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন।” “আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ এমন লোকদের আনবেন যাদেরকে তিনি মাহবুব হিসেবে গণ্য করবেন এবং তারাও তাঁকে মাহবুব মনে করবে।" এসব কথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা একথা বুঝাতে চান যে, সত্যিকারের মু'মিন ব্যক্তি তিনি হবেন, যাকে আল্লাহ মহব্বত করেন আর তিনি আল্লাহকে মহব্বত করেন। অন্য এক জায়গায় বলেছেন, ঈমানদার ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে মহব্বত করে। একথা দ্বারা প্রমাণিত হলো, মু'মিন যদিও সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ভালোবাসে কিন্তু অন্যদেরকেও মহব্বত করতে পারে। একথার অবশ্যম্ভাবী ফল এ দাঁড়ায় যে, মহব্বতে এককত্ব প্রয়োজন নেই কিন্তু 'খুল্লাত' এর বিপরীত। এতে একমুখীনতা অপরিহার্য।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন

📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন


সাধারণভাবে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব ছিলেন। আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর খলীল। মনে করা হয়, মহব্বতের দরজা 'খুল্লাতে'র চেয়ে উঁচু। কিন্তু এ ধারণার পেছনে কোনো প্রমাণ নেই। সহীহ হাদীস দ্বারা একথা ভালোভাবে প্রমাণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তা'আলার খলীল ছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম উভয় কিতাবেই এ রেওয়ায়াত বিদ্যমান আছে। বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيْلاً كَمَا اتَّخَذَا إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً -
"নিসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর খলীল বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাঁর খলীল বানিয়েছিলেন।"
এভাবে আর একটি হাদীসও আগে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আমি আল্লাহ তা'আলার খলীল। তাই এখন আমার আর কাউকে খলীল বানাবার অবকাশ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00