📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 অহংকার ও আনুগত্যের বৈপরীত্য

📄 অহংকার ও আনুগত্যের বৈপরীত্য


এ দীনের তালীম ও তাবলীগের জন্য আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। নাযিল করেছেন তাঁর অসংখ্য আসমানী কিতাব। অর্থাৎ বান্দাহ সবসময় সবদিক থেকেই নিজকে আল্লাহর হুকুমের অনুগত বানিয়ে রাখবে। কণা পরিমাণও গায়রুল্লাহর হুকুম মেনে চলবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহকেও মানবে সাথে সাথে অন্য কাউকেও মান্য করার মতো অধিকার প্রদান করবে সে মুশরিক। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর হুকুম মেনে চলাকে আদপেই সমর্থন করে না সে ব্যক্তি চরম হঠকারিতায় নিমজ্জিত।
হঠকারিতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ
إِنَّ الْجَنَّةَ لَايَدْخُلُهَا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَةِ مِنْ كِبْرٍ كَمَا أَنَّ النَّارَ لَا يَدْخُلُهَا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ مِنَ الْإِيْمَانِ -
"মনে রেখো, ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার মনে বিন্দু পরিমাণ অহংকার ও হঠকারিতা আছে। যেমন ওই ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে না, যার মনে এক কণা পরিমাণ ঈমান আছে।"
ঈমানের প্রশিক্ষক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অহংকার ও ঈমান একটি অপরটির বিপরীত জিনিস।
কারণ অহংকার-হঠকারিতা ইবাদাতের সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস। নীচের হাদীসে কুদসী থেকে একথা স্পষ্ট বুঝা যায়:
يَقُولُ اللهُ الْعَظْمَةُ إِزَارِى وَالْكِبْرِيَاء رِدَائِ فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا عَذِّبْتَهُ - مسلم
"আল্লাহ রাব্বুল ইয্যাত বলেছেন, শ্রেষ্ঠত্ব আমার 'ইজার' আর অহংকার আমার 'চাদর'। যে ব্যক্তি এ দুটো জিনিস আমার থেকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করবে তাকে আমি কঠিন সাজা দেবো।"
বুঝা গেলো শেষ্ঠত্ব ও অহংকার আল্লাহ তা'আলার খাস বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর সৃষ্টির কেউ এসব বৈশিষ্ট্যের অংশ পেতে পারে না। এ দুটো জিনিসের মধ্যে অহংকারের স্থান শ্রেষ্ঠত্বের উর্ধে। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা অহংকারকে 'চাদরের' স্থানে গণ্য করেছেন। শ্রেষ্ঠত্বকে গণ্য করেছেন 'ইজার' হিসেবে। 'চাদর' ইজারের (লুঙ্গি) চেয়ে উঁচু মানের। এ কারণেই আযান, নামায ও দুই ঈদের নিদর্শন 'আল্লাহু আকবর'কে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ জন্য যখন একজন মুসলমান 'সাফা' 'মারওয়া' অথবা কোনো উঁচু জায়গায় চড়ে থাকে অথবা কোনো আরোহীর উপর আরোহণ করে তখন 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনী দেবে। এ ধ্বনী দেয়া মুস্তাহাব। এ তাকবীর ধ্বনীতে দুর্দমনীয় শক্তি নিহিত আছে, যে শক্তিতে দাউ দাউ করে জুলা লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যে নিভে যায়। এ ধ্বনীর শব্দ শুনে শয়তান তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ বলেছেন:
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ، إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ المؤمن : ٦٠
"আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের কাকুতি শুনবো। যে ব্যক্তি নিজকে বড় মনে করে ও আমার ইবাদাত থেকে ফিরে থাকে, সে খুব তাড়াতাড়ি অপমান ও লাঞ্ছনার জগত জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" -সূরা আল মু'মিন: ৬০

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 অহংকারের মধ্যে শিরকের অস্তিত্ব বিদ্যমান

📄 অহংকারের মধ্যে শিরকের অস্তিত্ব বিদ্যমান


যে ব্যক্তি আল্লাহর বন্দেগী হতে মুখ ফিরিয়ে রাখে সে যেনো একথা না মনে করে, সে আনুগত্য বা 'বন্দেগী' হতে একেবারেই মুক্ত হয়ে গেছে। বরং সে অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া অপর কারো না কারো 'বন্দেগীর' জোয়াল নিজের কাঁধে জুড়ে নিয়েছে। কারণ মানুষ অনুভূতিহীন কোনো অচেতন জিনিস নয়। বরং প্রকৃতিগতভাবেই সে একটি অনুভূতি সম্পন্ন সত্তা। সহীহ হাদীসে আছে: "হারিছ" ও "হাম্মাম" শব্দ দুটি সবচেয়ে বেশী সত্য, অস্তিত্ব সম্পন্ন নাম। অর্থাৎ মানুষের বিশেষণ।
"হারিছ অর্থ হলো অর্জনকারী, ক্রিয়া ও কর্ম সম্পাদনকারী। আর হাম্মام অর্থ হলো ইচ্ছা পোষণকারী। অতএব 'ইচ্ছা' মানুষের একটি চিরন্তন বিশেষণ। এ বিশেষণ থেকে সে খালি হতে পারে না। প্রত্যেক ইচ্ছারই একটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অবশ্যই থাকে। এ দুটো কথা মেনে নেবার পর এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রত্যেক মানুষেরই একটি আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য থাকে। এ আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরেই তা রচিত হয়।
এখন যদি কোনো লোকের মা'বুদ ও মাহবুব আল্লাহ না হয় এবং সে আল্লাহর ভালোবাসা ও তার কাছে কিছু চাওয়া পাওয়া থেকে নিজেকে মুক্ত ও মুখাপেক্ষীহীন মনে করে, তাহলে কোনো না কোনো গায়রুল্লাহ তার মা'বুদ ও মাহবুব অবশ্যই হবে। সে নিজেকে ওই গায়রুল্লাহর গোলাম বানিয়ে রাখবে। যেমন ধন-সম্পদ অথবা শান-শওকাত অথবা রূপ-লাবন্য অথবা আল্লাহ ছাড়া তার নিজের মনগড়া কোনো মা'বুদ যেমন চাঁদ সুরুজ, গ্রহ-তারা মূর্তি-প্রতিমা, নবী-রাসূল ও অলি-কুতুবদের কবরসমূহ ইত্যাদি। অথবা কোনো নবী, কোনো ফেরেশতা অথবা অন্য কোনো জিনিস আল্লাহ ছাড়া যার সে পূজারী। সে যখন কোনো না কোনো গায়রুল্লাহকে পূজা করে তখন তার মুশরিক হবার আর কি বাকী থাকে? সুতরাং যে ব্যক্তি অহংকারী হবে সে মুশরিক হবে। ফিরআউন এ সত্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। সে ছিলো পৃথিবীর এক সেরা অহংকারী। সাথে সাথে সে ছিলো একজন মুশরিকও। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ফিরআউন একজন অহংকারী হবার প্রমাণ পাওয়া যায়।
وَقَالَ فِرْعَوْنُ نَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّ ...... وَقَالَ مُوسَى إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ مِنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ ..... كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ - المؤمن : ٢٦-٢٧، ٣٥
"এবং ফিরআউন বললো: আমাকে ছেড়ে দাও আমি মূসাকে হত্যা করে দিই। সে তার রবকে ডেকে দেখুক। ...... মূসা বললো, যে হিসেবের দিনের উপর বিশ্বাসস্থাপন করে না, সে অহংকারী থেকে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই.........। এভাবে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক অহংকারী ও যালিমের মনে মোহর মেরে দিয়ে থাকেন।” -সূরা আল মু'মিন: ২৬-২৭, ৩৫
وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَنَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوْسَى بِالْبَيِّنَتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ - العنكبوت : ٣٩
“এবং কারূন, ফিরআউন ও হামানকেও আমরা ধ্বংস করেছি; মূসা এদের কাছে স্পষ্ট দলীল নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু তারা পৃথিবীতে অহমিকা ও অহংকারের আচরণ অবলম্বন করলো। অথচ তারা আমাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম ছিলো না।” - সূরা আল আনকাবূত: ৩৯
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ أَيْتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِيْنٌ وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ
“কিন্তু আমাদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ যখন সেই লোকদের নিকট উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো তখন তারা বলে উঠলো, এটাতো সুস্পষ্ট যাদু। তারা সরাসরি যুলুম ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে এ নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করলো। অথচ তাদের মন এগুলোকে মেনে নিয়েছিলো। এখন লক্ষ্য করো এ বিপর্যয়কারীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে।” -সূরা আন নামল : ১৩-১৪
আর ফিরআউনের দ্বিতীয় দিক অর্থাৎ মুশরিক হবার সাক্ষ্য কুরআনের এসব আয়াত থেকে পাওয়া যায়:
وَقَالَ الْمَلَاءُ مِنْ قَوْمٍ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَالِهَتَكَ - - الاعراف : ১২৭
“এবং ফিরআউনকে তার জাতির সরদাররা বললো: আপনি কি মুসা ও তার সঙ্গী সাথীদেরকে এভাবে দেশে অশান্তি বিস্তার করার জন্য মুক্ত ছেড়ে দেবেন? আর তারা আপনার ও আপনার মা'বুদদের বন্দেগী ছেড়ে দিয়ে রেহাই পেয়ে যাবে? -সূরা আল আ'রাফ : ১২৭
প্রত্যেক অহংকারী ব্যক্তি শুধু মুশরিকই হয় না বরং অভিজ্ঞতায় বলে দেয়, যে ব্যক্তি আল্লাহর বন্দেগী ও অনুগত্যের সাথে যতোবেশী বিদ্রোহ করে, ততোবেশী সে পাক্কা মুশরিক হয়ে যায়। কেননা আল্লাহর হুকুমের সাথে সে যত বেশী বিদ্রোহ করতে থাকে ততবেশী সে কোনো না কোনো মনোবাঞ্ছা পূরণকারীর মুখাপেক্ষী ও পূজারী হয়ে যায়। সে তখন এদের আসল উদ্দেশ্য ও আশা ভরসার স্থল হয়ে যায়। মানুষ যখন তার মূল লক্ষ্য আল্লাহ তা'আলাকে তাদের মন থেকে বের করে দেবে, তখন অন্য কোনো না কোনো জিনিস সে স্থান এসে দখল করে নেবে। যে কোনো সৃষ্টি বা গায়রুল্লাহ থেকে মানুষের মন মুক্ত ও মুখাপেক্ষীহীন হওয়া ততোক্ষণ পর্যন্ত অসম্ভব যতক্ষণ না সে আল্লাহকে তার আসল কাঙ্ক্ষিত মনিব ও মাওলা হিসেবে গ্রহণ করবে। এমন 'মনিব' ও 'মাওলা' যাকে ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবে না, কারো কাছে কিছু চাইবে না। কারো উপর ভরসা করবে না। শুধু এমন জিনিসকে পসন্দ করবে যা আল্লাহর পসন্দ। ওই জিনিসকে অপসন্দ করবে যা আল্লাহর নিকটও অপসন্দনীয়। আল্লাহর বন্ধুকে নিজের বন্ধু, তাঁর শত্রুকে নিজের দুশমন বলে মনে করবে। আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে এবং আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করবে। এ অদৃশ্য বিশেষণের নামই হলো "ইখলাসে দীন।” এ ইখলাস যতবেশী গভীর ও মযবুত হবে আল্লাহর বন্দেগীও তত বেশী মযবুত ও পরিপূর্ণতা লাভ করবে। বন্দেগীর পরিপূর্ণতায় পৌছাই অহংকার ও শিরক হতে বাঁচার একমাত্র উপায়। এ দুটি রোগই আহলে কিতাবদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিলো। নাসারাদের উপর শিরকের প্রভাব ছিলো। আর ইহুদীদের উপর প্রভাব ছিলো অহংকারের। কুরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ ، وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا ، لا إِلهَ إِلَّا هُوَ سُبْحْنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
"এসব লোকেরা আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের ওলামা মাশায়েখদের 'রব' বানিয়ে নিয়েছে। এবং মারইয়ামের পুত্র ঈসাকেও। অথচ তাদেরকে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করার হুকুম দেয়া হয়নি। তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া আর কেউই বন্দেগী পাবার হকদার নয়। তিনি তাদের বলা এসব মুশরিকী কথাবার্তা হতে পাক ও পবিত্র।"-সূরা আত তাওবা : ৩১
ইহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
أَفَكُلَّمَا جَاءَ كُمْ رَسُولٌ بِمَا لَاتَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ : وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ - البقرة : ۸۷
"যখনই এমন কোনো নবী তোমাদের ইচ্ছার বিপরীত কোনো জিনিস নিয়ে তোমাদের নিকট এসেছে তখনই তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে তাঁর চেয়ে বড় মনে করে তাঁর বিরোধিতা করেছো। কাউকে মিথ্যাবাদী বলেছো আর কাউকে হত্যা করেছো।"-সূরা আল বাকারা : ৮৭
سَأَصْرِفُ عَنْ أَيْتِي الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ ، وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لا يُؤْمِنُوا بِهَا ، وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلاً ، وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلِ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلاً - - الاعراف : ١٤٦
"কোনো অধিকার ছাড়াই যারা পৃথিবীতে অহংকার করে বেড়ায়, আমি তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শনসমূহ হতে সরিয়ে রাখবো। তারা যে নিদর্শনই দেখুক না কেন, তার প্রতি কখনো ঈমান আনবে না। সঠিক সহজ ও সরল পথ তাদের সামনে এলেও তারা তা গ্রহণ করবে না। বাঁকা পথ দেখতে পেলে তাকেই পথরূপে গ্রহণ করে চলবে।" -সূরা আল আরাফ : ১৪৬

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 প্রত্যেক নবীর দীনই ছিলো ইসলাম

📄 প্রত্যেক নবীর দীনই ছিলো ইসলাম


যেহেতু অহংকার ও শিরক একই অর্থ বহনকারী এবং শিরক ইসলামের বিপরীত ও বড় গুনাহের কাজ এবং এ গুনাহ আল্লাহর কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর দরবারে ক্ষমার অযোগ্য, তাই সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত নবী দুনিয়ায় এসেছেন প্রত্যেকেই এ দীন 'ইসলাম' নিয়েই এসেছেন। তাই একমাত্র এ দীনই আল্লাহর নিকট গ্রহণীয়।
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম নিজের জাতিকে উদ্দেশ করে বলেছেন:
فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرٍ ، إِنْ أَجْرِي إِلَّا عَلَى اللَّهِ ، وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يونس : ۷۲
"তোমরা যদি আমার কথা না শোনো (তো আমার কি ক্ষতি করলে?) আমি তোমাদের নিকট হতে কোনোই প্রতিদান চাইনি। আমার প্রতিদান তো আল্লাহর নিকট রয়েছে। আর আমাকে আদেশ করা হয়েছে (কেউ মেনে নিক আর না নিক) আমি নিজে যেনো মুসলিম হয়ে থাকি।"-সূরা ইউনুস: ৭২
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দাওয়াত ও এরশাদ এবং তাঁর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ ، قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ ، وَوَصَّى بِهَا إِبْرَهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ ، يُبَنِيَّ إِنَّ اللهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ﴿ البقرة : ۱۳۱-۱۳۳
"তাঁর অবস্থা এই ছিলো যে, তাঁর রব যখন তাকে বললেন, 'মুসলিম' (অনুগত) হও। তখনি সে বললো, আমি বিশ্বপ্রতিপালকের অনুগত হলাম। এ পন্থায় চলার জন্য সে তার সন্তানদেরও হুকুম দিয়েছিলো। ইয়াকুবও তাঁর সন্তানদের এই উপদেশই দিয়েছিলো। সে বলেছিলোঃ হে আমার সন্তানরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দীন-ই মনোনীত করেছেন। কাজেই মৃত্যু পর্যন্ত তোমরা 'মুসলিম' হয়েই থাকবে।" -সূরা আল বাকারা: ১৩১-১৩২
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছেন:
تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ - يوسف : ١٠١
“(হে আমার রব!) ইসলামের আদর্শের উপরই তুমি আমাকে মৃত্যু দিও। আর সালেহীন ও সৎকর্মশীলদের সাথে তুমি আমার মিলন ঘটাও।"-সূরা ইউসুফ: ১০১
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে বললেন:
يقَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ - يونس : ٨٤
"হে আমার জাতি! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো, তাহলে তাঁর উপরেই ভরসা করো। যদি তোমরা প্রকৃতই মুসলিম হও।"-সূরা ইউনুস: ৮৪
তাওরাত প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলছেন- বনী ইসরাঈলের সকল নবী যারা তাওরাতের শরীআতের প্রচারক ও অনুশীলনকারী ছিলেন, তাদের দীন এ ইসলামই ছিলো।
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ ، يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا - المائدة : ٤٤
"আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। তাতে হিদায়াত ও নূর ছিলো। সকল নবী যারা ছিলো মুসলিম, এরি ভিত্তিতে ইহুদীদের ব্যাপারে বিচার ফায়সালা করতো।"-সূরা আল মায়েদা : ৪৪
সাবার রাণীর সামনে যখন সত্যের আলো জ্বলে উঠলো সাথে সাথেই তিনি বলে উঠলেন:
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَنَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ النمل : ٤٤
“হে আমার মালিক! এতদিন পর্যন্ত আমি আমার নিজের উপর যুলুম করেছি। এখন আমি সুলাইমানের সাথে সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে (মুসলিম হলাম) আত্মসমর্পণ করলাম।" -সূরা আন নামল: ৪৪
ঈসা আলাইহিস সালামের সাথীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলছেন:
وَإِذَا أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِينَ أَنْ آمِنُوا بِي وَبِرَسُولِي ، قَالُوا آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ - المائدة : ١١١
"এবং স্মরণ করো আমি যখন হাওয়ারীদের ইশারা করে বললাম, আমার ও আমার রাসূলের প্রতি ঈমান আনো। তখন তারা বললো, আমরা ঈমান আনলাম আর সাক্ষী থেকো আমরা মুসলিম।" -সূরা আল মায়েদা : ১১১
কুরআনে হাকীমের এসব ব্যাখ্যা হতে এ সত্য একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রত্যেক নবী-রাসূলের দীন ছিলো ইসলাম। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা এ ঘোষণা দিয়েছেন, ইসলামের রাজপথই একমাত্র রাজপথ যা আমার দরবারে গ্রহণীয়।'
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ - ال عمران : ۱۹
"নিশ্চয়ই ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণীয় দীন।" -সূরা আলে ইমরান: ১৯
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ : - ال عمران : ٨٥
"যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন অবলম্বন করে তার সে দীন কিছুতেই গ্রহণ করা হবে না।"-সূরা আলে ইমরান : ৮৫

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম

📄 ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম


প্রত্যেক নবীই যে, ইসলাম নিয়ে এসেছেন শুধু তা-ই নয়, বরং ইসলামই আদম সন্তানের একমাত্র দীন। ইসলাম গোটা পৃথিবীর দীন। কুরআন বলছেঃ
أَفَغَيْرَ دِيْنِ اللهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا
"এসব লোকেরা কি আল্লাহর দীন ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চায়? অথচ আসমান যমীনের সবকিছুই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছে।"-সূরা আলে ইমরান: ৮৩
كَرْهًا و طَوْعًا শব্দ দুটি সবকিছুকেই 'ইসলাম' এর সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে। কারণ আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর অনুগত্য করছে এবং তাঁর ফরমান মেনে চলছে। সকল সৃষ্টি আল্লাহর নিকট বড় অসহায়। তাঁরই মুষ্টিবদ্ধ সমগ্র বিশ্ব। তাঁর ইচ্ছা ও হুকুমের বাইরে চলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য ইচ্ছায় হোক কি অনিচ্ছায় সকলেই তাঁর প্রতি অনুগত হয়ে চলছে। তিনিই সকল শক্তির উৎস। চাঁদ-সুরুজ থেকে শুরু করে ছোট বড় সকল জিনিসের তিনিই প্রভূ-প্রতিপালক। কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই তিনি যেভাবে চান সবকিছু পরিচালনা করেন। সকলের সৃষ্টিকর্তা তিনি। সকলকে তিনি অস্তিত্ব দান করেছেন। সকলকে দিয়েছেন আকার আকৃতি। এ জগতে তিনি ছাড়া আর যা আছে সবই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দাস, তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তাঁর নিকট সহায় সম্বলহীন। সকল ক্ষেত্রেই তারা তাঁর অধীন। তিনি এককভাবে প্রত্যেকটি জিনিসের সৃষ্টিকর্তা ও রূপকার। যদিও তিনি যা সৃষ্টি করেছেন উপায় উপকরণের মাধ্যমেই করেছেন। এসব উপায় উপকরণও কিন্তু তাঁরই সৃষ্টি এবং তাঁর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।
এ কারণে এসব উপায়-উপকরণও কাজ করার ব্যাপারে একেবারেই স্বাধীন নয়। বরং এরা সর্বক্ষণ আল্লাহর হুকুমের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো উপকরণ উপাদানই তার ক্রিয়াকর্মে স্বনির্ভর নয়। বরং প্রতিটি উপকরণই আর একটি উপকরণের মুখাপেক্ষী। যার সাহায্য ছাড়া সে নিজের কাজ ও কাজের ফল প্রকাশ করতে পারে না। এ সহযোগিতা এবং উপায় অর্থাৎ কারণসমূহের কারণই হলো আল্লাহ তা'আলা। যিনি সকল উপায় উপকরণ ও কার্যকারণের স্রষ্টা, মুখাপেক্ষীহীন। সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরীক নেই। আর তাঁর সামনে দাঁড়াবার মতো তাঁর কোনো প্রতিপক্ষও নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00