📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ইবাদাতের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদার তারতম্য

📄 ইবাদাতের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদার তারতম্য


ইবাদাতের এ নিগূঢ় তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবার পর একথাটিও স্পষ্টভাবে বুঝে নেয়া দরকার যে, এ আকাঙ্ক্ষিত গুণটি লাভ করার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য সূচিত হয়। আর এ পার্থক্য প্রকৃতপক্ষে ঈমানের পার্থক্যকে প্রকাশ করে। ইবাদাতের স্তর এবং সিফাতে কামালের দিক থেকে মানুষ দুটি বড় শ্রেণীতে বিভক্ত।
একটি হলো বিশেষ শ্রেণী।
আর অপরটি হলো সাধারণ শ্রেণী।
এরই ভিত্তিতে বিশ্বপ্রতিপালকের সাথেও সকল মানুষের সম্পর্ক এক রকম নয়। বরং এক্ষেত্রেও স্তরগত পার্থক্য হওয়াই জরুরী। কোথাও এ হবে মামুলী ধরনের। আবার কোথাও হবে বিশেষ ধরনের। দুঃখের বিষয় নিরেট তাওহীদ ও সত্যিকারের ইবাদাতের পতাকাবাহী লোকেরাও সূক্ষ্ম শিরক থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
تَعْسَ عَبْدَ الدِّرْهَم تَعْسَ عَبْدَ الدِّينَارِ ، تَعْسَ عَبْدَ الْقَطِيفَةِ تَعْسَ عَبْدَ الْخَمِيصَةِ، تَعْسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيْكَ فَلَا انْتَقَشَ، إِذَا أَعْطَى رَضِيَ وَإِذَا مَنَعَ سخط - صحيح البخاري
“ধ্বংস হয়েছে দেরহামের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে দীনারের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে মখমলের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে কালো চতুর্ভূজ কাপড়ের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে সে এবং উপুড় হয়ে পড়েছে। ওদের অবস্থা এই যে, তাদের পায়ে কাঁটা বিঁধলে তারা তা বের করে না অর্থাৎ বিপদে পড়ে বিড়বিড় করতে থাকে, আর যখন কিছু পায় তখন তাতে মগ্ন ও তৃপ্ত হয়ে যায়। যদি কিছু না পায় তাহলে নারাজ হয়ে বসে থাকে।”-বুখারী,
সত্য উদ্‌ঘাটনকারী আল্লাহর রাসূলের উচ্চারিত এসব শব্দের প্রতি লক্ষ্য করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে দুনিয়ার উপায় উপকরণের পেছনে পড়ে থাকা মানুষকে দেরহামের দাস, দীনারের দাস বলে সম্বোধন করেছেন। তাদের জন্যে বদদোয়ার মতো বাক্য উচ্চারণ করেছেন। সাথে সাথে দৃষ্টান্তমূলক ভঙ্গিতে অর্থের পূজারী লোকদের নমুনা এঁকে এরশাদ করেছেন যে, তাদের খুশি ও না খুশীর মানদণ্ড হলো ধন- দৌলত। কুরআন মাজীদেও মানব প্রকৃতির এ দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
وَمِنْهُمْ مَّنْ يُلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَتِ ، فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ ٥ - التوبة : ٥٨
"এসব মুনাফিকদের কেউ কেউ সদকা বন্টনের ব্যাপারে তোমার উপর অভিযোগাত্মক কটাক্ষ করে। যদি ওদেরকে সদকা থেকে কিছু দিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা খুশী থাকে। আর যদি কিছু দেয়া না হয় তাহলে সাথে সাথেই অসন্তুষ্ট হয়ে যায়।"-সূরা আত তাওবা : ৫৮
মোটকথা তাদের খুশী অখুশী আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হয় না। বরং তা হয় স্বার্থের ভিত্তিতে। আর তা মূলত তাদের প্রবৃত্তির লালসা পূরণ এবং দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদন করা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ বান্দার বন্দেগীর দাবী হলো, সে নিজের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ভিত্তিস্থাপন করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর। নতুবা সে আল্লাহর বান্দাহ হবার দাবী করা সত্ত্বেও তাঁর হক আদায় করতে পারবে না। তখন সে মুখে মুখে আল্লাহর বান্দাহ দাবী করবে বটে, কিন্তু কার্যত সে হবে প্রবৃত্তি, ধন-সম্পদ ও টাকা পয়সার দাস।
একইভাবে যে ব্যক্তি ক্ষমতার রূপের কিংবা অনুরূপ অন্য কোনো জিনিসের প্রতি বিমোহিত ও প্রলোভিত হবে সেও ধন-সম্পদ পূজারীর মতই নিজের কাঙ্ক্ষিত জিনিসের পূজারী বলে গণ্য হবে। কারণ, যদি তার মনষ্কামনা পূর্ণ না হয় তাহলে সে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এভাবে উপরোল্লিখিত এ ব্যক্তি যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ অনুযায়ী ধন-দৌলতের গোলাম হয় তাহলে এ ব্যক্তিকেও তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসের গোলাম ও দাস বলে আখ্যা দেয়া হবে। কারণ বন্দেগী ও গোলামীর প্রকৃত অর্থই হচ্ছে হৃদয় মনের বন্দেগী ও গোলামী। যে জিনিসই মনকে নিজের গোলাম বানিয়ে নেয় মানুষ প্রকৃতপক্ষে তারই বান্দা ও গোলাম হয়ে যায়। এক কবি কতইনা উত্তম কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন:
الْعَبْدُ حُرَّمَا قَنَعَ وَالْحُرُّ عَبْدُ مَا طَمَعَ
‘অল্পের তুষ্ট গোলাম যে, স্বাধীন সেই হয় গোলাম হয় স্বাধীন লোক লোভী যদি হয়।’
একথাটিই আর একজন কবি এভাবে বলেছেন:
أَطْعَتْ مَطَامِعِي فَتَعَبُدَ تْنِي وَلَوْا لِنِي قَنَعْتُ لَكُنْتُ حُرّاً
‘অনুগত পেয়ে কামনা মোরে বানিয়েছে গোলাম, সংগী হলে তুষ্টি আমার নির্ঘাত স্বাধীন হতাম।’
"বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, “লোভ-লালসা গলার শৃংখল আর পায়ের বেড়ী। গলাকে শৃংখল মুক্ত করার সাথে সাথে পায়ের বেড়ীও দূর হয়ে যায়।"
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
الطَّمَعُ فَقْرُ وَالْيَائِسُ غَنِيٌّ وَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا يَئِسَ فِي شَيْءٍ اسْتَغْنَى عَنْهُ - - مشكوت
"হে মানুষেরা শুনে রাখো। লোভ হলো দারিদ্র আর বিমুখীনতা হলো প্রাচুর্য। তোমাদের কেউ যখন কোনো জিনিস হতে বিমুখ হয় তখন সে এ জিনিসের মুখাপেক্ষীহীন হয়ে যায়।"-মেশকাত
এটা একটা বাস্তব ব্যাপার। মানুষের স্বভাব হলো সে যে জিনিস থেকে নিরাশ হয়ে যায়, সে জিনিস প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা তার মন থেকে মুছে যায়। এরপর সে আর তার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেয় না। আর এ ব্যাপারে সে কাউকে সাহায্যকারী হিসেবেও পেতে চায় না। এর বিপরীত সে যদি কোনো ব্যাপারে আশাবাদী হয় আর তার মন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তখন সে তার জন্য পাগল পারা হয়ে যায় এবং সেটার মুখাপেক্ষী হয়ে যায়। মোটকথা মানবীয় স্বভাবের এটা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ধন-সম্পদ, শান-শওকত, রূপ-সৌন্দর্যসহ যে ব্যাপারেই কথা বলো সবকিছুর কামনার মধ্যেই এ নীতিমালা কার্যকর আছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের অসীয়ত করেছেন:
فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ - - العنكبوت : ١٧
"আল্লাহর নিকট রিস্ক তালাশ করো। তারই ইবাদাত করো এবং তারই শোকর আদায় করতে থাকো।"-সূরা আল আনকাবুত: ১৭
রিষ্ক ছাড়া তো কোনো উপায় নেই। প্রত্যেকেরই তা নিত্য প্রয়োজন। কোথাও না কোথাও তা অর্জন করতেই হয়। কোনো লোক যদি এ রিষ্ক আল্লাহর নিকট তালাশ করে তাহলে সে আল্লাহর বান্দা হবে এবং তাঁরই মুখাপেক্ষী হবে। আর যদি আল্লাহকে ছেড়ে কোনো সৃষ্টির কাছে রিস্ক তালাশ করে, তাহলে কার্যত সে তারই বান্দাহ হবে। তারই মুখাপেক্ষী হিসেবে সে চিহ্নিত হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00