📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 একটি অভিযোগ ও তার জবাব

📄 একটি অভিযোগ ও তার জবাব


এখানে অভিযোগ করা যেতে পারে, যদি আল্লাহর পসন্দনীয় আমল ও গুণাবলী ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হয়, তবে কেনো কুরআন মাজীদে 'ইবাদাত' শব্দটির প্রতি অন্যান্য নেক আমল অথবা ভালো গুণাবলীকে আল্ফ করা হয়েছে? আল্ফ তো হলো একথার দলিল যে, মাতুফ ও মাতুফে আলাইহে দুটি পৃথক জিনিস। এক জিনিস নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলো-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ - الفاتحة : ٤
"হে প্রভু! আমরা তোমারই ইবাদাত করছি। আর তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি।"-সূরা আল ফাতিহা: ৪
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ - هود : ۱۲۳
"অতএব তাঁরই ইবাদাত করো এবং তাঁর উপরে ভরসা করো।" -সূরা হুদ: ১২৩
أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ - نوح : ٣
"আল্লাহর বন্দেগী করো এবং ভয় তাঁকেই করো। আর আমার কথা মেনে চলো।"-সূরা নূহঃ ৩
প্রথম আয়াতে 'ইবাদাত' শব্দটির প্রতি "ইস্তেয়ানাত” (সাহায্য কামনা করা) শব্দটিকে, দ্বিতীয় আয়াতে "তাওয়াক্কুল” ও তৃতীয় আয়াতে "তাকওয়া” ও “এতায়াতে রাসূলকে” আল্ফ করা হয়েছে। এটা একথারই প্রমাণ যে, এসব জিনিস ইবাদাতের অংশ নয় বরং এর থেকে পৃথক নিজস্ব স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রাখে।
এসব অভিযোগ ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। একটি শব্দকে আর একটি শব্দের উপর "এবং" দ্বারা নির্দেশ করলে দুটি ভিন্ন জিনিস হয়ে যায়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। স্বয়ং কুরআনে কারীমে এমন অনেক বাক্য আছে যা এ অভিযোগ ভুল বলে প্রমাণ করে। যেমন:
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ - العنكبوت : ٤٥
"নিশ্চয়ই নামায অশ্লীলতা ও অসৎকাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।" -সূরা আল আনকাবুত : ৪৫
এ বাক্যটিতে 'ফাহশা' অশ্লীলতা শব্দের প্রতি 'মুনকার'শব্দটিকে 'এবং' দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। অথচ 'মুনকারের' মধ্যে ফাহশার অর্থ নিহিত এবং ফাহশা মুনকারের একটি অংশ বই কিছুই নয়। নিম্নের আয়াতটিও এ ধরণের:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبي - النحل : ٩٠
"নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার ও ইহসান অনুগ্রহ এবং আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করার নির্দেশ দেন।"-সূরা আন নাহল : ৯০
এ বাক্যটিতেও 'ইতায়িজিল কুরবা' (আত্মীয় স্বজন) শব্দটিকে 'আদল' ও ইহসান' শব্দের প্রতি সংযুক্ত করা হয়েছে অথচ আত্মীয় স্বজনকে আর্থিক সাহায্য করা আদল ও ইহসানেরই একটি রূপ।
এর আর একটি দৃষ্টান্ত:
وَالَّذِينَ يُمْسِكُونَ بِالْكِتٰبِ وَأَقَامُو الصلوة - - الاعراف : ۱۷۰
"যারা আল্লাহর কিতাবকে মযবুতভাবে ধারণ করে ও নামায় কায়েম করে।"-সূরা আল আ'রাফ: ১৭০
এখানে 'ইকামাতে সালাত' শব্দকে 'তামাসুক বিল কিতাবে'র সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ ইকামাতে সালাত 'তামাসসুক বিল কিতাবের'ই একটি রূপ শুধু নয় বরং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
এসব দলিল প্রমাণ দ্বারা একথাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, 'আতঙ্ক' সবসময় ভিন্নধর্মী কাজ বুঝাবার জন্যই ব্যবহৃত হয় না বরং অন্য উদ্দেশ্য বুঝাবার কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন কোনো সময় একটি শব্দের অর্থ অন্য আর একটি শব্দের অর্থের অংশ হিসেবে প্রকাশ পায়। কিন্তু এরপরও ঐ শব্দের উপর এ শব্দটিকে 'আতঙ্ক' করে দেয়া হয়। আর এ 'আফ্ফের' বা সংযুক্ত করা বাক্যের উদ্দেশ্য হলো যে, এভাবে এর উল্লেখের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ হয়ে যায়। এভাবে কখনো কখনো একটি শব্দ বিভিন্ন জায়গায় ক্ষেত্র বিশেষে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যদি তা একা নেয়া হতো তাহলে এর অর্থে স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা লাভ হতো। আর যদি অন্য কোনো শব্দের সাথে মিলিয়ে নেয়া হতো তাহলে তার বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট অর্থ হয়ে যেতো। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কুরআনের এ আয়াতে:
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أَحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ - البقرة : ۲۷۳
সূরা বাকারার এ আয়াতে 'ফকির' শব্দটিকে একা আনা হয়েছে। এভাবে 'মিসকিন' শব্দটি কুরআনে সূরা মায়েদার ৮৯ আয়াতে-
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسْكِينَ - المائدة : ٨٩
একা একা ব্যবহার হয়েছে। এতে ফকিরের অর্থও নিহিত আছে। কিন্তু এ দুটো শব্দই আবার যখন-সূরা তাওবার ৬০ আয়াতে
إِنَّمَا الصَّدَقْتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسْكِينِ - التوبة : ٦٠
পৃথক পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তখন উভয় শব্দের অর্থ পৃথক পৃথক ও সীমাবদ্ধ অর্থে রূপান্তরিত হয়েছে এবং উভয় শব্দই পৃথক পৃথক অর্থে ভাগ হয়ে গেছে।
এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি অর্থাৎ কোনো সাধারণ শব্দের উপর তার কোনো বিশেষ অংশকে সংযুক্ত করে দেবার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ইলমে বালাগাতের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর দিক দৃষ্টিগোচর হয়। এ ধরনের ব্যবহারে কোনো কোনো সময় বিশেষ কোনো শব্দের এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ও দিক তুলে ধরা হয় যা সাধারণ শব্দের অন্যান্য অংশে পাওয়া যায় না।
বর্ণনার এমন ধরনের ভঙ্গি ও 'ইল্মে বালাগাতের' ব্যবহার বিধি কুরআন মাজীদের অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। উপরে কিছু আয়াত আমি বর্ণনা করে এসেছি। আরো কিছু দৃষ্টান্ত একটু বিস্তারিতভাবে পেশ করা হচ্ছে-
(۱) أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتٰبِ وَأَقِمِ الصَّلوةَ - - العنكبوت : ٤٥
"এ কিতাব যা ওহীর মাধ্যমে তোমার উপর নাযিল হয়েছে তা তিলাওয়াত করো আর নামায কায়েম করো।"-সূরা আল আনকাবৃত: ৪৫
এখানে 'তিলাওয়াত করো' অর্থ শুধু মুখে শব্দগুলো উচ্চারণ করাই নয়। বরং কুরআনের হুকুম-আহকামের অনুসরণ করাও এর মধ্যে শামিল। হযরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-সূরা বাকারার ১২১ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَبَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاوَتِه - - البقرة : ١٢١
"যে সব লোককে আমি কিতাব দান করেছি তারা একে যথাযথভাবে পড়ে।"-সূরা আল বাকারা: ১২১
অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত হারাম জিনিসকে হারাম মনে করে আর হালালকে হালাল বলে মানে। এর মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর উপর ঈমান পোষণ করে এবং মুহকাম আয়াতগুলোর উপর নিজের আমলের ভিত্তিস্থাপন করে।
"কুরআনের আহকামের" মধ্যে যেসব হুকুমের অনুসরণ করার জন্য এ আয়াতে হুকুম দেয়া হয়েছে তার মধ্যে গোটা শরীআতই শামিল। এটা খুবই সুস্পষ্ট কথা। নামাযও গোটা শরীআতের একটি অংশ। কিন্তু এরপরও এ আয়াতে তিলাওয়াতে কিতাব এর উপর ইকামাতে সালাতকে সংযুক্ত করে এটাকে বিশেষ যত্নের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা যেন এর গুরুত্ব ও মহান মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।
সূরা আহযাবের ৭০ আয়াতে বলা হয়েছে :
(২) اتقوا الله وقولوا قولا سديداً الاحزاب : ۷۰
"আল্লাহকে ভয় করো এবং সরলভাবে কথা বলো।" -সূরা আল আহযাবঃ ৭০
(۲) اتقوا الله وابتغوا اليه الوسيلة - المائدة : ٣٥
"আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর সন্তুষ্টি ও সন্নিকটবর্তী হবার জন্য উপায় অনুসন্ধান করো।"-সূরা আল মায়েদা: ৩৫
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো এসব আয়াতে 'তাকওয়ার' উপর 'কাওলে সাদীদ' ও ইবতিগায়ে ওয়াসিলাকে আত্ফ বা সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ কাওলে সাদীদ ও ইবতিগায়ে ওয়াসিলা স্বয়ং তাকওয়ারই পরিপূরক অংশ ও এর শাখা। কিন্তু এসব গুণাগুণ দৃষ্টিতে রাখার পরও 'তাকওয়ার' সাধারণ হুকুমকে বিশেষভাবে আবার উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিশ্লেষণের আলোকে এখন এসব শব্দগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করুন, যেগুলোকে আপত্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত স্বরূপ পেশ করা হয়েছে। এগুলোকে "ইবাদাত” শব্দের উপর "তাওয়াক্কুল” ও “ইসতেআনাত" এবং "তাকওয়া” শব্দগুলোকে যদি সংযুক্ত হিসেবে নেয়া হয়ে থাকে তাহলে এ সংযুক্তির অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, এসব জিনিস ইবাদাতের সীমারেখার বাইরে। বরং ব্যাপারটা হলো যদিও এসব জিনিস ইবাদাতেরই অংশ কিন্তু ইবাদাতের এই আম শব্দ ব্যবহারের পরে একে খাসভাবে এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে যেন 'আবেদের' চোখে এর একটি বিশেষ স্থান লাভ হতে পারে এবং 'আবেদ' যেন এসব ঈমানের গুণাগুণকে নিজের মধ্যে বেশী বেশী সৃষ্টি করার ফিকিরে ডুবে থাকে। কারণ এসব জিনিস বাকী সব ইবাদাতকে সঠিকভাবে পালন করার ব্যাপারে মৌলিকভাবে গুরুত্বের অধিকারী। এর সাহায্য ছাড়া কোনো ইবাদাতই আদায় হতে পারে না।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 সৃষ্টির কামিয়াবাতের মাপকাঠি

📄 সৃষ্টির কামিয়াবাতের মাপকাঠি


এ গোটা আলোচনা হতে এ সত্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষসহ যে কোনো সৃষ্টির জন্য কামালিয়াতে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হলো আল্লাহর ইবাদাত। যে বান্দাহর ইবাদাত যত বেশী উন্নত হবে তার মর্যাদা বা কামালিয়াত ততবেশী উন্নত হবে। আর যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির জন্যে ইবাদাত-বন্দেগীর স্তর পার হয়ে আরো সামনে অগ্রসর হয়ে যাওয়া সম্ভব অথবা কোনো সৃষ্টির জন্য কামালিয়াতের স্তরে পৌছা ইবাদাত ছাড়াও অন্য কোনো জিনিসের মাধ্যমে সম্ভব, তারা জিহালাত ও গুমরাহীর চরম অধপতনে গিয়ে পৌঁছেছে। এ ধরনের গুমরাহীর নীচে আর কোনো গুমরাহী নেই। এ আলোচনার প্রথম দিকে কুরআনের আয়াত দিয়ে আমি একথাগুলো বুঝিয়ে দিয়েছি। আমি বলেছি যে, আল্লাহ যখন তার কোনো নিকটতম বান্দাহকে প্রশংসামূলক শব্দ দিয়ে ডাকতে চান তখন তিনি তাকে 'আবদ' শব্দ দিয়ে ডাকেন। তার ইবাদাত বন্দেগীই তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ঠিক এভাবে যখন কারো নিন্দা ও বদনাম করা হয় তখন তার উপর আল্লাহর ইবাদাতের হক আদায় না করার অপরাধকেই এর কারণ হিসেবে বলা হয়। এ ব্যাপারটিকে কুরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যত নবী দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন সকলকেই এ 'ইবাদাত'-এর নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই তাঁর দাওয়াতের সূচনায় উম্মতকে ইবাদাত করার নির্দেশ দানের মাধ্যমেই শুরু করেছিলেন।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ইবাদাতের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদার তারতম্য

📄 ইবাদাতের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদার তারতম্য


ইবাদাতের এ নিগূঢ় তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবার পর একথাটিও স্পষ্টভাবে বুঝে নেয়া দরকার যে, এ আকাঙ্ক্ষিত গুণটি লাভ করার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য সূচিত হয়। আর এ পার্থক্য প্রকৃতপক্ষে ঈমানের পার্থক্যকে প্রকাশ করে। ইবাদাতের স্তর এবং সিফাতে কামালের দিক থেকে মানুষ দুটি বড় শ্রেণীতে বিভক্ত।
একটি হলো বিশেষ শ্রেণী।
আর অপরটি হলো সাধারণ শ্রেণী।
এরই ভিত্তিতে বিশ্বপ্রতিপালকের সাথেও সকল মানুষের সম্পর্ক এক রকম নয়। বরং এক্ষেত্রেও স্তরগত পার্থক্য হওয়াই জরুরী। কোথাও এ হবে মামুলী ধরনের। আবার কোথাও হবে বিশেষ ধরনের। দুঃখের বিষয় নিরেট তাওহীদ ও সত্যিকারের ইবাদাতের পতাকাবাহী লোকেরাও সূক্ষ্ম শিরক থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
تَعْسَ عَبْدَ الدِّرْهَم تَعْسَ عَبْدَ الدِّينَارِ ، تَعْسَ عَبْدَ الْقَطِيفَةِ تَعْسَ عَبْدَ الْخَمِيصَةِ، تَعْسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيْكَ فَلَا انْتَقَشَ، إِذَا أَعْطَى رَضِيَ وَإِذَا مَنَعَ سخط - صحيح البخاري
“ধ্বংস হয়েছে দেরহামের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে দীনারের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে মখমলের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে কালো চতুর্ভূজ কাপড়ের দাসরা! ধ্বংস হয়েছে সে এবং উপুড় হয়ে পড়েছে। ওদের অবস্থা এই যে, তাদের পায়ে কাঁটা বিঁধলে তারা তা বের করে না অর্থাৎ বিপদে পড়ে বিড়বিড় করতে থাকে, আর যখন কিছু পায় তখন তাতে মগ্ন ও তৃপ্ত হয়ে যায়। যদি কিছু না পায় তাহলে নারাজ হয়ে বসে থাকে।”-বুখারী,
সত্য উদ্‌ঘাটনকারী আল্লাহর রাসূলের উচ্চারিত এসব শব্দের প্রতি লক্ষ্য করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে দুনিয়ার উপায় উপকরণের পেছনে পড়ে থাকা মানুষকে দেরহামের দাস, দীনারের দাস বলে সম্বোধন করেছেন। তাদের জন্যে বদদোয়ার মতো বাক্য উচ্চারণ করেছেন। সাথে সাথে দৃষ্টান্তমূলক ভঙ্গিতে অর্থের পূজারী লোকদের নমুনা এঁকে এরশাদ করেছেন যে, তাদের খুশি ও না খুশীর মানদণ্ড হলো ধন- দৌলত। কুরআন মাজীদেও মানব প্রকৃতির এ দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
وَمِنْهُمْ مَّنْ يُلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَتِ ، فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ ٥ - التوبة : ٥٨
"এসব মুনাফিকদের কেউ কেউ সদকা বন্টনের ব্যাপারে তোমার উপর অভিযোগাত্মক কটাক্ষ করে। যদি ওদেরকে সদকা থেকে কিছু দিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা খুশী থাকে। আর যদি কিছু দেয়া না হয় তাহলে সাথে সাথেই অসন্তুষ্ট হয়ে যায়।"-সূরা আত তাওবা : ৫৮
মোটকথা তাদের খুশী অখুশী আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হয় না। বরং তা হয় স্বার্থের ভিত্তিতে। আর তা মূলত তাদের প্রবৃত্তির লালসা পূরণ এবং দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদন করা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ বান্দার বন্দেগীর দাবী হলো, সে নিজের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ভিত্তিস্থাপন করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর। নতুবা সে আল্লাহর বান্দাহ হবার দাবী করা সত্ত্বেও তাঁর হক আদায় করতে পারবে না। তখন সে মুখে মুখে আল্লাহর বান্দাহ দাবী করবে বটে, কিন্তু কার্যত সে হবে প্রবৃত্তি, ধন-সম্পদ ও টাকা পয়সার দাস।
একইভাবে যে ব্যক্তি ক্ষমতার রূপের কিংবা অনুরূপ অন্য কোনো জিনিসের প্রতি বিমোহিত ও প্রলোভিত হবে সেও ধন-সম্পদ পূজারীর মতই নিজের কাঙ্ক্ষিত জিনিসের পূজারী বলে গণ্য হবে। কারণ, যদি তার মনষ্কামনা পূর্ণ না হয় তাহলে সে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এভাবে উপরোল্লিখিত এ ব্যক্তি যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ অনুযায়ী ধন-দৌলতের গোলাম হয় তাহলে এ ব্যক্তিকেও তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসের গোলাম ও দাস বলে আখ্যা দেয়া হবে। কারণ বন্দেগী ও গোলামীর প্রকৃত অর্থই হচ্ছে হৃদয় মনের বন্দেগী ও গোলামী। যে জিনিসই মনকে নিজের গোলাম বানিয়ে নেয় মানুষ প্রকৃতপক্ষে তারই বান্দা ও গোলাম হয়ে যায়। এক কবি কতইনা উত্তম কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন:
الْعَبْدُ حُرَّمَا قَنَعَ وَالْحُرُّ عَبْدُ مَا طَمَعَ
‘অল্পের তুষ্ট গোলাম যে, স্বাধীন সেই হয় গোলাম হয় স্বাধীন লোক লোভী যদি হয়।’
একথাটিই আর একজন কবি এভাবে বলেছেন:
أَطْعَتْ مَطَامِعِي فَتَعَبُدَ تْنِي وَلَوْا لِنِي قَنَعْتُ لَكُنْتُ حُرّاً
‘অনুগত পেয়ে কামনা মোরে বানিয়েছে গোলাম, সংগী হলে তুষ্টি আমার নির্ঘাত স্বাধীন হতাম।’
"বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, “লোভ-লালসা গলার শৃংখল আর পায়ের বেড়ী। গলাকে শৃংখল মুক্ত করার সাথে সাথে পায়ের বেড়ীও দূর হয়ে যায়।"
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
الطَّمَعُ فَقْرُ وَالْيَائِسُ غَنِيٌّ وَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا يَئِسَ فِي شَيْءٍ اسْتَغْنَى عَنْهُ - - مشكوت
"হে মানুষেরা শুনে রাখো। লোভ হলো দারিদ্র আর বিমুখীনতা হলো প্রাচুর্য। তোমাদের কেউ যখন কোনো জিনিস হতে বিমুখ হয় তখন সে এ জিনিসের মুখাপেক্ষীহীন হয়ে যায়।"-মেশকাত
এটা একটা বাস্তব ব্যাপার। মানুষের স্বভাব হলো সে যে জিনিস থেকে নিরাশ হয়ে যায়, সে জিনিস প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা তার মন থেকে মুছে যায়। এরপর সে আর তার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেয় না। আর এ ব্যাপারে সে কাউকে সাহায্যকারী হিসেবেও পেতে চায় না। এর বিপরীত সে যদি কোনো ব্যাপারে আশাবাদী হয় আর তার মন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তখন সে তার জন্য পাগল পারা হয়ে যায় এবং সেটার মুখাপেক্ষী হয়ে যায়। মোটকথা মানবীয় স্বভাবের এটা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ধন-সম্পদ, শান-শওকত, রূপ-সৌন্দর্যসহ যে ব্যাপারেই কথা বলো সবকিছুর কামনার মধ্যেই এ নীতিমালা কার্যকর আছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের অসীয়ত করেছেন:
فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ - - العنكبوت : ١٧
"আল্লাহর নিকট রিস্ক তালাশ করো। তারই ইবাদাত করো এবং তারই শোকর আদায় করতে থাকো।"-সূরা আল আনকাবুত: ১৭
রিষ্ক ছাড়া তো কোনো উপায় নেই। প্রত্যেকেরই তা নিত্য প্রয়োজন। কোথাও না কোথাও তা অর্জন করতেই হয়। কোনো লোক যদি এ রিষ্ক আল্লাহর নিকট তালাশ করে তাহলে সে আল্লাহর বান্দা হবে এবং তাঁরই মুখাপেক্ষী হবে। আর যদি আল্লাহকে ছেড়ে কোনো সৃষ্টির কাছে রিস্ক তালাশ করে, তাহলে কার্যত সে তারই বান্দাহ হবে। তারই মুখাপেক্ষী হিসেবে সে চিহ্নিত হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00