📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 প্রাকৃতিক বিধান ও শরয়ী বিধানের মধ্যে পার্থক্য

📄 প্রাকৃতিক বিধান ও শরয়ী বিধানের মধ্যে পার্থক্য


ইবাদাতের এ দুটো অর্থের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য বিদ্যমান তা বুঝার পর প্রাকৃতিক বিধান ও শরয়ী বিধানের পার্থক্য-সহজে বুঝা যায়। শরয়ী বিধান বলতে ওইসব কাজকে বুঝায় যেসব কাজ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত, এতায়াত ও শরীআতের সাথে সম্পর্কিত। এসব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায় এবং এসব কাজ সম্পাদনকারীকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধুত্বের সনদ দান করার মত গৌরবে গৌরবান্বিত করেন। আর প্রাকৃতিক বিধান হলো ওইসব কাজ, যেসব কাজের ব্যাপারে শয়তানের বন্ধুদের ধারণা এবং আল্লাহর বন্ধুদের ধারণার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি শুধু এসব বিধান মেনে নেয়াকে যথেষ্ট মনে করে, এর চেয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে শরয়ী বিধানের জ্ঞান ও বিশ্বাসের বাস্তব আমল নিজের মধ্যে সৃষ্টি না করে তাহলে সে ব্যক্তি ইবলিসের অনুসরণকারীদের চেয়ে পৃথক নয়। ঠিক এভাবেই যদি কোনো ব্যক্তি শুধু প্রাকৃতিক বিধান মানে এবং সে অনুযায়ী নিজের জীবন না চালায় বরং শরয়ী বিধানকেও মানে কিন্তু পুরোপুরী মানে না বরং কোনো কোনো ব্যাপারে এসব বিধানের আলোকে কাজ করে, আবার কোনো কোনো ব্যাপারে করে না, তবে এসব মানুষ আধাআধি ঈমানদার এবং আল্লাহর ত্রুটিপূর্ণ বান্দাহ। তার ঈমানের ওই পরিমাণ ত্রুটি ও কমতি আছে যে পরিমাণ সে দীনি বিধানের অনুসরণ করাকে পাশ কাটিয়ে ঈমান ও চরিত্রের দিক দিয়ে এসবকে অস্বীকার করে।
এটা শরীআতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং নাজুক জায়গা। এ জায়গায় কত মানুষের পা সত্যপথ থেকে পিছলে দূরে সরে গেছে। বিশেষ করে এ জায়গায় সুফীকুল সন্দেহ সংশয়ে নিপতিত হয়। এখানে এমন অনেক তরিকতের বুযুর্গ ব্যক্তিও টক্কর খেয়েছেন যাদেরকে হক অনুসন্ধানের ঈমান, তাওহীদ ও মারেফাতে ইলাহীর রহস্য উদ্‌ঘাটনকারী বলা হতো। এরি প্রতি শেখ আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি ইংগিত করে বলেছেন:
"অনেক লোক, আল্লাহর ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বুঝার সৌভাগ্য লাভ করার পর ওখানেই থেমে গেছে। কিন্তু আমার অবস্থা এমন নয়। আমি যখন ওখানে পৌঁছেছি তখন আমার সামনে একটি দরজা খুলে গেছে। আমি তকদীরের সাথে সত্য লাভের জন্যে যুদ্ধ করেছি। পুরুষ সে-ই যে কদরের মুকাবিলা করে। সে পুরুষ নয়, যে তার সামনে আত্মসমর্পণ করে বসে।"
হযরত আবদুল কাদের জিলানীর একথা প্রকৃতপক্ষে শরীআতের মূল দাবী। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ জিনিসের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর প্রিয় রাসূল আমাদেরকে এ শিক্ষাই দান করেছেন। কিন্তু অনেক লোকই এখানে পৌঁছে থেমে যায় ও হকের রজ্জুর মাথা তাদের হাত থেকে ছুটে যায়। আর এটা এভাবে হয়, যখন সে সুলুকের ধাপগুলো অতিক্রম করে কাযায়ে এলাহীর নিকটবর্তী পৌঁছে যায় এবং সেখানে তার বা অন্যদের শিরক ও কুফরীর মত সকল গুনাহ ও অপরাধগুলো দেখে এবং তারা দেখে যে, তাদের অপরাধ সংঘটিত হওয়া আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমে একটি পূর্ণ নির্ধারিত ব্যাপার। অর্থাৎ তারা তাদের রবুবিয়াতের ফায়সালার ও ইচ্ছার মধ্যে শামিল, সন্তুষ্টির মধ্যে নয়, তখন তাদের বিবেক বিবেচনায় এ ধারণা চেপে বসে যে, ব্যস্ এখন যা আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন তাই হবে। তখন তারা তাঁর কাছে মাথা নত করে দেয়। বরং তার উপর রাজী থাকাই দীন, ইবাদাত ও তরীকত বলে মনে করে। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন এ ধারণা কত বিপজ্জনক। এ ধারণা মুশরিকী ধারণা থেকে কিছুমাত্র ভিন্ন নয়। তাদের কথা ছিলো:
لَوْ شَاءَ اللهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ شَيْءٍ - الانعام : ١٤٨
"আল্লাহই যদি চাইতেন তাহলে না আমরা আর না আমাদের পিতৃপুরুষ শিরক করতেন ও কোনো জিনিসকে হারাম বলে নির্দিষ্ট করতেন।"-সূরা আল আনআম: ১৪৮
لَوْ شَاءَ الرَّحْمَنُ مَا عَبَدْنَا هُمْ ط - الزخرف : ٢٠
"যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা এসব দেব-দেবীর পূজা করতাম না।"-সূরা আয যুখরূফ: ২০
انطْعِمُ مَنْ لَّوْ يَشَاءُ اللَّهُ أَطْعَمَهُ وَ - يس : ٤٧
"আমরা কি তাদেরকে খাওয়াবো, যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে নিজেই তাদের খাইয়ে দিতেন।"
তাদের যদি হেদায়াতের আলোর সৌভাগ্য হতো তাহলে অবশ্যই তারা বুঝতো যে, ঈমান বিল-কাদর ও তাসলীম বির রেযার অবশ্যই ওই অর্থ নয় যা তারা বুঝে বসেছে। বরং এটা হলো 'আমার উপর যত বিপদ মুসীবতই আসুক আমি এ বিশ্বাসে সবর করে যাবো যে, এসব আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। এটা আমার জন্যে অবধারিত ছিলো। এটাকে হাসিমুখে বরদাশত করে যাবো। যেমন কুরআন বলে:
مَا أَصَابَ مِنْ مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ، وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ .
"বিপদ মুসীবত যা কিছুই মানুষের উপর আপতিত হয় তা আল্লাহর হুকুমেই হয়ে থাকে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে আল্লাহ তার দিলকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেন।" -সূরা আত তাগাবুন: ১১
অতীতের কোনো কোনো আলিমের তাফসির মোতাবিক مَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ এর মধ্যে এমন লোকের উল্লেখ করা হয়েছে যাদের মধ্যে মুসীবতের সময় এ বিশ্বাস জেগে উঠে যে, এ সকল মুসীবত আল্লাহর তরফ থেকে আসে। তারপর এসব মুসীবতে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে তাদের হৃদয়ে ধৈর্য ও তৃপ্তির বন্যা বয়ে যায়। আর এক আয়াতে বলা হয়েছে :
مَا أَصَابَ مِنْ مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَبٍ مِّنْ قَبْلِ أَنْ نَّبْرَاهَا ، إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرَة لِكَيْلَا تَأْسَوْ عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا أَتُكُمْ ، الحديد : ٢٢-٢٣
“যমিনে ও তোমাদের উপর যে বিপদ নাযিল হয় এসবই বাস্তবে ঘটবার আগে একটি কিতাবে লিখা থাকে। নিশ্চয়ই এ কাজ আল্লাহর জন্য অতি সহজ। যাতে করে তুমি কোনো জিনিস হাতে না আসার কারণে আফসোস না করো এবং তার তরফ থেকে কোনো জিনিস পেয়ে সীমার চেয়ে বেশী খুশী না হও।” -সূরা আল হাদীদ : ২২-২৩
বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আদম আলাইহিস সালাম ও মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। মূসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, আপনি ওই আদম আলাইহিস সালাম যাঁকে আল্লাহ পাক নিজ হাতে তৈরি করেছেন এবং আপনার মধ্যে নিজের ‘রূহ’ ফুঁকেছেন। ফেরেশতাদেরকে দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছেন। আপনাকে সকল জিনিসের নাম শিখিয়েছেন। এরপর কেন আপনি আমাদেরকে ও আপনাকে নিজেকে জান্নাত থেকে বের করে এনেছেন?”
আদম আলাইহিস সালাম জবাবে বলেন : “আপনি তো ঐ মূসা যাকে আল্লাহ পাক নিজের কালাম দিয়ে সৌভাগ্যবান করেছেন। নিজের পয়গামের বাহক ও মুবাল্লিগ বানিয়েছেন এবং নবুয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। আপনার কি জানা নেই যে, এসব কথা আমার ব্যাপারে আমার জন্মের অনেক আগেই লিখা হয়ে গিয়েছে।”
মূসা আলাইহিস সালাম তখন বললেন : “হ্যাঁ এসবই সত্য।”
উভয়ের বিতর্কের এ বিবরণী উল্লেখ করার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে উদ্দেশ করে এরশাদ করলেন, এ বিতর্কে আদম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালামকে তাঁর কথার সমর্থক বানিয়ে ফেলেছিলেন। এখানে দেখার বিষয় যে, আদম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালামের অভিযোগের জবাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য তাকদীরের প্রসঙ্গ টেনেছেন। কারণ তিনি জানতেন যে, মূর্খ, পাপীরাই তাকদীরকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে। এ কাজ কোনো মু'মিন মুসলিমের নয়। আর যদি এটা কারোর গুনাহের ওযর হিসেবে পেশ করা যায় তাহলে প্রত্যেক কাফির আদ ও সামুদের জাতির মত কোনো গুমরাহ ও অভিশপ্ত জাতি, এমনকি ইবলিসও এদিক দিয়ে অপারগ ছিলো' বলে বুঝতে হবে যে, তারা যা করেছে আল্লাহর ইচ্ছানুসারেই করেছে।
এরপর হযরত মুসা আলাইহিস সালামের অভিযোগের ব্যাপারেও লক্ষ্য করুন। তিনি হযরত আদমকে গুনাহ সংঘটিত করার কারণে কোনো ভর্ৎসনা করেননি। কেননা তাঁর এ গুনাহ আল্লাহর তরফ থেকে মাফ করে দেয়া হয়েছে। আর তিনি মাগফিরাত, হেদায়াত ও নবুয়াতের তিনটি গুণে পুরষ্কৃত হবার সৌভাগ্য অর্জন' করেছেন। বরং তাঁর ভুলের কারণে গোটা বনী আদমের উপর বাহ্যতঃ বিপদ নিপতিত হবার কথার প্রতি হযরত মূসা ইংগিত করেছিলেন। তিনি হযরত আদমকে শুধু একথাই বলেছিলেন যে, "আপনি আমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করলেন কেন?” সে কথার জবাবও হযরত আদম আলাইহিস সালাম তা-ই দিয়েছেন যা দেখার মত ছিলো। এ ঘটনা তো আমার জন্মের পূর্বেই নির্ধারিত হয়েছিলো অর্থাৎ এ ভুল ও ভুলের এ শাস্তি উভয়টাই পূর্বে নির্দিষ্ট ছিলো। যে বিপদ মুসীবত সুনির্দিষ্ট থাকে তা সংঘটিত হলে ধৈর্যধারণ করা জরুরী। কেননা আল্লাহকে 'রব' হিসেবে মানার এটাই মানদণ্ড। এর নামই হলো মানা ও সন্তুষ্ট থাকা। পরিপূর্ণ ঈমানের এটাই হলো দাবী। এ কারণেই কুরআন মজীদে এ জিনিসটি বারবার বলা হয়েছে।
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ - المؤمن : ٥٥
"অতএব বিপদ মুসীবতে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চিত থাকো যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য। নিজের গুনাহর ব্যাপারে তাঁর কাছে মাগফিরাত কামনা করো।"-সূরা আল মু'মিন: ৫৫
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেনঃ
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كيدهم شيئًا - ال عمران : ۱२०
"যদি তোমরা ধৈর্যের সাথে কাজ করো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো তাহলে দীনের শত্রুদের কোনো চালই তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।"-সূরা আলে ইমরান: ১২০
তিনি আরো বলেছেন:
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ال عمران : ١٨٦
"যদি তোমরা সবর করো এবং পরহেযগারী অবলম্বন করো তাহলে নিশ্চয়ই এটা হবে সাহসিকতাপূর্ণ কাজ। -সূরা আলে ইমরান: ১৮৬
হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন:
إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ - يوسف : ٩٠
"এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং সবর করে নিসন্দেহে আল্লাহ তাআলা মুহসিনদের পুরস্কারকে ধ্বংস করেন না।"-সূরা ইউসুফ: ৯০
মোটকথা বিপদ মুসীবতে সবর করা হলো মু'মিনের কর্তব্য, এর নামই ঈমান-বিল-কাদর। আর মু'মিনের কর্তব্য হলো কোনো পাপ কাজ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তেগফারের অশ্রু দিয়ে নিজেকে পাক পবিত্র করার চেষ্টা করা। এভাবে সে যদি অন্যকে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত দেখতে পায় তখন তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার জোর চেষ্টা করাও তার কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। যেখানেই কোনো খারাপ কাজ দেখবে তা দূর করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাবে। অর্থাৎ কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করবে। নেক ও ভালো ভালো কাজকে মহব্বতের চোখে দেখবে। এর প্রচার ও প্রসারের কাজে ব্যাপৃত থাকবে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে ভালোবাসবে, তাঁর দুশমনদেরকে দুশমন ভাববে, আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে আবার আল্লাহর জন্যই দুশমনি করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَ كُمْ مِّنَ الْحَقِّ ، يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ -
"হে ঈমানদারগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে তোমরা বন্ধু বানিও না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসার বাণী পাঠাও অথচ তারা তোমাদের নিকট যে হক এসেছে তা অস্বীকার করে বসেছে। রাসূলকে এবং তোমাদের সকলকে তোমাদের বাড়ী ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।"-সূরা আল মুমতাহিনা : ১
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ، إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَهُ وَ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ - الممتحنة : ٤
"তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সাথীদের মধ্যে একটি উত্তম আদর্শ বিদ্যমান। ওই সময়ের কথা স্মরণ করো যখন সে নিজের জাতিকে বলেছিলো, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যেসব মাবুদের ইবাদাত করছো তাদের থেকে আমি দায়িত্বমুক্ত ও সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের মতবাদকে অস্বীকার করেছি। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য শত্রুতা প্রকাশ হয়ে পড়েছে ও বিরোধ ব্যবধান শুরু হয়ে গেছে, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।" -সূরা আল মুমতাহিনা : ৪
لا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا أَبَاؤُهُمْ أَوْ أَبْنَاءَ هُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيْرَتَهُمْ ، أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحِ مِنْهُ - - المجادلة : ٢٢
"আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান পোষণকারী কোনো জাতিকে তোমরা কখনো এমন দেখবে না যে, তারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালোবেসেছে, তারা চাই তাদের পিতা হোক কিংবা পুত্র, ভাই হোক অথবা হোক তাদের বংশ পরিবারের লোক। এরা সে লোক যাদের দিলে আল্লাহ তাআলা ঈমানকে দৃঢ়মূল করে দিয়েছেন এবং নিজের তরফ থেকে একটা রূহ দান করে তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন।"-সূরা আল মুজাদালা : ২২
এখানে চিন্তার ব্যাপার হলো যদি কুফরী ও নিফাকের গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য 'কাযা' ও 'কদর' এর ওযর প্রকৃতই কোনো ওযর হতো, তাহলে তাদেরকে কঠিনভাবে ঘৃণা ও তাদের সাথে স্থায়ী শত্রুতা রাখার হুকুম কেনো দেয়া হলো। ঈমান বিল-কদর এর অর্থ যদি তা-ই হতো যে, যে যতো খারাপ কাজই করুকনা কেনো, যেহেতু তা আল্লাহর ইচ্ছায়ই হয়েছে তাই তাদের সাথে শত্রুতার চেয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানো দরকার, তাহলে তাহলে, ঈমান ও আহলে কুফর, আহলে তাকওয়া ও আহলে ফুজুর সকলেই আল্লাহর দরবারে এক সমান হওয়া উচিত ছিলো। অথচ এ ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে, এমন অবস্থা হতেই পারে না।
أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ ۚ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ ۚ - ص : ২৮
"আমি কি ঈমান গ্রহণকারী ও নেক আমলকারীদেরকে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সমান করবো? অথবা মুত্তাকীদেরকে করবো বদকারদের সমান?"-সূরা সাদঃ ২৮
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ ۚ - القلم : ৩৫
"আমি কি আত্মসমর্পণকারীদেরকে অপরাধীদের সমান করে দেবো?" -সূরা আল কলম: ৩৫
আল্লাহ আরো বলেছেন:
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ ۚ - الجاثية : ২১
"যারা গুনাহ অর্জন করেছে তারা কি একথা মনে করে রেখেছে যে, তাদেরকে লোকদের সমান করা হবে যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে।"-সূরা আল জাসিয়া: ২১
এভাবে একটি দুটি নয় বরং অসংখ্য আয়াত কুরআন মাজীদে বিদ্যমান আছে, যেসব আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আহলে মু'মিন ও কাফির, সত্যপন্থী ও বাতিলপন্থী এবং সঠিকপথের অনুসারী এবং ভ্রান্ত পথের অনুরাগীদের মধ্যে পরিপূর্ণ পার্থক্য করেছেন এবং এ দুটো শ্রেণীর একটিকে অপরটির প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু যে ব্যক্তির দৃষ্টি প্রাকৃতিক বিধান পর্যন্ত পৌঁছে, অথচ শরীআতের বিধান পর্যন্ত পৌছতে পারে না সে ঐ দুটো শ্রেণীর বিপরীত শ্রেণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। এ দুটো শ্রেণীকে সে একই সারিতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, তারা মূর্তিকে আল্লাহ তা'আলার সমপর্যায়ের বলে মানে। বস্তুত কিয়ামতের দিন এসব লোকেরা নিজেরাই নিজেদের বোকামীর কারণে আফসোসের সাথে বলবেঃ
تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ إِذْ نُسَوِّيكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ، شعراء : ۹৮
"আল্লাহর কসম, আমরা মূর্তিদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে নিজেদেরকে স্পষ্ট গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত রেখেছিলাম।” -সূরা আশ শুয়ারা : ৯৭-৯৮
শুধু তা-ই নয় বরং এ জাহেলী দর্শন অনেককে জিহালাত ও গুমরাহীর শেষ সীমায় নিয়ে পৌছিঁয়ে দিয়েছে। এরপর গুমরাহীর আর কোনো সীমা বাকী থাকে না। এসব লোকের অবস্থা হলো, তারা জগতের ছোট বড় প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক বানিয়ে দিয়েছে এবং প্রত্যেকটি জিনিসকে ওই ধরনের আনুগত্য উপাসনা লাভের অধিকারী মনে করে বসেছে, যা প্রকৃতপক্ষে একমাত্র আল্লাহরই অধিকার, অন্য কারো নয়। কারণ তারা মনে করে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অস্তিত্ব বিদ্যমান। অর্থাৎ জগতের অস্তিত্ব ও আল্লাহর সত্তা এ দুটি একই মূলের দুটো পৃথক নাম। তাদের মতে আল্লাহর সৃষ্টির অস্তিত্ব থেকে পৃথক এবং ভিন্ন কোনো জিনিস নয়-নাউযুবিল্লাহ। এবার দেখুন এরূপ চিন্তার পর কুফর ও আল্লাহদ্রোহিতার আর কোনো স্তর বাকী থাকে?
মনে হচ্ছে এ নির্ভেজাল কুফরী মতাদর্শের সমর্থকরা দর্শনগতভাবে এ দুটো অর্থের কোনোটিতেই 'দাস' হবার স্বীকৃতি দেয় না। এগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমি আগেই করেছি। এ দুর্শনের ভিত্তিতেই তো তারা তাদের নিজেদেরকে 'আল্লাহ' বলছে। অনেক মুলহিদ (আল্লাহ অস্বীকারকারী) প্রকাশ্যভারে এ কাজের দাবী করছে। তারা বলছে যে, তারা উপাস্য এবং উপাসক দুটোই। এসব কথাবার্তা দীনের বিধান সম্মত নয়। প্রাকৃতিক বিধান সম্মতও নয়। এটা হলো বরং স্পষ্ট গুমরাহী ও অন্ধ অনুকরণ। নাসারাদেরকে আল্লাহ তা'আলা শুধু এ কারণেই কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ তারা একজন মানুষ অর্থাৎ মসিহ আলাইহিস সালামকে আল্লাহর সন্তান হবার আকীদা পোষণ করতো।
এদের বিপরীত হলো ওদের পথ যারা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের উপর ঈমান পোষণকারী। যাদের নিকট আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব আছে। তাদের ধারণা ও বিশ্বাস হলো- "আল্লাহ প্রত্যেকটি বস্তুর ‘রব’। প্রত্যেকটি জিনিসের মালিক এবং প্রত্যেকটি সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা।” এমন সৃষ্টিকর্তা যিনি সমগ্র মাখলুকাত থেকে আলাদা সুষ্পষ্ট অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি না কোনো জিনিসের ভিতর লীন হয়ে যান, আর না কোনো জিনিসের সাথে যুক্ত হন, আর না তাঁর অস্তিত্ব ও সৃষ্টির অস্তিত্ব এক। তিনি তাঁর নিজের ও তাঁর রাসূলদের পূর্ণ অনুসরণ করার হুকুম দিয়েছেন। সকল প্রকার নাফরমানী হতে বিরত থাকতে বলেছেন। তিনি ধ্বংস পসন্দ করেন না। নিজের বান্দাদেরকে কুফর ও শিরক করতে দেখলে তাঁর রাগের সীমা থাকে না। আল্লাহর সৃষ্টিকে প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর বন্দিগীতে কাটানো ও তাঁর হুকুম পালনে রত থাকা চাই। এসব কাজ পালনের ব্যাপারে সকলকে আল্লাহর নিকট তাওফিক কামনা করতে হবে। কুরআন মাজীদ শিখাচ্ছে:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ - الفاتحة : ٤
"আমরা তোমার দাসত্ব করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।" -সূরা আল ফাতিহা : ৪
আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক আরোপিত সকল ফরযের মধ্যে একটি ফরয হলো-তাঁর বান্দারা তাদের শক্তি সামর্থ অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎকাজের বিরোধিতা করবে, আর আল্লাহর পথে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে।
এছাড়া তারা বাস্তব ক্ষেত্রে আল্লাহর দীনকে দুনিয়ায় জারী করার জন্য নিজেদের সমস্ত শক্তি ও প্রচেষ্টা নিয়োগ করবে। এ পথে আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করবে। তাকদীরের উপর নির্ভর করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে না। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা ও সামর্থ কামনা করবে, যেনো বিপদ মুসীবতে আল্লাহ তাদের হৃদয়ে দৃঢ়তা দান করেন। বাঁধা বিপত্তি মোকাবিলা করার জন্য তাদের শক্তি দান করেন। এর দৃষ্টান্ত হলো-খাদ্য খাবারের মতো। মানুষ খাবার খায় তার ক্ষুধা দূর করার জন্য এবং দেহকে এমন শক্তি যোগাবার জন্য যা স্বতন্ত্র চাহিদার প্রতিরোধ ও মুকাবিলা করতে পারে। সে তাকদীরের উপর নির্ভর করে। সে কখনো খাবার দাবার ছেড়ে দেয় না। হাদীসে আমরা এ সত্যটা দেখতে পাই। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল!
آرايْتَ أَرويَةً نَتَدَاوَى بِهَا وَرَقَى تَسْتَرْقَى بِهَا وَتَقَى نَتْقَى بِهَا، هَلْ تُرَدُّ مِنْ قَدْرِ اللَّهِ شَيْئًا ؟
"ওই সব ঔষধপত্র যা দ্বারা আমরা রোগ শোকে চিকিৎসা করি আর ওই তাবিজ তুমার যা আমরা ঝাড় ফুঁক করি, এভাবে সকল সতর্কতা-মূলক ব্যবস্থা ও তদবির যা আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অবলম্বন করি এসব কি তাকদীরকে বদলিয়ে দিতে পারে?"
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :
هِي مِنْ قَدَرِ اللهِ -
"এসব জিনিসও তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত।"
এভাবে আর একটি হাদীসে আছে :
الدعاء والبلاء ليلتقيان فيعتلجان بين السماء والارض ..
"আসমান ও যমীনে দোয়া ও বালার মধ্যে সাক্ষাত হয়। তারা পরষ্পর প্রতিযোগিতা করে কে আগে যাবে।
এ হাদীস থেকেও একথার আভাস পাওয়া যায়।
যারা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের উপর ঈমান পোষণ করে এবং আল্লাহর দাসত্ব করে তাদের ইলেম, আকীদা, চেষ্টা ও আমলের এ হলো পরিচয়। উপরে উল্লেখিত এসব জিনিসই হলো ইবাদাত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00