📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 দীন এবং ইবাদাতের স্বাভাবিক সম্পর্ক

📄 দীন এবং ইবাদাতের স্বাভাবিক সম্পর্ক


কুরআন ও হাদীস থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, গোলামী ও বন্দেগী আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদা এবং তাঁর সৌভাগ্যের শ্রেষ্ঠ সোপান। এখানে একথাও প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, সকল শাখা প্রশাখাসহ গোটা দীনই “ইবাদাতের” মধ্যে গণ্য। সকল নবী আল্লাহর দীন শিখাবার জন্য এসেছেন। কুরআনের বেশ কয়েকটি জায়গায়ই একথার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর নবীগণ যাদের নিকটই দীনের দাওয়াত দিয়েছেন তাদেরকে فَاعْبُدُوهُ “তাঁর ইবাদাত করো” বলে সম্বোধন করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, “দীন” আর “ইবাদাত” শব্দ দুটো একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দুটি পৃথক দিক। হাদীসে জিবরীলের দীর্ঘ হাদীসটি এ কথারই প্রমাণ।
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম একজন বেদুইনের বেশে রাসূলের নিকট এসে সাহাবায়ে কেরামের সামনেই তাঁকে কতিপয় প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন করলেন ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইসলাম কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন : আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযান মাসের রোযা রাখা এবং সামর্থ থাকলে হজ্জ করার নামই হলো ইসলাম।
এরপর আগন্তুক জিজ্ঞেস করলেন, ঈমান কাকে বলে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন : আল্লাহর একত্ব, তাঁর ফেরেশতা, অবতীর্ণ করা কিতাব, তাঁর প্রেরিত রাসূল, মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বারের জীবন, তাকদীরের ভালো ও খারাপ দিকের উপর মন থেকে বিশ্বাস স্থাপন করার নামই “ঈমান”।
এরপর আগন্তুক প্রশ্ন করলেন: “ইহসান কাকে বলে?”
উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : “আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করো যেনো তুমি তাঁকে দেখছো। আর তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তো তোমাকে দেখছেন।
এসব প্রশ্ন ও উত্তরের পর হযরত জিবরাঈল আমীন আলাইহিস সালাম চলে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন : فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمَكُمْ دِينَكُمْ
আগন্তুক ছিলেন জিবরীল আমীন। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিখাতে এসেছিলেন।
লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজগুলোকে দীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত এ কাজগুলোর সমষ্টির নামই “ইবাদাত”।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 দীন এবং ইবাদাতের অর্থ বিশ্লেষণ

📄 দীন এবং ইবাদাতের অর্থ বিশ্লেষণ


এবার দেখা যাক “দীন” ও “ইবাদাতের” আভিধানিক অর্থ কি? দীনের আভিধানিক অর্থ বিনীতভাবে মাথা নত করা, নিজকে ছোট মনে করা। আরবরা বলে থাকেন : بُنْتُهُ فَدَانَ
অর্থাৎ আমি তাকে অসহায়, অনুগত, বিনয়ী ও হুকুমের অধীন বানিয়েছি। আর সে ওইরূপ হয়ে গেলো। نَبِيِّنُ لِلَّهِ وَ نَبِيِّنُ اللَّهَ
অর্থাৎ “আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি এবং আমাদেরকে তাঁর সমীপে সমর্পণ করি।” অতএব “আল্লাহর দীন” অর্থ তাঁর আনুগত্য ও বন্দেগী করা। তাঁর সামনে বিনয় প্রকাশ করা এবং মাথা নত করা। “ইবাদাত” এর আভিধানিক অর্থই দীনের অর্থের কাছাকাছি। ইবাদাত শব্দের অর্থ নিজেকে ছোট জানা এবং পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। যে পথ বেশী বেশী চলাচলের কারণে পথচারীদের পদচারণায় দলিত মথিত হয়ে পরিষ্কার ও সমতল হয়ে যায় সে পথকে আরববাসীরা طريق معبد (অর্থাৎ চলাচলের সহজ পথ) বলে। কিন্তু শরীআতের পরিভাষায় ইবাদাতের অর্থ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজেকে ছোট জানা ও মাথানত করার সাথে সাথে এতে গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধের সংমিশ্রণ আছে। অর্থাৎ শরীআতের পরিভাষায় আল্লাহর দরবারে চরম বিনয় ও তাঁর জন্যে পরিপূর্ণ ভালোবাসা—এ উভয়ের সমষ্টির নামই হলো 'ইবাদাত'। এ দিক দিয়েই আরবী ভাষায় টিম (তায়াম) শব্দ (বান্দা) অর্থে ব্যবহৃত হয়। ভালোবাসার শেষ স্তরের নাম। এর প্রথম স্তরকে দ্বিতীয় স্তরকে তৃতীয় স্তরকে চতুর্থ স্তরকে বলা হয়। এ কারনেই ‘মুতিম’ ওই ব্যক্তিকে বলা হয় যে প্রিয়তমের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তার পরিপূর্ণ অধীন ও গোলাম হয়ে যায়। এ ‘মুতিম’ ও ‘তায়াম’ শব্দাবলী অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর এর তাৎপর্য হলো, ইবাদাতের মধ্যে মহব্বতের বরং পূর্ণ প্রেমের অর্থ নিহিত আছে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি অপর কোনো ব্যক্তির সামনে মাথা নত করে কিন্তু মহব্বত ও ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা খারাপ মন নিয়ে নত করে অথবা কাউকে ভালোবাসে বটে, কিন্তু তার সাথে বিনয়ের আচরণ করে না, তাহলে এ অবস্থায় তাকে বা বলা যাবে না : যেমন কখনো কখনো পিতা পুত্রের সাথে অথবা বন্ধুর সাথে এরূপ ব্যবহার করে।
‘ইবাদাত’ শব্দের এ ব্যাখ্যা সামনে রাখলে এ সত্য ও নিগূঢ় রহস্য নিজ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শরীআত আল্লাহর ইবাদাতের ব্যাপারে আমাদেরকে যে হুকুম দিয়েছে এবং যে জিনিসকে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করেছে, তার হক ততোক্ষণ পর্যন্ত আদায় হয় না যতোক্ষণ এর মধ্যে এ দুটো জিনিসের (বিনয় ও ভালোবাসা) সমন্বয় না ঘটবে। সেই সাথে আল্লাহকে দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে বেশী ভালোবাসতে ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বরং সত্য কথা তো হলো পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং পরিপূর্ণ বিনয় ও শ্রদ্ধা পাবার অধিকার তো একমাত্র আল্লাহরই। অনুরূপ ভালোবাসা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্য নাজায়েয। এভাবে এ ধরনের বিনয় ও ভালোবাসার প্রদর্শন বাতিল ও নাজায়েয গণ্য হবে যা আল্লাহর ফরমানের বাইরে আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা হবে। আল্লাহ বলেছেন :
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - توية : ٢٤
"হে নবী! বলো : যদি তোমাদের মাতাপিতা, তোমাদের সন্তান সন্ততি, তোমাদের ভাই-বোন, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়- স্বজন, ওই সম্পদ যা তোমরা উপার্জন করেছো, ওই ব্যবসা যার মন্দা হবার তোমরা ভয় করো, আর ওই বাড়ী ঘর যা তোমরা খুবই পসন্দ করো, যদি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা থেকে তোমাদের নিকট বেশী প্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর চূড়ান্ত হুকুম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।"-সূরা আত তাওবা : ২৪
এ আয়াত থেকে জানা গেলো প্রকৃত ভালোবাসা পাবার অধিকার আল্লাহ সোবহানাহু তাআলার। নবীকে ভালোবাসাও আল্লাহর আনুগত্যের শর্তে অন্তর্ভুক্ত। শরীআতের দৃষ্টিতে সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসা জরুরী। যেমন জরুরী তাঁর শর্তহীন আনুগত্য এবং সন্তুষ্টিলাভের আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ এরশাদ করেছেন :
وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَنْ يُرْضُوهُ - التوبة : ٦٢
"আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূলেরই সর্বাধিক অধিকার রয়েছে, তারা তাঁদের সন্তুষ্ট করবে।"-সূরা আত তাওবা : ৬২
এভাবে হুকুম ও নির্দেশ দেবার মালিক দু'জনই। যেমন এরশাদ হচ্ছে :
وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتْهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ لا - التوبة : ٥٩
"যদি এসব লোক আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যে জিনিস তাদের দিয়েছেন তার উপর রাজী থাকতো।"-সূরা আত তাওবা : ৫৯
মনে রাখতে হবে, ইবাদাত ও ইবাদাতের আনুসঙ্গিক বিষয়গুলোর যেমন তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ইত্যাদিরও হকদার শুধু আল্লাহই। আল্লাহর রাসূলও কোনো অবস্থাতেই এসব বিষয়ের সাথে শরীক নন। কুরআনে এরশাদ হয়েছে :
قُلْ يَاهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ ، فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ( ال عمران : ٦٤
"(হে নবী!) বলো : হে আহলে কিতাব ! আসো আমরা এমন একটি কথায় একমত হই যা আমাদের আর তোমাদের মধ্যে সমান। অর্থাৎ আমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদাত করবো, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আমাদের কেউ আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কাউকে ‘রব’ বানাবো না। তারপরও যদি তারা তোমার কথা না মানে তাহলে তাদেরকে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেকো আমরা মুসলমান।" -সূরা আলে ইমরান : ৬৪
এখন উভয় ধারণার একটি পূর্ণাঙ্গ আয়াত শুনুন :
وَلَوْأَنَّهُمْ رَضُوا مَا أَتُهُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ ، وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ سَيُؤْتِينَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُوْلُهُ : إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُونَ ( التوبة : ٥٩
"কতো ভালো হতো যদি এসব লোক সন্তুষ্ট থাকতো ওই জিনিসের উপর যা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তাদেরকে দান করেছেন। আর যদি বলতো আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তিনি অচিরেই আমাদেরকে আরো অনুগ্রহ দান করবেন এবং তাঁর রাসূলও। আমরা আল্লাহর দিকেরই অনুরাগী।"-সূরা আত তাওবা : ৫৯
কুরআনের এ আয়াত থেকে দুটো কথাই প্রমাণিত হলো। এখানেও আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ নিষেধের মালিক বলে প্রমাণিত হয়েছে:
وَمَا أَتْكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ ، وَمَا نَهْكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا الحشر : 7
“যে কথার হুকুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন তা গ্রহণ করো আর যা তিনি নিষেধ করেছেন তার থেকে বিরত থাকো।"-সূরা আল হাশর ৭
এ আয়াতেও এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, অর্থাৎ আল্লাহই যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সব কাজ সম্পন্নকারী। এ সত্যটিকেও একের অধিক আয়াতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যেমন :
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ال عمران : ۱۷۳
"আর যাদের নিকট লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের বিরুদ্ধে বিরাট সেনাবাহিনী সমবেত হয়েছে তাদেরকে ভয় করো। একথা শুনে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেলো। উত্তরে তারা বললো, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই সর্বোত্তম কর্মকর্তা।"-সূরা আলে ইমরান : ১৭৩
يأَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللهُ - الانفال : ٦٤
"হে নবী! আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"-সূরা আল আনফালঃ ৬৪
الَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ - الزمر : ٣٦
"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?"-সূরা আয যুমার: ৩৬
এখন আমি عبد ও عبادة এ দুটো শব্দের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো। عبد (আবদুন) শব্দটির দুটো অর্থ। প্রথম অর্থ হলো مُعَبُدُ আর দ্বিতীয় অর্থ হলো معبد - عابد অর্থাৎ, আল্লাহর ফায়সালার অনুগত ও বাধ্যগত গোলাম। যারা আল্লাহর হুকুমের সামনে জন্মগতভাবেই মাথানত। আর আল্লাহ সোবহানাহু তা'আলা তার অবস্থা ও অবস্থানকে যেভাবে খুশী গড়ে তুলেন ও ভেঙ্গে ফেলেন বা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেন।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ইবাদাতের প্রাকৃতিক অর্থ

📄 ইবাদাতের প্রাকৃতিক অর্থ


এ দিক দিয়ে বিশ্ব সৃষ্টির প্রতিটি অনু-পরমাণু কোনো 'শর্ত' বা 'কিন্তু' ছাড়াই আল্লাহর বান্দা। নেক্কার হোক কিংবা বদকার, মুনাফিক হোক অথবা কাফির, মুত্তাকী হোক কিংবা ফাসিক-ফাজির, জান্নাতী হোক অথবা জাহান্নামী, সবাই তাঁর সমান বান্দা বা দাস। কেননা আল্লাহ তাআলা সবার 'রব', মালিক ও সৃষ্টিকর্তা। এদের কেউই আল্লাহর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের বাইরে এক পা-ও বাড়াতে পারে না। তিনি যা চান তা-ই হয়। তা না হবার জন্য যতই আশা পোষণ করা হোক না কেন। এ সত্যটিই কুরআনে হাকীম এভাবে বর্ণনা করেছে:
أَفَغَيْرَ دِينِ اللهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ ( ال عمران : ۸۳
"তারা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আনুগত্যের বিধান অন্বেষণ করে? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবাই ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক তাঁরই নির্দেশের অধীন অনুগত হয়ে আছে। আর মূলতঃ তাঁর দিকেই একদিন সকলকে ফিরে যেতে হবে।"-সূরা আলে ইমরান: ৮৩
মোটকথা আল্লাহ তা'আলাই সকলের প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা, রিযিক দাতা এবং জীবন ও মৃত্যুর মালিক। তিনিই সকলের অন্তরকে ফিরিয়ে দেবার মালিক। সকলের পরিণাম পরিণতির অবস্থার ভিতর তাঁর ইচ্ছানুসারে হস্তক্ষেপকারী। তিনি ছাড়া তাদের কোনো রব, খালিক ও মালিক নেই। একথা চাই কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, একথা সম্পর্কে কেউ অবহিত হোক বা না হোক, তাতে কিছু যায় আসে না।
দাস ও দাসত্বের এই অর্থের দিক থেকে ঈমানদার ও কাফির উভয়েই আল্লাহর বান্দা। কিন্তু এর পরবর্তীতে গিয়ে দু'জনের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। উভয়ের মধ্যে পার্থক্যের এক সরলরেখা টানা হয়ে যায়। ঈমানদারগণ একটি স্পষ্ট কথা ও ধ্রুব সত্যের জ্ঞান রাখে এবং সেই জ্ঞানের সাথে সাথে হৃদয়ের গহীনে তার উপর বিশ্বাসও স্থাপন করে। কিন্তু যারা ঈমানের আলো থেকে বঞ্চিত, তারা হয় সেই মহাসত্যের জন্য যে জ্ঞান দরকার সে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। অথবা জ্ঞান তো আছে বটে, কিন্তু তারপর তা মেনে নিতে অস্বীকার করে বসে। প্রকৃত পরওয়ারদিগারের বিরুদ্ধে নিজের জ্ঞান-গরীমার বড়াই দেখিয়ে হঠকারিতায় নিমজ্জিত হয়। তাঁর সামনে মাথানত করার পরিবর্তে অহমিকা প্রদর্শন করে। যদিও ভিতরে থেকে তার মনও সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে তাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের রিযিক দেন। জেনে অস্বীকার আর না জেনে অস্বীকার করা উভয় প্রকার মানুষই ঈমান ও কুফরের দিক থেকে একই অবস্থার অধিকারী। দু'জনই সমানভাবে সত্যের অস্বীকারকারী। একথা চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই যে, দ্বিতীয় ধরনের লোকেরা সত্য সম্পর্কে অবহিত হলে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হবে। না, কখনো এমন নয়। আর যে জ্ঞান ঈমানের পথে পরিচালিত করে না, তাতো আরো বেশী আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফিরআউন ও ফিরআউনের অনুসারীদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ ( النمل : ١٤
"তারা সরাসরি যুলুম ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে এ নিদর্শনগুলো অস্বীকার করলো। অথচ তাদের মন এগুলোকে মেনে নিয়েছিলো। সুতরাং দেখো বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কত ভয়াবহ।” -সূরা আন নামল : ১৪
এভাবে আহলি কিতাবদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَ هُمْ ، وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ : البقرة : ١٤٦
"যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা তো তাকে ঠিক তেমনিভাবে চিনতে পারে যেমন চিনতে পারে নিজেদের সন্তানদেরকে। কিন্তু তাদের একটি দল জেনে বুঝে প্রকৃত সত্যকে গোপন করছে।" -সূরা আল বাকারা: ১৪৬
فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّلِمِينَ بِأَيْتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ - الانعام : ٣٣
"কিন্তু তারা শুধু তোমাকেই অমান্য করছে না বরং এ যালেমরা মূলতঃ আল্লাহর বাণী ও তাঁর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করছে।" -সূরা আল আনআম: ৩৩
মোটকথা আল্লাহ বান্দার পরওয়ারদিগার, সৃষ্টিকর্তা এবং সর্বাবস্থায়ই সে তাঁর মুখাপেক্ষী ও অনুগ্রহ লাভকারী। এ ধারণা বিশ্বাস ও স্বীকৃতিই বান্দার বন্দেগীর স্বীকৃতি যা আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়াতের সাথে জড়িত। এ ধরনের আত্মসমর্পিত ব্যক্তি নিজের প্রকৃত 'রবের' সামনে প্রয়োজনের সময় চাওয়া পাওয়ার হাত প্রশস্ত করতে পারে, কাকুতি মিনতি করতে পারে, তাঁর উপর ভরসা করতে পারে। কিন্তু এরপরও তাঁর হুকুম আহকাম মেনে চলার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প প্রমাণিত হয় না। তারা কখনো তাঁর হুকুম মানে, কখনো আবার মানে না। কখনো আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে, আবার কখনো শয়তান ও প্রতিমার সামনে মাথা নুইয়ে থাকে। অতএব এ ধরনের বন্দেগী অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার শুধু 'রব' সিফাতের উপর ইলম ও ইয়াকীনের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে মু'মিন বলা যেতে পারে না। আর এ ব্যক্তিকে এ কারণে জান্নাতী বলেও গণ্য করা যাবে না। এ ধরনের ঈমান থাকা আর না থাকা সমান। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ وَهُمْ مُشْرِكُوْنَ ٥ - يوسف : ١٠٦
"আর এদের অধিকাংশ তো আল্লাহর উপর এমনভাবে ঈমান পোষণ করে যে, সাথে অন্যকেও আল্লাহর শরীক করে।"-সূরা ইউসুফ: ১০৬
বস্তুত মুশরিকরাও একথা অস্বীকার করতো না যে, আল্লাহই সকলের খালিক ও রিযিকদাতা। কুরআনে কারীম কখনো এ ধরনের মু'মিনদেরকে সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা হিসেবে আল্লাহকে অস্বীকারকারী বলে অভিযুক্ত করে না। তাদের উপর অভিযোগ শুধু এই যে, তারা আল্লাহকে সকলের অস্তিত্বদানকারী, রিযিকদানকারী স্বীকার ও বিশ্বাস করার পরও অন্য শক্তিকে আল্লাহর বন্দেগীতে অংশিদার করে।
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَّنْ خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ : - العنكبوت : ٦١
“তুমি যদি এদের জিজ্ঞেস করো, যমীন ও আসমানকে কে সৃষ্টি করেছে এবং চাঁদ ও সুরুজ কে নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছে? তাহলে তারা নিশ্চয় জবাব দেবে: “আল্লাহ।”-সূরা আল আনকাবুত : ৬১
قُلْ لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيْهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ ، قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ قُلْ مَنْ رَّبُّ السَّمَوتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ ، قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ ، قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ ، قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ . - المؤمنون : ٨٩-٨٤
“তাদের জিজ্ঞেস করো এ যমীন ও এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কার? যদি জানো তবে বলো। এরা অবশ্যই জবাব দেবে, এসব আল্লাহর। বলো, তাহলে তোমরা সতর্ক হও না কেন? তাদেরকে জিজ্ঞেস করো সপ্ত আকাশ ও মহান আরশের মালিক কে? এরা অবশ্যই উত্তরে বলবে, 'আল্লাহ'। বলো, তাহলে তোমরা ভয় করোনা কেন? তাদেরকে বলো, তোমরা যদি জানো তবে জবাব দাও, সকল জিনিসের উপর কার কর্তৃত্ব চলছে? আর কে আছেন যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাকে আশ্রয় দিতে হয় না? এরা নিশ্চয়ই বলবে, এটাতো আল্লাহরই কাজ। তাহলে তোমরা কি যাদুর কারণে ধোঁকায় পড়ে যাও?”-সূরা আল মু'মিনূন : ৮৪-৮৯
আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা হবার বিষয়টা এত স্পষ্ট সত্য যে, জেনে বুঝে যা কোনো মানুষ অস্বীকার করতেই পারে না। আল্লাহর ফরমাবরদার খাস বান্দাদেরই শুধু এ বৈশিষ্ট্য নয় বরং তাঁর বিদ্রোহী নাফরমান 'বান্দারাও এ সত্য স্বীকার করে। এমনকি অভিশপ্ত ইবলিসও আল্লাহর সাথে অনেক কিছুর শরীক করার পরও এ সত্যকে অস্বীকার করার সাহস পায়নি। এমনকি 'অভিশপ্ত' হবার শাস্তি শুনার পরও তার মুখ থেকে সর্বপ্রথম একথা বের হয়ে এসেছে:
رَبِّ فَانْظُرْنِي إِلى يَوْمِ يُبْعَثُونَ - الحجر : ٣٦
"সে বলল, হে আমার প্রভু প্রতিপালক! যদি তা-ই হয় তবে আমাকে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যখন সব মানুষকে উঠানো হবে।"-সূরা আল হিজর : ৩৬
رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ
"ইবলিস বললো, হে আমার প্রভু প্রতিপালক! যেমন করে তুমি আমাকে গুমরাহ করেছো তেমন করে আমিও এখন পৃথিবীতে তাদের জন্য চাকচিক্যের সৃষ্টি করে তাদের সবাইকে গুমরাহ করে দেবো।" -সূরা আল হিজর : ৩৯
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ - ص : ৮২
"সে বললো, তোমার ইয্যতের কসম খেয়ে বলছি, আমি এসব লোককে বিভ্রান্ত করবো।"-সূরা সাদ: ৮২
এ সহ আরো অসংখ্য আয়াতের দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, শয়তান আল্লাহকেই প্রভু প্রতিপালক স্বীকার করে প্রকাশ্যভাবে, অন্য কাউকে নয়। আর এভাবে জাহান্নামবাসীরাও এ ধরনের স্বীকার উক্তিতে কারো থেকে পিছিয়ে থাকবে না। তারা একথা স্বীকার করবে যেঃ
رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شَقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالَّيْنَ - المؤمنون : ١٠٦
“হে আমাদের রব! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। সত্যিকারেই আমরা গুমরাহ লোক ছিলাম।" -সূরা আল মুমিনূন: ১০৬
الَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ ، قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا - - الانعام : ٣٠
"আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, এটা (জাহান্নামের সাজা) কি সংঘটিত হওয়া সত্য নয়? তারা তখন জবাব দেবে: হ্যাঁ, হে আমাদের প্রতিপালক! এটা সংঘটিত হওয়া অবশ্যই সত্য।"-সূরা আল আনআম : ৩০
অতএব যে ব্যক্তি এ সত্যে উপনীত হয়ে থেমে যায় এবং ওই ইবাদাত যার সাথে আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়াতের সম্পর্ক তার থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে শরীআতের বিধি পালন করে না এবং সেই ইবাদাতের অনুসারী হয় না। যার সম্পর্ক আল্লাহ তা'আলার উপাস্য হবার এবং রাসূলদের আনুগত্যের সাথে জড়িত। এমন ব্যক্তি কোনো অবস্থায়ই ইবলিস ও জাহান্নামবাসীদের চাইতে ভিন্ন নয়। প্রকৃতপক্ষে এসব মানুষ ওদেরই দলভুক্ত। নিজের এ অবস্থা সত্ত্বেও যদি কেউ নিজের সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করে যে, সে আল্লাহ তা'আলার খাস বান্দা, নিকটবর্তী অলী, আরেফ এবং পূর্ণতা লাভকারীদের মধ্যে গণ্য, শরীআতের অনুসরণ করার দায়-দায়িত্ব তার নেই। তাহলে এমন ব্যক্তি কাফির ও নাস্তিকের চেয়েও বেশী গুমরাহ। আর যে ব্যক্তি খিযির অথবা কোনো বুযুর্গ সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করে যে, তাঁরা শরীআতের হুকুম আহকাম পালন করার জন্য বাধ্য নয়। কারণ তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর রহস্যময় ব্যাপারসমূহ সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছেন। তাদের এ ধারণা আল্লাহ অস্বীকারকারীদের বক্তব্যের চেয়েও আরো বেশী অসার ও ভিত্তিহীন।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ইবাদাতের বিশেষিত অর্থ

📄 ইবাদাতের বিশেষিত অর্থ


'আব্দ' শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হলো 'আবেদ'। অর্থাৎ এমন দাস যারা শুধু আল্লাহরই হুকুম পালন করে। আর কারো হুকুমের সামনে তারা মাথা নত করে না। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের হুকুম নির্দেশের অনুসরণ করে। তারা সৎ ও মুত্তাকী বান্দাদের সাথে সম্পর্ক ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে, তারা নাফরমান ও বিদ্রোহী বান্দাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ ধরনের বান্দাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি গণ্য হতে পারে না, যে আল্লাহর প্রভু প্রতিপালক হওয়াকে তো মানে, কিন্তু তার ইবাদাত ও আনুগত্য করে না। অথবা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কোনো ইলাহর দাসত্ব করে। কেননা কোনো সত্তাকে ইলাহ মানার অর্থ হলো, মানুষের হৃদয়মন পূর্ণ একাগ্রতা ঐকান্তিকতা, ভালোবাসা ও পূর্ণ মাত্রার সম্মানবোধ, ভয়-ভীতি, আশা-নিরাশা, সবর-শোকর, নৈকট্য ও তাওয়াক্কুলের গভীর আবেগানুভূতির সাথে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়া। অতএব যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়াও অন্য কাউকে 'মাবুদ' ও 'ইলাহ' বানিয়ে নেয়, তখন তার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, সে নিজের আনুগত্যের আবেগানুভূতি ও ঐকান্তিকতা ও ভালোবাসার উপলব্ধিকে বিভক্ত করে দেয়। তখন সে আর শুধু আল্লাহর ইবাদাতগুযার হিসেবেই অবশিষ্ট থাকে না। বরং অবস্থা প্রকৃতপক্ষে এমন হয়ে যায় যে, এ ধরনের ব্যক্তি সাধারণত নিজের সকল কামনা বাসনার বিষয় গায়রুল্লাহর নিকট সমর্পন করে বসে।
আল্লাহর দাস ও দাসত্বের এ ধারণা আল্লাহ তা'আলার 'ইলাহ' হবার সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ তাঁকে 'ইলাহ' মানার মাধ্যমেই তাঁর দাস ও দাসত্বের দাবী পূর্ণ করা সম্ভব। এ জন্যই তাওহীদের মূল শিরোনামই হলো-
لا اله الا الله - "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।”
এটাই হলো আল্লাহর দাস হওয়া এবং তাঁর দাসত্ব করার সেই ধারণা, আল্লাহর দৃষ্টিতে যা গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিদান পাবার যোগ্য। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার নিকট এরূপ দাসত্বেরই দাবী করেন। এ দাসত্বই তাঁর নেক ও বুযুর্গ বান্দাদের বিশেষ গুণাগুণ ও মর্যাদার প্রতীক। দাসত্বের এ ধারণার প্রচার ও প্রসারের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে দাস ও দাসত্বের প্রথম অর্থ এমন এক জিনিস, আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং যেমন আগে বর্ণিত হয়েছে যে, এতে কাফির ও মু'মিন সকলে এক সমান। দাসত্বের এ অর্থের দিক দিয়ে একজন কাফিরও আল্লাহর সেরকম দাস যেমন একজন মু'মিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00